কৃষকের বন্ধু খেঁকশিয়াল কেন হারিয়ে যাচ্ছে
বাংলাদেশে পরিবেশ ও খাদ্যশৃঙ্খলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণী খেঁকশিয়াল (বেঙ্গল ফক্স) দ্রুত বিলুপ্তির পথে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থার (IUCN) চলমান মূল্যায়নে প্রাণীটি 'সংকটাপন্ন' (Vulnerable) থেকে 'বিপন্ন' (Endangered) শ্রেণিতে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বাসস্থানের অভাব, গৃহপালিত পশু-পাখি শিকারের ভুল ধারণা এবং স্থানীয় মানুষের হাতে হত্যার কারণে প্রাণীটির অস্তিত্ব এখন বিপন্ন।
খেঁকশিয়াল ও পাতিশিয়ালের পার্থক্য
সাধারণ মানুষ প্রায়শই খেঁকশিয়াল ও পাতিশিয়ালকে একই প্রাণী মনে করে। তবে প্রাণিবিজ্ঞানের শ্রেণিবিন্যাস ও শারীরিক গঠনে এদের স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে:
খেঁকশিয়াল (Bengal Fox - Vulpes bengalensis):
শারীরিক গঠন: আকারে ছোট ও হালকা, মুখ সরু, কান বড় এবং ঘন ঝোপালো লেজের ডগায় স্পষ্ট কালো রঙ থাকে।
গায়ের রঙ: হালকা ধূসর বা ছাই রঙের।
বাসস্থান ও ডাক: নির্জন চরাঞ্চল, পুকুরপাড় বা নদীর পাড়ের বেলে-দোআঁশ মাটিতে জটিল নেটওয়ার্কভিত্তিক সুড়ঙ্গ বা টানেল তৈরি করে থাকে। এদের ডাক তীক্ষ্ণ 'খেঁক-খেঁক' ধরনের।
পাতিশিয়াল (Golden Jackal - Canis aureus)
শারীরিক গঠন: আকারে বড়, দেখতে বুনো কুকুরের মতো, পা লম্বা এবং লেজে খেঁকশিয়ালের মতো কালো ডগা থাকে না। গায়ের রঙ: সোনালি-বাদামি থেকে কালচে-বাদামি। বাসস্থান ও ডাক: যেকোনো পরিবেশে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারে এবং মানুষের বসতির কাছে সাধারণ গর্তে থাকে। এদের ডাক দীর্ঘ 'হুক্কাহুয়া' প্রকৃতির।
কেন খেঁকশিয়ালকে 'কৃষকের বন্ধু' বলা হয়?
কৃষকদের মাঝে প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে খেঁকশিয়াল হাঁস-মুরগি খেয়ে ফেলে। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, খেঁকশিয়াল অত্যন্ত বিরলভাবে হাঁস-মুরগি শিকার করে; এই কাজটি মূলত আকারে বড় পাতিশিয়াল করে থাকে।
খেঁকশিয়ালের মূল খাবার হলো ফসলের জন্য ক্ষতিকারক ইঁদুর, নানা ধরনের কীটপতঙ্গ, ছোট সরীসৃপ, ফলমূল ও মৃত প্রাণী। ইঁদুর ও পোকা-মাকড় খেয়ে এটি প্রাকৃতিক উপায়ে ফসলের সুরক্ষা দেয় এবং পরিবেশ পরিষ্কার রাখতে সহায়তা করে। ফলে পরিবেশবিদদের মতে, খেঁকশিয়াল ক্ষতিকর প্রাণী নয়, বরং কৃষকের প্রকৃত বন্ধু।
বিলুপ্তির প্রধান কারণসমূহ
আবাসস্থল ধ্বংস: খেঁকশিয়াল নিভৃতচারী এবং পরিবারকেন্দ্রিক প্রাণী। মাটির নিচে গুহা তৈরির জন্য এরা শান্ত, শুকনো ও জনমানবহীন এলাকা পছন্দ করে। কিন্তু চরাঞ্চল ও নদী অববাহিকায় মানুষের কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির ফলে এদের থাকার জায়গা শেষ হয়ে আসছে।
মানুষের ভুল ধারণা ও সংঘাত: পাতিশিয়ালের হাঁস-মুরগি শিকারের দায় খেঁকশিয়ালের ওপর পড়ে। ফলে অসচেতন গ্রামবাসীদের হাতে অন্যায়ভাবে খেঁকশিয়াল মারা পড়ে।
সীমিত ভৌগোলিক বিস্তৃতি: একসময় সারা দেশে দেখা গেলেও বর্তমানে এরা মূলত বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের (যেমন: পঞ্চগড়, রাজশাহী, দিনাজপুর, মাগুরা, কুষ্টিয়া) নির্দিষ্ট অঞ্চল এবং মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের কিছু এলাকায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
বর্তমান সংরক্ষণ অবস্থা ও আইন
বিশ্বজুড়ে খেঁকশিয়াল এখনও বিলুপ্তির তাৎক্ষণিক ঝুঁকিতে না থাকলেও (IUCN গ্লোবাল তালিকায় Least Concern), বাংলাদেশে এদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। বর্তমানে বন বিভাগ ও আইইউসিএন বাংলাদেশে ২০২৬ সালের প্রাণী রেড লিস্ট হালনাগাদের কাজ করছে, যেখানে খেঁকশিয়ালকে ‘বিপন্ন’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, খেঁকশিয়ালসহ যেকোনো শিয়াল হত্যা করা, এদের মাংস খাওয়া বা বিক্রি করা আইনত দণ্ডনীয় ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষা ও কৃষির সুবিধার্থে এই নিরীহ প্রাণীটির বাসস্থান সুরক্ষা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।