মুক্ত কর ভয়
মাঝেমধ্যে আমি ভাবি, হয় আমি পাগল, নয়তো আমার ঘোড়া পাগল। তা না হলে আমার জীবনে এত ঘনঘন দুর্ঘটনা ঘটে কেন? আবার এও ভাবি, আমি যা, আপনিও তো তা। সুতরাং আমরা দুজনে মিলেমিশে যা তা! আমার অনেক অযোগ্যতার মধ্যেও কেউ যদি সামান্যতম যোগ্যতা খুঁজে পান, তিনিই তো আমার আপনজন! তিনিই তো আমার পরম বন্ধু।
মানুষ বড় হয়, লেখাপড়া করে সম্মানিত হয়। কেউ আবার খেলাধুলার মাধ্যমে সম্মান অর্জন করে। সংস্কৃতিচর্চা, যেমন গান, নৃত্য কিংবা আবৃত্তি করেও কেউ কেউ বড় হয়। অর্থাৎ বড় ও সম্মানিত হওয়ার বহুবিধ উপায় রয়েছে। পদ্ধতিগুলো আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আপনার জন্য যেটি উপযুক্ত মনে হবে, আপনি সেটিই বেছে নিন।
দেখুন, আমার জন্ম গ্রামে হলেও আমি ভালো অভিভাবক পেয়েছিলাম। ভালো একটি বিদ্যালয়, ভালো শিক্ষক ও সুন্দর একটি সাংস্কৃতিক পরিবেশ পেয়েছিলাম। সামাজিক অভিভাবকও পেয়েছিলাম, যেমন চাচা, জেঠা, মামা, খালু ও গ্রামের মুরব্বিরা। অর্থাৎ আমি বলতে চাইছি, ভালোর প্রতি আমার আগ্রহ বরাবরই ছিল; মন্দের প্রতি ঝোঁক সেই ছোটবেলা থেকেই কম ছিল।
যেদিন থেকে আমার ব্যক্তিগত বিকাশ শুরু হলো, সেদিন থেকেই আমি আমার আবেগনির্ভর সিদ্ধান্তগুলো নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছি। বহুকাল ধরেই আমি নিজেকে ‘নোবডি’ ভাবার পরিবর্তে ‘সামবডি’ ভাবতে বেশি পছন্দ করি। আমার মনে হয়, আমরা প্রত্যেকেই যার যার বৃত্তে সামবডি। সবাই নিজ নিজ পরিসরে স্বীকৃতি চায়। আমাকে সম্মান করার লোক যদি দশজন থাকে, অসম্মান করার লোকও বিশজন আছে।
আমাদের সময়ে জীবন অনেক সহজ ও সুন্দর ছিল। আর এখন কথা বলার আগেও হিসাব করতে হয়। কে কোন কথার কী অর্থ করবেন, তা তিনিই ভালো জানেন! তর্ক যদি বোঝার জন্য হয়, সেটি ভালো; আর যদি জেতার জন্য হয়, তবে সেটি খারাপ। মিসওয়াক সাত ইঞ্চি হবে, নাকি নয় ইঞ্চি হবে, এ নিয়ে এখন তর্কাতর্কি; তারপর হাতাহাতি; শেষে দাঁতটাই ভেঙে দিল! তাহলে কী হলো? অথচ আমাদের সমাজে এখন এমন ঘটনাই ঘটছে।
মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব ঘোষণা করা হয়েছে। অন্য প্রাণীদের জিজ্ঞেস করে কি তা করা হয়েছে? কিংবা কোনো ভোটাভুটি হয়েছিল কি? অথচ মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব, কিসের ভিত্তিতে? এর মাপকাঠিই বা কী?
আমি আজ পর্যন্ত কোনো প্রাপ্তবয়স্ক কুকুরকে শিশু কুকুর ধর্ষণ করতে দেখিনি; অথচ মানুষ শিশুকন্যাকে ধর্ষণ করে। তাহলে শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড কোথায়? কিংবা ধরুন, উড়তে পারার ক্ষমতাই যদি শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড হয়, তাহলে তো পাখিরাই শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার। প্রজাপতি সুন্দর, সুতরাং সেও শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করতে পারে। কে জানে, কোনো একদিন হয়তো ফুলও শ্রেষ্ঠত্বের দাবি করে বসবে! কিংবা মাছও বলতে পারে, ‘আমি পানিতে সাঁতার কাটতে পারি।’ এটিই হবে তার শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড।
মানুষ এক আজব প্রাণী। সে জানে, তার এই শ্রেষ্ঠত্বের দাবির বিরুদ্ধে কোনো প্রাণী কোনো দিন আপিল করবে না। মানুষ যত দিন অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকবে, তত দিন তার স্রষ্টার প্রয়োজন হবে।
এখন কোনো কিছুতেই আর মন বসাতে পারি না। সম্ভবত এটি বয়সের ত্রুটি। জীবন তো এমনই, কখনো ভিড়, আবার কখনো নির্জনতা। তারপরও নিজের কোনো বিকল্প আমি খুঁজে পাই না।
গৌতম বুদ্ধকে আমি এখনো একজন শ্রেষ্ঠ মানুষ বলেই মানি। কারণ, তাঁর কাছ থেকেই আমি শিখেছি, “বিশ্বাসে মুক্তি আসে না; মুক্তি আসে চিন্তা ও জ্ঞানে।” তিনি আরও বলেছেন, “যে কাজ দোষহীন ও কল্যাণকর, তুমি তাই করবে; আর তাতেই তুমি মুক্তি পাবে।”
আমার কথা হচ্ছে, বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে সীমা ও সম্মান দুটিই রক্ষা করতে হবে। কোথায় কাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, সেই বোধবুদ্ধি তোমাদের থাকতে হবে। মুরব্বিরা যদি ছটফট করতে করতে মারা যান, আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, তোমাদের একটি শ্বাস থেকে আরেকটি দীর্ঘশ্বাসের দূরত্ব বেড়ে যাবে।
মনকে এমনভাবে তৈরি করো, যেন তোমার ব্যবহারে অন্যের মন বিঘ্নিত না হয়।