কেন আজও জনপ্রিয় সালমান শাহ
সালমান শাহ। ছবি: সংগৃহীত
নব্বইয়ের দশকের ঢাকাই চলচ্চিত্রের শীর্ষ নায়ক সালমান শাহর মৃত্যুর তিন দশক পার হলেও তাকে ঘিরে দর্শক ও ভক্তদের আগ্রহ, কৌতুহল ও উন্মাদনা আজও অম্লান। ১৯৯৬ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা অবস্থায় মাত্র ২৫ বছর বয়সে এই ক্ষণজন্মা অভিনেতার রহস্যজনক মৃত্যু হয়। চার বছরের স্বল্পস্থায়ী ক্যারিয়ারে ২৭টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এমন এক ছাপ রেখে গেছেন, যা আজও তরুণ প্রজন্মকে আকর্ষণ করে।
নতুন প্রজন্মের কাছে সালমান শাহর জনপ্রিয়তা
মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পর জন্ম নেওয়া বর্তমান জেন-জি (Gen-Z) বা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণ-তরুণীদের কাছেও সালমান শাহ একজন ট্রেন্ডসেটার ও 'ফ্যাশন আইকন'। কেবল বাবা-মায়ের মুখে শোনা গল্প নয়, তার অভিনয় দক্ষতা, ফ্যাশন সেন্স, ন্যাচারাল সংলাপ পরিবেশন এবং সাবলীল দূরদর্শী চালচলনের কারণে নতুন প্রজন্ম তার প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট। আধুনিক প্রজন্মের দর্শকরা মনে করেন, অভিনয় ও পোশাকে সালমান শাহ তৎকালীন সময়ের চেয়ে 'টু-স্টেপ এহেড' বা দু'কদম এগিয়ে ছিলেন।
নামের ইতিহাস ও মিডিয়া জগতে আগমন
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় সিলেটের দাড়িয়াপাড়ায় নানাবাড়িতে জন্ম নেন সালমান শাহ। বাবা কমরউদ্দিন চৌধুরী ও মা নীলা চৌধুরীর দেওয়া নাম ছিল চৌধুরী মোহাম্মদ সালমান শাহরিয়ার (ডাকনাম ইমন)।
নাম পরিবর্তন: কুমিল্লায় স্কুলে ভর্তির সময় শিক্ষকরা নাম ছোট করতে বললে 'সালমান' শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে 'কেয়ামত থেকে কেয়ামত' সিনেমার পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান নাম পরিবর্তনের কথা বললে, মা নীলা চৌধুরী প্রিয় অভিনেতা নাসিরুদ্দীন শাহর অনুপ্রেরণায় 'শাহরিয়ার'-এর 'শাহ' যুক্ত করে ছেলের নাম রাখেন 'সালমান শাহ'।
অভিনয় জীবন: নানা কামরুজ্জামান (বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র 'মুখ ও মুখোশ'-এর অভিনেতা) এবং মা নীলা চৌধুরীর সাংস্কৃতিক প্রভাব সালমানকে অনুপ্রাণিত করে। বিটিভির ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান, নাটক ও বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে পথচলা শুরু হয়। ১৯৮৯ সালে প্রখ্যাত নির্মাতা আলমগীর কবিরের 'হাঙর নদী গ্রেনেড' চলচ্চিত্রে রইস চরিত্রে সুযোগ পেলেও নির্মাতার আকস্মিক মৃত্যুতে তা আলোর মুখ দেখেনি।
সুপারস্টার হয়ে ওঠা: ১৯৯২ সালে পরিচালক সোহানুর রহমান সোহানের প্রস্তাবে 'কেয়ামত সে কেয়ামত তক'-এর অফিসিয়াল রিমেক 'কেয়ামত থেকে কেয়ামত' (১৯৯৩)-এ অভিনয়ের মাধ্যমে রাতে রাতেই তারকা বনে যান সালমান। এরপর পরপর সুপারহিট সিনেমা উপহার দিয়ে ঢাকাই সিনেমার মোড় ঘুরিয়ে দেন।
অকাল মৃত্যু ও রহস্যের সূচনা
১৯৯৬ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর সকালে ঢাকার নিউ ইস্কাটন এলাকার ১১ তলার ফ্ল্যাট থেকে সালমান শাহর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। প্রথমে ঢাকা মেডিকেলের ময়নাতদন্ত রিপোর্টে এটিকে 'আত্মহত্যা' বলা হলেও পরিবার ও ভক্তরা তা মেনে নিতে অস্বীকার করেন।
পরিবারের সন্দেহ বাড়ার কয়েকটি মূল কারণ: গলায় চিকন দাগ, যা ঝুলিয়ে রাখা মোটা রশির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বাসা থেকে উদ্ধারকৃত টেবিল ফ্যানের তারের সাথে গলার দাগের মিল পাওয়া। ঘরোয়া কলহ ও অন্যান্য পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি।
তিন দশকের আইনি আবর্ত
সালমান শাহর মৃত্যুর পর তার পরিবার মামলাটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন জানালে তদন্তের দীর্ঘ পথচলা শুরু হয়। দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত: সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত অনুষ্ঠিত হয়। তৎকালীন বোর্ড প্রধান ডা. নারগিস বাহার চৌধুরী মৃত্যুর কারণ আত্মহত্যা বলেই উল্লেখ করেন।
সিআইডি ও বিচার বিভাগীয় তদন্ত: ১৯৯৭ সালে রেজভী আহম্মেদ নামের এক ব্যক্তি সালমান হত্যার সাথে যুক্ত থাকার স্বীকারোক্তি দিয়ে সামিরা হক, আজিজ মোহাম্মদ ভাই, আশরাফুল হক ডনসহ বেশ কয়েকজনের নাম বলেন, যা পরবর্তীতে তিনি প্রত্যাহার করেন। ১৯৯৭ সালে সিআইডি এবং ২০১৪ সালে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি সালমানের মৃত্যুকে 'অপমৃত্যু' বা 'আত্মহত্যা' হিসেবে উল্লেখ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়।
পিবিআই তদন্ত (২০২০): দীর্ঘ তদন্ত শেষে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে এটি আত্মহত্যা এবং একটি 'সুইসাইড নোট' উদ্ধারের দাবি জানায়। কিন্তু সালমানের পরিবার এই রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করে নারাজি দেয়।
হত্যা মামলা ও গ্রেপ্তার (২০২৫-২০২৬): আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০২৫ সালে আদালত পুনর্নির্বাচনের নির্দেশ দিলে সালমানের মামা আলমগীর কুমকুম রমনা থানায় ১১ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। আসামিদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় এবং ২০২৬ সালের ৯ই আগস্ট অন্যতম আসামি অভিনেতা ডন বিদেশে যাওয়ার চেষ্টাকালে গ্রেপ্তার হন। বর্তমানে সিআইডি মামলাটি তদন্ত করছে।
অভিযুক্তদের বক্তব্য
সামিরা হক: সালমানের সাবেক স্ত্রী সামিরা হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, নায়িকা শাবনূরের সাথে কাজ করা ও প্রেমের গুঞ্জন ঘিরে সংসারে মনোমালিন্য তৈরি হয়েছিল। শাবনূর: সামাজিক মাধ্যমে একাধিকবার স্পষ্ট করেছেন যে সালমানের সাথে তার সম্পর্ক পেশাগত সীমানার বাইরে ছিল না। অন্যান্যরা: অভিনেতা ডন ও রেজভী আহম্মেদ উভয়েই বিভিন্ন সময় জবানবন্দি ও বক্তব্যে হত্যাকাণ্ডে যুক্ত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন।
বাংলা চলচ্চিত্রে সালমান শাহর প্রভাব ও অমরতা
সালমান শাহর আকস্মিক প্রয়াণে তৎকালীন চলচ্চিত্র শিল্প বিশাল আর্থিক ও মানসিক ক্ষতির মুখে পড়ে। অনেক সিনেমার শুটিং মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায়, কিছু সিনেমা বিকল্প উপায়ে শেষ করতে হয়।
গবেষক ও চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মতে, সালমান শাহর এই চিরসবুজ জনপ্রিয়তার পেছনে দুটি প্রধান কারণ রয়েছে। কালজয়ী প্রভাব: তৎকালীন টিনএজ ও তরুণ জনগোষ্ঠীর মাঝে তার পোশাক, সানগ্লাস, হেয়ারস্টাইল, বাঁধনহারা চালচলন ও সাবলীল অভিনয়ের যে প্রভাব পড়েছিল, তা বর্তমান তরুণদের কাছেও আকর্ষণীয়।
অমীমাংসিত রহস্য: তার আকস্মিক ও রহস্যময় প্রয়াণ দর্শকদের মনে এক গভীর শূন্যতা ও দীর্ঘস্থায়ী জল্পনা-কল্পনার জন্ম দিয়েছে, যা তাকে তিন দশক পরও মানুষের চর্চার কেন্দ্রে টিকিয়ে রেখেছে।
তথ্যসূত্র : বিবিসি বাংলা