আতঙ্ক নয়, ডেঙ্গুতে সতর্কতা জরুরি
দেশব্যাপী ডেঙ্গুর বিস্তার নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সর্বস্তরের মানুষকে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন জনস্বাস্থ্যবিদ ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। তারা জানিয়েছেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট কোনো কার্যকর ওষুধ বা কার্যকর প্রতিষেধক ভ্যাকসিন না থাকায় সচেতনতা বৃদ্ধি ও এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ করাই এই রোগ থেকে বাঁচার প্রধান উপায়।
জ্বর হলে ঘরে বসে না থেকে অবিলম্বে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পাশাপাশি বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এ বছরের ২৮ জুলাই পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৪,১৫৬ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ৪৭ জনের। একই সময়ে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে উঠেছেন ১৭,০০৯ জন। ২০২৫ সালে (১ জানুয়ারি - ৩১ ডিসেম্বর) মোট ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১,০২,৮৬১ জন ও মোট মৃত্যু হয়েছিল ৪১৩ জনের।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এডিস মশা সাধারণত বাসাবাড়ি ও আশপাশের জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়ে। তাই মশার বিস্তার রোধে বেশকিছু পদক্ষেপগুলো নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। ফুলের টব, ড্রাম, বালতি, এয়ার কন্ডিশনার (AC) ও রেফ্রিজারেটরের ট্রের পানি নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই যেন টানা ৫ দিনের বেশি পানি জমে না থাকে। বাড়ির ছাদ, আঙিনা ও আনাচে-কানাচে জমা থাকা অপ্রয়োজনীয় ডাবের খোসা, কাপ বা অন্যান্য পাত্র ডাস্টবিনে ফেলে দিতে হবে। বাড়ির চারপাশের ঝোপঝাড়, জঙ্গল ও জলাশয় নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
ডেঙ্গুর লক্ষণ ও প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যবস্থা
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হাসান হাফিজুর রহমান ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন:
ডেঙ্গু জ্বরে শরীরের তাপমাত্রা ১০২ থেকে ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠতে পারে। মাথায় পানি দেওয়া এবং সুতি ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর বারবার মুছে দেওয়ার মাধ্যমে জ্বর নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা পর পর জ্বরের তীব্রতা বুঝে কেবল প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ দেওয়া যাবে।
ডেঙ্গু চিকিৎসার মূল ভিত্তি হলো শরীরে পানির ভারসাম্য বজায় রাখা। রোগীকে পর্যাপ্ত পানির পাশাপাশি খাবার স্যালাইন, ডাবের পানি, ফলের রস, স্যুপ ও শরবতের মতো তরল খাবার বেশি করে খাওয়াতে হবে।
সামাজিক সমন্বয় ও দীর্ঘমেয়াদী কৌশল : জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মুশতাক হোসেন উল্লেখ করেন, ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই কেবল হাসপাতালে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; এর সূচনা হতে হবে বাড়ি, স্কুল, কর্মস্থল ও স্থানীয় জনসমাজ থেকে। তিনি বলেন, "বৃষ্টিকে কেবল একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে না দেখে, বৃষ্টির পর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। দ্রুত রোগী শনাক্তকরণ, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষার আওতায় আনা এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সমন্বিত উদ্যোগ নিলে ডেঙ্গুজনিত মৃত্যু ও বার্ষিক দুর্ভোগ থেকে দেশকে মুক্ত করা সম্ভব।"
প্যানিক বা আতঙ্ক না ছড়িয়ে নাগরিক দায়িত্ব পালন ও সচেতনতার মাধ্যমেই ডেঙ্গুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত দিয়েছেন।