বাংলাদেশ থেকে লস অ্যাঞ্জেলেস
দ্বিতীয়বার আইএমএফএ মনোনয়ন পেলেন সাইফ সারোয়ার
বাংলাদেশি অটোমোটিভ চলচ্চিত্র নির্মাতা ও কনটেন্ট নির্মাতা সাইফ সারোয়ার টানা দ্বিতীয়বারের মতো ইন্টারন্যাশনাল মোটর ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডস (আইএমএফএ) এর মনোনয়ন পেয়েছেন। এবার তার চলচ্চিত্র ‘বিয়ন্ড দ্য মেশিন’ এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশি অটোমোটিভ চলচ্চিত্র নির্মাণকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার যাত্রায় আরও বড় এক ধাপ এগিয়ে গেলেন তিনি।
২০২৫ সালে ‘গো বিয়ন্ড’ চলচ্চিত্রের জন্য আইএমএফএ’তে মনোনয়ন পেয়ে ইতিহাস গড়েন সাইফ। তিনিই প্রথম বাংলাদেশি চলচ্চিত্র নির্মাতা, যিনি আন্তর্জাতিক এই অটোমোটিভ চলচ্চিত্র পুরস্কারে মনোনয়ন পান। এক বছর পর ‘বিয়ন্ড দ্য মেশিন’ এর মাধ্যমে আবারও মনোনয়ন তালিকায় জায়গা করে নিয়ে টানা দুইবারের মনোনীত নির্মাতা হলেন তিনি।
পোরশে ৭১৮ বক্সস্টার’কে কেন্দ্র করে নির্মিত ‘বিয়ন্ড দ্য মেশিন’ অটোমোটিভ চলচ্চিত্র নির্মাণের পেছনের ভাবনা ও সৃজনশীলতাকে তুলে ধরে। সাইফের মতে, অটোমোটিভ চলচ্চিত্র শুধু একটি গাড়ি দেখানোর বিষয় নয়। প্রতিটি দৃশ্যের পেছনে থাকে নির্মাতার ভাবনা, সৃজনশীলতা, পরিশ্রম ও ভালোবাসা, যা শেষ পর্যন্ত দর্শকের চোখে একটি গাড়িকে নতুনভাবে তুলে ধরে।
টানা দুইবারের এই মনোনয়ন সাইফকে বিশ্বের পরিচিত অটোমোটিভ ও বিনোদনমাধ্যমের নির্মাতা ও প্রযোজনার সঙ্গে একই মঞ্চে নিয়ে এসেছে। এই তালিকায় রয়েছে হ্যাগার্টি, টপ গিয়ার, রেড বুল ও কার ম্যাগাজিন এর যুক্ত নির্মাতা ও প্রযোজনা।
আইএমএফএ ২০২৬-এর মনোনয়ন তালিকায় রয়েছে বেশ কয়েকটি আলোচিত হলিউডের চলচ্চিত্র ও তারকা। এর মধ্যে আছে বার্ট লেটন পরিচালিত ‘ক্রাইম ১০১’, যেখানে অভিনয় করেছেন ক্রিস হেমসওর্থ, মার্ক রাফালো ও হ্যালি বেরি। রয়েছে এডগার রাইট পরিচালিত ‘দ্য রানিং ম্যান’, অভিনয়ে গ্লেন পাওয়েল, জশ ব্রোলিন ও কোলম্যান ডোমিঙ্গো। এছাড়া জোয়াকিম রনিং পরিচালিত ‘ট্রন: এরিস’-এ অভিনয় করেছেন জ্যারেড লেটো, জেফ ব্রিজেস, গ্রেটা লি ও ইভান পিটার্স।
অন্যান্য উল্লেখযোগ্য মনোনীত প্রযোজনার মধ্যে রয়েছে ম্যাথিউ ম্যাককনাহে ও আমেরিকা ফেরেরা অভিনীত ‘দ্য লস্ট বাস’; জেমি ফক্স, ক্যামেরন ডিয়াজ ও গ্লেন ক্লোজ অভিনীত ‘ব্যাক ইন অ্যাকশন’; এডি মারফি, পিট ডেভিডসন, ইভা লঙ্গোরিয়া ও কেকে পামার অভিনীত ‘দ্য পিকআপ’; এবং সাং কাং ও লাতিসিয়া ফ্যান অভিনীত ‘সাং কাং এক্স ড্রিফটার | এই৮৬ ইন তাইওয়ান’ এবং জো কারনাহানের লেখা ও পরিচালনায় ম্যাট ডেমন ও বেন অ্যাফ্লেক অভিনীত ‘দ্য রিপ’।
আইএমএফএ ২০২৬ পুরস্কার অনুষ্ঠান আগামী ১৪ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসের পিটারসেন অটোমোটিভ মিউজিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে অটোমোটিভ চলচ্চিত্র নির্মাণ, চলচ্চিত্র, টেলিভিশন ও মোটরস্পোর্টস অঙ্গনের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা একত্রিত হবেন।
তবে এবার সাইফের লক্ষ্য শুধু আরেকটি মনোনয়ন পাওয়া নয়। এবারের স্বপ্ন আরও বড়—বাংলাদেশের নাম সঙ্গে নিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেসের সেই মঞ্চে দাঁড়ানো। কিন্তু বাংলাদেশ কি তার পাশে দাঁড়াবে?
সাইফের কাছে দ্বিতীয়বারের এই মনোনয়ন তাই গভীর ব্যক্তিগত অর্থ বহন করে। তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন আর মনোনয়ন পাওয়া নয়, বরং সেই মুহূর্তটি নিজের চোখে দেখতে লস অ্যাঞ্জেলেসে পৌঁছানো।
“আইএমএফএ-তে দ্বিতীয়বার মনোনীত হয়ে আনন্দের চেয়ে ভয়ই বেশি লাগছে,” সারওয়ার বলেন। “আমি জানি, এই পর্যায়ে পৌঁছানো কতটা কঠিন। কিন্তু বাংলাদেশের একজন অটোমোটিভ চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া আরও কঠিন।”
সাইফ বলেন, তার যাত্রা শুরু হয়েছিল স্বীকৃতির জন্য নয়, ভালোবাসা থেকেই।
“আমি অটোমোটিভ চলচ্চিত্র বানাই, কারণ এটা করতে আমি ভালোবাসি। কিন্তু বাংলাদেশে অটোমোটিভ চলচ্চিত্র নির্মাণ এখনো যে স্বীকৃতি ও মূল্য পাওয়ার যোগ্য, তা পায় না। একজন বাংলাদেশি নির্মাতা হিসেবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে জায়গা করে নেওয়া কতটা কঠিন, আমি নিজেই তা অনুভব করেছি,” তিনি বলেন।
২০২৫ সালে ‘গো বিয়ন্ড’-এর মাধ্যমে প্রথমবার আইএমএফএ-তে মনোনয়ন পান সাইফ। সে সময় পুরস্কার অনুষ্ঠানের পরিচালক তাকে লন্ডনে আয়োজনে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানালেও শেষ পর্যন্ত সেখানে যেতে পারেননি তিনি।
“গত বছর লন্ডনে আইএমএফএ পুরস্কার অনুষ্ঠানে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। সেখানে থাকতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা পাইনি। আমার যাত্রার সবচেয়ে বড় আফসোসগুলোর একটি হয়ে আছে এটি,” তিনি বলেন।
সাইফ জানান, বিষয়টি আরও বেশি কষ্টের ছিল কারণ ওই অনুষ্ঠানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অটোমোটিভ নির্মাতাদের পাশাপাশি হলিউডের পরিচালক ও প্রযোজকরাও উপস্থিত ছিলেন।
“যাদের আমি অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখি, তাদের অনেকেই একই ছাদের নিচে ছিলেন। অথচ আমি সেখানে থাকতে পারিনি—এটা এমন একটি বিষয়, যার জন্য আমি গভীরভাবে আফসোস করেছি,” সাইফ বলেন।
এবার ‘বিয়ন্ড দ্য মেশিন’-এর মাধ্যমে টানা দ্বিতীয়বার মনোনয়ন এবং অনুষ্ঠান লস অ্যাঞ্জেলেসে হওয়ায় সাইফ আশা করছেন, এবার হয়তো সেই মঞ্চে উপস্থিত হতে পারবেন।
“এ বছর পুরস্কার অনুষ্ঠান হচ্ছে লস অ্যাঞ্জেলেসে, হলিউডে। আমি পুরস্কার অনুষ্ঠানের পরিচালকের কাছ থেকে সরাসরি আমন্ত্রণপত্রও পেয়েছি। কিন্তু আমার সবচেয়ে বড় ভয় এখনো একই, আমি কি এবারও সেই সুযোগ হারাব? নিজের হাতে সনদ নেওয়ার জন্য কি আমি সেখানে দাঁড়াতে পারব না?” তিনি বলেন।
বাংলাদেশ থেকে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছানোর এই পথকে সাইফ দেখছেন দীর্ঘ অধ্যবসায়ের যাত্রা হিসেবে।
“একজন বাংলাদেশি নির্মাতা হিসেবে আমার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়তো মনোনয়ন পাওয়া নয়, সেখানে পৌঁছানো। আমি নিজের চোখে দেখতে চাই, যে স্বপ্ন আমি দেশের নাম সঙ্গে নিয়ে শুরু করেছিলাম, সেটি শেষ পর্যন্ত তার গন্তব্যে পৌঁছেছে,” তিনি বলেন।
তার মতে, পথে পাওয়া বাধাগুলোই একদিন এই যাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।
“কখনো কখনো ভাবি, আমি যদি আবারও এতদূর আসতে পারি, কিন্তু সুযোগ বা সহায়তার অভাবে শেষ পর্যন্ত সেখানে দাঁড়াতে না পারি, তাহলে একজন বাংলাদেশি নির্মাতা হওয়াটা কি আমার ব্যর্থতা হবে? নাকি এই সংগ্রামই একদিন আমার সবচেয়ে বড় অর্জনে পরিণত হবে?”
“আমি এখনো হাল ছাড়িনি,” যোগ করেন সাইফ।
সাইফের সর্বশেষ আইএমএফএ মনোনয়ন এসেছে ২০২৫ সালের আরেকটি আন্তর্জাতিক অর্জনের পর। সে বছর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের গ্র্যান্ড মোটোরিং ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল-এ ‘জাজেস অনারেবল মেনশন’ পাওয়া প্রথম বাংলাদেশি নির্মাতা হন।
২০২৫ সালের ‘গো বিয়ন্ড’ থেকে ২০২৬ সালের ‘বিয়ন্ড দ্য মেশিন’ সাইফ সারোয়ারের এই যাত্রা বাংলাদেশি অটোমোটিভ চলচ্চিত্র নির্মাণকে ধীরে ধীরে নিয়ে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক সৃজনশীলতার বড় মঞ্চে।