শুধু ছবি নও তুমি উত্তম কুমার!

বিনোদন প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৫১ পিএম
আপডেট: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৩ পিএম
Main News Image

মহানায়ক উত্তম কুমার। ছবি: সংগৃহীত

১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া মহানায়ক উত্তম কুমারের শতবর্ষে দাঁড়িয়েও মনে হয়, সময়ের ধুলোবালি তাঁর সার্বিক উজ্জ্বলতাকে এতটুকু স্পর্শ করতে পারেনি। ১৯৮০ সালের২৪ জুলাই মাত্র ৫৪ বছর বয়সে তাঁর অকালপ্রয়াণ ঘটেছিল। আজ ৪৬ বছর অতিক্রান্ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও জেন-জি প্রজন্মের এই বদলে যাওয়া বাঙালি সংস্কৃতিতেও উত্তম কুমার কেবল স্মৃতির ফ্রেমে বাঁধা কোনো পুরোনো ছবি নন, তিনি আজও সমান জীবন্ত ও আকর্ষণীয়।

১৯৬৬ সালের দিকে ‘গৃহদাহ’ ছবির শুটিংয়ের একটি স্মৃতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বোম্বের অভিনেতা প্রদীপ কুমার, পাহাড়ী সান্যাল এবং উত্তম কুমার বসে আছেন অচলার (সুচিত্রা সেন) বাড়ির বসার ঘরের সেটে। পাহাড়ী সান্যাল চোখ বুজে যেন ধ্যানমগ্ন, আর সাধারণ এক চেয়ারে বসেও উত্তম কুমার তাঁর সহজাত আকর্ষণ দিয়ে পুরো ঘরের আবহ ধরে রেখেছেন। এমন সময় ঘরের চৌকাঠে এসে দাঁড়ালেন সুচিত্রা সেন। একটি শটের পর পরিচালক সুবোধ মিত্র মৃদু স্বরে জানালেন যে ম্যাডাম কিছুটা ‘ফাম্বল’ করেছেন, তাই আরেকটি টেক নেওয়া দরকার। সুচিত্রা সেন উত্তমের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি সুরে জানতে চাইলেন, ‘কী গো? আমি ফাম্বল করেছি?’ উত্তমের আশ্বস্ত জবাব, ‘না তো! রমা একেবারেই ওকে।’ এর পরপরই উত্তমের কোলে মাথা দিয়ে সুচিত্রার শুয়ে পড়া এবং উত্তমের হাতে থাকা হাতপাখা দিয়ে তাঁকে বাতাস করার সেই স্বাভাবিক রসায়ন আজও এক চিরন্তন স্মৃতি হয়ে আছে।

উত্তম কুমারের ময়রা স্ট্রিটের অ্যাপার্টমেন্টের অভিজ্ঞতাও একইভাবে উজ্জ্বল। দুধসাদা তিনটে বন্ধ দরজা পার হয়ে প্রকাণ্ড লিভিং রুমে বসে থাকা সেই ধুতি-পাঞ্জাবি পরা রূপবান পুরুষটিকে দেখলে মনে হতো—কোনো মানুষের এত বিপজ্জনকভাবে সুদর্শন হওয়া উচিত নয়! সিল্কের পাঞ্জাবিতে হীরের বোতামের ঝিলিক, মহার্ঘ আফটার শেভের সুবাস আর সোনালি লাইটারে ‘পল মল’ সিগারেট ধরানোর ভঙ্গি—সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন এক অনন্য ব্যক্তিত্ব।একদিন ফাঁকা লিভিং রুমে মুখোমুখি বসে কথাপ্রসঙ্গে একটি বহুল আলোচিত প্রশ্ন উঠে এসেছিল: ‘আপনি কি কখনও সুচিত্রা সেনের প্রেমে পড়েননি?’ প্রশ্নটি শুনে কিছুক্ষণ গম্ভীরভাবে চুপ থেকে উত্তম কুমার তাঁর মনের গোপন কথাটি প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আরে আমি তো সব ছেড়ে চলে আসতে চেয়েছিলাম রমার কাছে।’ কিন্তু রমা (সুচিত্রা সেন) সেই প্রস্তাবে সায় দেননি। তিনি অত্যন্ত বাস্তববুদ্ধি দিয়ে বলেছিলেন, ‘তুমি আর আমি স্বামী-স্ত্রী হলে আমাদের প্রেম আর টিকিট কেটে কেউ দেখতে আসবে না।’ পেশাদারিত্ব আর সম্পর্কের এই অদ্ভুত সমীকরণটি সেদিন উত্তমকুমারকে এক নতুন আলোয় চিনিয়েছিল।

অন্য একদিন লেখক যখন উত্তম কুমারের হাতে ‘ফিল্ম ওয়ার্ল্ড’ পত্রিকার একটি নতুন সংখ্যা তুলে দেন, যার প্রচ্ছদে ছিল শশী কাপুর ও সিমি গারেওয়ালের একটি বিতর্কিত ছবি। ছবিটি দেখে উত্তম কুমার মৃদু হেসে মন্তব্য করেছিলেন যে এমন প্রচ্ছদের কারণে লেখাটি মার খেতে পারে এবং সংখ্যাটি বাজেয়াপ্ত হতে পারে। ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন সুপ্রিয়া দেবী। বেতের মতো ছিপছিপে শরীরে চরম স্লিভলেস পোশাকে তিনি ধরে রেখেছিলেন এক অনন্য আভিজাত্য। উত্তম ও সুপ্রিয়ার চোখের পলকহীন ইশারাময় চাহনিতে যেন প্রকাশ পেয়েছিল তাঁদের গভীর অভ্যন্তরীণ বোঝাপড়া।

আজ ৪৬ বছর পরেও ময়রা স্ট্রিটের সেই ছবি কিংবা স্মৃতিপট থেকে উঠে আসা রক্ত-মাংসের উত্তম কুমারকে দেখে একটাই কথা মনে হয়—‘তুমি কি কেবলই ছবি?’ উত্তরটা বাঙালির হৃদয়ে চিরকাল ‘না’ হয়েই থাকবে।