মুঠোফোন, আমরা ও আমাদের অর্ধাঙ্গিনীরা
সভ্যতার ইতিহাসে মানুষ অনেক বিপ্লব দেখেছে। আগুন আবিষ্কার, চাকার উদ্ভব, বাষ্পীয় ইঞ্জিন, ইন্টারনেট এসব নিয়ে পণ্ডিতেরা মহাগ্রন্থ রচনা করেছেন। কিন্তু আমার মতে, সবচেয়ে নীরব, সবচেয়ে গভীর এবং সবচেয়ে বিপজ্জনক বিপ্লবটি ঘটেছে বিবাহিত পুরুষের হাতে একটি মুঠোফোন তুলে দেওয়ার মধ্যদিয়ে। এই একটি যন্ত্র দাম্পত্য জীবনের সমীকরণ চিরতরে পাল্টে দিয়েছে। এবং সেই পরিবর্তনের সিংহভাগ, দুঃখজনকভাবে, আমাদের অর্থাৎ স্বামীজাতির বিপক্ষে গেছে।
প্রথম অধ্যায় : ফোনের জন্মের আগের সেই স্বর্ণযুগ
একটু কল্পনা করুন সেই সময়টার কথা, যখন মুঠোফোন ছিল না। স্বামী অফিস থেকে একটু দেরিতে ফিরলে কেবল বলতেন, "আরে, রাস্তায় জ্যাম ছিল।" স্ত্রী হয়তো একটু ভুরু কুঁচকাতেন, কিন্তু কোনো প্রমাণ ছিল না। সন্দেহ ছিল, কিন্তু সেই সন্দেহ ছিল অনুমানের ওপর ভাসমান মেঘের মতো ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না।
এখন? স্ত্রী গুগল ম্যাপে রিয়েল-টাইম ট্র্যাফিক দেখে ফেলেন। "তোমার রাস্তায় জ্যাম ছিল? গুগল বলছে সেখানে ট্র্যাফিক একদম ফাঁকা ছিল রাত আটটায়!" এই একটি বাক্যের সামনে পৃথিবীর সেরা আইনজীবীও নির্বাক হয়ে যাবেন।
মুঠোফোন আসলে স্বামীজাতির শেষ আশ্রয়টুকু কেড়ে নিয়েছে সেটার নাম হলো সুবিধাজনক অস্পষ্টতা।
দ্বিতীয় অধ্যায় : "তুমি ফোনে কার সাথে কথা বলছিলে?"
বিজ্ঞানীরা বলেন মানুষের স্মৃতিশক্তি অনির্ভরযোগ্য। কিন্তু এই সূত্র বিবাহিত মহিলাদের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ প্রযোজ্য নয়। আমার বন্ধু রতন পুরো নাম রতনকুমার সাহা, ডাকনাম এখন "ওই ফোন-আসক্ত মানুষটা" একবার তার অফিসের সহকর্মী পিন্টুর সাথে ফোনে কথা বলছিল। কথোপকথনের বিষয় ছিল ক্রিকেট। তার স্ত্রী মিতা জিজ্ঞেস করলেন, "কার সাথে কথা বলছিলে?"
"পিন্টুর সাথে।"
"পিন্টু কে?"
"অফিসের কলিগ।"
"কী দরকার ছিল?"
"ক্রিকেট নিয়ে।"
"রাত দশটায় ক্রিকেট নিয়ে কথা বলতে হয়?"
"ম্যাচ চলছিল।"
"কোন চ্যানেলে?"
রতন এই পর্যায়ে নিজেই ভুলে গিয়েছিল কোন চ্যানেলে ম্যাচ ছিল। তার বিবাহিত জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা ছিল এটি। সে পরীক্ষায় সে ফেল করেছিল।
এই হলো মুঠোফোনের প্রথম অভিশাপ এটি প্রশ্নের দরজা খুলে দেয়, কিন্তু উত্তরের জানালা বন্ধ করে দেয়।
তৃতীয় অধ্যায় : হোয়াটসঅ্যাপ - আশীর্বাদ না অভিশাপ?
হোয়াটসঅ্যাপ আবিষ্কার করেছিলেন জ্যান কাউম আর ব্রায়ান অ্যাক্টন। তাঁরা নিশ্চয়ই ভাবেননি যে তাঁদের এই সৃষ্টি একদিন লক্ষ লক্ষ বিবাহিত পুরুষের ঘুম কেড়ে নেবে।
সমস্যার শুরু হয় "লাস্ট সিন" নামক সেই ছোট্ট অথচ মারাত্মক ফিচারটি দিয়ে। ধরুন, রাত বারোটায় আপনি ঘুমাচ্ছেন না, বরং ফোনে কয়েকটা মিম দেখছেন। আপনার স্ত্রী সকালে উঠে দেখলেন আপনার হোয়াটসঅ্যাপের লাস্ট সিন রাত ১২টা ৪৭ মিনিট। তাঁর প্রশ্ন আসবেই "রাত বারোটার পর ফোনে কী করছিলে?" এখন আপনি যদি বলেন "মিম দেখছিলাম," তাহলে প্রশ্ন আসবে, "কার পাঠানো মিম?"
দেখুন, মিমেরও জাত-পাত আছে। বন্ধুর পাঠানো মিম গ্রহণযোগ্য। কিন্তু অফিসের কোনো মহিলা সহকর্মীর পাঠানো মিম? সেটা কেবল মিম নয়, সেটা একটি কূটনৈতিক সংকটের সূচনাবিন্দু।
আমার আরেক বন্ধু সুমন একবার আমাকে বলেছিল, "ভাই, আমি এখন ঘুমাতে যাওয়ার আগে ফোন বন্ধ করে দিই, যাতে লাস্ট সিন না দেখায়।" আমি জিজ্ঞেস করলাম, "তাতে কাজ হয়?" সে একটু চুপ করে বলল, "না। কারণ ফোন বন্ধ থাকলে ও জিজ্ঞেস করে, 'ফোন বন্ধ কেন রেখেছিলে রাতে?'"
মুঠোফোন ব্যবহার করলে সমস্যা, না করলেও সমস্যা। এই হলো আধুনিক বিবাহিত পুরুষের অস্তিত্বসংকট।
চতুর্থ অধ্যায় : ফোন ঘাঁটা একটি জাতীয় সংকট
বিবাহিত জীবনে একটি অলিখিত সংবিধান থাকে। তার প্রথম ধারায় লেখা আছে "স্বামীর ফোন স্ত্রীর সম্পত্তি।" দ্বিতীয় ধারায় "স্ত্রীর ফোন স্ত্রীর একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়।"
এই দুটি ধারার মধ্যে যে বিশাল বৈষম্য, তা নিয়ে কোনো আন্দোলন হয় না। কারণ যে আন্দোলন করবে, সে রাতে ভাত পাবে না।
আমার বন্ধু অরিন্দম একটি অভূতপূর্ব কাজ করেছিল। সে তার ফোনে পাসওয়ার্ড দিয়েছিল। এই একটি সিদ্ধান্ত তার বিবাহিত জীবনে যে ঝড় ডেকে এনেছিল, তার বিবরণ দিতে গেলে মহাভারত হয়ে যাবে। সংক্ষেপে বলি পাসওয়ার্ড দেওয়ার কারণ হিসেবে "অফিসের গোপন ডকুমেন্ট আছে" বলার পরও তার স্ত্রী সন্তুষ্ট হননি। শেষমেশ পাসওয়ার্ড তুলে দিতে হয়েছিল এবং ফোনের সমস্ত কনটাক্টে মহিলা নামগুলো যত্ন করে পরীক্ষা করা হয়েছিল।
"রিয়া কে?" এই প্রশ্নের উত্তরে "অফিসের অ্যাকাউন্ট্যান্ট" বললে যে সংশয়ের দৃষ্টি পাওয়া যায়, তা সারাদিন রোদে দাঁড়িয়ে কাজ করার চেয়েও বেশি ক্লান্তিকর।
পঞ্চম অধ্যায় : ডিনার টেবিলে ফোন —মহাপাপ
অবশ্য, মুঠোফোন নিয়ে কেবল স্বামীরাই বিপদে পড়েন না। স্ত্রীরাও এখন ফোনে আসক্ত। কিন্তু তাদের আসক্তির ধরন ভিন্ন। স্বামীর আসক্তি হলো ক্রিকেট স্কোর, ইউটিউব, বা বন্ধুদের গ্রুপ চ্যাট। স্ত্রীর আসক্তি হলো রিলস দেখা যেখানে হয় রান্নার রেসিপি, নয়তো "হাজব্যান্ড কতটা অকেজো" ধরনের ভিডিও।
ডিনার টেবিলে একটি দৃশ্য এখন অতি পরিচিত স্বামী ফোনে ক্রিকেট দেখছেন, স্ত্রী রিলস দেখছেন, আর মাঝখানে ধোঁয়া ওঠা ভাত ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। এই দৃশ্যটি আধুনিক দাম্পত্যের সবচেয়ে সৎ প্রতিচ্ছবি।
কিন্তু এখানেও আইন অসম। স্ত্রী ফোন দেখলে সেটা "রান্নার আইডিয়া নিচ্ছি।" স্বামী দেখলে সেটা "সারাক্ষণ ফোনে পড়ে থাকো!"
ষষ্ঠ অধ্যায় : সেলফি সম্পর্কের নতুন পরিমাপক
"আমাদের একটা ছবি তুলব?" এই নিরীহ প্রশ্নটি এখন বিশাল দায়িত্বের জন্ম দেয়। ছবি তুলতে হবে, কিন্তু কোন অ্যাঙ্গেলে? কোন আলোয়? স্ত্রী যদি বলেন "আরেকটা তোলো," তাহলে বুঝতে হবে এটি একটি দীর্ঘ অভিযানের শুরু মাত্র।
আমার বন্ধু প্রদীপ বলেছিল, "ভাই, গত বার কক্সবাজার গেলাম। সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে দুই ঘণ্টা ছবি তুললাম। কিন্তু সমুদ্র নিজে দেখিনি।" এই কষ্টের কথাটা সে এতটাই নির্লিপ্তভাবে বলেছিল যে আমার চোখে জল এসে গিয়েছিল।
তারপর ইনস্টাগ্রামে ছবি পোস্ট হয়। ক্যাপশন "My world 🌸❤️"। স্বামী লাইক না দিলে? সর্বনাশ! "তোমার কি আমার ছবিতে লাইক দিতে লজ্জা করে?"
সপ্তম অধ্যায় : বাস্তবের হাসির খনি — যা না বললেই নয়!
"১ ফোন কোথায়?" — একটি চিরন্তন মহাকাব্য
প্রতিটি বিবাহিত পুরুষের দিন শুরু হয় একটি প্রশ্ন দিয়ে নয়, একটি আতঙ্ক দিয়ে। সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথম কাজ হলো ফোন খোঁজা। বালিশের নিচে নেই, চার্জারে নেই, বিছানার চাদরের ভেতরে নেই। ততক্ষণে স্ত্রী রান্নাঘর থেকে চিৎকার করছেন "চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে!"
অথচ রহস্যের কথা হলো ফোনটা শেষমেশ পাওয়া যাবে ঠিকই, কিন্তু কোথায়? স্ত্রীর আঁচলের নিচে। তিনি নিজেই রাতে নিয়ে ফেলেছেন, ভুলে গেছেন, আবার জিজ্ঞেসও করছেন না। এই দৃশ্যে স্বামী রাগ করতে পারবেন না, হাসতেও পারবেন না। শুধু চুপচাপ ফোনটা নিয়ে চা খাবেন এটাই নিয়তি।
২. ডুয়েল ক্যামেরার যুগে একটি ছবির জন্য তিরিশ মিনিট
রেস্তোরাঁয় খাবার এসেছে। ধোঁয়া উঠছে। গন্ধে পেট ডাকছে। কিন্তু কেউ হাত দিতে পারবেন না। কারণ ছবি তোলা হয়নি।
স্ত্রী ফোন তুলেছেন। প্রথম ছবি — "আলো ঠিক নেই।" দ্বিতীয় ছবি — "প্লেটটা একটু সরাও।" তৃতীয় ছবি — "তুমি ফ্রেমে ঢুকে গেছ।" চতুর্থ ছবি — "ওই লোকটা পেছনে দাঁড়িয়ে আছে।" পঞ্চম ছবি — "এবার ঠিক আছে, কিন্তু আমার আঙুলটা একটু বাঁকা লাগছে।"
এই পর্যায়ে বিরিয়ানি ঠান্ডা হয়ে গেছে, স্বামীর ক্ষুধা রাগে পরিণত হয়েছে, আর ওয়েটার তিনবার এসে ফিরে গেছে। শেষে যে ছবিটা ইনস্টাগ্রামে যাবে, সেটার ক্যাপশন হবে "Perfect evening "।
স্বামী জানেন, সেই ইভনিং-এর একমাত্র পারফেক্ট জিনিস ছিল বিরিয়ানির প্রথম দশ মিনিটের ধোঁয়া যেটা ছবি তুলতে গিয়ে মিস হয়ে গেছে।
৩. "তোমার ফোনে ওই মেয়েটার নম্বর কেন সেভ করা?"
এটি বিবাহিত জীবনের সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রশ্নগুলোর একটি। এবং এই প্রশ্নের উত্তর যত সত্যি হবে, ততই সন্দেহজনক শোনাবে।
আমার বন্ধু তমাল একবার এই প্রশ্নের মুখে পড়েছিল। তার ফোনে "সোনিয়া আপা" নামে একটি নম্বর ছিল। স্ত্রী দেখে জিজ্ঞেস করলেন, "এই সোনিয়া আপা কে?"
তমাল শান্তভাবে বলল, "ওটা আমাদের বাড়িওয়ালার বউ।"
স্ত্রী — "বাড়িওয়ালার বউকে সোনিয়া আপা বলো কেন? উনি কি তোমার চেয়ে বড়?"
তমাল — "হ্যাঁ, বয়সে বড়।"
স্ত্রী — "কতটুকু বড়?"
তমাল — "মানে... বছর পাঁচেক হবে।"
স্ত্রী — "পাঁচ বছরের বড়কে এত আদর করে আপা ডাকতে হয়?"
এই পর্যায়ে তমাল বুঝে গিয়েছিল উত্তর যাই দিক, রাতের ভাত অনিশ্চিত।
৪. গ্রুপ চ্যাটের বিপদ — "বন্ধুরা" নামক মাইনফিল্ড
স্বামীদের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থাকে। নাম হয় "দোস্তরা", "ব্রো গ্যাং ", বা "চার ইয়ার পুরানা দোস্ত।" এই গ্রুপে যা কথা হয় তার নব্বই ভাগই নির্দোষ ক্রিকেট, সিনেমা, আড্ডার পরিকল্পনা।
কিন্তু সমস্যা হয় যেদিন স্ত্রীর হাতে ফোন পড়ে এবং তিনি গ্রুপের পুরনো চ্যাট স্ক্রোল করতে থাকেন। তিন মাস আগে কেউ একটা মজার মিম পাঠিয়েছিল, যেটাতে লেখা ছিল "বিয়ের পর জীবন মানে খাঁচার পাখি "। এবং স্বামী সেটায় হাহা রিয়েক্ট দিয়েছিলেন।
সেই একটি হাহা রিয়েক্ট সেদিন রাতে পারিবারিক আদালতের প্রধান সাক্ষ্য হয়ে উঠেছিল।
"তাহলে আমি তোমার কাছে খাঁচা?"
"না না, ওটা মজার ছিল।"
"কীসে মজা? বিয়েটা কি মজার বিষয়?"
বন্ধুরা পরদিন জানতে পারল — গ্রুপ থেকে স্বামীটি নিজেই বেরিয়ে গেছেন। শান্তিচুক্তির শর্ত হিসেবে।
৫. ভয়েস নোট — নতুন যুগের নতুন বিপদ
হোয়াটসঅ্যাপে ভয়েস নোট পাঠানো এখন ভীষণ জনপ্রিয়। কিন্তু এই ফিচারটি বিবাহিত পুরুষের জন্য একটি সূক্ষ্ম ফাঁদ।
অফিসের কোনো মহিলা সহকর্মী যদি কাজের বিষয়ে একটি ভয়েস নোট পাঠান, আর সেই নোটে তার কণ্ঠস্বর যদি সামান্য মিষ্টি হয় তাহলে স্ত্রীর কাছে সেটা আর কাজের বার্তা থাকে না। সেটা হয়ে ওঠে একটি "তদন্তযোগ্য দলিল।"
"এত মিষ্টি গলায় কথা বলে কেন?"
"ও এমনিই কথা বলে।"
"তুমি কীভাবে জানো ও এমনিই কথা বলে?"
এই প্রশ্নের জাল থেকে বের হওয়ার কোনো পথ নেই। এটি একটি যৌক্তিক ব্ল্যাকহোল।
৬. চার্জার নিয়ে মহাযুদ্ধ — বিবাহিত জীবনের সবচেয়ে বাস্তব লড়াই
বিশ্বাস করুন, অনেক দম্পতির সবচেয়ে বড় ঝগড়া ভালোবাসা বা সম্পর্ক নিয়ে নয় — চার্জার নিয়ে।
একটিমাত্র চার্জার। দুটি ফোন। দুটি আত্মা। এবং একটি অনন্তকালীন সংঘাত।
রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে স্বামী চার্জার লাগিয়ে দিয়েছেন। সকালে উঠে দেখেন — চার্জার তাঁর ফোন থেকে খুলে স্ত্রীর ফোনে লাগানো। তাঁর ফোনের ব্যাটারি তিন শতাংশ।
"তুমি আমার চার্জার নিলে কেন?"
"আমারটা নষ্ট।"
"তাহলে আগে বলবে?"
"তুমি ঘুমিয়ে ছিলে।"
"জাগিয়ে দিলেই হতো।"
"ঘুম ভাঙালে রাগ করতে।"
এই যুক্তির কাছে পৃথিবীর কোনো দর্শন টিকতে পারে না। ইমান্যুয়েল কান্ট বেঁচে থাকলে এই কথোপকথন শুনে নিজেই দর্শনশাস্ত্র ছেড়ে দিতেন।
৭. "একটু ফোন রেখে কথা বলো" — রিভার্স সমস্যা
এতক্ষণ স্বামীর ফোন-আসক্তির গল্প বললাম। এবার একটু ন্যায্যতা দিই।
রবিবার সকাল। স্বামী ফোন রেখে বললেন, "চলো, একটু গল্প করি।" স্ত্রী বললেন, "হ্যাঁ, একটু দাঁড়াও।" তারপর তিনি ফোনে একটা রিলস দেখতে শুরু করলেন। সেটা শেষ হলো দ্বিতীয় রিলস এলো। তারপর তৃতীয়। তারপর চতুর্থ।
চল্লিশ মিনিট পরে স্বামী নিজেই ফোন তুলে ক্রিকেটের স্কোর দেখতে শুরু করলেন।
তখন স্ত্রী ফোন রেখে বললেন, "দেখো, সারাক্ষণ ফোনেই থাকো!"
এই মুহূর্তে স্বামীর মুখে যে অভিব্যক্তি আসে, সেটার কোনো ভাষাগত বর্ণনা সম্ভব নয়। কেবল একজন অভিজ্ঞ চিত্রশিল্পী হয়তো সেটা আঁকতে পারতেন শোক, বিস্ময় এবং অসীম ক্লান্তির এক অদ্ভুত মিশ্রণ।
শেষ কথা
সপ্তম অধ্যায়ের এই সব ঘটনা কোনো কল্পনা নয়। এগুলো প্রতিদিন, প্রতিটি বাড়িতে, প্রতিটি শহরে ঘটে চলেছে। লক্ষ লক্ষ স্বামী প্রতিদিন এই ছোট ছোট যুদ্ধে হারছেন, আবার হেসে উঠছেন। কারণ এই হারার ভেতরেই আছে এক অদ্ভুত জয় ভালোবাসার জয়।
মুঠোফোন আমাদের কাছে এসেছে। কিন্তু আমাদের অর্ধাঙ্গিনীরা আরও আগে এসেছেন। এবং তাঁরাই চার্জার চুরি, লাস্ট সিন যাচাই, ভয়েস নোট বিশ্লেষণ সহ আমাদের জীবনের সবচেয়ে রঙিন অধ্যায়।
তবুও ভালোবাসা
এতক্ষণ যা বললাম, তার পুরোটাই হাসির। কিন্তু শেষ কথাটা একটু গভীর।
মুঠোফোন এসে আমাদের জীবনে যত ঝামেলাই করুক, একটা সত্য কিন্তু পাল্টায়নি। রাত তিনটায় জ্বর এলে স্ত্রী যে ফোনটা তুলে ডাক্তারের নম্বর খোঁজেন, সেই ফোন তখন আশীর্বাদ। দূরে থাকলে ভিডিও কলে মুখ দেখার যে আনন্দ, সেটা মুঠোফোন ছাড়া সম্ভব হতো না। আর স্ত্রী যখন হাজার মাইল দূর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে একটা হৃদয় পাঠান, সেই ছোট্ট লাল হৃদয়ের ভেতরে কত বড় ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে সেটা কোনো যন্ত্র মাপতে পারে না।
তাই মুঠোফোন নিয়ে আমাদের ঝামেলা আছে, ঝগড়া আছে, সন্দেহ আছে কিন্তু ভালোবাসাও আছে। এবং সেই ভালোবাসাটাই আসল।
শেষমেশ বলি, মুঠোফোন হয়তো আমাদের দাম্পত্যে অনেক প্রশ্ন যোগ করেছে। কিন্তু সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমরা প্রতিদিন একটু বেশি করে একে অপরকে চিনি এটাই হয়তো মুঠোফোনের সবচেয়ে বড় উপহার।
এবং হ্যাঁ এই রম্যগল্পটি পড়ার পর আপনার স্ত্রী যদি জিজ্ঞেস করেন, "এটা কি আমাকে নিয়ে লেখা?" উত্তর দেওয়ার আগে একটু ভেবে নিন।