টানেলের আঁধারে ১০ দিন: নেপালি শ্রমিকের অলৌকিক প্রত্যাবর্তন
নেপালের একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বন্যাকবলিত টানেলে টানা ১০ দিন আঁধারে বন্দি থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরেছেন ৩০ বছর বয়সী নেপালি শ্রমিক সঞ্জয় সাহ। পাহাড়ি ঢলে টানেল তলিয়ে যাওয়ার পর কাদামিশ্রিত পানি পান করে এবং ঈশ্বরারাধনায় মন স্থির রেখে তিনি মৃত্যুপুরী থেকে অক্ষত অবস্থায় রক্ষা পেয়েছেন।
গত ২৬ আগস্ট চীন-নেপাল সীমান্তে হিমবাহ ধসের ফলে সৃষ্ট প্রলয়ঙ্করি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। সুনামি সদৃশ ঢেউয়ের তোড়ে নিমেষেই তছনছ হয়ে যায় চারপাশ। অন্তত ১,৪২৯ জনের মৃত্যু এবং ৫,৬৪০ জনেরও বেশি মানুষের নিখোঁজ হওয়ার এই ট্র্যাজেডিতে সঞ্জয়ের বেঁচে ফেরা এক বিরল আশার আলো হয়ে দেখা দিয়েছে।
অন্ধকার ও বাঁচার আকুতি
বন্যার পূর্বাভাস পেয়ে সহকর্মীদের সতর্ক করতে করতে নিজেই আটকে পড়েন সঞ্জয়। মুহূর্তের মধ্যে পানি ও পলির তীব্র স্রোতে পুরো টানেল তলিয়ে যায়। সহকর্মীদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সম্পূর্ণ অন্ধকারে বন্দি হয়ে পড়েন তিনি।
সেই দুঃসহ সময়ে টিকে থাকার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে সঞ্জয় জানান, বিশুদ্ধ পানির অভাবে টানেলে থাকা কাদামিশ্রিত পানি পান করেই তৃষ্ণা মেটাতে হয়েছে তাকে। দিন-রাতের বিভেদ ভুলে একসময় সময়ের অনুভূতিও হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। চরম মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় ও ভয় কাটাতে তিনি ক্রমাগত ‘মহামন্ত্র’ জপ করতেন, যা তাকে মানসিকভাবে টিকিয়ে রেখেছিল।
আশা জাগানিয়া সহকর্মী
একাকীত্বের যন্ত্রণার মধ্যেও কাছেই আটকে থাকা ৪৫ বছর বয়সী সহকর্মী কবির মহার্জনের উপস্থিতি জানতে পারেন সঞ্জয়। আঁধারের ঘনঘটায় একে অপরের সঙ্গে কথা বলা এবং একে অপরকে সাহস দেওয়াই তাদের টিকে থাকার বড় অবলম্বন হয়ে ওঠে।
উদ্ধার ও আকুল আবেদন
কঠিন উদ্ধার অভিযান চালিয়ে গত ৪ সেপ্টেম্বর দুর্যোগ মোকাবিলা দলের সদস্যরা সঞ্জয়কে জীবিত বের করে আনেন। টানেল থেকে বের হয়েই তিনি উদ্ধারকারীদের কাছে জানতে চান, ‘কত দিন পার হয়েছে?’
হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে সপ্তারি জেলায় নিজ বাড়িতে পৌঁছালে স্বজনেরা তাকে অশ্রুসিক্ত চোখে বরণ করে নেন। তবে নিজের বেঁচে যাওয়ার আনন্দের পাশাপাশি হারানো সহকর্মীদের জন্য গভীর বিষাদ ছুঁয়ে গেছে তাকে। সঞ্জয় নেপাল সরকারের কাছে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাওয়ার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে টানেলে এখনও আটকে থাকা মানুষদের জীবিত উদ্ধার বা নিহতদের মরদেহ অন্তত পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়।