বোয়িংয়ের ডানায় ঢাকা–ওয়াশিংটন সম্পর্ক: বিলিয়ন ডলারের চুক্তিতে বাংলাদেশের প্রাপ্তি কী?
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে অদূর ভবিষ্যতে সরাসরি সাক্ষাতের প্রত্যাশা জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ৩১শে আগস্ট পাঠানো এক চিঠিতে তিনি বাংলাদেশের জনগণের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করার পাশাপাশি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান। তাঁর আশ্বাস “বোয়িং বাংলাদেশকে হতাশ করবে না।”
কূটনৈতিক চিঠিতে এমন ব্যক্তিগত ও সরাসরি ভাষার ব্যবহার তাৎপর্যপূর্ণ। এতে বোঝা যায়, বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ কেনা এখন আর কেবল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নয়; এটি ঢাকা ও ওয়াশিংটনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক, শুল্ক আলোচনা এবং ভবিষ্যৎ কৌশলগত অংশীদারত্বের গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়েছে। ট্রাম্পের চিঠির বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের বরাত দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে।
এর আগে ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে সম্পাদিত নতুন এক সমঝোতার আওতায় বাংলাদেশ কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে আরও বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তাঁর দাবি, এর ফলে বাংলাদেশের প্রাথমিক ক্রয়াদেশ “উল্লেখযোগ্যভাবে” বাড়বে।
তবে এখানেই প্রথম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসে। নতুন করে কতটি উড়োজাহাজ কেনা হবে, সেগুলোর মডেল কী, কারা ক্রেতা, মূল্য কত, অর্থায়ন কীভাবে হবে এবং কখন সরবরাহ পাওয়া যাবে এসব বিষয়ে এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। সার্জিও গোরের ঘোষণাতেও অর্ডারের নতুন সংখ্যা বা মূল্য উল্লেখ করা হয়নি। অতএব রাজনৈতিক ঘোষণা ও আইনগতভাবে কার্যকর ক্রয়চুক্তির মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি।
১৪ উড়োজাহাজের নিশ্চিত অর্ডার
২০২৬ সালের ৩০শে এপ্রিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১৪টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার বৃহত্তম একক অর্ডার ঘোষণা করে। এতে রয়েছে আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০, দুটি ৭৮৭-৯ এবং চারটি ৭৩৭-৮ ম্যাক্স। তালিকামূল্যে এই অর্ডারের মূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, যদিও বড় ক্রেতারা সাধারণত উল্লেখযোগ্য বাণিজ্যিক ছাড় পেয়ে থাকে। এটি বিমানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বহর সম্প্রসারণ পরিকল্পনা। বোয়িং আনুষ্ঠানিকভাবে অর্ডারটির বিন্যাস নিশ্চিত করেছে।
একই সময়ে বাংলাদেশের বেসরকারি বিমান চলাচল খাতেও বোয়িংয়ের উপস্থিতি বাড়ছে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ২১টি বোয়িং উড়োজাহাজ অন্তর্ভুক্ত করার প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের সম্প্রসারণ পরিকল্পনা জানিয়েছে। এতে ১৫টি ৭৩৭-৮ এবং ছয়টি ৭৩৭-৮০০ অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা। তবে এই পরিকল্পনার একটি বড় অংশ লিজিং ব্যবস্থার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে এবং এটি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের রাষ্ট্রীয় ক্রয়াদেশ থেকে আলাদা। রয়টার্সের প্রতিবেদনে ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ এই বহর সম্প্রসারণের লক্ষ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
সুতরাং “বাংলাদেশের বোয়িং অর্ডার” বলতে বিমান বাংলাদেশ, ইউএস-বাংলা নাকি অন্য কোনো সম্ভাব্য ক্রেতার প্রতিশ্রুতি বোঝানো হচ্ছে, তা সরকারকে স্পষ্ট করতে হবে। রাষ্ট্রীয় ক্রয়, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি একই সংখ্যার মধ্যে উপস্থাপন করা হলে জনগণের কাছে প্রকৃত আর্থিক দায় অস্পষ্ট থেকে যাবে।
উড়োজাহাজ, শুল্ক ও তৈরি পোশাকের বাজার
এই ক্রয়চুক্তির বড় প্রেক্ষাপট যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্পর্ক। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সম্পাদিত বাণিজ্য সমঝোতায় বাংলাদেশি পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্ক ১৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে বাংলাদেশে তৈরি কিছু পোশাকের জন্য শূন্য পারস্পরিক শুল্কের একটি ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
বিনিময়ে বাংলাদেশ মার্কিন উড়োজাহাজ, জ্বালানি, কৃষিপণ্য ও শিল্পপণ্য কেনা এবং কিছু অশুল্ক বাধা শিথিল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। চুক্তিতে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনা ছাড়াও প্রায় ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য এবং ১৫ বছরে সর্বোচ্চ ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানির বিষয় রয়েছে। বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সমঝোতার এসব শর্ত রয়টার্সের প্রতিবেদনে বিস্তারিত এসেছে।
বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্র তৈরি পোশাকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একক বাজার। এই রপ্তানির সঙ্গে লাখ লাখ শ্রমিকের জীবন-জীবিকা, বৈদেশিক মুদ্রার আয় এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জড়িত। ফলে মার্কিন বাজারে প্রতিযোগিতামূলক প্রবেশাধিকার রক্ষার বিনিময়ে প্রয়োজনীয় উড়োজাহাজ, জ্বালানি বা কৃষিপণ্য কেনার প্রতিশ্রুতির একটি বাণিজ্যিক যুক্তি রয়েছে।
কিন্তু শুল্কসুবিধার মূল্য যদি অতিরিক্ত ঋণ, অব্যবহৃত উড়োজাহাজ কিংবা দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক মুদ্রার দায় দিয়ে পরিশোধ করতে হয়, তাহলে সেই সমঝোতার প্রকৃত লাভ নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। বাণিজ্য কূটনীতির সাফল্য কেবল তাৎক্ষণিক শুল্কহ্রাসে নয়; সমঝোতার পুরো মেয়াদে দেশের আর্থিক ও শিল্পস্বার্থ কতটা সুরক্ষিত থাকবে, সেটিই মূল বিবেচ্য।
বিমানের প্রয়োজন আছে, কিন্তু ব্যবসায়িক পরিকল্পনা কোথায়?
বাংলাদেশের বিমান পরিবহন বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিপুল প্রবাসী জনগোষ্ঠী, ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, পর্যটন এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের কারণে যাত্রী ও কার্গো পরিবহনের চাহিদা বাড়ার বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালসহ বিমানবন্দর অবকাঠামোয় বিনিয়োগও এই বাজারকে নতুন সুযোগ দিচ্ছে।
তবে একটি দেশের বিমান চলাচল বাজার বড় হওয়া এবং জাতীয় বিমান সংস্থার লাভজনক হওয়া এক বিষয় নয়। আধুনিক উড়োজাহাজ কেনা সহজ; সেগুলোকে নিয়মিতভাবে লাভজনক রুটে পরিচালনা করা অনেক কঠিন। এর জন্য প্রয়োজন পেশাদার ব্যবস্থাপনা, যথাযথ রুট পরিকল্পনা, সময়ানুবর্তিতা, উন্নত যাত্রীসেবা, প্রতিযোগিতামূলক ভাড়া, কার্যকর ডিজিটাল বিপণন এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত বাণিজ্যিক পরিচালনা।
বিমানকে তাই প্রকাশ করতে হবে, আটটি ৭৮৭-১০ এবং দুটি ৭৮৭-৯ কোন কোন রুটে ব্যবহার করা হবে। নিউইয়র্ক, টরন্টো, সিডনি, টোকিও কিংবা ইউরোপের নতুন গন্তব্যের নাম উচ্চারণ করা রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয়। কিন্তু কোনো রুটের সাফল্য নির্ভর করে যাত্রীসংখ্যা, কার্গো চাহিদা, সংযোগ সুবিধা, মৌসুমি ওঠানামা, বিমানবন্দরের স্লট এবং প্রতিযোগী এয়ারলাইন্সের বিপণন শক্তির ওপর।
৭৩৭-৮ ম্যাক্স আঞ্চলিক ও মধ্যম পাল্লার রুটে বিমানের সক্ষমতা বাড়াতে পারে। দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, চীন এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যে সরাসরি যোগাযোগ সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে ৭৮৭ বহর ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও পূর্ব এশিয়ার দূরপাল্লার বাজারে কার্যকর হতে পারে। কিন্তু পর্যাপ্ত যাত্রী ও কার্গো ছাড়া শুধু জাতীয় মর্যাদার জন্য রুট চালু করলে শেষ পর্যন্ত লোকসানের দায় করদাতাদেরই বহন করতে হবে।
বোয়িং কেন, এয়ারবাস নয়?
বোয়িং বেছে নেওয়ার একটি পরিচালনগত যুক্তি রয়েছে। বিমানের বর্তমান বহরে ৭৩৭, ৭৭৭ ও ৭৮৭ রয়েছে। একই নির্মাতার আরও উড়োজাহাজ যুক্ত হলে পাইলট ও প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশ এবং বহর ব্যবস্থাপনায় কিছু সুবিধা পাওয়া সম্ভব।
তবে একই নির্মাতার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের দরকষাকষির ক্ষমতা কমাতে পারে। বোয়িংয়ের পাশাপাশি এয়ারবাসও বিমানের বহর সম্প্রসারণে আগ্রহী ছিল। শেষ পর্যন্ত কেন এয়ারবাসের প্রস্তাব বাদ দেওয়া হলো, দুই নির্মাতার মূল্য, ঋণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও সরবরাহের শর্তের মধ্যে কী পার্থক্য ছিল এবং কোন স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়নের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তা জানার অধিকার জনগণের রয়েছে।
এ প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ৭৩৭ ম্যাক্স ও ৭৮৭ উভয় কর্মসূচিই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিরাপত্তা, উৎপাদনমান এবং নিয়ন্ত্রক তদারকির আলোচনায় ছিল। তাই ক্রয়চুক্তিতে বিলম্বজনিত ক্ষতিপূরণ, কারিগরি ত্রুটির দায়, প্রতিস্থাপন উড়োজাহাজ, যন্ত্রাংশের নিশ্চয়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের কঠোর শর্ত থাকা প্রয়োজন।
ঘোষিত মূল্যের বাইরেও বিপুল ব্যয়
উড়োজাহাজের ক্রয়মূল্যই মোট ব্যয় নয়। ইঞ্জিন ও অতিরিক্ত ইঞ্জিন, খুচরা যন্ত্রাংশ, সিমুলেটর, প্রশিক্ষণ, বীমা, রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি, বিমানবন্দর সরঞ্জাম এবং দীর্ঘমেয়াদি কারিগরি সহায়তার ব্যয় যোগ হলে প্রকল্পের প্রকৃত দায় আরও বড় হতে পারে।
অর্থায়নের কাঠামো তাই প্রকাশ করা জরুরি। ঋণ কি মার্কিন রপ্তানি ঋণ সংস্থা দেবে, নাকি বাণিজ্যিক ব্যাংক, বোয়িংয়ের অংশীদার প্রতিষ্ঠান বা আন্তর্জাতিক লিজিং কোম্পানি অর্থায়ন করবে? সুদের হার কত হবে? ঋণ পরিশোধের সময়সীমা ও গ্রেস পিরিয়ড কী? ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন ঘটলে অতিরিক্ত দায় কে বহন করবে?
রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি দেওয়া হলে শেষ পর্যন্ত ঝুঁকিটি বাংলাদেশের করদাতাদের ওপর পড়ে। বাণিজ্যিক গোপনীয়তার অজুহাতে পুরো চুক্তি প্রকাশ করা সম্ভব না হলেও মোট সম্ভাব্য দায়, অর্থায়নের ধরন, সরবরাহসূচি, রুটভিত্তিক আয়-ব্যয়ের পূর্বাভাস এবং ঝুঁকি বিশ্লেষণ সংসদীয় কমিটির সামনে উপস্থাপন করা উচিত।
উড়োজাহাজ কেনার সঙ্গে প্রযুক্তিও আনতে হবে
সার্জিও গোরের বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ বেতনের কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। মার্কিন কূটনীতিক হিসেবে তাঁর এমন অবস্থান স্বাভাবিক। বাংলাদেশের নেতৃত্বের দায়িত্ব হলো নিশ্চিত করা কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের বিনিময়ে বাংলাদেশেও দক্ষ কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও শিল্পসক্ষমতা তৈরি হচ্ছে।
বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তিতে বাংলাদেশি পাইলট ও প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণ, ঢাকায় আঞ্চলিক রক্ষণাবেক্ষণ ও ওভারহল কেন্দ্র, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের মজুত এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে অ্যারোস্পেস শিক্ষা ও গবেষণা কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিমান রক্ষণাবেক্ষণ বাজারে বাংলাদেশ একটি প্রতিযোগিতামূলক কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারলে এই বিনিয়োগের সুফল বহুগুণ বাড়বে।
বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানকে বোয়িংয়ের বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় যুক্ত করার সুযোগও আলোচনায় থাকা উচিত। হালকা প্রকৌশল, সফটওয়্যার, কেবিন টেক্সটাইল, আসনের উপাদান কিংবা নন-ক্রিটিক্যাল বিমান সরঞ্জাম উৎপাদনে বাংলাদেশের শিল্পকে ধীরে ধীরে সম্পৃক্ত করা সম্ভব। কয়েক ডজন উড়োজাহাজ কেনার বিপরীতে এমন শিল্প-সহযোগিতা দাবি করা মোটেও অযৌক্তিক নয়।
সম্পর্কের নতুন অধ্যায়, তবে স্বায়ত্তশাসন অক্ষুণ্ন রেখে
ট্রাম্পের চিঠি এবং তাঁর প্রশাসনের প্রকাশ্য প্রশংসা ঢাকা–ওয়াশিংটন সম্পর্কের পরিবর্তিত চরিত্র নির্দেশ করে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে এখন শুধু উন্নয়ন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার কিংবা নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে না; একটি বড় বাজার, সম্ভাব্য বিনিয়োগ গন্তব্য এবং ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবেও বিবেচনা করছে।
বাংলাদেশের জন্য এটি একই সঙ্গে সুযোগ ও পরীক্ষা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর করতে গিয়ে ঢাকা যেন নিজের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন হারিয়ে না ফেলে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত, জাপান, তুরস্ক ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা। বোয়িং চুক্তি যেন অন্য কোনো অংশীদারের বিরুদ্ধে ভূরাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে ব্যবহৃত না হয়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর সংঘাতে কোনো একটি পক্ষের অনুসারী হয়ে যাওয়া নয়; বরং প্রতিযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে বাজার, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থানের সর্বোচ্চ সুবিধা অর্জন করা।
সাফল্যের প্রকৃত মানদণ্ড
ওয়াশিংটনের কাছে এই চুক্তি বোয়িংয়ের ব্যবসা, মার্কিন শ্রমিকদের কর্মসংস্থান এবং দক্ষিণ এশিয়ায় অর্থনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির হাতিয়ার। বাংলাদেশের কাছে এর সাফল্যের মানদণ্ড সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে হবে।
নতুন উড়োজাহাজ কি বিমানকে লাভজনক করবে? যাত্রীসেবা ও সময়ানুবর্তিতা কি উন্নত হবে? প্রবাসীরা কি প্রতিযোগিতামূলক ভাড়ায় সরাসরি ভ্রমণের সুযোগ পাবেন? কার্গো পরিবহন ও রপ্তানি কি বাড়বে? বাংলাদেশের তরুণদের জন্য উচ্চ দক্ষতার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে? দেশ কি বিমান রক্ষণাবেক্ষণ ও অ্যারোস্পেস প্রযুক্তিতে সক্ষমতা অর্জন করবে?
নাকি কয়েক বছর পর লোকসানি রুট, পর্যাপ্ত ব্যবহার না হওয়া উড়োজাহাজ, অতিরিক্ত পরিচালন ব্যয় এবং ডলারভিত্তিক ঋণের কিস্তি বিমান ও রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করবে?
এই প্রশ্নগুলোর বিশ্বাসযোগ্য উত্তর ছাড়া “বিলিয়ন ডলারের চুক্তি” নিজে কোনো সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়। সরকারকে পূর্ণাঙ্গ বহর পরিকল্পনা, স্বাধীন আর্থিক মূল্যায়ন, প্রতিযোগিতামূলক ক্রয়প্রক্রিয়া এবং প্রয়োজনীয় সংসদীয় তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। নতুন অর্ডারের সংখ্যা ও শর্ত চূড়ান্ত হওয়ার পর বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ এবং সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের দিয়ে এর বাণিজ্যিক যৌক্তিকতা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর দেশের কর্মসংস্থানের কথা বলবেন এটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে নিশ্চিত করতে হবে, এই চুক্তি বাংলাদেশের জন্য কী অর্জন করছে। বোয়িংয়ের ডানায় ঢাকা যদি নতুন আন্তর্জাতিক গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে, বিমান যদি একটি প্রতিযোগিতামূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয় এবং দেশের তরুণদের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, তবে এটি সত্যিকার অর্থেই দুই দেশের জন্য লাভজনক অংশীদারত্ব হবে।
কিন্তু আমেরিকায় কর্মসংস্থান আর বাংলাদেশে ঋণের বোঝা এমন অসম সমীকরণ গ্রহণযোগ্য নয়। অংশীদারত্ব তখনই অর্থবহ হবে, যখন এর সুফলের অংশীদার হবেন বাংলাদেশের যাত্রী, প্রবাসী, শ্রমিক, করদাতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মও।
(লেখক: সহিদুল আলম স্বপন; সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ, কলামিস্ট ও কবি। ই-মেইল: shahidul.alam@bluewin.ch)