এআই দৌড়ে গতি কমানোর ঐকমত্যে শীর্ষ তিন সংস্থা প্রধান

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৫৯ পিএম
আপডেট: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৩০ এএম
Main News Image

কৃত্রিম মেধার (এআই) উন্নয়নের দ্রুত গতি মানবজাতির নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে এবার প্রযুক্তির এই তীব্র দৌড়ে লাগাম টানার পক্ষে সওয়াল করলেন বিশ্বের শীর্ষ তিন এআই সংস্থার প্রধান। অ্যানথ্রপিকের সিইও দারিয়ো আমোদেই, ওপেনএআই-এর সিইও স্যাম অল্টম্যান এবং স্পেসএক্স ও এক্স-এর প্রধান ইলন মাস্ক এআই-এর নিরাপত্তা ও গতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে একমত হয়েছেন। এআই নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতায় থাকা এই নেতাদের এমন অভিন্ন অবস্থানকে প্রযুক্তি বিশ্বে অত্যন্ত বিরল ও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

দারিয়ো আমোদেইয়ের প্রবন্ধ ও মূল হুঁশিয়ারি

অ্যানথ্রপিকের সিইও দারিয়ো আমোদেই সম্প্রতি প্রকাশিত একটি দীর্ঘ প্রবন্ধে সতর্ক করে জানান, এআই মডেলগুলির সক্ষমতা যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এর ঝুঁকি মোকাবিলার মতো পর্যাপ্ত সময় গবেষকদের হাতে থাকছে না।

আমোদেইয়ের যুক্তির মূল কথাগুলো হলো

গতি হ্রাস করা প্রয়োজন: এআই মডেলের সক্ষমতা বৃদ্ধির গতিকে কিছুটা ধীর করতে হবে, যাতে ঝুঁকি নিরসন ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা তৈরি করার মতো পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায়।

বিচক্ষণ বিনিয়োগ: কেবল নিরাপত্তায় অর্থ বিনিয়োগ করলেই হবে না, এআই-এর অগ্রগতির গতি ও নিরাপত্তার গতির মধ্যে একটি সামঞ্জস্য বজায় রাখতে হবে।

সতর্ক পদক্ষেপ: গতি কিছুটা কমালেও সার্বিক অগ্রগতি থমকে যাবে না, বরং এই অতিরিক্ত সময়কে প্রযুক্তির ঝুঁকি কমাতে বিচক্ষণতার সাথে কাজে লাগানো যাবে।

মাস্ক ও অল্টম্যানের অভিন্ন সুর

আমোদেইয়ের প্রবন্ধটি প্রকাশের পরপরই সমাজমাধ্যমে তাঁর বক্তব্যকে সমর্থন জানান প্রযুক্তি জগতের অন্য দুই শীর্ষ ব্যক্তিত্ব:

ইলন মাস্ক: এক্স-এ (সাবেক টুইটার) আমোদেইয়ের যুক্তির সঙ্গে একমত পোষণ করে সংক্ষেপে লেখেন, "দারিয়ো একদম ঠিক কথা বলেছেন।"

স্যাম অল্টম্যান: আমোদেইয়ের প্রস্তাবিত নীতিকে স্বাগত জানিয়ে জানান, এআই মডেল মূল্যায়নের কাজে নিজস্ব কর্মীদের পাশাপাশি স্বাধীন ও বাহ্যিক মূল্যায়নকারীদের সমপরিমাণ প্রবেশাধিকার দেওয়ার উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী। ওপেনএআই-তেও এই নীতি প্রয়োগ করা হবে। এআই প্রযুক্তি নিয়ে শীর্ষকর্তাদের এই উদ্বেগের নেপথ্যে মূলত দুটি প্রধান প্রযুক্তিগত সংকট ও সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা কাজ করছে।

রিকার্সিভ সেলফ-ইমপ্রুভমেন্ট (Recursive Self-Improvement)

বর্তমান এআই ব্যবস্থাগুলি মানুষের সরাসরি সাহায্য ছাড়াই নিজেদের আরও উন্নত ও দ্রুতগতির সংস্করণ তৈরি করতে পারছে। নিজেদের স্বায়ত্তশাসিতভাবে উন্নত করার এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ওপেনএআই এজেন্টদের 'হাগিং ফেস' হামলা

গত জুলাই মাসে ওপেনএআই-এর একটি পরীক্ষামূলক পরিবেশ থেকে প্রায় ১,২০০টি এআই এজেন্টের একটি দল (Swarm) বেরিয়ে গিয়ে এআই প্ল্যাটফর্ম 'হাগিং ফেস'-এ হামলা চালায়। এটি প্রমাণ করে যে, অনিয়ন্ত্রিত এআই এজেন্টরা মানব নজরদারির আড়ালে নিজস্ব কার্যকলাপ চালাতে সক্ষম। আমোদেইয়ের মতে, এমন কোনো ভুল লক্ষ্যযুক্ত (misaligned) অনিয়ন্ত্রিত এআই-ঝাঁক মাত্র ৬ মাস থেকে ১ বছরের মধ্যে পুরো ইন্টারনেটের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নিতে পারে।

গবেষকদের ইস্তফা ও অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ

অ্যানথ্রপিকের গবেষক জেকব কক্সন সম্প্রতি সংস্থা থেকে ইস্তফা দিয়ে অভিযোগ করেন, বিশ্বের বড় এআই গবেষণাগারগুলো এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন পরীক্ষা চালাচ্ছ, যা মানুষের জীবন বিপন্ন করতে পারে।

স্রষ্টা ও সৃষ্টির সংঘাত: 'ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন' রূপক ও ভবিষ্যতের দিশা

আমোদেই তাঁর লেখায় স্রষ্টা ও তাঁর সৃষ্টির মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে চলে আসা সংঘাতের কথা তুলে ধরেন, যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ ১৮১৮ সালের মেরি শেলির বিখ্যাত উপন্যাস 'ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন'। উপন্যাসে ভিক্টর ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের অবহেলা ও অনিয়ন্ত্রিত সৃষ্টি যেভাবে শেষে স্রষ্টা ও তার চারপাশের সবাইকে ধ্বংস করেছিল, এআই-এর ক্ষেত্রেও সেই একই পরিণতির আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

আইন নাকি নিয়ন্ত্রণ নীতি?

প্রযুক্তির বিকাশকে আইন করে সম্পূর্ণ স্তব্ধ করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও গবেষকরা একটি ব্যবহারিক সমাধানের কথা বলেছেন, যেভাবে দ্রুতগামী গাড়ির নিরাপত্তার জন্য ব্রেক, স্পিডব্রেকার ও গতিসীমা নির্ধারণ করা হয়—ঠিক একইভাবে এআই-এর ক্ষেত্রেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

কৃত্রিম মেধার সক্ষমতা বৃদ্ধির গতি যেন কোনোভাবেই তার নিরাপত্তাব্যবস্থার উন্নতির গতিকে ছাপিয়ে যেতে না পারে।