নাগোয়া পোর্ট অ্যাকোয়ারিয়াম স্থলে সাগরতল

ফেরদৌস সিদ্দিকী
প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৫:২৮ পিএম
আপডেট: ০১ আগস্ট ২০২৬, ১১:৪৮ পিএম
Main News Image

মানুষ চাঁদের মাটিতে পা রেখেছে বহু আগেই। আবিষ্কার করেছে দূরবর্তী গ্রহনক্ষত্র। কিন্তু নিজেদের চেনা পৃথিবীর সাগরতল আজও রয়ে গেছে অজানা। পৃথিবীর পৃষ্ঠের তুলনায় এই অজানা জগৎ যেন আরও দূরবর্তী, আরও দুর্বোধ্য। জাপানের নাগোয়া পোর্ট পাবলিক অ্যাকোয়ারিয়ামের বিশাল কাঁচঘেরা ট্যাংকের সামনে দাঁড়ালে সেই অদৃশ্য জগতের এক ঝলক দেখা যায়। এটি একটি বিশাল, বিজ্ঞানভিত্তিক ও অত্যন্ত জনপ্রিয় সামুদ্রিক জীবউদ্যান। এখানকার গভীর সমুদ্রভিত্তিক প্রদর্শনী দর্শককে শুধু মুগ্ধই করে না, বরং আধুনিক সামুদ্রিক বিজ্ঞানের এক বিস্ময়কর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। এখানে শুধু সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য দেখা যায় না, বিবর্তন, বাস্তুতন্ত্র ও মানুষের সম্পর্ক সবকিছু একসাথে খোলা হয়ে যায়; একে নাগরিকবিজ্ঞানের একটি জীবন্ত শিক্ষাগার বললে বেশি বলা হবে না।

দুই ভবন, একই সাগর 

উত্তর ভবন ও দক্ষিণ ভবন নামে দুটি বিশাল বিভাগে বিভক্ত। দক্ষিণ ভবনের থিম “অ্যান্টার্কটিক ও বিশ্বের পাঁচটি সমুদ্র”, যেখানে জাপান, অস্ট্রেলিয়া, নিরক্ষরেখা, অ্যান্টার্কটিকা ও গভীর সমুদ্রের পরিবেশ কৃত্রিম ভাবে তৈরি করা হয়েছে। এখানে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে শুরু করে প্রায় হাজার মিটারের পর শুরু হওয়া আলোহীন অঞ্চলের কাছাকাছি পরিবেশ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। উত্তর ভবনের থিম “৩.৫ বিলিয়ন বছর প্রক্রিয়া: আবার সমুদ্রে ফিরে আসা প্রাণী”; যেখানে প্রধানত বেলুগা হোয়েল, কিলার হোয়েল, বোটলনোজ ডলফিন ও স্থলআদি উভচরপ্রাণীর বিবর্তন ও আদিম জীবাশ্ম নিয়ে প্রদর্শনী বিন্যাস করা হয়েছে। যা পর্যটকদের সাগরের বর্তমানই নয়, জীবনের বিবর্তনগত পথে হাঁটার অভিজ্ঞতা দেবে।

 ডলফিন, তিনি ও টর্নেডো সার্ডিন 

অ্যাকোয়ারিয়ামের সবচেয়ে বিখ্যাত আকর্ষণ জাপানের বৃহত্তম বহিরঙ্গন মেইন পুল। প্রতিদিন বড় স্ট্যান্ডে বসে হাজারো দর্শক বোটলনোজ ডলফিনের অ্যাক্রোব্যাটিক পারফরম্যান্স উপভোগ করেন। কিলার তিমি ও বেলুগা তিমি পাবলিক ট্রেনিং ও শোতও দেখা যায়। জাপানে কিলার তিমি রাখে এমন সুযোগ্য ফ্যাসিলিটি খুব কমের মধ্যে একটি, তাই এই অভিজ্ঞতা বিশেষ করে বিজ্ঞান ও প্রাণীবিজ্ঞানপ্রেমীদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

দক্ষিণ ভবনের কুরোশিও ট্যাংক একটি বিশাল সমুদ্রসদৃশ ট্যাংক, যেখানে প্রায় ৩৫ হাজার সার্ডিন এক বিশাল বলয় বানিয়ে ঘোরে। সাধারণত প্রায় ৫ মিনিট ব্যাপী সার্ডিন টর্নেডো নামে একটি ফিডিং ইভেন্ট হয়, যখন দৈনিক সার্ডিন খাদ্যের পিছনে ঘুরে ঘুরে এক ঘূর্ণিসদৃশ ঘূর্ণন তৈরি করে। এই ঘটনাগুলো শুধু বিনোদন নয়, এগুলো মাছের সামাজিক আচরণ ও সহযোগিতার নিদর্শন—হাজার হাজার মাছ একসাথে একটি বিশালাকার ঘূর্ণি তৈরি করে শিকারিকে বিভ্রান্ত করে রাখার মতো একটি শৈল্পিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে এটা বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনার খুব সুন্দর উদাহরণ বানিয়ে তুলেছে।

আলোহীন জগতের বিকল্প জীবনপ্রবাহ 

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২০০ মিটারের নিচে নামলেই হারিয়ে যায় সূর্যালোক। ১০০০ মিটারের পর শুরু হয় সম্পূর্ণ আলোকহীন অঞ্চল। এখানে সালোকসংশ্লেষণ অসম্ভব হলেও জীবন থেমে নেই। নাগোয়া অ্যাকোয়ারিয়ামের গভীর সমুদ্র গ্যালারিতে গেলে দেখা মেলে সেই রহস্যময় জগতের। সমুদ্রতলের হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট বা উত্তপ্ত প্রস্রবণ থেকে নির্গত রাসায়নিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে অণুজীবরা এখানে কেমোসিন্থেসিস বা রাসায়নিক সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় শক্তি উৎপাদন করে। এই অণুজীবরাই টিউবওয়ার্ম, বৃহৎ কাঁকড়া ও ঝিনুকদের বেঁচে থাকার প্রধান উৎস। এটি আমাদের শেখায় যে, চরম প্রতিকূলতাও প্রাণের স্পন্দনকে থামিয়ে দিতে পারে না।

টিকে থাকার লড়াই ও প্রকৌশল

 গভীর সমুদ্রের প্রাণীরা প্রবল পানির চাপ সহ্য করার জন্য অসাধারণ অভিযোজন গড়ে তুলেছে। প্রকৌশলগত দৃষ্টিতে দেখলে, এই প্রবল চাপ সহ্য করার জন্য অনেক প্রাণীর দেহ অত্যন্ত নমনীয় হয় এবং তাদের হাড়ের গঠন অত্যন্ত হালকা বা অনুপস্থিত থাকে। আবার অন্ধকারে পথ চলতে বা শত্রু তাড়াতে অনেক প্রাণী ব্যবহার করে বায়োলুমিনেসেন্স বা নিজস্ব দেহজ আলো। প্রকৃতির এই প্রকৌশল বিজ্ঞান ও প্রাণীবিজ্ঞান-প্রেমীদের কাছে এক গভীর বিস্ময়। 

বিপন্ন মহাসাগর ও টেকসই আগামীর ভাবনা 

অ্যাকোয়ারিয়ামের নীল জলরাশি আমাদের যেমন মুগ্ধ করে, তেমনি এর আড়ালে থাকা বাস্তুসংস্থানের সংকট আমাদের ভাবিয়ে তোলে। প্লাস্টিক দূষণ বর্তমানে মহাসাগরের অন্যতম বড় হুমকি। মাইক্রোপ্লাস্টিক আজ গভীর সমুদ্রের প্রাণীদের দেহেও প্রবেশ করছে। একজন গবেষক হিসেবে যখন আমরা টেকসই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করি, তখন সমুদ্রকে এই দূষণমুক্ত রাখা আমাদের বড় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং প্রবাল প্রাচীর ধ্বংস হওয়া রোধে বৈশ্বিক সচেতনতা এখন সময়ের দাবি। পরিশেষে বলতে হয়, নাগোয়া পোর্ট পাবলিক অ্যাকোয়ারিয়াম কেবল একটি বিনোদনকেন্দ্র নয়; এটি একটি সামুদ্রিক বিজ্ঞান কেন্দ্র। এখানে বিপন্ন সামুদ্রিক কচ্ছপ ও বিরল মাছের প্রজনন ও পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এই অন্ধকার জগৎ আমাদের শেখায় যে জীবন শুধু আলোয় নয়, অন্ধকারেও বিকশিত হতে পারে। সমুদ্রই পৃথিবীর অধিকাংশ অক্সিজেন সরবরাহ করে এবং বৈক্সিক জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ করে। তাই টেকসই জীবনযাত্রা এবং ব্যক্তিগত সচেতনতার মাধ্যমে এই নীল জগৎকে রক্ষা করাই হোক আমাদের সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার।

ফেরদৌস সিদ্দিকী: পিএইচডি গবেষক, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগ, মিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান।