দিল্লির BRICS মঞ্চে না গিয়ে ঢাকা কি নতুন কূটনৈতিক বার্তা দিল?

তারেক রহমানের অনুপস্থিতি, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং নতুন বাস্তবতার প্রশ্ন

সহিদুল আলম স্বপন
জেনেভা, সুইজারল্যান্ড
প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৩৫ পিএম
আপডেট: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:০৮ এএম
Main News Image

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে সব বার্তা মঞ্চে দাঁড়িয়ে দেওয়া হয় না। কখনো কখনো অনুপস্থিতিও একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ভাষা হয়ে ওঠে।

নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত BRICS সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্তকে ঘিরে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। কেউ এটিকে কূটনৈতিক সুযোগ হারানো বলছেন, আবার কেউ দেখছেন বাংলাদেশের নতুন পররাষ্ট্রনীতির একটি সচেতন সংকেত হিসেবে।

বাস্তবতা সম্ভবত এই দুইয়ের মাঝখানে।

প্রশ্নটি আসলে BRICS-এ যাওয়া না যাওয়ার নয়। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ এখন ভারতের সঙ্গে তার সম্পর্ককে কোন ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে চায়।

কূটনীতিতে অনুপস্থিতিও কখনো বার্তা

ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল মূলত BIMSTEC-এর বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর জন্য একটি পৃথক দ্বিপক্ষীয় ভারত সফরের সম্ভাবনাও ছিল।

ঢাকা শেষ পর্যন্ত যে পথটি বেছে নিয়েছে, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা বহন করতে পারে।

বাংলাদেশ হয়তো বোঝাতে চেয়েছে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে সেটিকে কোনো বহুপক্ষীয় সম্মেলনের পার্শ্ব বৈঠকের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। দুই দেশের সম্পর্কের জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলাদা রাজনৈতিক গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।

এটি ভারতবিরোধী অবস্থান নয়। আবার নিছক আনুষ্ঠানিক দূরত্ব তৈরির চেষ্টাও নয়। বরং একটি পরিণত ও আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের নিজস্ব কূটনৈতিক পরিসর প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা যেতে পারে।


BRICS গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বাংলাদেশের সবকিছু নয়


BRICS বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম আলোচিত বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্ম। বৈশ্বিক অর্থনীতি, উন্নয়ন অর্থায়ন, দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে এই জোট নানা আলোচনা করছে।

তবে BRICS এখনো ইউরোপীয় ইউনিয়ন অথবা ন্যাটোর মতো কোনো সুসংহত রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কাঠামোয় পরিণত হয়নি। এর সদস্য দেশগুলোর মধ্যেও কৌশলগত প্রতিযোগিতা ও মতপার্থক্য রয়েছে।

তাই BRICS-এর একটি আউটরিচ অধিবেশনে বাংলাদেশের অনুপস্থিতিকে জাতীয় কূটনীতির বড় ধরনের ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ কম।

বাংলাদেশের জন্য BRICS গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্ভাবনার ক্ষেত্র। কিন্তু ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সম্পর্কের বিকল্প নয়।

পররাষ্ট্রনীতিতে বাস্তববাদই সবচেয়ে বড় বিষয়। প্রতিটি মঞ্চে উপস্থিত থাকাই সাফল্য নয়। বরং কোথায়, কখন এবং কোন উদ্দেশ্যে উপস্থিত হওয়া হবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

দিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের আসল পরীক্ষা এখনো বাকি

ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী। ভৌগোলিক বাস্তবতা, নিরাপত্তা, অর্থনীতি, নদী, বাণিজ্য এবং যোগাযোগের প্রশ্নে দুই দেশ অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত।

সেই কারণে প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়, "প্রধানমন্ত্রী দিল্লি গেলেন কি গেলেন না।"

প্রশ্ন হওয়া উচিত, "বাংলাদেশ কী অর্জন করতে চায়?"

যদি কোনো রাষ্ট্রীয় সফর শুধু ছবি তোলা, যৌথ বিবৃতি প্রকাশ এবং সৌজন্য বিনিময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তার প্রকৃত মূল্য খুব বেশি নয়।

অন্যদিকে, যদি আলোচনার টেবিলে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়গুলো বাস্তব অগ্রগতির পথে এগিয়ে যায়, তাহলে সেটিই হবে সফল কূটনীতি।


গঙ্গা ও তিস্তা: সময় ফুরিয়ে আসছে


বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে পানিবণ্টন এখনও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোর একটি।

১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে। আগামী বছরগুলোতে নতুন কাঠামো বা নবায়ন নিয়ে আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

একই সঙ্গে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত।

বাংলাদেশের জনগণ এখন জানতে চায়:

গঙ্গা চুক্তির ভবিষ্যৎ কী?

তিস্তা সমস্যার কোনো অগ্রগতি হবে কি?

অভিন্ন নদীগুলোর পানি ব্যবস্থাপনায় নতুন উদ্যোগ আসবে কি?

এসব প্রশ্নের উত্তর করিডোর বৈঠকে পাওয়া যাবে না। প্রয়োজন সুসংগঠিত, ফলাফলভিত্তিক উচ্চপর্যায়ের আলোচনা।


সীমান্ত, বাণিজ্য ও নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ


পানি ইস্যুর পাশাপাশি সীমান্তে প্রাণহানি, বাণিজ্য ঘাটতি, পণ্যের বাজার প্রবেশাধিকার, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা, রেল ও সড়ক যোগাযোগ, আঞ্চলিক সংযোগ এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয়গুলোও বাংলাদেশের অগ্রাধিকার তালিকায় থাকা উচিত।

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের একটি প্রশ্ন রয়েছে: দুই দেশের সহযোগিতা থেকে দুই পক্ষই কি সমানভাবে লাভবান হচ্ছে?

এই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর খুঁজে বের করাই আগামী দিনের কূটনীতির বড় চ্যালেঞ্জ।


প্রত্যর্পণ ইস্যুতেও প্রয়োজন বাস্তববাদ


শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্ন সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের কূটনৈতিক আলোচনায় একটি স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে উঠেছে।

তবে আবেগ বা রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে গিয়ে বিষয়টিকে আইনি ও কূটনৈতিক কাঠামোর মধ্যেই দেখতে হবে।

প্রত্যর্পণ আন্তর্জাতিক আইন, দ্বিপক্ষীয় চুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট দেশের বিচারিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি জটিল বিষয়।

সুতরাং এই প্রশ্নে জনমতের আবেগ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।


বাংলাদেশের সামনে নতুন সুযোগ: BIMSTEC

BRICS নিয়ে আলোচনা হলেও বাস্তবে বাংলাদেশের জন্য BIMSTEC আরও কার্যকর কৌশলগত প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডকে যুক্ত করা এই জোট দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে অনন্য একটি সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারে।

যদি বাংলাদেশ BIMSTEC-এর নেতৃত্বকে কাজে লাগিয়ে বাণিজ্য, কানেক্টিভিটি, সমুদ্র অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা, জ্বালানি এবং জলবায়ু সহযোগিতায় বাস্তব অগ্রগতি দেখাতে পারে, তাহলে দেশটির আঞ্চলিক গুরুত্ব বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।

সেটি একটি সম্মেলনে উপস্থিতির চেয়েও বড় অর্জন হবে।


বন্ধুত্ব থাকবে, নির্ভরতাহীন


বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ভারসাম্য।

ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রয়োজন। কিন্তু সেই সম্পর্ক যেন নির্ভরতায় রূপ না নেয়।

চীনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু কোনো পক্ষ বেছে নেওয়ার রাজনীতিতে নয়।

যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য ও ASEAN-এর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়বে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আপস করে নয়।

একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পররাষ্ট্রনীতি হতে পারে "বহুমুখী অংশীদারিত্ব, একমুখী নির্ভরতা নয়"।


অনুপস্থিতি নয়, ফলাফলই হবে আসল মাপকাঠি


দিল্লির BRICS মঞ্চে না যাওয়া নিজে কোনো বিজয় নয়।

আবার এটিকে কূটনৈতিক ব্যর্থতাও বলা যাবে না।

এর প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হবে পরবর্তী পদক্ষেপে।

যদি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটি সুপরিকল্পিত দ্বিপক্ষীয় ভারত সফরের উদ্যোগ নেওয়া হয়, যেখানে পানি, বাণিজ্য, সীমান্ত, যোগাযোগ, জ্বালানি ও নিরাপত্তা বিষয়ে পরিমাপযোগ্য অগ্রগতি অর্জনের লক্ষ্য থাকে, তাহলে এই অনুপস্থিতি বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

কিন্তু যদি এর পরে কোনো বাস্তব কূটনৈতিক উদ্যোগ না দেখা যায়, তাহলে এই সিদ্ধান্ত কেবল প্রতীকী অবস্থান হিসেবেই থেকে যাবে।


শেষ কথা


বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কোনো একটি সম্মেলনের মঞ্চে নির্ধারিত হবে না।

সেটি নির্ধারিত হবে আলোচনার টেবিলে, যেখানে থাকবে স্পষ্ট এজেন্ডা, পারস্পরিক সম্মান, সমমর্যাদা এবং বাস্তব ফলাফলের প্রত্যাশা।

বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু নির্ভরতা নয়।

সহযোগিতা থাকবে, কিন্তু একতরফা সুবিধা নয়।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু বাংলাদেশের নিজস্ব কূটনৈতিক পরিসরও থাকবে।

সেই অর্থে দিল্লির BRICS মঞ্চে তারেক রহমানের অনুপস্থিতি হয়তো কোনো সমাপ্তি নয়। বরং এটি একটি বড় প্রশ্নের সূচনা।

বাংলাদেশ কি এবার ভারতের সঙ্গে তার সম্পর্ককে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে প্রস্তুত?

এই প্রশ্নের উত্তর BRICS-এর সম্মেলন কক্ষে নয়, বরং ঢাকা ও দিল্লির ভবিষ্যৎ আলোচনার টেবিলেই নির্ধারিত হবে।