টাইম লাইন
দর্শনশাস্ত্রে একটি কথা আছে, “সবকিছুকেই সন্দেহ করা যায়, কিন্তু সন্দেহকে সন্দেহ করা যায় না।” কথাটি একেবারেই সত্য। ঢেউয়ের যেমন চূড়া আছে, তেমনি তলও আছে। বটগাছে ময়না ও টিয়া বসে, আবার চামচিকাও বসে। তাই বলে সেটি তো আর বটগাছের দোষ হতে পারে না!
যা-ই হোক, আলাদাভাবে বিচার করলে আমরা প্রত্যেকেই একেকজন স্বতন্ত্র মানুষ। সুতরাং আদর্শ সম্পর্কে সবার ধারণা এক হবে না। ছোটবেলায় দাদি আমাকে ‘মজনু’ বলে ডাকতেন। আমিও সাড়া দিতাম। এখন অবশ্য ওই নামে আর কেউ ডাকে না।
বুদ্ধি যতই অসাধারণ হোক না কেন, ন্যায়বোধ সবার সমান নয়। ফলে টাইম ট্রাভেল কী, তা সবাই জানে না। তারপরও কেউ কারও বুকে শ্বাস ভরে দেয় না; নিজের শ্বাস সবাই নিজেই নেয়। আমার ঠোঁট যেমন অন্য একটি ঠোঁট দাবি করে, অন্যের ঠোঁটও নিশ্চয়ই আরেকটি ঠোঁটের অপেক্ষায় আছে।
পৃথিবীতে কত অসম্পূর্ণ কথা ও অসমাপ্ত অভিমান পড়ে আছে, কে কার খবর রাখে! পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী কথা সম্ভবত সেটিই, যে কথাগুলো বলা উচিত ছিল অথচ বলা হয়নি। মূলত আমাদের জীবনযাপন তুচ্ছ প্রথায় ভরা। এমনকি তুচ্ছ বিশ্বাসের আধিক্যও বেশি। সুতরাং আমাদের অধিকাংশের বুদ্ধিও অতিতুচ্ছ।
আমরা যা কিছু চিন্তাভাবনা করি, তাতে উপকারী ভূমিকা খুবই কম। কেননা আমাদের চিন্তার মস্তিষ্কটি সব সময় ততটা ভদ্র নয়। আমাদের প্রত্যেকের বোঝাপড়ার পথ ও মত আলাদা। আমরা সবাই নিজেকে প্রমাণ করতে চাই। অথচ পৃথিবীর সব প্রাণীর মধ্যে মানুষের বিরুদ্ধেই অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। এখন কেউ ভুল করলে সেটিকে তো আর মানবাধিকার বলে চালিয়ে দেওয়া যাবে না!
তারপরও মানুষ পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্তে অনড় থাকতে পছন্দ করে। নিজের পক্ষে কথা বলার উৎসাহ মানুষেরই বেশি। নিজেকে সৎ প্রমাণের ওকালতিও সে নিজেই করে। মূলত মানুষ দুটি কাজ করতে পারে না। প্রথমত, নিজের অপরাধ স্বীকার করা এবং দ্বিতীয়ত, নিজেকে পাপমুক্ত রাখা।
এ ক্ষেত্রে দুটি উদাহরণ দেওয়া যায়। ‘দ্য লাঞ্চবক্স’ সিনেমার একটি বিখ্যাত সংলাপ হলো, “কখনো কখনো ভুল ট্রেনও তোমাকে ঠিক স্টেশনে নামিয়ে দেয়।” আবার জাপানের একটি প্রবাদে বলা হয়, “যদি তুমি ভুল ট্রেনে উঠে পড়ো, তবে কাছাকাছি কোনো স্টেশনে নেমে পড়ো। কেননা তোমার যাত্রা যত দীর্ঘ হবে, ফিরে আসা ততই ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে উঠবে।” দুটি কথাই মানুষের জীবনের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।
আবারও বলছি, আপনি যদি আমার লেখার গল্পটাই না বোঝেন, তাহলে আমার আবেগ, কল্পনা ও আলোকচিত্র বুঝবেন কী করে?
কিছু অকারণ মুগ্ধতা আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই আছে। তারপরও আমরা একে অপরের প্রতি মুগ্ধ হই। সব জলেই একই সাঁতার, এটি বুঝেও আমরা নদীর গতিপথ পাল্টাই। আমরা বুঝতে পারি না, খাবার আমাদের বাঁচিয়ে রাখে; আবার এই খাবারই কখনো কখনো আমাদের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
আমি বিশ্বাস করি, সবার কাছ থেকে একটু একটু ভালোবাসা পাওয়ার চেয়ে নির্দিষ্ট দু-একজনের কাছ থেকে অনেক বেশি ভালোবাসা পাওয়াই শ্রেয়। সুতরাং সব সম্পর্ক রক্ষা করতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই।
এখনকার আমাকে দেখতে তো এমনই হওয়ার কথা। মাথায় চুল নেই, শরীরে বলিরেখা দেখা দিয়েছে, ভুঁড়িও বেড়েছে। আমি বুঝতে পারছি, জীবনের গণিত একটি পর্যায়ে এসে দিনে দিনে ব্যক্তিগত হয়ে যায়। তারপরও এই বয়সে অন্যের অজানা বিষয় আমরা সহজেই বুঝে ফেলি, অথচ নিজের অসম্পূর্ণতা স্বীকার করতে চাই না।
অন্ধকার ঘরে আপনাকে দেখা যাচ্ছে না, তার অর্থ এই নয় যে আপনার অস্তিত্ব নেই। এমনটি ভাবলে বোকামিই করা হবে।