হিমালয়ের দ্রুত গলনশীল হিমবাহ: ভারতে বড় ধরনের বিপর্যয়

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০৪ পিএম
আপডেট: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৪৬ এএম
Main News Image

হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহগুলো আশঙ্কাজনক গতিতে গলে যাওয়ার ফলে নতুন নতুন অস্থিতিশীল হ্রদ তৈরি হচ্ছে, যা দক্ষিণ এশিয়াকে একটি পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। 'সিস্টেমিক' এবং 'ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ইনিশিয়েটিভ'-এর সাম্প্রতিক যৌথ প্রতিবেদনে এই সংকটের বিস্তারিত চিত্র উঠে এসেছে।

গলনের তীব্রতা ও পর্যবেক্ষণের ঘাটতি

গলনের গতি: এক দশক আগের তুলনায় বর্তমানে হিমালয়ের হিমবাহগুলো ৬৫% দ্রুত হারে বরফ হারাচ্ছে।

পর্যবেক্ষণের সীমাবদ্ধতা: হিমালয়-কারাকোরাম অঞ্চলে প্রায় ৪০,০০০ হিমবাহ রয়েছে, অথচ মাত্র ২১টির ওপর ধারাবাহিক বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ চালানো হয়। ফলে অধিকাংশ এলাকা নজরদারির বাইরে থেকে যাচ্ছে।

ব্ল্যাক কার্বনের প্রভাব: হিমবাহ গলনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কারণ হলো সমতলের ইটভাটা থেকে উৎপন্ন 'ব্ল্যাক কার্বন' বা ধোঁয়ার কালি। এই কালি বরফের ওপর জমা হয়ে বেশি পরিমাণে সূর্যালোক শোষণ করে এবং গলন ত্বরান্বিত করে।

ভারতের ওপর অর্থনৈতিক ও প্রাকৃতিক প্রভাব

দুর্যোগের কেন্দ্রস্থল: ভারতের মোট ভূমির মাত্র ১৮% হিমালয় অঞ্চলে হলেও, দেশের মোট প্রাকৃতিক দুর্যোগের ৩৫%-ই ঘটে এই সংবেদনশীল এলাকায়।

উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদ: হিমালয়ীয় নদী অববাহিকার ১০ হেক্টরের বড় ২,৪৮৫টি হ্রদের মধ্যে ভারত সরকার ৫৬টিকে "অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ" হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে।

অর্থনৈতিক নির্ভরতা: ভারতের জিডিপির (GDP) প্রায় ২০% সরাসরি হিমালয়ের পানির ওপর নির্ভরশীল, যা গম, ধান, চা, জলবিদ্যুৎ ও তীর্থভিত্তিক পর্যটন খাতকে টিকিয়ে রাখে।

'পিক ওয়াটার' সংকট: চলতি শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে হিমবাহ গলে নদীতে পানি প্রবাহ সর্বোচ্চ ("পিক ওয়াটার") পর্যায়ে পৌঁছাবে। এরপর হিমবাহের আকার কমে যাওয়ায় পানির প্রবাহ ক্রমাগত হ্রাস পেতে শুরু করবে।

বিগত বছরের ক্ষয়ক্ষতি

উত্তরাখণ্ড ট্র্যাজেডি (২০২১): হিমবাহ ভেঙে আকস্মিক বন্যায় ঋষিগঙ্গা ও ধৌলিগঙ্গা উপত্যকায় ২০০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারান।

সিকিম বিপর্যয় (২০২৩): হিমবাহজাত হ্রদ ফেটে আকস্মিক প্লাবনে অন্তত ৭০ জনের মৃত্যু হয় এবং সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যাপক ক্ষতি ঘটে।

সংকট মোকাবিলায় অগ্রাধিকারমূলক প্রস্তাব

দূষণ রোধ: বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাসের তুলনায় ব্ল্যাক কার্বন দূষণ স্থানীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণযোগ্য। তাই ইটভাটার ধোঁয়া ও স্থানীয় দূষণ কমাতে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ প্রয়োজন।

আগাম সতর্কীকরণ: হিমবাহ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র বাড়ানো এবং জলবায়ু দুর্যোগের আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার করা।

টেকসই পর্যটন: বছরে প্রায় ৪০ কোটি পর্যটকের পরিবেশগত চাপ সামলাতে পর্যটন নীতি সংস্কার করা, যাতে অর্জিত রাজস্ব পাহাড়ি পরিবেশ রক্ষা ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের জন্য পুনঃবিনিয়োগ করা যায়।

সীমান্তপার সহযোগিতা: হিমালয়ের পরিবেশগত ঝুঁকি সীমান্ত দিয়ে সীমাবদ্ধ নয়। তাই ভারত, নেপাল, চীনসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে যৌথ ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ ও তথ্য বিনিময় জোরদার করা আবশ্যক।