ছোটগল্প

ধুলোমাখা আয়না

মাধবী তাপসী
প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৫:২২ পিএম
আপডেট: ০১ আগস্ট ২০২৬, ১১:৪৮ পিএম
Main News Image

আজ কি তবে বুকের গহিনে কোনো এক নামহীন মেঘ জমেছে? চারপাশের এই চেনা বাতাসটাও কি বড্ড ভারী ঠেকছে আজ? তবে চলো না, সমস্ত জাগতিক হিসেব-নিকেশ একপাশে সরিয়ে রেখে দুজনে মিলে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা কাঁচাপাতি চা নিয়ে বসি। চায়ের লিকারটা আজ না হয় একটু বেশিই তিতকুটে হোক। উষ্ণ চিনেমাটির কাপে আজ না হয় জীবনের সমস্ত না-বলা দীর্ঘশ্বাসগুলোকে অল্প অল্প করে গুলিয়ে নেওয়া যাক। দীর্ঘশ্বাসের সেই তেতো স্বাদটুকু যখন ঠোঁট ছুঁয়ে ভেতরে প্রবেশ করবে, তখন হয়তো ভেতরের জমে থাকা শূন্যতাটুকু এক লহমায় কিছুটা হলেও হালকা মনে হবে।

এই যে চারপাশের নিশ্চল দেয়ালগুলো, এরাই কি আজ আস্ত একটা জ্যান্ত দানবের মতো গ্রাস করতে আসছে? মনে হচ্ছে না কি, এই জড় ইটের পাঁজরগুলো আসলে এক অমোঘ পঞ্চভূত হয়ে চারদিক থেকে চারপাশ চেপে ধরছে? দমবন্ধ করা এই খাঁচা ভেঙে আজ বাইরে বেরিয়ে পড়লে কেমন হয়? চলো, আজ ওই অসীম, নির্বাক আর উদার আকাশটার নিচে গিয়ে দাঁড়াই। সেখানে তারারা হয়তো টু শব্দটিও করবে না ঠিকই, কিন্তু বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখা যে গভীর মৌনতা, যে নৈশব্দ্য, তাকে চিনে নিতে তারা কখনোই ভুল করবে না।

সেখানেও কি খুব কষ্ট হচ্ছে? একাকিত্বের আঁচড় কি তবে সেখানেও তাড়া করে বেড়াচ্ছে? তবে এসো, ঘরের কোণে একটা সাধারণ মোমবাতি জ্বালাই। যদি চোখের সামনে জ্বলতে থাকা কোনো আলোই ভালো না লাগে, তবে ওই জ্বলন্ত মোমটির শরীর বেয়ে গলে পড়া অশ্রুগুলোর দিকে একবার নিবিষ্ট মনে তাকিয়ে দেখো। নিজেকে তিল তিল করে পুড়িয়ে অন্যকে আলো দেওয়ার যে অদ্ভুত ক্লান্তি, তার সাথে কি আমাদের চিরকালীন সত্তার অবিকল মিল খুঁজে পাওয়া যায় না? মোম যেমন কোনো অভিযোগ ছাড়া নিজেকে নিঃশব্দে ক্ষয় করে ফেলে, আমরাও কি অবিকল সেভাবেই নিজেদের গভীরে গুমরে মরি না?

আচ্ছা, ঘরের আলমারিটাতে কি খুব সাধারণ কোনো আটপৌরে শাড়ি খুঁজে পাওয়া যাবে? কোনো কৃত্রিম আভিজাত্যের চাকচিক্য নয়, খুব দামী রেশম সুতোর কারুকাজও নয়—একদম সাদামাটা একটা সুতির শাড়ি হলেই চলবে। চলো, সমস্ত জাগতিক লৌকিকতা আর অহমিকার আবরণ খুলে আজ না হয় খুব সাধারণ এক আত্মপরিচয়ে বাঁচি। শাড়ির প্রতিটি ভাঁজে ভাঁজে জড়িয়ে থাকুক এক সহজাত সারল্য। তবে তার আগে, চোখের কোণে জমে থাকা সবটুকু ঝাপসা মেঘ আর নোনা বিষাদকে একটু স্বচ্ছ জলের ঝাপটায় ধুয়ে নেওয়া যাক। মন যখন পাথরের মতো অসাড় হয়ে যায়, তখন ওই শীতল জলের স্পর্শও এক তীব্র জ্বলন সৃষ্টি করে, এ কথা তো ধ্রুব সত্য। কিন্তু জীবন তো আসলে এক অলিখিত, অঘোষিত যুদ্ধের নাম, যেখানে লড়াইটা সবসময় নিজেরই সাথে নিজের করতে হয়।

যখন চারপাশের পৃথিবীটা পুরোপুরি নিশ্চুপ হয়ে যায়, যখন নিজের ঘরের দেয়ালগুলোও দানবের মতো গ্রাস করতে আসে, তখন মানুষ নিজের অবয়বের মুখোমুখি দাঁড়ায়! এক দোসর অন্য দোসরের চোখ দিয়ে চেয়ে দেখে নিজেরই ভাঙা প্রতিবিম্ব!

একবার স্মৃতির পাতা উল্টে মনে করে দেখো তো, প্রিয় কোনো মানুষকে চিরতরে হারানোর সেই পাহাড়সম শোক যখন মাথার ওপরের আস্ত আকাশটাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিল, তখনও কি লড়াইটা শেষ হয়ে গিয়েছিল? যখন এই রূঢ় পৃথিবীর কারো সামনে দাঁড়ানোর ন্যূনতম শক্তি অবশিষ্ট ছিল না, তখনও কি মেরুদণ্ড সোজা করে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা যায়নি? তবে আজ নিজের অবাধ্য মনের কাছে একটা ছোট চ্যালেঞ্জে হেরে যাওয়া কি খুব সমীচীন হবে?

চলো, আজ একটু শহরের ব্যস্ত কোলাহলের ভেতর নিজেদের সত্তা হারিয়ে ফেলি। মোড়ের মাথায় ওই পান মামা কীভাবে পরম আয়েশে নিখুঁত হাতের ছোঁয়ায় পানের খিলি সাজাচ্ছেন, তা না হয় একটু দূর থেকে খেয়াল করি। কান পাতা যাক সেই অতিপরিচিত হকারদের সমস্বরে চেঁচামেচিতে—‘তিনশো তিনশো, ওই মামা লাগবো নাকি!’ মানুষের এই অতি সাধারণ, ধুলোবালিমাখা বেঁচে থাকার তীব্র লড়াইটা আজ খুব কাছ থেকে অনুভব করা দরকার। যেখানে বেঁচে থাকার কোনো অলঙ্কার নেই, অথচ বেঁচে থাকার জেদটা কি অসামান্য।

তারপর চলো, একটা রিকশায় চড়ে বসি। হুডটা ফেলে দিয়ে রিকশাওয়ালা মামাকে ডেকে বলি, ‘ও মামা, চলেন! যেদিকে দুচোখ যায়, যেদিকে আপনার চাকা ঘুরতে চায়, আজ সেদিকেই চলেন।’ মামার সাথে অলস গল্প জুড়ি। জানতে চাই, ‘মামা, সকালে কী খেয়েছেন? ঘরে মামি ভালো আছে তো?’ গল্পের এই সহজ সুরের মাঝেই যখন দূর থেকে ঝকঝকে রঙিন হাওয়াই মিঠাইয়ের কাচপাত্রটি দেখা যাবে, তখন মামাকে থামিয়ে বলি, ‘এই যে মামা, হাওয়াই মিঠাই নেন। আসুন, আমরা সবাই মিলে আজ এই মেঘের মতো মিষ্টি তুলোটা ভাগ করে খাই।’

হাওয়ার বুকে যখন হাওয়াই মিঠাইয়ের আঁশগুলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাবে, তখন চলন্ত চাকার ছন্দে না হয় রবিবাবুর সেই চেনা গানটা গুনগুন করে গাওয়া যাক—‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে।’ একাকী পথ চলার যে অসীম বল, তা না হয় এই গানের চিরন্তন সুর থেকে আজ একটুখানি কুড়িয়ে নিই। তারপর হঠাৎ কোনো রাস্তার মোড়ে এক চিলতে চায়ের টং দোকান দেখে আনন্দের সুর ভেসে উঠুক—‘মামা, এই যে চায়ের দোকান পেয়ে গেছি। রিকশাটা একটু থামান।’ দোকানি মামাকে কড়া করে চায়ের ফরমাশ দিয়ে, পাশের রিকশাচালক মামার দিকে চেয়ে বলি, ‘মামা, চায়ের সাথে কিন্তু একটু মনের মতো টা-ও খেয়ে নিয়েন। আপনার যা ভালো লাগে, বিড়ি হোক বা সিগারেট, একটু ধোঁয়া উড়িয়ে আয়েশ করে তবেই না হয় আবার চাকা ঘোরাবেন।’

এই যে দেখো, একটু কাছে এসে বসা যায় না? মনের ভেতরটা যখন নাম না জানা এক শূন্যতায় ভারী হয়ে ওঠে, তখন বুকের ভেতর বয়ে চলা প্রতিটি তপ্ত নিঃশ্বাসও একেকটা বিশাল পাথরের চাইয়ের মতো চেপে বসে। বিষাদের নিবিড় কালো মেঘ যখন দরজায় সশব্দে করাঘাত করে, তখন মানুষ স্বভাবতই নিজেকে এক গভীর অন্ধকার কোণে গুটিয়ে আড়াল করতে চায়, এটাই তো চরম বাস্তবতা। কিন্তু ওভাবে নিজেকে বিলীন করে দিও না তো।

এসো না, আজ দুজনে মিলে এই জমাট বাঁধা কুয়াশা কেটে ভোরের আলো খোঁজার চেষ্টা করি। এই অনন্ত মহাবিশ্বে কোনো হাহাকার, কোনো দীর্ঘশ্বাসই তো শুধু একজনের একার সম্পত্তি নয়। আমরা সবাই তো ভেতরে ভেতরে কোনো না কোনো ভাঙা আয়নার টুকরো পরম যত্নে বুকে বয়ে বেড়াচ্ছি। কারো আয়না হয়তো একটু বেশি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়েছে, কারোটা হয়তো সামান্য কম—পার্থক্য তো কেবল এটুকুই।

একটু কাছে এসো, লক্ষ্মীটি। চলো, আমাদের বুকের গভীরে ভাঙা আয়নায় প্রতিফলিত সেই ধুলোমাখা একাকী সত্তাটাকে পরম মমতায়, খুব সাবধানে আগলে রাখি। দেখবে, যখন জীবনের এই বহমান স্রোতে আমরা নিজেদের একাকার করে দেব, তখন ওই পাহাড়সম ভারী নিঃশ্বাসগুলোও কোনো এক স্নিগ্ধ ভোরের নরম বাতাসের মতো হালকা হয়ে চারদিকে মিলিয়ে যাবে।

মাধবী তাপসী: জন্ম ও বেড়ে ওঠা ময়মনসিংহ বিভাগে। পড়াশোনা শেষে এখন ঢাকায় বসবাস করেন। মূলত গল্প লেখেন। মূল নাম, তাপসী সুরাইয়া মাধবী। লেখালেখি করেন, মাধবী তাপসী নামে।