*সাপ-লুডুর খেলা
মানুষের মন যেন এক অনন্ত সাপ-লুডুর খেলা। কখনও সামান্য যত্ন, ভালোবাসা কিংবা একটি আন্তরিক স্পর্শ তাকে মই বেয়ে জীবনের উচ্চতায় পৌঁছে দেয়; আবার কখনও অবহেলা, ভুল বোঝাবুঝি কিংবা অযত্নের বিষদাঁতে সে মুহূর্তেই নিচে নেমে আসে। জীবনের সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধগুলো বাইরে নয়, মানুষের নিজের মনের ভেতরেই সংঘটিত হয়।
আমরা প্রায়ই বলি ফিটনেস। কিন্তু ফিটনেস কি কেবল সুগঠিত শরীরের নাম? না, প্রকৃত ফিটনেস হলো শরীর, মন, আত্মবিশ্বাস এবং আত্মমর্যাদার এক সুষম সমন্বয়। শরীর সুস্থ হলেও যদি মন ক্লান্ত থাকে, যদি আত্মবিশ্বাস ভেঙে পড়ে, তবে সেই সুস্থতা কেবল বাহ্যিক প্রদর্শনী ছাড়া আর কিছুই নয়।
একজন মানুষ কত বছর পৃথিবীতে বেঁচে ছিলেন, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তা খুব বেশি মনে রাখে না। মানুষ স্মরণে থাকে তিনি কীভাবে বেঁচেছিলেন, কতজনের জীবনে আলো জ্বালিয়েছিলেন, পরিবার, সমাজ কিংবা কর্মক্ষেত্রে কতটা মানবিকতা ও মূল্যবোধ রেখে গিয়েছিলেন সেই উত্তরাধিকারেই একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় লুকিয়ে থাকে।
একটা সময় ছিল, যখন মন বলত, আর হৃদয় কোনো যুক্তির অপেক্ষা না করেই ভালোবেসে ফেলত। আজ সেই দিনগুলো স্মৃতির অ্যালবামে বন্দী। চোখের নিচে জমে ওঠা ভাঁজ, অনিদ্রার কালচে ছাপ কিংবা সময়ের অদৃশ্য রেখাগুলো প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয় জীবন আর কৈশোরের সরল নদী নয়; এটি বহু স্রোত, বহু ভাঙন আর বহু উপলব্ধির সমুদ্র।
এই বয়সে বিশুদ্ধ অনুভূতি খুঁজে পাওয়া কঠিন তবু মানুষ ভালোবাসে। কারণ ভালোবাসা যুক্তির বিষয় নয়; এটি মানুষের অন্তর্গত এক চিরন্তন তৃষ্ণা। মানুষ জানে, সব সম্পর্ক পূর্ণতা পায় না; তবুও সে ভালোবাসে। কারণ প্রত্যেক মানুষ তার ভেতরে এক অপ্রকাশিত সুখের স্বপ্ন বহন করে, যা তাকে বারবার নতুন করে বাঁচতে শেখায়।
ভালোবাসার সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অনেক সীমারেখাই মুছে যেতে থাকে। তখন মানুষ কেবল নিজের জন্য বাঁচে না; অন্য একজনের হাসি, অভিমান, কষ্ট কিংবা নীরবতাও তার জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাসনার উচ্ছ্বাস স্তিমিত হয়, আর সম্পর্কের প্রকৃত ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায় শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, দায়িত্ববোধ এবং পারস্পরিক সহমর্মিতা।
মানুষ কখনও কষ্ট পাওয়ার জন্য ভালোবাসে না; বরং আগের চেয়ে একটু বেশি ভালো থাকার আশাতেই অন্য একজনকে নিজের জীবনে আমন্ত্রণ জানায়। অথচ একা থাকলে প্রতারণার ভয় থাকে না, অভিমানের ভার থাকে না, প্রত্যাশার হিসাবও থাকে না। নিঃসঙ্গতারও এক ধরনের স্বাধীনতা আছে, যদিও সেই স্বাধীনতার মূল্য কখনও কখনও গভীর নীরবতা।
জীবন আপনার। আপনিও আপনার। আপনার আনন্দ, আপনার বেদনা, আপনার সাফল্য, আপনার ব্যর্থতা সবকিছুর দায় শেষ পর্যন্ত আপনাকেই বহন করতে হয়। তাই জীবনের এই পরিণত সময়ে দায়িত্বহীন স্বাধীনতা নয়, প্রয়োজন সচেতন স্বাধীনতা। কারণ বয়স কেবল ক্যালেন্ডারের একটি সংখ্যা নয়; এটি অভিজ্ঞতার পরিমাপ, উপলব্ধির গভীরতা এবং আত্মপরিচয়ের দীর্ঘ যাত্রাপথ।
সময় তার নিজস্ব নিয়মে শরীর বদলায়, মোহের রং ফিকে করে, আকর্ষণের সংজ্ঞা পাল্টে দেয় এবং মানুষকে আরও পরিণত করে তোলে। এই পরিবর্তন অনিবার্য। তাই সম্পর্ক যদি কেবল আকর্ষণের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তবে তার স্থায়িত্ব খুবই ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু সম্পর্ক যদি শ্রদ্ধা, সততা, মমতা এবং পারস্পরিক আস্থার ওপর নির্মিত হয়, তবে সময় তাকে আরও দৃঢ় করে।
যে সম্পর্কের কোনো সুস্পষ্ট পরিচয় নেই, কোনো দায়িত্ব নেই, কোনো ভবিষ্যৎ নেই সে সম্পর্ক অনেক সময় সাময়িক উষ্ণতা দিলেও শেষ পর্যন্ত মানুষকে শূন্যতার কাছেই ফিরিয়ে দেয়। নামহীন সম্পর্কের দীর্ঘ ছায়ায় দাঁড়িয়ে জীবনকে অপচয় করার চেয়ে আত্মমর্যাদার সঙ্গে একা থাকা অনেক বেশি সম্মানের।
জীবনের এক পর্যায়ে এসে মানুষ বুঝতে শেখে ভালোবাসার চেয়েও মূল্যবান হলো মানসিক শান্তি, আকর্ষণের চেয়েও গভীর হলো সম্মান, আর একসঙ্গে থাকার চেয়েও জরুরি হলো এমন একজন মানুষের সঙ্গ, যার উপস্থিতিতে নিজের স্বাধীনতা, মর্যাদা এবং স্বকীয়তা অক্ষুণ্ণ থাকে।
শেষ পর্যন্ত জীবন আমাদের শেখায়, সুখ কখনও অন্য কারও হাতে সম্পূর্ণভাবে সমর্পণ করা যায় না। সুখের সবচেয়ে নিরাপদ ঠিকানা মানুষের নিজের ভেতরেই। যে মানুষ নিজেকে ভালোবাসতে শেখে, নিজের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে শেখে এবং নিজের স্বাধীনতাকে সম্মান করতে শেখে, সে-ই প্রকৃত অর্থে জীবনের সাপ-লুডুর খেলায় জয়ী হয়।
কারণ জীবনের সবচেয়ে বড় বিজয় অন্য কাউকে জয় করা নয়; বরং নিজের মনকে পরাজিত না হতে দেওয়া।
লেখক: কলামিস্ট, সংবাদ বিশ্লেষক ও কবি। বোর্ড মেম্বার, পিভিসি কন্টেইনার কর্পোরেশন ইউএসএ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র