আশ্রয়, না রাজনৈতিক মঞ্চ: ভারতের মাটিতে নির্বাসিত নেতাদের তৎপরতার আইনি সীমা
রাজনৈতিক অভ্যুত্থান, গণ-আন্দোলন, গৃহযুদ্ধ কিংবা ক্ষমতার পালাবদলের পর প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় নেওয়ার ঘটনা দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন নয়। ভৌগোলিক অবস্থান ও আঞ্চলিক প্রভাবের কারণে ভারত বহুবার অন্য দেশের ক্ষমতাচ্যুত রাজনীতিক, রাজপরিবারের সদস্য, ধর্মীয় নেতা ও রাজনৈতিক কর্মীদের আশ্রয় দিয়েছে।
মানবিক কারণে জীবন রক্ষা করা অবশ্যই একটি সভ্য রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল আচরণ। কিন্তু আশ্রয়প্রাপ্ত কোনো নেতা যখন ভারতের মাটিতে বসে নিজের দেশের সরকার, নির্বাচন কিংবা রাজনৈতিক আন্দোলন নিয়ে নিয়মিত বক্তব্য দেন, তখন প্রশ্ন ওঠে ভারতের সংবিধান কি তাঁকে সেই অধিকার দিয়েছে? ভারত সরকার কি এমন তৎপরতা বন্ধ করতে পারে? আদালতই-বা বিদেশিদের অধিকার সম্পর্কে কী বলেছেন?
আইনের আলোকে আশ্রয় দেওয়া এবং আশ্রিত ব্যক্তিকে রাজনৈতিক তৎপরতার সুযোগ দেওয়া এক বিষয় নয়। প্রথমটি ভারতের সার্বভৌম ও মানবিক সিদ্ধান্ত; দ্বিতীয়টি ভারতের আইন, ভিসার শর্ত, জাতীয় নিরাপত্তা এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্ন।
সংবিধানে রাজনৈতিক আশ্রয়ের মৌলিক অধিকার নেই
ভারতের সংবিধানে “রাজনৈতিক আশ্রয়ের অধিকার” নামে কোনো স্বতন্ত্র মৌলিক অধিকার নেই। ভারত ১৯৫১ সালের জাতিসংঘ শরণার্থী কনভেনশন কিংবা ১৯৬৭ সালের প্রটোকলের পক্ষভুক্তও নয়। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে বলেছে, শরণার্থী ও আশ্রয়সংক্রান্ত বিষয় ভারতের জাতীয় আইনের অধীন পরিচালিত হয়।
ফলে কোনো বিদেশি রাজনৈতিক নেতা দাবি করতে পারেন না যে ভারত তাঁকে আশ্রয় দিতে সাংবিধানিকভাবে বাধ্য। কাকে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে, কে কত দিন থাকবেন এবং তাঁর অবস্থানের ওপর কী শর্ত থাকবে এসব সিদ্ধান্ত প্রধানত কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে।
২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর Immigration and Foreigners Act, 2025 এবং Immigration and Foreigners Order, 2025 বিদেশিদের প্রবেশ, অবস্থান, চলাচল ও বহিষ্কারের বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারকে ব্যাপক ক্ষমতা দিয়েছে। এর মাধ্যমে পুরোনো Foreigners Act, 1946 এবং Foreigners Order, 1948 প্রতিস্থাপিত হয়েছে।
নতুন আদেশ অনুসারে, কোনো বিদেশিকে ভারতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার সময় কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় শর্ত আরোপ করতে পারে। কেন্দ্রীয় সরকার পরবর্তী সময়ে সেই শর্ত পরিবর্তন বা বাতিলও করতে পারে। লিখিত আদেশের মাধ্যমে কোনো বিদেশির বাসস্থান, চলাচল এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা শ্রেণির মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত করার ক্ষমতাও কর্তৃপক্ষের রয়েছে।
অতএব, কাউকে আশ্রয় দেওয়া মানেই তাঁকে ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে সীমাহীন রাজনৈতিক প্রচারণা চালানোর অনুমতি দেওয়া নয়।
বিদেশির মতপ্রকাশের অধিকার কতটুকু?
ভারতের সংবিধান নাগরিক ও বিদেশির অধিকারের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য করেছে।
সংবিধানের ১৪ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং ২১ অনুচ্ছেদে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষা “প্রত্যেক ব্যক্তি”কে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ বৈধ বা অবৈধভাবে অবস্থানরত বিদেশির জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
কিন্তু ১৯(১)(ক) অনুচ্ছেদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কেবল ভারতের নাগরিকদের জন্য। একজন বিদেশি রাজনৈতিক নেতা এই অনুচ্ছেদের অধীনে ভারতীয় নাগরিকের সমান মতপ্রকাশের মৌলিক অধিকার দাবি করতে পারেন না।
Louis De Raedt বনাম Union of India মামলায় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বলেন, বিদেশিরা ২১ অনুচ্ছেদের সুরক্ষা পেলেও ভারতে অবস্থান ও বসবাসের মৌলিক অধিকার তাঁদের নেই। আদালত পরবর্তী বিভিন্ন রায়েও পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে ১৯ অনুচ্ছেদের অধিকার বিদেশিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
অন্যদিকে National Human Rights Commission বনাম State of Arunachal Pradesh মামলায় সুপ্রিম কোর্ট চাকমা জনগোষ্ঠীর জীবন ও নিরাপত্তা রক্ষার নির্দেশ দেন। এর মাধ্যমে আদালত বোঝান যে ভারতীয় নাগরিক না হলেও কাউকে বেআইনিভাবে ভয় দেখানো, আক্রমণ বা জোর করে বিতাড়িত করা যাবে না।
আর Mohammad Salimullah বনাম Union of India মামলায় রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের প্রশ্নে আদালত স্বীকার করেন যে ১৪ ও ২১ অনুচ্ছেদের সুরক্ষা বিদেশিদের জন্যও প্রযোজ্য; তবে ১৯ অনুচ্ছেদের অধিকার এবং ভারতে স্থায়ীভাবে বসবাসের অধিকার তাঁদের নেই। আদালত জাতীয় নিরাপত্তা ও সরকারের অভিবাসন-নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাকেও গুরুত্ব দেন।
এসব রায়ের সারকথা হচ্ছে বিদেশির জীবন ও মানবিক মর্যাদা সুরক্ষিত, কিন্তু ভারতে থাকা কিংবা এখান থেকে রাজনৈতিক প্রচারণা চালানো তাঁর অবাধ মৌলিক অধিকার নয়।
শেখ হাসিনার ঘটনা: আশ্রয় থেকে কূটনৈতিক বিরোধ
এই প্রশ্নের সবচেয়ে সাম্প্রতিক উদাহরণ বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০২৪ সালের আগস্টে গণ-আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা হারানোর পর তিনি ভারতে যান এবং সেখানে অবস্থান করতে থাকেন। ভারত সরকার জানায়, নিরাপত্তাজনিত কারণে তিনি ভারতে এসেছেন।
ভারতে অবস্থানকালে শেখ হাসিনা অনলাইন ভাষণ ও রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে বাংলাদেশের সরকার, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং তাঁর দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে মতামত দিয়েছেন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতকে অনুরোধ করে যেন শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে “মিথ্যা ও উসকানিমূলক” বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত রাখা হয়। তাঁর একটি অনলাইন ভাষণের পর ঢাকায় উত্তেজনা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে বলেও বাংলাদেশ অভিযোগ করে।
২০২৬ সালে দিল্লিতে তাঁর একটি সংবাদমাধ্যমের আয়োজন নিয়ে ঢাকা আবার আপত্তি জানায়। ভারত অবশ্য জানায়, সরকার অনুষ্ঠানটি আয়োজন বা সমর্থন করেনি। কিন্তু বাংলাদেশের আপত্তির কেন্দ্রীয় বক্তব্য ছিল ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে একজন ক্ষমতাচ্যুত নেতা যদি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি প্রভাবিত করেন, তাহলে সেটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর। এই সংবাদ সম্মেলন বাংলাদেশের মনে ভারতের অবস্থান এবং সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে ।
আইনগতভাবে শেখ হাসিনা ভারতীয় নাগরিক নন। ফলে তিনি ভারতের সংবিধানের ১৯ অনুচ্ছেদের অধীনে অবাধ রাজনৈতিক বক্তব্যের অধিকার দাবি করতে পারেন না। ভারত সরকার চাইলে তাঁর অবস্থানের শর্ত হিসেবে সংবাদ সম্মেলন, অনলাইন ভাষণ, দলীয় নির্দেশনা কিংবা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক যোগাযোগ সীমিত করতে পারে।
তবে কোনো নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা না থাকলে তাঁর প্রতিটি মন্তব্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধ হয়ে যাবে এ কথাও সঠিক নয়। বক্তব্যটি অপরাধমূলক কি না, অবস্থানের কোনো শর্ত ভঙ্গ করেছে কি না এবং ভারত সরকার তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চায় কি না এসব পৃথকভাবে পরীক্ষা করতে হবে।
দালাই লামা: আশ্রয় ও নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক পরিসর
১৯৫৯ সালে তিব্বতে চীনা শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর দালাই লামা ভারতে আশ্রয় নেন। পরবর্তী সময়ে হিমাচল প্রদেশের ধর্মশালায় তিব্বতিদের নির্বাসিত প্রশাসন গড়ে ওঠে। দালাই লামা ও তিব্বতি নেতারা কয়েক দশক ধরে তিব্বতের স্বায়ত্তশাসন, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলে আসছেন।
কিন্তু তাঁদের রাজনৈতিক কার্যক্রম যে পুরোপুরি সীমাহীন নয়, তার বাস্তব উদাহরণও রয়েছে। ২০১৮ সালে দিল্লিতে তিব্বতি নির্বাসনের ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বড় অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনা থাকলেও ভারত-চীন সম্পর্কের সংবেদনশীলতার কারণে তা ধর্মশালায় সরিয়ে নেওয়া হয়। সেই সময়ে দিল্লিতে তিব্বতিদের একটি সমাবেশের ওপরও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল।
এটি দেখায়, ভারত মানবিক ও ধর্মীয় আশ্রয় দিলেও পররাষ্ট্রনৈতিক স্বার্থে আশ্রিত ব্যক্তির প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। দালাই লামাকে ধর্মীয় নেতা হিসেবে চলাচল ও বক্তব্যের সুযোগ দেওয়া হলেও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের পরিস্থিতি অনুসারে তাঁর কর্মসূচির মাত্রা ও স্থান নিয়ে ভারত সরকার ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে।
এই উদাহরণে আইনের পাশাপাশি রাজনৈতিক বিবেচনার ভূমিকাই সবচেয়ে স্পষ্ট
নেপালের রাজা ত্রিভুবন: আশ্রয় থেকে ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন
১৯৫০ সালে নেপালের রাজা ত্রিভুবন রানা শাসকদের সঙ্গে বিরোধের পর কাঠমান্ডুতে ভারতীয় দূতাবাসে আশ্রয় নেন এবং পরে দিল্লিতে যান। রানা সরকার তাঁর নাবালক নাতি জ্ঞানেন্দ্রকে রাজা ঘোষণা করলেও ভারত সেই পরিবর্তনকে স্বীকৃতি দেয়নি। ভারতের মধ্যস্থতায় ১৯৫১ সালে একটি রাজনৈতিক সমঝোতা হয় এবং ত্রিভুবন নেপালে ফিরে গিয়ে পুনরায় সিংহাসনে বসেন।
তবে জওহরলাল নেহরুর নথিভুক্ত বক্তব্য থেকে জানা যায়, ভারত নেপালের রাজনৈতিক সংস্কারের প্রতি সহানুভূতিশীল হলেও ভারতীয় ভূখণ্ডকে নেপালের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভিযান বা হামলার ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে দিতে চায়নি। ভারত নির্দেশ দিয়েছিল, তার ভূখণ্ড থেকে নেপালের বিরুদ্ধে সশস্ত্র দল বা অভিযান পরিচালিত হতে দেওয়া হবে না।
এই ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়: ভারত কোনো নির্বাসিত নেতাকে রাজনৈতিক সমর্থন বা কূটনৈতিক সহায়তা দিতে পারে, কিন্তু তার ভূখণ্ড থেকে সহিংস কার্যক্রম চালানোর অনুমতি না-ও দিতে পারে।
শ্রীলঙ্কার তামিল প্রশ্নের কঠিন শিক্ষা
১৯৮০-এর দশকে শ্রীলঙ্কার তামিল সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কিছু সদস্য ভারতে অবস্থান ও সহায়তা পেয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এলটিটিইসহ কয়েকটি সংগঠনের সহিংসতা ভারতের নিরাপত্তার জন্যও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। ১৯৯১ সালে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী এলটিটিইর আত্মঘাতী হামলায় নিহত হন।
এই অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, মানবিক আশ্রয়, রাজনৈতিক সমর্থন এবং বিদেশি সশস্ত্র সংগঠনকে ভূখণ্ড ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া এই তিনটির সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে গেলে আশ্রয়দাতা রাষ্ট্র নিজেও ভয়াবহ নিরাপত্তাঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এ কারণে রাজনৈতিক বক্তব্য যদি সহিংসতার নির্দেশ, সন্ত্রাসে সহায়তা, অর্থায়ন, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র বা সংগঠিত অস্থিতিশীলতার অংশ হয়ে ওঠে, তখন বিষয়টি আর শুধু মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকে না; তা ভারতের ফৌজদারি ও জাতীয় নিরাপত্তা আইনের আওতায় চলে আসে।
আশ্রয় ও প্রত্যর্পণ এক নয়
কোনো নেতাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়া এবং তাঁর বিরুদ্ধে প্রত্যর্পণের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা দুটি পৃথক আইনি বিষয়। প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে ভারতের Extradition Act, 1962 এবং সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি প্রযোজ্য হয়।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে। রাজনৈতিক চরিত্রের অপরাধ হলে প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যানের সুযোগ থাকলেও হত্যা, সন্ত্রাসবাদসহ কিছু গুরুতর অপরাধকে শুধু “রাজনৈতিক অপরাধ” বলে দায়মুক্তি দেওয়া যায় না। আবার অনুরোধটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, ন্যায়বিচারের স্বার্থবিরোধী বা অন্যায্য হলে অনুরোধপ্রাপ্ত রাষ্ট্র তা বিবেচনা করতে পারে।
অতএব, কোনো নেতা রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছেন বলেই তাঁকে প্রত্যর্পণ করতে হবে এমন নয়। আবার আশ্রয় পেয়েছেন বলেই তাঁর বিরুদ্ধে প্রত্যর্পণের আইনি প্রক্রিয়া চলতে পারবে না এ কথাও সঠিক নয়।
আইনি ক্ষমতা থাকলেই কি সব সিদ্ধান্ত ন্যায়সংগত?
আইন ভারত সরকারকে বিদেশিদের ওপর ব্যাপক নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দিয়েছে। কিন্তু সেই ক্ষমতা প্রয়োগে ধারাবাহিকতা ও স্বচ্ছতা থাকা জরুরি। এক দেশের নির্বাসিত নেতাকে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক তৎপরতার সুযোগ দিয়ে অন্য দেশের নেতার ক্ষেত্রে “অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ” বা “জাতীয় নিরাপত্তা”র যুক্তি তুলে ধরলে দ্বৈত মানদণ্ডের অভিযোগ উঠবে।
ভারত যদি কোনো নেতাকে মানবিক কারণে আশ্রয় দেয়, তাহলে তাঁর জীবন, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করা উচিত। একই সঙ্গে কয়েকটি নীতি সবার জন্য সমভাবে প্রযোজ্য করা প্রয়োজন-
ভারতের ভূখণ্ড থেকে সহিংসতা বা বিদ্রোহে উসকানি দেওয়া যাবে না।
আশ্রিত ব্যক্তি নিজ দেশের রাজনৈতিক দলকে সহিংস বা গোপন নির্দেশ দিতে পারবেন না।
ভারতীয় ভূখণ্ডকে অর্থায়ন, নিয়োগ বা সশস্ত্র সংগঠনের ঘাঁটি করা যাবে না।
কূটনৈতিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এমন প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচির বিষয়ে স্বচ্ছ শর্ত থাকা দরকার।
প্রত্যর্পণের অনুরোধ রাজনৈতিক দর-কষাকষির বদলে চুক্তি, প্রমাণ ও ন্যায়বিচারের মানদণ্ডে বিবেচনা করা উচিত।
মানবিক আশ্রয় হোক, রাজনৈতিক ঘাঁটি নয়
ভারতের সংবিধান ও আদালতের অবস্থান মোটামুটি পরিষ্কার। বিদেশিরাও জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং আইনের সমান সুরক্ষা পাবেন। কিন্তু ভারতে বসবাস, স্থায়ীভাবে থাকার কিংবা ভারতীয় নাগরিকের মতো অবাধ রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার মৌলিক অধিকার তাঁদের নেই।
ভারত সরকার তাই কোনো বিদেশি নেতাকে আশ্রয় দিতে পারে, তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বক্তব্যের সুযোগও দিতে পারে। একইভাবে সরকার তাঁর চলাচল, যোগাযোগ, সভা কিংবা বক্তব্য সীমিতও করতে পারে। তবে সেই সিদ্ধান্ত যেন গোপন রাজনৈতিক সুবিধা, ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা আঞ্চলিক আধিপত্যের বদলে আইন, মানবিকতা ও সমতার ভিত্তিতে হয়।
দালাই লামা, রাজা ত্রিভুবন, শ্রীলঙ্কার তামিল সংগঠন এবং শেখ হাসিনার ঘটনাগুলো একটি অভিন্ন শিক্ষা দেয় আশ্রয় মানবিকতার পরিচয় হতে পারে, কিন্তু আশ্রয়দাতা দেশের ভূখণ্ডকে অন্য রাষ্ট্রের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ বা অস্থিতিশীল করার মঞ্চে পরিণত করা বিপজ্জনক।
ভারত কাউকে নিরাপদ আশ্রয় দিতে পারে; কিন্তু ভারতের সংবিধান কোনো আশ্রিত বিদেশি নেতাকে ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহারের সীমাহীন রাজনৈতিক লাইসেন্স দেয় না।
(লেখক: সহিদুল আলম স্বপন, সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি। ইমেইল: shahidul.alam@bluewin.ch)