জনস্বাস্থ্য নেতৃত্বে এ সম্মাননা পাওয়া প্রথম বাংলাদেশি; দুর্যোগ, মহামারি ও জলবায়ুজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে
বিশ্বস্বীকৃত মেধাকে দেশের কাজে লাগাতে হবে: হার্ভার্ডের সম্মাননায় বাংলাদেশের কুদসিয়া হুদা
বিশ্ব জনস্বাস্থ্য, মানবিক সহায়তা, দুর্যোগ প্রস্তুতি ও জলবায়ু সহনশীলতা প্রতিষ্ঠায় অসামান্য নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবে হার্ভার্ড টি এইচ চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথের ২০২৬ সালের ‘লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড ইন পাবলিক হেলথ প্র্যাকটিস’ পেয়েছেন বাংলাদেশি চিকিৎসক ও আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ কুদসিয়া হুদা। তিনিই প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে হার্ভার্ডের এই মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা অর্জন করেছেন।
কুদসিয়া হুদার এ অর্জন শুধু একজন ব্যক্তির পেশাগত সাফল্য নয়; এটি বিশ্ব জনস্বাস্থ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশের সক্ষমতা ও মেধার একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। একই সঙ্গে এই অর্জন একটি জরুরি প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব দেওয়া এমন বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও দূরদর্শিতা দেশের নীতিনির্ধারণ এবং রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের কাজে কতটা ব্যবহার করা হচ্ছে?
বর্তমানে কুদসিয়া হুদা সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদর দপ্তরে দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, সহনশীলতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলার কার্যক্রমে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এ দায়িত্বে তিনি স্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতির প্রস্তুতি, মোকাবিলা, পুনরুদ্ধার এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত বৈশ্বিক নীতি ও কৌশল প্রণয়নে ভূমিকা রাখছেন।
হার্ভার্ড টি এইচ চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথ গত ৩ আগস্ট ২০২৬ সালের অ্যালামনাই অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্তদের নাম ঘোষণা করে। আগামী ২৫ ও ২৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠেয় স্কুলটির অ্যালামনাই উইকেন্ডে নির্বাচিত ব্যক্তিদের আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মানিত করা হবে।
প্রতি বছর হার্ভার্ড চ্যান অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন বিশ্ব জনস্বাস্থ্যে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা সাবেক শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন বিভাগে পুরস্কৃত করে। সরকারি বা বেসরকারি পরিসরে জনস্বাস্থ্যের বাস্তব প্রয়োগে অসাধারণ ও কার্যকর নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী একজন স্নাতককে ‘লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড ইন পাবলিক হেলথ প্র্যাকটিস’ দেওয়া হয়।
এই সম্মাননা প্রদানের ক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্যে নিঃস্বার্থ সেবা, স্থানীয় থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জনস্বাস্থ্যনীতির বাস্তবায়ন এবং সরকার, বেসরকারি সংস্থা কিংবা জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে তাৎপর্যপূর্ণ নেতৃত্বকে বিশেষভাবে মূল্যায়ন করা হয়। কুদসিয়া হুদার ২৫ বছরের বেশি সময়ের পেশাগত জীবন এই যোগ্যতাগুলোর একটি অনন্য সমন্বয়।
বাংলাদেশ থেকে বিশ্ব জনস্বাস্থ্যের নেতৃত্বে
বাংলাদেশে জন্ম ও বেড়ে ওঠা কুদসিয়া হুদা চিকিৎসক হিসেবে পেশাজীবন শুরু করেন। রোগ দেখা দেওয়ার পর একজন রোগীকে চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, আগাম প্রস্তুতি এবং শক্তিশালী জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার মাধ্যমে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জীবন রক্ষা করা সম্ভব এই উপলব্ধিই তাঁকে জনস্বাস্থ্যের বিস্তৃত পরিসরে নিয়ে আসে।
পরবর্তী সময়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড টি এইচ চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথ থেকে ২০০২ সালে মাস্টার অব পাবলিক হেলথ বা এমপিএইচ ডিগ্রি অর্জন করেন। হার্ভার্ডে অধ্যয়নের সময় তিনি প্রতিষ্ঠানটির হিউম্যানিটারিয়ান স্টাডিজ প্রোগ্রামের প্রথম ব্যাচের অগ্রগামী সদস্যদের একজন ছিলেন।
এই শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ তাঁকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে দুর্যোগ, সশস্ত্র সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি, রোগের প্রাদুর্ভাব এবং মানবিক সংকটের জটিল সম্পর্ক বুঝতে সহায়তা করে। পরবর্তী সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন সংকটপূর্ণ অঞ্চলে দায়িত্ব পালন এবং আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য নীতি প্রণয়নে এই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তাঁর কর্মজীবন প্রমাণ করে, বাংলাদেশের শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তি থেকে উঠে আসা একজন পেশাজীবী নিষ্ঠা, উচ্চশিক্ষা, দক্ষতা ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয়ে বিশ্ব জনস্বাস্থ্যের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে পারেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় দুই দশকের পথচলা
কুদসিয়া হুদা ২০০৪ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় যোগ দেন। এরপর দুই দশকের বেশি সময় ধরে বিশ্বের কয়েকটি বড় মানবিক ও জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০০৪ সালের ভারত মহাসাগরীয় সুনামি, ইবোলা মহামারি, করোনাভাইরাস মহামারি এবং এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বিভিন্ন যুদ্ধ, সংঘাত ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাড়াদান কার্যক্রমে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন।
প্রতিটি দুর্যোগ ও স্বাস্থ্যসংকটের প্রকৃতি ছিল ভিন্ন। ভারত মহাসাগরীয় সুনামি একাধিক দেশের উপকূলীয় জনপদ ধ্বংস করে দেয় এবং স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ, মানবিক সংস্থা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা সামনে আনে। ইবোলা মোকাবিলায় রোগ শনাক্তকরণ ও নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আস্থা অর্জন এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
অন্যদিকে করোনাভাইরাস মহামারি বিশ্বকে নজরদারি, গবেষণা, ঝুঁকি-যোগাযোগ, চিকিৎসাসেবা, স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে নজিরবিহীন সংকটের মুখে দাঁড় করায়।
এসব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে কুদসিয়া হুদা দুর্যোগ সংঘটিত হওয়ার পর শুধু সাড়া দেওয়ার পরিবর্তে আগাম ঝুঁকি শনাক্তকরণ, প্রতিরোধ, প্রস্তুতি এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার সহনশীলতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
তাঁর নেতৃত্বাধীন কার্যক্রমের একটি প্রধান লক্ষ্য হলো যুদ্ধ, মহামারি কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেও যেন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো সচল থাকে এবং সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত না হয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের সময়োপযোগী স্বীকৃতি
কুদসিয়া হুদা এমন এক সময়ে হার্ভার্ডের সম্মাননা পেলেন, যখন জলবায়ু পরিবর্তন বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।
অতিরিক্ত তাপমাত্রা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, দাবানল, খরা ও অন্যান্য জলবায়ুজনিত দুর্যোগ শুধু তাৎক্ষণিক প্রাণহানি ও আহতের কারণ হয় না; এগুলো বিশুদ্ধ পানির সংকট, অপুষ্টি, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা, সংক্রামক রোগের বিস্তার, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, হাসপাতালের ক্ষয়ক্ষতি এবং মানুষের বাস্তুচ্যুতির মতো দীর্ঘমেয়াদি সংকটও সৃষ্টি করে।
শিশু, বয়স্ক, প্রতিবন্ধী, নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী এবং বাস্তুচ্যুত মানুষ এসব সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন এখন কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, মানবাধিকার এবং সামাজিক ন্যায়বিচারেরও প্রশ্ন।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের জন্য কুদসিয়া হুদার কাজ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস, আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক এবং কমিউনিটিভিত্তিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে বন্যা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাঁর কাজ বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনকে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য নীতির সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করছে।
স্বাস্থ্য কূটনীতিতে বাংলাদেশের উজ্জ্বল উপস্থিতি
কারিগরি দায়িত্বের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য কূটনীতিতেও কুদসিয়া হুদার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও জনস্বাস্থ্য অগ্রাধিকারের দেশগুলোর মধ্যে জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঐকমত্য তৈরি করা তাঁর কাজের একটি বড় অংশ।
তিনি ইন্টারন্যাশনাল রিকভারি প্ল্যাটফর্মের কো-চেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে জি২০ এবং জাতিসংঘের সেন্দাই ফ্রেমওয়ার্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফোকাল পয়েন্ট হিসেবেও কাজ করছেন।
২০১৫ সালে জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রগুলো গৃহীত সেন্দাই ফ্রেমওয়ার্ক দুর্যোগজনিত ক্ষয়ক্ষতি কমানো এবং রাষ্ট্র ও জনগোষ্ঠীর সহনশীলতা বাড়ানোর একটি আন্তর্জাতিক রূপরেখা। এতে দুর্যোগের ঝুঁকি বোঝা, কার্যকর শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা, প্রতিরোধ ও প্রস্তুতিতে বিনিয়োগ এবং দুর্যোগ-পরবর্তী টেকসই পুনরুদ্ধারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এসব আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়ায় স্বাস্থ্য খাতের প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকর্মী, জরুরি চিকিৎসাসেবা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার বিষয়টি নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে রাখতে কাজ করছেন কুদসিয়া হুদা।
তিনি একজন লেখক ও কারিগরি বিশেষজ্ঞ হিসেবেও পরিচিত। তাঁর বিভিন্ন গবেষণা, প্রকাশনা, নীতিমালা ও কারিগরি নির্দেশিকা বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য জরুরি প্রস্তুতি এবং দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে প্রভাব রেখেছে।
২০২৬ সালের অন্য পুরস্কারপ্রাপ্তরা
কুদসিয়া হুদাসহ পাঁচজন বিশিষ্ট সাবেক শিক্ষার্থী হার্ভার্ড টি এইচ চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথের ২০২৬ সালের অ্যালামনাই অ্যাওয়ার্ডের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন।
জনস হপকিন্স ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথের সহযোগী অধ্যাপক লরেন ডিন এবং সুইজারল্যান্ডের বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সংসদ সদস্য ফেলিক্স গুটসভিলার পেয়েছেন ‘অ্যালামনাই অ্যাওয়ার্ড অব মেরিট’। ১৯৯২ সালে প্রবর্তিত এটি হার্ভার্ড চ্যান অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সর্বোচ্চ সম্মাননা।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ, মহামারি বিশেষজ্ঞ ও সহযোগী অধ্যাপক আব্রার করণ পেয়েছেন ‘ইমার্জিং পাবলিক হেলথ প্রফেশনাল অ্যাওয়ার্ড’। স্বাস্থ্যসেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ নিয়ে কাজ করা ব্যাসিস ডট এআইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী অ্যাম্বার নিগাম পেয়েছেন ‘পাবলিক হেলথ ইনোভেটর অ্যাওয়ার্ড’।
হার্ভার্ড কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের পুরস্কারপ্রাপ্তদের কাজ জনস্বাস্থ্যের ব্যাপকতা এবং স্বাস্থ্যসমতা প্রতিষ্ঠায় প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য ও মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটায়।
বিশ্বমানের বাংলাদেশিদের নেতৃত্বে যুক্ত করার সময়
কুদসিয়া হুদার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বাংলাদেশের জন্য গর্বের। কিন্তু শুধু অভিনন্দন কিংবা গর্ব প্রকাশের মধ্যেই এমন অর্জনের মূল্য সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। তাঁর মতো বিশ্বমানের বাংলাদেশি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, বিজ্ঞানী, গবেষক, কূটনীতিক ও পেশাজীবীদের দেশের নীতিনির্ধারণ ও জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় যুক্ত করার কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অনেক বাংলাদেশির রয়েছে আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবিলা, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, নীতি প্রণয়ন এবং বহুপক্ষীয় সমন্বয়ের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। তাঁদের শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মান জানানো নয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে নেতৃত্ব দেওয়া এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রাখার সুযোগ সৃষ্টি করা উচিত।
এ ধরনের বিশেষজ্ঞদের স্থায়ীভাবে দেশে ফিরে আসাই একমাত্র পথ নয়। জাতীয় পরামর্শক পরিষদ, বিশেষজ্ঞ প্যানেল, গবেষণা সহযোগিতা, নীতি প্রণয়ন কমিটি এবং স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি নেতৃত্বমূলক দায়িত্বের মাধ্যমে তাঁদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো সম্ভব।
বাংলাদেশ দুর্যোগ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হলেও জলবায়ু পরিবর্তন, নগর স্বাস্থ্যঝুঁকি, মহামারি প্রস্তুতি, হাসপাতালের নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য গবেষণা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সমন্বিত নেতৃত্বের ক্ষেত্রে এখনো অনেক কাজ বাকি। কুদসিয়া হুদার মতো অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ততা এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে পারে।
জাতীয় পর্যায়ে যোগ্য ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয়, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা আমলাতান্ত্রিক সংকীর্ণতার পরিবর্তে পেশাগত দক্ষতা, সততা, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও জনসেবার মানসিকতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। বিশ্ব যখন বাংলাদেশি মেধাকে স্বীকৃতি দিচ্ছে, তখন বাংলাদেশকেও সেই মেধাকে জাতীয় নেতৃত্বের অংশ করে নেওয়ার উদারতা ও দূরদর্শিতা দেখাতে হবে।
কুদসিয়া হুদার সাফল্য বাংলাদেশের তরুণ চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্যকর্মীদের, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেতৃত্ব দেওয়ার স্বপ্ন দেখা নারীদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। তাঁর যাত্রা দেখিয়ে দেয় বাংলাদেশ থেকে উঠে এসে অধ্যবসায়, উচ্চশিক্ষা, দক্ষতা ও মানবিক সেবার মাধ্যমে বিশ্ব জনস্বাস্থ্য নীতিনির্ধারণের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব।
আগামী সেপ্টেম্বরে হার্ভার্ড চ্যান স্কুলের অ্যালামনাই উইকেন্ডে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মাননা জানানো হবে। তবে তাঁর এই অর্জনের সবচেয়ে অর্থবহ উদ্যাপন হবে তখনই, যখন বাংলাদেশ বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠিত নিজের মেধাবী সন্তানদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বকে জাতীয় উন্নয়নের কাজে যুক্ত করার বাস্তব উদ্যোগ নেবে।
(সহিদুল আলম স্বপন, সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি। ইমেইল: shahidul.alam@bluewin.ch)