সাম্বার পায়ে ঢাকার দুয়ারে নতুন কূটনীতি
বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশ যেন কয়েক সপ্তাহের জন্য ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার এক আবেগঘন যৌথ ভূখণ্ডে পরিণত হয়। শহরের বহুতল ভবন থেকে গ্রামের বাঁশঝাড়, বিশ্ববিদ্যালয়ের হল থেকে চায়ের দোকান সবখানেই উড়তে থাকে হলুদ-সবুজ কিংবা আকাশি-সাদা পতাকা। একই পরিবারের সদস্যরাও তখন দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েন। তর্ক হয়, খুনসুটি হয়, কখনও উত্তেজনাও সীমা ছাড়ায়। অথচ হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের দুটি দেশের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসাকে রাষ্ট্রীয়, সাংস্কৃতিক কিংবা অর্থনৈতিক সম্পর্কের শক্তিতে রূপান্তর করার উদ্যোগ খুব কমই দেখা গেছে।
এমন প্রেক্ষাপটে ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনের একটি প্রতিনিধিদলের ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়াম পরিদর্শন নিছক ক্রীড়া-সংবাদ নয়। পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদলটি মাঠ, ড্রেসিংরুম, গ্যালারি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পর্যবেক্ষণ করেছে। আগামী ৩ অক্টোবর কলকাতায় ভারতের বিপক্ষে ব্রাজিলের প্রীতি ম্যাচের আগে ঢাকাকে সম্ভাব্য অনুশীলনকেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ কিংবা অন্য কোনো দলের বিপক্ষে ব্রাজিলের ম্যাচ আয়োজনের সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে। তবে এখন পর্যন্ত ব্রাজিল–বাংলাদেশ ম্যাচের কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়নি এই বাস্তবতাটিও মনে রাখা জরুরি।
তবু এই সফরের প্রতীকী গুরুত্ব কোনো অংশেই কম নয়। একটি ফুটবল পরাশক্তির প্রতিনিধিরা যখন ঢাকার মাঠের ঘাস, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা, নিরাপত্তা ও দর্শক ধারণক্ষমতা পরীক্ষা করেন, তখন তাঁরা মূলত বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক আয়োজন-সক্ষমতারই মূল্যায়ন করেন। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে ঢাকার সামনে শুধু একটি প্রীতি ম্যাচের দরজা খুলবে না; আন্তর্জাতিক ফুটবলের বৃহত্তর মানচিত্রে বাংলাদেশকে নতুনভাবে তুলে ধরার সুযোগও সৃষ্টি হবে।
আধুনিক বিশ্বে কূটনীতি আর কেবল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বৈঠককক্ষ, রাষ্ট্রপ্রধানদের সফর কিংবা বাণিজ্যচুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ফুটবল, ক্রিকেট, চলচ্চিত্র, সংগীত ও সংস্কৃতি এখন রাষ্ট্রের ‘সফট পাওয়ার’-এর গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। ব্রাজিলের ক্ষেত্রে ফুটবল তার জাতীয় পরিচয়ের অন্যতম শক্তিশালী আন্তর্জাতিক ভাষা। পেলে, গারিঞ্চা, সক্রেটিস, রোমারিও, রোনালদো, রোনালদিনহো থেকে নেইমার এই দীর্ঘ উত্তরাধিকার ব্রাজিলকে এমন এক আবেগের সাম্রাজ্য দিয়েছে, যার কোনো ভিসা বা সীমান্ত নেই।
বাংলাদেশ সেই সাম্রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। এখানকার লাখো ব্রাজিল-সমর্থক কোনো রাষ্ট্রীয় প্রচারণার কারণে দলটিকে ভালোবাসেন না। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে নান্দনিক ফুটবল, বিশ্বকাপের ইতিহাস এবং কিংবদন্তি খেলোয়াড়দের আকর্ষণ এই সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। কূটনীতির ভাষায় এমন স্বতঃস্ফূর্ত জনসমর্থন একটি অমূল্য সম্পদ। ব্রাজিল যদি ঢাকায় খেলতে আসে, তবে সেটি দুই দেশের আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের চেয়েও গভীরে থাকা মানুষে-মানুষে যোগাযোগকে দৃশ্যমান করবে।
বাংলাদেশের উচিত এই সুযোগকে একটি একদিনের প্রদর্শনী ম্যাচ কিংবা তারকাদের সঙ্গে ছবি তোলার আয়োজনে সীমাবদ্ধ না রাখা। ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তোলার প্রস্তাব সামনে আনা প্রয়োজন। এর মধ্যে থাকতে পারে বয়সভিত্তিক ফুটবল উন্নয়ন, কোচ ও রেফারি প্রশিক্ষণ, স্পোর্টস মেডিসিন, একাডেমি পরিচালনা, নারী ফুটবলের বিকাশ এবং প্রতিভাবান বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের ব্রাজিলে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। ব্রাজিলের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিভাগে তৃণমূল ফুটবল একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা গেলে এই সফরের প্রকৃত উত্তরাধিকার তৈরি হবে।
এই সম্ভাবনাকে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর বাস্তবতা থেকেও বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না। কলকাতায় ভারতের বিপক্ষে ব্রাজিলের সম্ভাব্য ম্যাচটি প্রমাণ করে, বিশ্ব ফুটবলের বড় দলগুলো দক্ষিণ এশিয়াকে ক্রমবর্ধমান বাজার হিসেবে বিবেচনা করছে। প্রায় দুইশ’ কোটি মানুষের এই অঞ্চলে ফুটবলের দর্শকসংখ্যা বিপুল হলেও অবকাঠামো, বিপণন ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ তুলনামূলকভাবে দুর্বল। ভারত তার অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও বড় বাজার ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজন টেনে নিচ্ছে। বাংলাদেশও পরিকল্পিতভাবে এগোতে পারলে এই আঞ্চলিক ফুটবল অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠতে পারে।
ঢাকা ও কলকাতার ভৌগোলিক নৈকট্য এখানে বিশেষ সুবিধা সৃষ্টি করতে পারে। ব্রাজিল যদি কলকাতায় ম্যাচ খেলে এবং ঢাকায় অনুশীলন করে, তবে ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ায় আসা ইউরোপীয় ও লাতিন আমেরিকান দলগুলোর জন্য ঢাকা–কলকাতা–কাঠমান্ডু কিংবা ঢাকা–কলকাতা–কলম্বো মিলিয়ে একটি আঞ্চলিক সফরসূচি তৈরি করা অসম্ভব নয়। এতে একদিকে আয়োজক দেশগুলোর ব্যয় কমবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক দলগুলোর কাছে পুরো অঞ্চলটি একটি সমন্বিত বাজার হিসেবে আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।
ফুটবল এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো রাজনৈতিক মতপার্থক্য অতিক্রম করে সহযোগিতা করতে পারে। ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও পাকিস্তানের মধ্যে নিয়মিত উচ্চমানের আঞ্চলিক টুর্নামেন্ট, যুব উন্নয়ন কর্মসূচি এবং অবকাঠামোগত অংশীদারত্ব গড়ে উঠলে সাফ ফুটবলও নতুন প্রাণ পেতে পারে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মতো রাজনৈতিক কাঠামো দক্ষিণ এশিয়ায় না থাকলেও ফুটবল একটি সামাজিক সংযোগবলয় তৈরি করতে পারে। একটি বল কখনও কখনও এমন দরজা খুলতে পারে, যা দীর্ঘ কূটনৈতিক আলোচনাও খুলতে পারে না।
ব্রাজিলের সম্ভাব্য আগমন বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা-সমর্থকদের প্রসঙ্গও সামনে আনে। ২০১১ সালে লিওনেল মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা ঢাকায় নাইজেরিয়ার বিপক্ষে খেলেছিল। সেই ম্যাচ বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে এখনও জীবন্ত। ব্রাজিল ঢাকায় এলে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের প্রতি বাংলাদেশের ভালোবাসার এক ধরনের ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে। আরও বড় স্বপ্ন হতে পারে ভবিষ্যতে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাকে নিয়ে ঢাকায় একটি প্রীতি ম্যাচ আয়োজন। বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তাগত দিক থেকে এটি অত্যন্ত কঠিন হলেও অসম্ভব বলে উড়িয়ে দেওয়ার কারণ নেই।
তবে সমর্থকদের আবেগকে দায়িত্বশীল সংস্কৃতিতে রূপ দেওয়া প্রয়োজন। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে বিভাজন বা সহিংসতার কারণ হতে পারে না। বরং দুই দেশের সমর্থকগোষ্ঠীকে রক্তদান, বৃক্ষরোপণ, শিশুদের ক্রীড়াসামগ্রী বিতরণ কিংবা মাদকবিরোধী প্রচারের মতো সামাজিক উদ্যোগে যুক্ত করা যেতে পারে। তখন পতাকার প্রতিযোগিতা একটি ইতিবাচক সামাজিক শক্তিতে পরিণত হবে। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার দূতাবাসও এসব উদ্যোগে অংশীদার হতে পারে।
এ ধরনের ম্যাচ আয়োজনের সঙ্গে অর্থনীতির সম্পর্কও গভীর। হোটেল, বিমান পরিবহন, পর্যটন, সম্প্রচারস্বত্ব, বিজ্ঞাপন, ক্রীড়াসামগ্রী ও ক্ষুদ্র ব্যবসা সব ক্ষেত্রেই নতুন সুযোগ তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ঢাকার ইতিবাচক উপস্থিতি দেশের ভাবমূর্তি নির্মাণে সহায়তা করতে পারে। ব্রাজিলের মতো একটি দলকে নিরাপদ ও পেশাদার পরিবেশে আতিথেয়তা দিতে পারলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে অন্য বড় দল ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা আয়োজনের ক্ষেত্রেও আস্থা অর্জন করবে।
কিন্তু আবেগের পাশাপাশি কঠিন বাস্তবতাও স্বীকার করতে হবে। মাঠের মান, ড্রেনেজ, ড্রেসিংরুম, অনুশীলন সুবিধা, জরুরি চিকিৎসা, দর্শক ব্যবস্থাপনা, টিকিটের স্বচ্ছতা এবং খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক মানে নিতে হবে। শুধু স্টেডিয়ামের দৃশ্যমান সৌন্দর্য বাড়ালেই চলবে না; রক্ষণাবেক্ষণের স্থায়ী ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বড় দল আনার নামে অস্বচ্ছ চুক্তি বা মাত্রাতিরিক্ত সরকারি ব্যয় জনমনে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। তাই যেকোনো আয়োজনের আর্থিক কাঠামো, স্পনসরশিপ এবং দীর্ঘমেয়াদি সুফল পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
জাতীয় স্টেডিয়ামে ব্রাজিলের প্রতিনিধিদলের পদচারণা তাই আশার সূচনা, চূড়ান্ত সাফল্য নয়। এখন দায়িত্ব বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন, ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বেসরকারি খাতের। তাদের সমন্বিতভাবে ব্রাজিলের কাছে এমন একটি প্রস্তাব রাখতে হবে, যাতে প্রীতি ম্যাচের সঙ্গে ফুটবল উন্নয়ন ও দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার স্থায়ী রূপরেখা যুক্ত থাকে।
ব্রাজিল যদি শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের বিপক্ষে মাঠে না-ও নামে, এই আগ্রহকে হারিয়ে যেতে দেওয়া উচিত হবে না। প্রতিনিধিদলের সফর দেখিয়ে দিয়েছে, সঠিক অবকাঠামো ও পেশাদার পরিকল্পনা থাকলে ঢাকা বিশ্ব ফুটবলের বড় আয়োজনের সম্ভাব্য গন্তব্য হতে পারে। আর যদি একদিন হলুদ জার্সির পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা জাতীয় স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের বিপক্ষে মাঠে নামে, সেটি শুধু নব্বই মিনিটের একটি ম্যাচ হবে না। সেটি হবে ফুটবল-আবেগকে কূটনীতি, অর্থনীতি ও প্রজন্মের স্বপ্নের সঙ্গে যুক্ত করার এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
বাংলাদেশের মানুষ বহু দশক ধরে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাকে হৃদয় উজাড় করে সমর্থন দিয়েছে। এবার সেই ভালোবাসাকে বাংলাদেশের ফুটবলের উন্নয়নে ফিরিয়ে আনার সময় এসেছে।
লেখক: সহিদুল আলম স্বপন, সুইজারল্যান্ড ভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ, কলামিস্ট ও কবি।