দিল্লির আমন্ত্রণ, নাকি ঢাকার উদ্যোগ: নতুন অধ্যায় শুরু হোক মোদির বাংলাদেশ সফরে!
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভৌগোলিক নৈকট্য যেমন অনিবার্য, তেমনি মতপার্থক্যও অস্বাভাবিক নয়। দুই দেশের মধ্যে ইতিহাস, সংস্কৃতি, নদী, সীমান্ত, বাণিজ্য, নিরাপত্তা এবং মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগের যে গভীর বন্ধন রয়েছে, তা পৃথিবীর খুব কম প্রতিবেশী দেশের মধ্যেই দেখা যায়। কিন্তু এই ঘনিষ্ঠতার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন, আস্থার সংকট এবং পারস্পরিক অভিযোগও রয়েছে। তাই সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য শুধু সৌজন্যমূলক বক্তব্য নয়, প্রয়োজন দৃশ্যমান রাজনৈতিক উদ্যোগ ও সমমর্যাদার কূটনীতি।
বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী সম্প্রতি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর আরও দ্রুত হওয়া উচিত। তাঁর মতে, তারেক রহমান ও নরেন্দ্র মোদি দুজনই জনগণের নেতা এবং তাঁরা একসঙ্গে বসলে এমন কোনো সমস্যা নেই, যা আলোচনা ও সমাধান করা সম্ভব নয়। ভারতীয় হাইকমিশনার বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের একটি নতুন ‘সোনালি সময়’ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাও প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনের সদিচ্ছার ইঙ্গিত বহন করে।
তবে স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন সামনে আসে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু করার একমাত্র পথ কি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর? এর বিপরীত পথটিও কি বিবেচনা করা যায় না? নরেন্দ্র মোদি যদি তারেক রহমানের ভারত সফরের আগে বাংলাদেশে আসেন, তাহলে সেই সফর কি দুই দেশের মধ্যকার আস্থার সংকট নিরসনে আরও শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা হয়ে উঠতে পারে না?
আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে কে আগে কার দেশ সফর করলেন, সেটি সব সময় মর্যাদা বা শক্তির প্রশ্ন নয়। রাষ্ট্রীয় সফর নির্ধারিত হয় রাজনৈতিক প্রয়োজন, পারস্পরিক সুবিধা, নিরাপত্তা, সময়সূচি এবং আলোচ্য বিষয়ের প্রস্তুতির ভিত্তিতে। অতএব তারেক রহমান আগে ভারত সফর করলে বাংলাদেশের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে এমন ধারণা যেমন সঠিক নয়, তেমনি নরেন্দ্র মোদি আগে বাংলাদেশে এলে ভারত দুর্বলতা দেখাবে এমন ব্যাখ্যাও অযৌক্তিক।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সাধারণ কোনো সময়ের মতো নয়। গত কয়েক বছরে দুই দেশের সম্পর্কে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা কেবল সরকার পরিবর্তনের ফল নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের ভূমিকা সম্পর্কে জনমনে গড়ে ওঠা ধারণা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, তাঁর প্রত্যর্পণের প্রশ্ন, সীমান্তে হত্যা ও অনানুষ্ঠানিকভাবে মানুষ ঠেলে পাঠানোর অভিযোগ, তিস্তার পানিবণ্টন, বাণিজ্যবৈষম্য এবং বাংলাদেশকে ঘিরে ভারতীয় রাজনীতিকদের বিভিন্ন বিতর্কিত মন্তব্য।
ঢাকা ইতোমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছে যে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের আগে আরও অনুকূল কূটনৈতিক পরিবেশ তৈরি হওয়া প্রয়োজন। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাঁকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে বাংলাদেশের অনুরোধ দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম সংবেদনশীল ইস্যু হয়ে উঠেছে। ভারত বলেছে, বাংলাদেশের অনুরোধ দেশটির নিজস্ব আইনগত কাঠামোর মধ্যে বিবেচনা করা হচ্ছে। কিন্তু বিষয়টি দীর্ঘদিন অমীমাংসিত থাকলে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ভারতের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্দেহ আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই অবস্থায় মোদির ঢাকা সফর হলে সেটি একটি সাধারণ রাষ্ট্রীয় সফরের চেয়ে অনেক বেশি তাৎপর্য বহন করবে। এটি বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে ভারতের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি, জনগণের নির্বাচিত সরকারের প্রতি সম্মান এবং অতীতের অস্বস্তিকর অধ্যায় পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার দৃশ্যমান প্রতিশ্রুতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বাংলাদেশ ও ভারত সমান সার্বভৌম রাষ্ট্র হলেও আয়তন, অর্থনীতি, সামরিক সামর্থ্য ও আন্তর্জাতিক প্রভাবের ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। এ ধরনের অসম শক্তির প্রতিবেশী সম্পর্কের ক্ষেত্রে বৃহৎ রাষ্ট্রটির দায়িত্বও তুলনামূলকভাবে বেশি। ছোট প্রতিবেশীর উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়া, তার সার্বভৌমত্ব ও রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার প্রতি সম্মান দেখানো এবং সম্পর্কের ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় বাড়তি উদ্যোগ নেওয়া বৃহৎ রাষ্ট্রের দুর্বলতা নয়; বরং আত্মবিশ্বাস ও দায়িত্বশীল নেতৃত্বের পরিচয়।
নরেন্দ্র মোদি যদি এই সন্ধিক্ষণে ঢাকা সফর করেন, তাহলে তিনি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিতে পারবেন। প্রথমত, ভারত কোনো নির্দিষ্ট দল, পরিবার বা ব্যক্তির সঙ্গে নয়, বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও জনগণের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়। দ্বিতীয়ত, দিল্লি বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে নতুন সরকারের সঙ্গে সমমর্যাদার ভিত্তিতে কাজ করতে প্রস্তুত। তৃতীয়ত, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সমস্যাগুলো সমাধানে ভারত শুধু বাংলাদেশের পদক্ষেপের অপেক্ষায় নেই; নিজেও রাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে সামনে এগিয়ে আসতে প্রস্তুত।
দীনেশ ত্রিবেদী যখন বলেছেন, উভয় দেশের মানুষ যেন মর্যাদা, সম্মান ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে, তখন সেই নীতির সবচেয়ে কার্যকর বাস্তব প্রকাশ হতে পারে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা সফর। কারণ শ্রদ্ধা শুধু ভাষণে নয়, বাস্তব উদ্যোগের মধ্যেও প্রতিফলিত হতে হয়।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করবেন এটি কূটনৈতিকভাবে অস্বাভাবিক কোনো প্রস্তাব নয়। নরেন্দ্র মোদি ২০১৫ সালে রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশে এসেছিলেন। তিনি ২০২১ সালের ২৬ ও ২৭ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এবং দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আবার ঢাকা সফর করেন। অতএব নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাঁর আরেকটি বাংলাদেশ সফর দ্বিপক্ষীয় কূটনীতির স্বাভাবিক ধারাবাহিকতার অংশই হবে। বরং ২০২১ সালের পর দীর্ঘ ব্যবধান এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের কারণে এমন একটি সফরের প্রয়োজনীয়তা এখন আরও বেশি।
তবে এবার সফরটি নিছক আনুষ্ঠানিকতা বা পুরোনো বন্ধুত্বের পুনরাবৃত্তিতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সফরকে অবশ্যই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, ফলাফলমুখী এবং জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে। শুধু বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা, রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ, যৌথ ছবি এবং বন্ধুত্বের আবেগপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে বর্তমানে বিরাজমান আস্থার সংকট দূর করা সম্ভব হবে না।
শীর্ষ নেতাদের বৈঠক অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু দুই নেতা একই টেবিলে বসলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে এমন অতিরিক্ত আশাবাদ বাস্তবসম্মত নয়। বহু দ্বিপক্ষীয় সমস্যার সঙ্গে আইনি প্রক্রিয়া, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, ভারতের রাজ্য সরকারের সম্মতি, নিরাপত্তা সংস্থার অবস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত।
তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তিই এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। বছরের পর বছর শীর্ষ বৈঠক ও আশ্বাস সত্ত্বেও চুক্তিটি সম্পন্ন হয়নি। সীমান্তে প্রাণহানি বন্ধের প্রতিশ্রুতিও বারবার দেওয়া হয়েছে, কিন্তু প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি। বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ভারসাম্যহীনতা এবং বিভিন্ন অশুল্ক বাধার অভিযোগ করে আসছে। বাংলাদেশ ভারতকে ট্রানজিট ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা দিলেও বাংলাদেশের পণ্য ভারতীয় বাজারে প্রবেশের সময় বিভিন্ন প্রশাসনিক ও অশুল্ক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়। তৃতীয় দেশে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানির কিছু ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা প্রত্যাহারের মতো সিদ্ধান্তও বাংলাদেশের রপ্তানি ব্যয় এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
অতএব মোদির সম্ভাব্য সফরের আগে দুই দেশের কূটনীতিক ও কর্মকর্তাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ন্যূনতম সমঝোতা তৈরি করা প্রয়োজন। সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ বা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা এবং প্রতিটি মৃত্যুর যৌথ ও স্বচ্ছ তদন্তের ব্যবস্থা করা জরুরি। তথাকথিত ‘পুশ-ইন’ বন্ধ করে সন্দেহভাজন নাগরিকদের পরিচয় যাচাই ও প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। তিস্তা এবং অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন নিয়ে সময়বদ্ধ আলোচনার রূপরেখা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
একইভাবে বাংলাদেশের বাণিজ্যঘাটতি কমাতে ভারতীয় বাজারে বাস্তব প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা, অশুল্ক বাধা অপসারণ এবং সীমান্ত বাণিজ্য সহজ করার বিষয়ে নির্দিষ্ট ঘোষণা থাকা উচিত। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, ট্রানজিট এবং যোগাযোগ চুক্তির মূল্য ও শর্তে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ অনুরোধের বিষয়ে ভারতকে আইনসম্মত, আনুষ্ঠানিক ও সুস্পষ্ট জবাব দিতে হবে। পাশাপাশি উভয় দেশকে পুনরায় অঙ্গীকার করতে হবে যে তাদের ভূখণ্ড একে অপরের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ববিরোধী কোনো কাজে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। শিক্ষা, চিকিৎসা, ভিসা এবং জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ সহজ করার জন্যও নতুন ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
ভারতের প্রকাশিত সাম্প্রতিক দ্বিপক্ষীয় কার্যক্রমের তথ্য অনুযায়ী সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পানি, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও উন্নয়ন সহযোগিতা নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে। অর্থাৎ আলোচনার কাঠামো আগে থেকেই রয়েছে। এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং অগ্রগতি পর্যালোচনার কার্যকর ব্যবস্থা।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরকে যদি দিল্লির কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে প্রচার করা হয় অথবা মোদির বাংলাদেশ সফরকে ঢাকার কাছে ভারতের নতি স্বীকার হিসেবে দেখানো হয়, তাহলে উভয় ক্ষেত্রেই সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রতিবেশী কূটনীতিকে জয়-পরাজয়ের খেলায় পরিণত করলে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা তৈরি হয় না। সফরের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সমস্যা সমাধান, পারস্পরিক শ্রদ্ধা প্রতিষ্ঠা এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার কাঠামো তৈরি করা।
বাংলাদেশের একটি অংশের মধ্যে ভারত সম্পর্কে গভীর সন্দেহ রয়েছে। একইভাবে ভারতের জনপরিসরেও বাংলাদেশকে প্রায়ই অভিবাসন, সীমান্ত কিংবা ধর্মীয় সংখ্যালঘুর একমাত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করা হয়। দুই সরকারেরই দায়িত্ব হবে এমন ভাষা ও প্রচারণা এড়িয়ে চলা, যা অন্য দেশের মানুষের মর্যাদায় আঘাত করে অথবা দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান অবিশ্বাসকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
এই কারণে মোদির সম্ভাব্য ঢাকা সফরকে কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রদর্শনী না বানিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের পুনর্নির্মাণ হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত। বৈঠকে সরকারপ্রধানদের পাশাপাশি বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, ব্যবসায়ী, তরুণ প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থাও থাকতে পারে। এতে ভারত যে শুধু একটি বিশেষ রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে নয়, বাংলাদেশের বহুমাত্রিক সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়, সেই বার্তা স্পষ্ট হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগে দিল্লি যাবেন, না নরেন্দ্র মোদি আগে ঢাকা আসবেন আলোচনাকে শুধু এই দুটি বিকল্পে সীমাবদ্ধ রাখারও প্রয়োজন নেই। তৃতীয় একটি পথ হতে পারে কোনো আঞ্চলিক বা বহুপক্ষীয় সম্মেলনের পাশে দুই নেতার প্রথম পূর্ণাঙ্গ বৈঠক আয়োজন করা। সেই বৈঠকে একটি যৌথ রোডম্যাপ অনুমোদিত হতে পারে। এরপর নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফর এবং তার কয়েক মাসের মধ্যে তারেক রহমানের দিল্লি সফর আয়োজন করা যেতে পারে।
আরও অর্থবহ হতে পারে পরস্পরের সফরকে একটি ‘যৌথ কূটনৈতিক পর্ব’ হিসেবে ঘোষণা করা। প্রথমে মোদির ঢাকা সফরে আস্থা পুনর্গঠন এবং কয়েকটি জরুরি সমস্যায় অগ্রগতি অর্জিত হতে পারে। পরে তারেক রহমানের দিল্লি সফরে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার কাঠামো চূড়ান্ত করা যেতে পারে। এতে কে আগে গেলেন, সেই অপ্রয়োজনীয় বিতর্কের বদলে সফরগুলো থেকে কী অর্জিত হলো, সেটিই মুখ্য হয়ে উঠবে।
ভারতীয় হাইকমিশনারের ‘সোনালি সময়’ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা স্বাগত জানানোর মতো। কিন্তু সোনালি সম্পর্ক শুধু আবেগ, ইতিহাস কিংবা নেতাদের ব্যক্তিগত রসায়নের ওপর নির্মিত হয় না। এর ভিত্তি হতে হবে পারস্পরিক স্বার্থ, ন্যায্যতা, সার্বভৌম সমতা, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং দেওয়া প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন।
বাংলাদেশও ভারতের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্বার্থকে উপেক্ষা করতে পারে না। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ, সীমান্ত নিরাপত্তা, আন্তদেশীয় অপরাধ দমন, জ্বালানি সহযোগিতা এবং বঙ্গোপসাগরের স্থিতিশীলতা সবকিছুতেই বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য, পানি, সীমান্ত এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ভারতের সহযোগিতা প্রয়োজন। ফলে এই সম্পর্ক একতরফা নির্ভরতার নয়; বরং পারস্পরিক প্রয়োজন ও যৌথ স্বার্থের সম্পর্ক। এই বাস্তবতা উভয় পক্ষকে স্বীকার করতে হবে।
তারেক রহমানের ভারত সফর অবশ্যই হওয়া উচিত। দুই ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী দেশের সরকারপ্রধানদের দীর্ঘদিন মুখোমুখি আলোচনা না হওয়া কোনো সমাধান নয়। তবে সেই সফরের আগে নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের প্রস্তাবও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। বর্তমান আস্থার সংকটের মধ্যে এমন উদ্যোগ ভারতের পক্ষ থেকে শক্তিশালী সদিচ্ছার প্রমাণ হতে পারে। এটি বাংলাদেশের জনগণকে জানাবে দিল্লি শুধু ঢাকার কাছ থেকে পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছে না, নিজেও সম্পর্ক পুনর্গঠনে এগিয়ে আসছে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি কে আগে কার রাজধানীতে যাবেন, তা নয়। আসল প্রশ্ন হলো, প্রথম সফরটি কি পুরোনো সৌজন্যবাক্যের পুনরাবৃত্তি হবে, নাকি দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সমস্যার সমাধানে নতুন রাজনৈতিক সাহসের সূচনা করবে?
সম্পর্কের সত্যিকারের সোনালি সময় প্রতিষ্ঠা করতে হলে সফরের ক্রমের চেয়ে সফরের দর্শন, প্রস্তুতি ও ফলাফল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবু বর্তমান পরিস্থিতিতে নরেন্দ্র মোদি যদি প্রথম পদক্ষেপ নিয়ে ঢাকায় আসেন, সেটি হতে পারে নতুন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দেওয়া, পারস্পরিক সম্মান ফিরিয়ে আনা এবং সমমর্যাদার বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক নির্মাণের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সূচনা।অঙ্গীকার করতে হবে যে তাদের ভূখণ্ড একে অপরের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ববিরোধী কোনো কাজে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। শিক্ষা, চিকিৎসা, ভিসা এবং জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ সহজ করার জন্যও নতুন ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
ভারতের প্রকাশিত সাম্প্রতিক দ্বিপক্ষীয় কার্যক্রমের তথ্য অনুযায়ী সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পানি, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও উন্নয়ন সহযোগিতা নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে। অর্থাৎ আলোচনার কাঠামো আগে থেকেই রয়েছে। এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং অগ্রগতি পর্যালোচনার কার্যকর ব্যবস্থা।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরকে যদি দিল্লির কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে প্রচার করা হয় অথবা মোদির বাংলাদেশ সফরকে ঢাকার কাছে ভারতের নতি স্বীকার হিসেবে দেখানো হয়, তাহলে উভয় ক্ষেত্রেই সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রতিবেশী কূটনীতিকে জয়-পরাজয়ের খেলায় পরিণত করলে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা তৈরি হয় না। সফরের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সমস্যা সমাধান, পারস্পরিক শ্রদ্ধা প্রতিষ্ঠা এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার কাঠামো তৈরি করা।
বাংলাদেশের একটি অংশের মধ্যে ভারত সম্পর্কে গভীর সন্দেহ রয়েছে। একইভাবে ভারতের জনপরিসরেও বাংলাদেশকে প্রায়ই অভিবাসন, সীমান্ত কিংবা ধর্মীয় সংখ্যালঘুর একমাত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করা হয়। দুই সরকারেরই দায়িত্ব হবে এমন ভাষা ও প্রচারণা এড়িয়ে চলা, যা অন্য দেশের মানুষের মর্যাদায় আঘাত করে অথবা দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান অবিশ্বাসকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
এই কারণে মোদির সম্ভাব্য ঢাকা সফরকে কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রদর্শনী না বানিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের পুনর্নির্মাণ হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত। বৈঠকে সরকারপ্রধানদের পাশাপাশি বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, ব্যবসায়ী, তরুণ প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থাও থাকতে পারে। এতে ভারত যে শুধু একটি বিশেষ রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে নয়, বাংলাদেশের বহুমাত্রিক সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়, সেই বার্তা স্পষ্ট হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগে দিল্লি যাবেন, না নরেন্দ্র মোদি আগে ঢাকা আসবেন আলোচনাকে শুধু এই দুটি বিকল্পে সীমাবদ্ধ রাখারও প্রয়োজন নেই। তৃতীয় একটি পথ হতে পারে কোনো আঞ্চলিক বা বহুপক্ষীয় সম্মেলনের পাশে দুই নেতার প্রথম পূর্ণাঙ্গ বৈঠক আয়োজন করা। সেই বৈঠকে একটি যৌথ রোডম্যাপ অনুমোদিত হতে পারে। এরপর নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফর এবং তার কয়েক মাসের মধ্যে তারেক রহমানের দিল্লি সফর আয়োজন করা যেতে পারে।
আরও অর্থবহ হতে পারে পরস্পরের সফরকে একটি ‘যৌথ কূটনৈতিক পর্ব’ হিসেবে ঘোষণা করা। প্রথমে মোদির ঢাকা সফরে আস্থা পুনর্গঠন এবং কয়েকটি জরুরি সমস্যায় অগ্রগতি অর্জিত হতে পারে। পরে তারেক রহমানের দিল্লি সফরে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার কাঠামো চূড়ান্ত করা যেতে পারে। এতে কে আগে গেলেন, সেই অপ্রয়োজনীয় বিতর্কের বদলে সফরগুলো থেকে কী অর্জিত হলো, সেটিই মুখ্য হয়ে উঠবে।
ভারতীয় হাইকমিশনারের ‘সোনালি সময়’ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা স্বাগত জানানোর মতো। কিন্তু সোনালি সম্পর্ক শুধু আবেগ, ইতিহাস কিংবা নেতাদের ব্যক্তিগত রসায়নের ওপর নির্মিত হয় না। এর ভিত্তি হতে হবে পারস্পরিক স্বার্থ, ন্যায্যতা, সার্বভৌম সমতা, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং দেওয়া প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন।
বাংলাদেশও ভারতের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্বার্থকে উপেক্ষা করতে পারে না। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ, সীমান্ত নিরাপত্তা, আন্তদেশীয় অপরাধ দমন, জ্বালানি সহযোগিতা এবং বঙ্গোপসাগরের স্থিতিশীলতা সবকিছুতেই বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য, পানি, সীমান্ত এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ভারতের সহযোগিতা প্রয়োজন। ফলে এই সম্পর্ক একতরফা নির্ভরতার নয়; বরং পারস্পরিক প্রয়োজন ও যৌথ স্বার্থের সম্পর্ক। এই বাস্তবতা উভয় পক্ষকে স্বীকার করতে হবে।
তারেক রহমানের ভারত সফর অবশ্যই হওয়া উচিত। দুই ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী দেশের সরকারপ্রধানদের দীর্ঘদিন মুখোমুখি আলোচনা না হওয়া কোনো সমাধান নয়। তবে সেই সফরের আগে নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরের প্রস্তাবও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। বর্তমান আস্থার সংকটের মধ্যে এমন উদ্যোগ ভারতের পক্ষ থেকে শক্তিশালী সদিচ্ছার প্রমাণ হতে পারে। এটি বাংলাদেশের জনগণকে জানাবে দিল্লি শুধু ঢাকার কাছ থেকে পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছে না, নিজেও সম্পর্ক পুনর্গঠনে এগিয়ে আসছে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি কে আগে কার রাজধানীতে যাবেন, তা নয়। আসল প্রশ্ন হলো, প্রথম সফরটি কি পুরোনো সৌজন্যবাক্যের পুনরাবৃত্তি হবে, নাকি দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সমস্যার সমাধানে নতুন রাজনৈতিক সাহসের সূচনা করবে?
সম্পর্কের সত্যিকারের সোনালি সময় প্রতিষ্ঠা করতে হলে সফরের ক্রমের চেয়ে সফরের দর্শন, প্রস্তুতি ও ফলাফল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবু বর্তমান পরিস্থিতিতে নরেন্দ্র মোদি যদি প্রথম পদক্ষেপ নিয়ে ঢাকায় আসেন, সেটি হতে পারে নতুন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দেওয়া, পারস্পরিক সম্মান ফিরিয়ে আনা এবং সমমর্যাদার বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক নির্মাণের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সূচনা।
লেখক: সহিদুল আলম স্বপন, সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং ও আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ, কলামিস্ট ও কবি।