বাংলা কাহিনিচিত্রে হাসপাতালচিত্র
প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা চলচ্চিত্র তথা কাহিনিচিত্র ‘বিল্বমঙ্গল’ (১৯১৯)। এই নির্বাক সিনেমার উপজীব্য ছিল, মধ্যযুগের হিন্দি ভাষার কবি বিল্বমঙ্গলের জীবন। অন্যদিকে প্রথম সবাক বাংলা কাহিনিচিত্র 'জামাইষষ্ঠী' (১৯৩১)। এই ছবির বিষয় নামেই প্রকাশিত। এদেশের প্রথম নির্বাক ছবি ‘লাস্ট কিস’ (১৯৩১)। এখানে সামন্ত প্রভুদের নিষ্ঠুরতা ও সামাজিক অনাচার মূর্ত হয়ে উঠেছিল। আর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ (১৯৫৬)-এ পারিবারিক জীবন ও ডাকাতদের কাণ্ডকারখানা ফুটে উঠেছে। এমনিভাবে বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নানা চলচ্চিত্র নানা বিষয়কে ঘিরে নির্মিত হয়েছে। যেমন, প্রেম, ভালোবাসা, পরকীয়া, পারিবারিক সম্পর্ক, হাস্যরস, পুঁজিপতি-শ্রমিক সংঘাত, শ্রেণিগত অবস্থান ও আভিজাত্যের দম্ভ, শোষক-শোষিতের দ্বন্দ্ব, সাম্যবাদ, দেশভাগ ও বাস্তুহারাদের জীবন, দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ, ধর্মীয় কুসংস্কার, মানবিক ও অযান্ত্রিক সম্পর্ক, মনস্তাত্ত্বিক ক্রিয়াকলাপ, যৌন চেতনা, যৌনশিক্ষা, নিষিদ্ধ সম্পর্ক, সমকাম, যক্ষা রোগ-বিষয়ক সচেতনতা, এইডসের ভয়াবহতা, নারী মুক্তি, পুরুষ শাসিত সমাজে নারীর একাকী জীবন, জেলেদের জীবন, নদীকেন্দ্রিক মানুষের জীবন, উপকূলবর্তী মানুষের জীবন, সেলিব্রেটিদের জীবন, সংখ্যালঘুদের জীবন, বেকারত্ব, সামাজিক অস্থিরতা, সন্ত্রাস, নকশাল আন্দোলন, পুলিশ অ্যাকশন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ইত্যাদি।
মূল বিষয়ে প্রবেশ করা যাক। হাসপাতাল দুই বাংলার চলচ্চিত্রের একটি সাধারণ বিষয়। কোনো চরিত্রের আহত হওয়া, চিকিৎসা, মৃত্যু, গর্ভবতীর প্রসব, নার্স কিংবা চিকিৎসক হিসেবে কাজ করা, রক্ত দেওয়া, ডোম হিসেবে মর্গে কাজ করা... নানাভাবেই বহু বাংলা চলচ্চিত্রে হাসপাতাল মূর্ত হয়ে উঠেছে। কিন্ত হাসপাতালকে ঘিরে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে কমই।যাহোক, এই নিবন্ধে হাসপাতাল সংক্রান্ত দুই বাংলার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের কথা তুলে ধরা হলো।
১.
শুরুতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ তথা টালিউডের চলচ্চিত্র প্রসঙ্গ
ছবির নাম ‘দীপ জ্বেলে যাই’ (১৯৫৯)। পরিচালক অসিত সেন। ছবিটি আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের ‘নার্স মিত্র’ গল্প অবলম্বনে নির্মিত।
কাহিনিধারায় দেখা যায়, রাধা মিত্র (সুচিত্রা সেন) একটি মানসিক চিকিৎসার হাসপাতালের নার্স। রোগীদের সেবাতেই আ-নিবেদিতা। এক সময় সেই হাসপাতালে দেবাশিষ নামের এক নতুন রোগী আসে। হাসপাতালের পরিচালক কর্নেল মিত্র (পাহাড়ী সান্যাল)-র অনুরোধে দেবাশিষকে সুস্থ করার দায়িত্ব নেয় রাধা। সে প্রেমিকা হিসেবে অভিনয় করতে শুরু করে দেবাশিষের সঙ্গে। কিন্ত এক পর্যায়ে রাধা সত্যি সত্যি দেবাশিষকে ভালোবেসে ফেলে। বিষয়টি দেবাশিষ জানতেই পারে না। ফলে সুস্থ হয়ে দেবাশিষ ধন্যবাদ জানিয়ে তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে চলে গেলে রাধা কান্নায় ভেঙে পড়ে।...আবার নতুন রোগী ভর্তি হয় হাসপাতালে। তাপস চৌধুরী (বসন্ত চৌধুরী) তার নাম। কর্নেল মিত্রের অনুরোধে এবারও রাধা তাপসের প্রেমিকার অভিনয় করে, তাকে সুস্থ করার জন্য। কিন্ত দেখা যায়, অভিনয় করতে করতে রাধা নিজেই মানসিক রোগীতে পরিণত হয়েছে। কান্না আর হাসিতে ডুবে গিয়ে সে তখন কর্নেল মিত্রের দিকে চেয়ে বলে ওঠে: ‘বিশ্বাস করুন, আমি অভিনয় করিনি, আমি কোনো দিন অভিনয় করিনি, আমি অভিনয় করতে জানি না’। তারপর সে কর্নেল মিত্রের পায়ের কাছে বসে পড়ে।...শেষ পর্যন্ত রাধার ঠাঁই হয় ২৪ নম্বর কেবিনে, যেখানে দেবাশিষ আর তাপস চৌধুরী রোগী হিসেবে থাকতো।
‘দীপ জ্বেলে যাই’ বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র। এখানে এ প্রজন্মের কোনো দর্শক যদি মানসিক চিকিৎসার হাসপাতালের পূর্ণাঙ্গ চিত্র দেখতে চায়, তাহলে সে হতাশ হবে। কেননা এ ছবিতে প্রেমে ব্যর্থ হওয়ার দরুন মানসিক রোগগ্রস্ত এমন মানুষদেরই (দেবাশিষ ও তাপস) প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। যেমন, মহিলা ওয়ার্ডের এক রোগিনীকে চিকিৎসক দেখতে গেলে ওই নারী চিকিৎসকের হাত শক্ত করে ধরে বলে: ‘এবার তোমাকে পেয়েছি। তোমাকে আর যেতে দেব না’। এতে দর্শক কী বুঝবে ? হয় প্রেমিক অথবা স্বামী তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে। এ জন্যই সে মানসিক চিকিৎসার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। আবার দেখা যায়, এক রোগী দাবার বোর্ডের সামনে স্থির বসে আছে। কোনো কিছু করছে না। নার্স রাধা মিত্র তার কাছে এসে বোর্ডের একটি গুটি ধরে চাল দিয়ে চলে যায়। এই রোগীর কেস কী ? উত্তর মেলে না। আবার তাপস কলকাতার যে মেসে থাকতো, সেই মেসের মালিক (তুলসী চক্রবর্তী) একদিন হাসপাতালে আসেন, তাপসকে দেখার জন্য। তখন তিনি দেখতে পান, এক রোগী সিলিংয়ের দিকে হাত উঁচু করে কী যেন খুঁজছে। খুঁজেই চলেছে। এই সময় এক রোগী তার পেটে কাতুকুতু দিয়ে বিড়ি চায়। অন্য আরেকজন এসে ‘কী ব্যাপার টাকার জন্য এসেছো ? কী যে করো না তোমরা! টাকার জন্য আমাকে অস্থির করে ফেলো।’ এই বলে পকেট থেকে একটি কাগজে হিজিবিজি লিখে মেসের মালিকের হাতে দিয়ে বলে ওঠে, ‘নাও, এই চেকটি নিয়ে যাও। ব্যাংক থেকে ভাঙিয়ে নিয়ো।’ এতে দর্শক হয়তো এই ম্যাসেজ পায় যে, আর্থিক কারণে লোকটি মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছে। কিন্ত অন্য দুই রোগীর আচরণের ব্যাখ্যা কী ? আসলে এখানে পরিচালক-চিত্রনাট্যকারের উদ্দেশ্য ছিল, দর্শকদের বিনোদন দেওয়া। তাদের হাসানো। অন্য কিছু নয়।
বাঙালির কাছে সুচিত্রা সেনের ইমেজ হলো, চিরকালের প্রেমিকার। তাঁর এই ইমেজকেই এ ছবিতে ব্যবহার করা হয়েছে। হাসপাতালের পরিচালক কর্নেল মিত্রের থিওরি হলো, প্রেমে ব্যর্থ রোগীর সঙ্গে হৃদ্যতা (প্রেমের অভিনয়) গড়ে তুলতে হবে। এতেই সে ভালো হবে। ইঞ্জেকশন কিংবা ইলেক্ট্রিক শক দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। এই বিষয়টি দেবাশিষের ক্ষেত্রে বেশ কার্যকর হলে নার্স রাধা মিত্র (সুচিত্রা সেন)-কে আবার নতুন রোগীর দায়িত্ব নিতে হয়, তাকে ভালো করার জন্য। অর্থাৎ ছবিতে দর্শকেরা প্রেম-ভালোবাসার ঘেরাটোপের মধ্যেই ঘুরপাক খায়। আনন্দ পায়। প্রিয় নায়িকার রূপ আর সুন্দর অভিনয়ে মুগ্ধ হয়। রোমান্টিক দুটি গান, ‘আর যেন নেই কোনো ভাবনা’ এবং ‘এই রাত তোমার আমার’-ও তাদের তৃপ্তি দেয়। আর ‘তোমার মতো বন্ধু কে আছে’ মান্না দে’র এই গানটি হাসপাতালের এক রোগী, যে নাকি মদ পান করতে পছন্দ করে (তাকে বোতলের মধ্যে পানি ভরে মদ হিসেবে চালায় রাধা মিত্র)। সে পানিকে মদ হিসেবে পান করে ভীষণ খুশি হয় রাধা মিত্রের ওপর। তার উদ্দেশে সে গেয়ে ওঠে গানটি। গানে রয়েছে এই কথাটি: ‘কখনোবা ডার্লিং, কভু তুমি জননী/ কখনোবা হ্লেময়ী সিস্টার’। এই গানে নার্স রাধা মিত্রের গুণাবলি প্রকাশিত। এর দরুন মানসিক রোগীরা সুস্থ হয়ে ওঠে, রাধার আন্তরিক সেবায়।
উলে¬খ্য, ‘দীপ জ্বেলে যাই’-এ হাসপাতাল ছাড়াও কয়েকটি জায়গায় ক্যামেরা ঘোরাফেরা করেছে। যেমন, ট্রাম, তাপসের মেস, প্রাক্তন প্রেমিকার বাড়ি, বিচিত্রানুষ্ঠানের অডিটরিয়াম, মেকাপ রুম, গঙ্গার পাড়...।
আরেকটি উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র ‘কাঁচের স্বর্গ’ (১৯৬২)। কাহিনি, সংলাপ, চিত্রনাট্য ও পরিচালনা যাত্রিক। সেলুলয়েডে এই সিনেমার গল্পে আমরা দেখতে পাই, সঞ্জয় চৌধুরীর (দিলীপ মুখোপাধ্যায়) স্বপ্ন ছিল, সে ডাক্তার হবে। তাই বড় হয়ে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়। কিন্ত ফিজ জমা দিতে না-পারায় ফাইনাল পরীক্ষা দিতে পারে না তাই সে কলকাতা ত্যাগ করে, একটি মিলিটারি হাসপাতালের আরদালির চাকরি নিয়ে। তখন বার্মা মানে মায়ানমারের সীমান্তে যুদ্ধ চলছে। প্রচুর আহত সৈনিক হাসপাতালে ভর্তি। তাদের সামান্য চিকিৎসা দেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না। এদিকে হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত ডাক্তার সঞ্জয়ের বিষয়টি জানতেন। তিনি সঞ্জয়কে অনুরোধ করেন, তার সহকারী হিসেবে কাজ করার জন্য। সঞ্জয় তা-ই করে। ডাক্তারকে সাহায্য করে, সার্জারি করার সময়। ফলে অল্প কিছু দিনের মধ্যেই সঞ্জয় দক্ষ সার্জনে পরিণত হয়। তবে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সে আবার বেকার হয়ে পড়ে।...হঠাৎ একদিন সুশোভনের সঙ্গে সঞ্জয়ের দেখা হয়, যাকে যুদ্ধের সময় মিলিটারি হাসপাতালে সুস্থ করে তুলেছিল সে। সুশোভন অবশ্য সঞ্জয়কে একজন ডাক্তার হিসেবেই জানে। সুশোভনের সুপারিশে বাতাসপুর মিউনিসিপ্যাল হাসপাতালে সঞ্জয়ের চাকরি হয়, অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জন হিসেবে। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই নিজের কর্ম দক্ষতায় সঞ্জয় রোগী ও হাসপাতালের সার্জন ডা. ব্যানার্জির আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়। এদিকে বাতাসপুরের টিবি রোগীদের স্যানাটোরিয়ামের ডাক্তার অসীম মৈত্রের সঙ্গে সঞ্জয়ের আলাপ হয়। ঘটনাচক্রে স্যানাটোরিয়ামটির দুর্নীতি সম্পর্কে অবগত হয় অসীম, যার স্টাফ-ডাক্তার ছাড়াও হাসপাতালের মালিক করুণাময় ঘোষও জড়িত। ফলে অসীমকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। সঞ্জয় সাহায্য করার জন্য এগিয়ে গেলে করুণাময় তাকে ব্ল্যাকমেইল করে। কেননা করুনাময় জানে যে, সঞ্জয় ডাক্তারি জানলেও এ বিষয়ে তার কোনো ডিগ্রি নেই। কিন্ত সঞ্জয়ের সংবর্ধনা সভায় সঞ্জয় নিজেই এ বিষয়টি প্রকাশ করে। ফলে সঞ্জয়ের বিরুদ্ধে মামলা রজু করা হয়। বিচারক সার্জারিতে সঞ্জয়ের দক্ষতার বিষয়টি বিবেচনা করে এবং তার অতীতের সমস্ত জেনে তাকে যথাসম্ভব লঘু দণ্ডে দণ্ডিত করেন।
‘কাঁচের স্বর্গ’-এ হাসপাতালের পরিবেশ জীবন্তভাবে ধরা পড়েছে। যদিও বার্মা সীমান্তের কাছে মিলিটারি হাসপাতাল ডিটেইলে ফুটে উঠেনি সংগত কারণেই। যাহোক, বাতাসপুর মিউনিসিপ্যাল হাসপাতালে ডাক্তার, নার্স, রোগী, সবাই মিলে বেশ জমজমাট পরিবেশ। ওয়ার্ডে ডাক্তারদের রোগী দেখা, প্রেসার মাপা; নার্সের ওষুধ খাওয়ানোসহ বিভিন্ন সেবা করা, অপারেশনের সময় সার্জনকে সাহায্য করা ইত্যাদি ফুটে উঠেছে বড় পর্দায়। আর ফুটে উঠেছে একটি অপারেশন। মোটামুটি ডিটেইলে। এখানে দেখা যায়, হাসপাতালটির সার্জন ডা. ব্যানার্জি, যিনি শুরু থেকে সঞ্জয়কে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেন নি, তার কাছে একটি কঠিন কেস আসে। এক অল্প বয়সী শিক্ষয়িত্রী, লীনা, তার হার্টের আর্টারিতে রক্ত জমাট বেঁধে আছে। এই অবস্থায় অপারেশন বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। ডা. ব্যানার্জি চোখে অন্ধকার দেখেন। কোনো উপায় খুঁজে পান না। তখন তার সহকারী, সঞ্জয়, এগিয়ে আসে। সে জানায়, রোগিনীর এই অবস্থায় টেন্ডালাম বাল্ব অপারেশন করা প্রয়োজন। এতে হয়তো লীনা বেঁচেও যেতে পারে। এই অপারেশনটি হলো, পঁয়তালি¬শ সেকেন্ডের মধ্যে হার্টের কাজ বন্ধ রেখে জমাট বাঁধা রক্তের চাপ অপারেশন করে সারিয়ে ফেলতে হবে। ঠিক পঁয়তাল্লিশ সেকেন্ডের মধ্যে। এক সেকেন্ডও দেরি করা যাবে না। সঞ্জয় এই কঠিন অপারেশনটি করে আর তাকে সাহায্য করে ডা. ব্যানার্জি, নার্স সীমা সেন ও অন্য ডাক্তাররা। অপারেশনটি সফল হয়। লীনা বেঁচে যায়।...একদিন বাতাসপুরের টিবি রোগীদের স্যানাটোরিয়ামের ডাক্তার অসীম মৈত্রের (অনিল চট্টোপাধ্যায়) অনুরোধে সেখানকার চা-বাগানের কুলিদের সর্দারের কিশোর ছেলের অপারেশনও করে সঞ্জয়, অসীমের সহযোগিতায়। কিশোরটি বেঁচে যায়, যার দুটি লাংসই ঝাঁঝড়া হয়ে গিয়েছিল। আর কোনো হাসপাতালে যে দুর্নীতি চলে, রোগীরা প্রয়োজনীয় ওষুধ, খাবারদাবার পায় না, সেটিও এই সিনেমায় দেখানো হয়েছে টিবি রোগীদের স্যানাটোরিয়ামের মাধ্যমে। এমনকি বিরল হলেও ডাক্তার-নার্সের প্রেমও এখানে মূর্ত হয়ে উঠেছে। উলে¬খ্য, এ চলচ্চিত্রে যথাযথ সিচ্যুয়েশনে, শৈল্পিকভাবে, ব্যাকগ্রাউন্ডে ব্যবহৃত হয়েছে দুটি রবীন্দ্রসংগীত: 'দিনগুলি মোর' এবং ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে’।
আরেকটি চলচ্চিত্র ‘হাসপাতাল’ (১৯৬০)। সুশীল মজুমদার পরিচালিত এ ছবিতে দেখা যায়, শৈবাল ও শর্বরী একটি হাসপাতালের ডাক্তার। একসঙ্গে তারা ডাক্তারি পড়েছে। তখন থেকে সম্পর্ক। প্রেম। এখন বিয়ের অপেক্ষায়। কিন্ত শর্বরীর বাবা পঙ্গু। ভাইবোনেরা পড়াশুনা করছে। সাংসারিক দায়িত্ব বাদ দিয়ে তাই সে বিয়েতে রাজি নয়। অথচ যখন শৈবাল ও শর্বরী একদিন হঠাৎ শহরের বাইরে গেল এবং ঘটনাচক্রে একটি রাত কাটাতে হলো এক বাংলায়। তারপর শর্বরী অন্তস্বত্বা হয়ে পড়ে। বিষয়টি সে টের পায় কয়েক মাস পরে। তখন সে নিজেই বিয়ের কথা বলে শৈবালকে। কিন্ত লোকলজ্জার ভয়ে শৈবাল রাজি হয়ে না। শর্বরীর বাবাও মেয়ের মুখ দেখতে চান না। ফলে কোলিয়ারির হাসপাতালে চলে যায় শর্বরী, চাকরি নিয়ে। সেখান থেকে বোম্বে। ইতিমধ্যে তার একটি ছেলে হয়েছে। সেই বালকপুত্রকে নিয়েই তার সিঙ্গেল লাইফ। কিন্ত হঠাৎ সে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ে। অপারেশনের দরকার হয়। কঠিন সেই অপারেশন করে শৈবাল। শর্বরী বেঁচে ওঠে। বাবা-শ্বশুরসহ সবাইকে সে ফিরে পায় জীবনে।
নাম ‘হাসপাতাল’ হলেও এটি হাসপাতাল কেন্দ্রিক চলচ্চিত্র নয়। ছবিটি আসলে আবর্তিত হয়েছে শৈবাল ও শর্বরীর ব্যক্তিগত সমস্যাকে ঘিরে। যদিও দুই ডাক্তারের গল্প বলে হাসপাতালের পরিবেশ ফুটে উঠেছে চলচ্চিত্রে। ডাক্তারকে দেখানোর জন্য রোগীদের লাইন, নার্সদের ছোটাছুটি, বাজেট স্বল্পতার কারণে প্যাথলজি বিভাগের প্রধানের সমস্যাজর্জরিত অবস্থা; ডাক্তারদের স্বল্প বেতন, তাই বাইরের কলে অ্যাটেন্ড করা ইত্যাদি। আর ছবির শেষে রয়েছে অপারেশন থিয়েটারের দীর্ঘ সিকোয়েন্স, যেখানে শর্বরীকে অপারেশন করার সময় তার অবস্থার অবনতি হলে শৈবাল নার্ভাস হয়ে পড়ে। অপারেশন থেকে বিরতি নেয়। সেই সময় পরিস্থিতি সামলায় ডাক্তার চৌধুরী। শৈবাল ও শর্বরীর গুরুদেব। শর্বরীর অবস্থা স্বাভাবিক হলে সবার অনুরোধে অপারেশনটি শেষ করে শৈবাল। উল্লেখ্য, ছবির দুটি প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন, অশোক কুমার (শৈবাল) ও সুচিত্রা সেন (শর্বরী)।
পরিচালক অজয় করের ছবি ‘সপ্তপদী’ (১৯৬১)। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত। ছবিতে আমরা দেখতে পাই, কৃষ্ণেন্দু (উত্তমকুমার) মেডিকেল কলেজের ছাত্র। শুধু পড়াশোনায় নয়, সব ক্ষেত্রেই তার উজ্জ্বল পদচারণা। তার সহপাঠী রীনা ব্রাউন (সুচিত্রা সেন) কৃষ্ণেন্দুকে পছন্দ করে না। ক্লেটন নামের অন্য একজনের সঙ্গে তার সম্পর্ক আছে। তবে ‘ওথেলো’-র নাট্যাভিনয়ে যখন কৃষ্ণেন্দু সাজে ওথেলো আর রীনা ডেসডিমোনা, তখন দুজনেই পরস্পরের প্রতি কিছুটা আকর্ষণ বোধ করে।...রীনা তার বাবার কাছ থেকে জানতে পারে, বাড়ির আয়া হলো তার মা আর তাকে বিয়ে করেনি বাবা। ফলে ক্লেটন সম্পর্ক ছেদ করে রীনার সঙ্গে। এরপর কৃষ্ণেন্দু আর রীনা ঘনিষ্ঠ হয়। রীনাকে পাওয়ার জন্য কৃষ্ণেন্দু ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে। অন্যদিকে কৃষ্ণেন্দুর বাবার চিঠি পেয়ে তার একমাত্র সন্তানকে মুক্তি দিয়ে রীনা দেশান্তরিত হয়।...অতঃপর সময় অতিবাহিত হয়। দেখা যায়, তখন কৃষ্ণেন্দু রেভারেন্ড কৃষ্ণস্বামী। সাঁওতাল অধ্যুষিত বাঁকুড়া জেলার একটি প্রত্যন্ত গ্রামের একটি ছোট হাসপাতালের দায়িত্বে আছে সে। গরিব মানুষদের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছে। হঠাৎ তার কাছে আসে সামরিক বাহিনীর এক উচ্চ পদস্থ বিদেশিনী, রোগী হিসেবে। চমকে ওঠে কৃষ্ণেন্দু। এই বিদেশিনী তার অতি চেনা, প্রিয় নারী রীনা ব্রাউন। সুস্থ হয়ে রীনাও চিনতে পারে কৃষ্ণেন্দুকে এবং কৃষ্ণেন্দুর বাবাকে দেওয়া প্রতিশ্র“তির কথা স্মরণ করে হাসপাতাল থেকে চলে যায়। এর পর রীনার সঙ্গে যখন কৃষ্ণেন্দুর দেখা হয়, তখন রীনার শারীরিক অবস্থা খুবই গুরুতর। এবারও কৃষ্ণেন্দু পরম যতেœ চিকিৎসা করে রীনাকে সুস্থ করে তোলে। দুজনের ভবিষ্যৎ মিলনের সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে ছবিটি শেষ হয়।
এই সিনেমার শুরুতে, মাঝে ও শেষ পর্যায়ে হাসপাতালের সিকোয়েন্স রয়েছে। কেননা মূলত ফ্ল্যাশব্যাকের মাধ্যমে গল্পটি বলা হয়েছে। বাঁকুড়া ও আসামের মিশনারি হাসপাতালের চিত্র রয়েছে এখানে। রয়েছে যুদ্ধের ভয়াবহ অবস্থা, বহু আহত রোগীর শোচনীয় অবস্থা। কৃষ্ণেন্দু ও নার্সদের স্বাস্থ্যসেবা। চলচ্চিত্রটির শেষ সিকোয়েন্সগুলি চিত্রনাট্য থেকে তুলে ধরা হলো:
১.
মিশনারি হাসপাতাল। অপারেশন থিয়েটার।
কৃষ্ণেন্দু রীনার আঘাতের স্থানে ব্যাঁন্ডেজ বেঁধে দিয়ে ওকে দেখে।
রীনা পরম শান্তিতে ঘুমাচ্ছে।
কৃষ্ণেন্দু মাস্ক খোলে। রীনাকে এক দৃষ্টিতে দেখে।
২.
হাসপাতালের বাইরে। সকাল।
চারদিক বিধ্বস্ত।
৩.
হাসপাতালের বেড।
ঘুম থেকে জেগে ওঠে রীনা। চারদিক দেখে।
নার্স রীনার কাছে আসে।
রীনা: আমি কোথায় ?
নার্স: হাসপাতালে।
রীনা: হাসপাতালে!
নার্স: হ্যাঁ। বোম্বিং-এ আপনি সামান্য আহত হন। আপনি একজন মিলিটারি অফিসার বলে ফাদার কিছুতেই অপারেশন করতে দেবেন না। শেষে রেভারেন্ড মুখার্জি নিজে দায়িত্ব নিয়ে অপারেশন করেন।
রীনা: রেভারেন্ড মুখার্জি!
নার্স: হ্যাঁ, উনি বললেন আমার স্ত্রীর জীবনমরণের দায়িত্ব সব আমার।
রীনা: স্ত্রী!
কৃষ্ণেন্দু দরজায় দাঁড়িয়ে।
নার্স (অফ ভয়েসে): গুড মর্নিং।
কৃষ্ণেন্দু: গুড মর্নিং।
রীনা দরজার দিকে তাকায়। কৃষ্ণেন্দুকে দেখে অবাক।
নার্স কৃষ্ণেন্দুর পাশ দিয়ে চলে যায়।
রীনা কৃষ্ণেন্দুকে দেখছে।
কৃষ্ণেন্দু এগিয়ে আসে।
রীনার চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ে। কৃষ্ণেন্দুর হ্লের হাত রীনাকে ছোঁয়।
কৃষ্ণেন্দুর চোখে অনুরাগ। রীনাকে দেখছে।
রীনা মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
কৃষ্ণেন্দু (আবেগে): রীনা! রীনা!
রীনা ধীরে ধীরে কৃষ্ণেন্দুর দিকে তাকায়। কৃষ্ণেন্দু তাকে বাবার চিঠি দেখায়। রীনা অবাক হয়ে দেখে। বোঝার চেষ্টা করে।
কৃষ্ণেন্দুর বাবার কণ্ঠ: “রীনা ব্রাউনের সঙ্গে আমি দেখা করি। সে আমাকে কথা দেয়, তোমার জীবন থেকে সে সরে যাবে। পাছে তুমি একথা জানতে পারলে পিতার হিসেবে তোমার চোখে আমি ছোট হয়ে যাই, তাই স্বেচ্ছায় এ প্রতিশ্র“তি সে দিয়েছিল কোনোদিন তোমাকে এ কথা সে বলবে না। জানি না, আজ তার জন্য কী মূল্য তাকে দিতে হয়েছে। এ মেয়েটির সঙ্গে দেখা এ জীবনে হয়তো আর হবে না, এলে ক্ষমা চেয়ে নিতাম।”
রীনার চোখে জল আসে। সে হাত দিয়ে মুখ ঢাকে। কৃষ্ণেন্দু রীনাকে দেখছে। তার চোখে শুধু অনুরাগ।
রীনা (অসহায় কান্নায়): কিন্ত কৃষ্ণেন্দু-কৃষ্ণেন্দু-আমি যে সব হারিয়েছি। আমার ধর্ম, প্রেম, ভালোবাসা, বিশ্বাস-আমি যে সব হারিয়েছি।
কৃষ্ণেন্দু (প্রত্যয় নিয়ে): তুমি কিছুই হারাওনি। তোমার সব আছে। সব।
রীনার চোখেও অনুরাগের ছোঁয়া লেগেছে।
কৃষ্ণেন্দুরও একই অবস্থা।
দূরে গির্জার ঘণ্টা শুনে রীনা ওই দিকে তাকায়।
কৃষ্ণেন্দুও তাকায়।
জানালা দিয়ে প্রার্থনা কক্ষ দেখা যায়।
কৃষ্ণেন্দু রীনার দিকে যায়।
রীনা প্রার্থনা কক্ষের দিকে তাকিয়ে।
কৃষ্ণেন্দু: যাবে ওখানে ?
রীনা ঘাড় নেড়ে ‘না’ জানায়।
কৃষ্ণেন্দু: কেন ?
রীনা: আমার যাবার কোনো অধিকার নেই।
কৃষ্ণেন্দু: অধিকার তোমার নিশ্চয়ই আছে। আমি তোমায় নিয়ে যাব।
রীনাকে দু’হাতে তুলে নেয় কৃষ্ণেন্দু। গির্জার ঘণ্টা বাজে।
৪.
হাসপাতাল। করিডর।
কৃষ্ণেন্দু রীনাকে নিয়ে করিডর দিয়ে এসে সিঁড়ির কাছে থামে।
গির্জার ঘণ্টা বাজে।
৫.
বাইরে।
দূরে প্রার্থনা ঘর। গির্জার ঘণ্টা বাজে।
৬.
করিডর।
রীনা কৃষ্ণেন্দুর হাতে নিজেকে সঁপে দেয়। কৃষ্ণেন্দু ভীষণ খুশি।
গির্জার ঘণ্টা বাজে।
৭.
বাইরে।
দূরে পাহাড়ের ঢাল দিয়ে প্রার্থনা ঘর দেখা যাচ্ছে। কৃষ্ণেন্দু রীনাকে নিয়ে ওই দিকে যায়।
হাসপাতাল-বিষয়ক আরেকটি উলে¬খযোগ্য ছবি হলো, ‘হুইল চেয়ার’ (১৯৯৪)। তপন সিংহ পরিচালিত এ ছবিতে দেখা যায়, ডাক্তার মিত্র (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়) ‘হোম ফর নিউরোলজিক্যাল পেসেন্ট’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। নিজে নিউরো পেশেন্ট এবং হুইল চেয়ারে চলাচল করেন। তবু তার সেবার মনোভাব এবং উদ্যোগে প্রতিষ্ঠানটি মানুষের আস্থা অর্জন করেছে। তিনি প্রত্যেক রোগীকে সমান দৃষ্টিতে দেখেন; অপরিসীম মমতায় তাদের সেবা করেন।
সন্তু (অর্জুন চক্রবর্তী) ডাঃ মিত্রের প্রতিষ্ঠানে ফিজিওথেরাপি করে। সে এক সময় মাস্তান ছিল। এখন তা অতীত। বর্তমানে রোগীর সেবাই তার আরাধ্য। এখানে অন্য রোগীদের সঙ্গে ভর্তি আছে ব্যবসায়ী শতদল বাবু (মনোজ মিত্র) এবং সাবেক চোর (কৌশিক)।
একদিন একটি দুর্ঘটনায় প্রচণ্ড আঘাত পায় সুস্মিতা (লাবণী সরকার)। সে পঙ্গু অবস্থায় ডাক্তার মিত্রের প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়। তার মনকে চাঙা করার জন্য ডাক্তার মিত্র বলেন, ‘যার নাম হলো সুন্দর হাসি। সে মুখ গোমড়া করে থাকবে কেন ?’ ফলে এক সময় ডাক্তারের চিকিৎসায় এবং সন্তুর ফিজিওথেরাপিতে সুস্মিতা শয্যাশায়ী অবস্থা থেকে হইল চেয়ারে বসতে পারে। তাকে সন্তু বিয়ের প্রস্তাব দেয়, তার অতীত জেনেও। অবশ্য এ বিয়েতে ডাক্তার মিত্রের সায় আছে।
এক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটির সরকারি অনুদান বন্ধ হয়ে যায। আর্থিক সমস্যায় হাবুডুবু খেতে থাকে ডাক্তার মিত্রের প্রতিষ্ঠানটি। তখন প্রতিষ্ঠানটিকে রক্ষা করার জন্য এগিয়ে আসেন শতদল বাবু। তিনি দশ লক্ষ টাকা দান করেন। ফলে প্রতিষ্ঠানটির কাজ আরও গতি লাভ করে। ডাক্তার মিত্র সামাজিক স্বীকৃতি লাভ করেন, তার নিঃস্বার্থ সেবার জন্য।
এই ছবিতে প্রতিবন্ধী রোগী এবং তাদের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে তুলে ধরা হয়েছে। অন্য কথায়, হোম ফর নিউরোলজিক্যাল হলো বিশেষ ধরনের হাসপাতাল।
পরিচালক অজয় করের সিনেমা ‘হারানো সুর’ (১৯৫৭) উত্তমকুমার-সুচিত্রা সেন অভিনীত এ ছবিতে দেখা যায়, কলকাতার উচ্চবিত্ত পরিবারের ছেলে অলক (উত্তম) স্মৃতিভ্রষ্ট হয়ে পড়লে তাকে দেওদা মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেই হাসপাতালই কিছুক্ষণের ছবিতে মূর্ত হয়ে উঠেছে।
শুরুতেই দেখা যায়, হাসপাতালের করিডরে নানা জনের আনাগোনা। একজন মানসিক রোগীকে দুই পাশ থেকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে দুজন লোক। একজন মাথা চুলকাতে চুলকাতে হাঁটছে। একজন ডাক্তার ঢুকলেন বাম দিকের একটি কক্ষে। একজন নার্স ঢুকে পড়লেন ডান দিকের একটি কক্ষে। দেখা গেল দাড়ি-গোঁফে আচ্ছন্ন মুখে অলক পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে। নার্স তার কাছে গিয়ে জানান, অলকের মা এসেছেন তার সঙ্গে দেখা করতে। এর পরই দেখা যায় অলকের মাকে। তিনি ছেলের কাছে গিয়ে তার নাম ধরে ডাকেন। কিন্ত অলক তাকে চিনতে পারে না। এ সময় সেখানে দেখা যায় অলকের যিনি চিকিৎসা করছেন, সেই ডাক্তার মজুমদারকে। তার কাছে অলকের মা অভিযোগ করেন ছেলে তাকে চিনতে পারেনি বলে। ডাক্তার মজুমদার তাকে আশ্বাস দিয়ে বলেন, পরের বার যখন তিনি আসবেন তখন অলক মাকে ঠিকই চিনতে পারবে। অলকের মা চলে যায়। অলকও অন্য রুমে যায়। তার পিছু পিছু যান ডাক্তার মজুমদারও। তিনি উত্তেজিত হয়ে অলককে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। অলক কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে জানায়, তাকে যেন বিরক্ত করা না হয়। এই বলে অলক অন্যত্র চলে যায়। সেখানে ছিল রমা (সুচিত্রা)। সে ডাক্তার মজুমদারের চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে কথা বলে। বলে রোগীর সঙ্গে ডাক্তারের উত্তেজিত হয়ে কথা বলা উচিত নয়। মজুমদার বিষয়টি সহজভাবে নিতে পারেন না। তিনি হাসপাতালের পরিচালককে বিষয়টি জানান। এদিকে ডাক্তার রমা এক রোগীকে ইলেক্ট্রিক শক দিয়ে পরিচালকের রুমে গেলে তিনি রমাকে ক্ষমা চাইতে বলেন ডাক্তার মজুমদারের কাছে। কিন্ত রমা তা না করে চাকরি থেকে রিজাইন দেয়। লাইব্রেরিতে গিয়ে তার কাছে থাকা বই ও কার্ড জমা দিয়ে এক কলিগের সঙ্গে যখন সে কথা বলছে তখন পাগলা ঘণ্টা বেজে ওঠে। কোনো এক মানসিক রোগী পালিয়ে গেছে, তারই সংকেত। সেই রোগী আর কেউ নয়। অলক। এখানেই ছবিটির হাসপাতালের অংশের সমাপ্তি ঘটে।
অগ্রগামী পরিচালিত ‘সাগরিকা’ (১৯৫৬)। এটিও উত্তম-সুচিত্রার ছবি। এ ছবির শুরুতেই দেখা যায়, হাসপাতালের দৃশ্য। হাউস সার্জন হিসেবে হাসপাতালে সকাল থেকেই রোগীদের সেবা করছে অরুণ (উত্তম)। রাতের বেলা সিনিয়র ডাক্তার এসে এক মুমূর্ষু রোগীকে দেখে তাকে একটি ইঞ্জেকশন দিতে বলেন। অরুণ জানায়, সেই ইঞ্জেকশন সে দিয়েছে। শুনে ডাক্তার বলেন অক্সিজেনের ব্যবস্থা রাখতে। অরুণ জানায়, সেই ব্যবস্থাও সে করেছে। ডাক্তার দেখেন, অদূরে অক্সিজেন সিলিন্ডার। দেখেশুনে ডাক্তার খুব খুশি হন। বলেন, তিনি অরুণের জন্য নিজেকে গর্বিত বোধ করছেন। তিনি একটি গামলায় হাত ধোন, পানি দিয়ে। অরুণ তাকে সাহায্য করে।...মুমূর্ষু রোগীটির বেডের সামনে অরুণ। রোগীটি কাতর স্বরে অনুনয় করছে অরুণের কাছে, সে যেন তাকে বাঁচিয়ে তোলে। নইলে তার বউ-ছেলেমেয়ে পথে বসবে। জানায় কম খাওয়া আর চিকিৎসার অভাবে তার এই অবস্থা। ফ্ল্যাশব্যাকে তখন দেখানো হয়, মৃত্যুপথ যাত্রী অরুণের বাবা। তার শিয়রে বালক অরুণ। বাবা বলছে, অরুণকে বড় ডাক্তার হতে হবে। বিলেত ফেরত ডাক্তার। তারপর গ্রামে এসে গরিব মানুষদের চিকিৎসা করতে হবে, যাতে তারা তার মতো বিনা চিকিৎসায় মারা না যায়। অরুণের কাকা আশ্বাস দেয় দাদাকে, হ্যাঁ, অরুণ একদিন বড় ডাক্তার হবে। বিলেত ফেরত ডাক্তার।...ফ্ল্যাশব্যাক শেষ হয়। দেখা যায়, তখনো আ-মগ্ন অরুণ। নার্সের কথায় তার সংবিত ফিরে।...বিলেতের হাসপাতালের ল্যাবরেটরিতে অরুণ কাচের জারে নানা কেমিক্যাল নিয়ে পরীক্ষারত অবস্থায় বাগদত্তা বাসন্তীর চিঠি পড়ছে (আসলে চিঠিটি লিখেছে সাগরিকা)। অরুণ অন্যমনস্ক থাকায় কাচের জারে বিস্ফোরণ ঘটে। অরুণ অন্ধ হয়ে পড়ে।...দেশের হাসপাতালে অরুণের চোখের অপারেশন হয়েছে (এর আগে সাগরিকা নিজের বাড়িতে রেখে সেবা-যতেœর মাধ্যমে অরুণকে প্রস্তুত করেছে অপারেশনের জন্য, বাসন্তীর ছদ্মবেশে।) ডাক্তার অরুণের চোখের ব্যান্ডেজ খুলছে আর অরুণ সাগরিকা (সুচিত্রা সেন)-র হাত চেপে ধরে বলছে, বাসন্তী, আমি চোখ খুলে তোমাকে দেখতে চাই। সাগরিকা আশ্বস্ত করে অরুণকে। কিন্ত চোখ খোলার পর সাগরিকা নয়, অরুণ দেখে সত্যিকারের বাসন্তীকে। সে হাত বাড়িয়ে বাসন্তীর হাত ধরে। কিন্ত স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গেই তার অস্বস্তি হয়। অরুণ আবার চোখ বন্ধ করে। সে মাথা নাড়ে। চোখ খুলে উত্তেজিত কণ্ঠে বলে, কে তুমি ? তুমি তো আমার সেই বাসন্তী নও। বাসন্তী ভয় পেয়ে জানায়, সত্যি সে সেই বাসন্তী নয়। অরুণ তখন আরও উত্তেজিত হয়ে পড়ে। নিজের চোখ নষ্ট করতে চায়। বলে, আমি দেখতে চাই না। চাই না। তখন একজন বাইরে যায়, সাগরিকাকে খুঁজতে। সাগরিকা তার মুখ দেখেই বিষয়টি বুঝতে পারে এবং ছুটে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে অরুণের বুকে। অরুণ তখন চোখ বোজা অবস্থায় ছিল, সেই অবস্থায় সাগরিকার স্পর্শে সে বলে ওঠে, এই তো আমার বাসন্তী! চোখ খুলে সে দেখে, সাগরিকাকে। সাগরিকা বলে, আমার ছলনাটুকু তুমি ক্ষমা করতে পারবে তো ? শুনে অরুণ প্রবল আবেগে জড়িয়ে ধরে সাগরিকাকে। বলাই বাহুল্য, এ সিনেমার হাসপাতালে বিজ্ঞান নয়, সিনেমাটিক ব্যাপার-স্যাপার লক্ষণীয়।
নীতিন বসুর চলচ্চিত্র ‘জীবন মরণ’ (১৯৩৯)। কুন্দনলাল সায়গল এখানে মোহন চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তার বিপরীতে লীলা দেশাই। ছবিতে দেখা যায়, মোহনের যক্ষ্মা হয়। সে সুস্থ হওয়ার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হয়। সেখানে ধীরে ধীরে সে সুস্থ হয়ে ওঠে। এটিই চলচ্চিত্রে বিশেষভাবে দেখানো হয়েছে। কেননা সেকালে মনে করা হতো, ‘যার হয় যক্ষ্মা, তার নাই রক্ষ্মা’। তাছাড়া এই রোগে আক্রান্ত রোগীকে একঘরে করা হতো। সেই বিষয়েও বার্তা দেওয়া হয়েছে চলচ্চিত্রে।
ফনী মজুমদারের চলচ্চিত্র ‘ডাক্তার’ (১৯৪০)। এখানে সীতানাথ, অমরনাথ, সোমনাথ, তিন পুরুষের কাহিনি। ডাক্তার অমরনাথ এক যক্ষ্মা রোগীকে না বাঁচাতে পারলেও তার মেয়েকে বিয়ে করে। অমরনাথের বাবা সীতানাথ তা মেনে নেয় না। ফলে অমরনাথ এক গ্রামে ছোট এক হাসপাতাল গড়ে তোলে। গরিব রোগীদের সেবা করে। পরে ঘটনাচক্রে তার ছেলে সোমনাথও এই হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত হয়। তিনটি প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন অহীন্দ্র চৌধুরী, পঙ্কজ মল্লিক ও জ্যোতিপ্রকাশ।
১৯৫৬ সালের চলচ্চিত্র ‘চলাচল’। পরিচালক অসিত সেন। এ ছবিতেও যক্ষ্মা রোগী এবং তাদের চিকিৎসার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। দেখা যায়, অবিনাশের (নির্মল কুমার) যক্ষ্মা হয়েছে। তাকে সুস্থ করে তোলে ডাক্তার চন্দ্র (পাহাড়ী সান্যাল) ও সরমা (অরুন্ধতী দেবী)। কিন্ত ঘটনাচক্রে আবারও সেই রোগে আক্রান্ত হয় অবিনাশ। আসলে তার পরিবারের সব সদস্যই যক্ষ্মার রোগী। দ্বিতীয়বারে কিন্ত অবিনাশ সেরে ওঠে না। হাসপাতালে ডাক্তার চন্দ্র ও সরমা তার চিকিৎসা করলেও সে না-ফেরার দেশে যাত্রা করে।
২.
এবার বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের কথা। দেখা যাক, হাসপাতালের চিত্র কী রকমভাবে উঠে এসেছে কাহিনিচিত্রে।
শুরুতে ‘অবুঝ মন’ (১৯৭২)-এর প্রসঙ্গ। বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় পরিচালক কাজী জহিরের ছবি। এখানে হিন্দু ও মুসলমান, দুই ধর্মের মানুষের মধ্যে প্রেম ও বন্ধুত্ব দেখানো হয়েছে। কাহিনির প্রয়োজনে হাসপাতাল মূর্ত হয়ে উঠেছে এ ছবিতে।
দেখা যায়, ট্রেনে পরিচয় হয় মাসুম (রাজ্জাক) ও মাধবী (শাবানা)-র। অতঃপর তাদের মধ্যে প্রেম। কিন্ত বিয়েতে বাধা হয়ে দাঁড়ায় দুজনের ধর্ম। ফলে মাধবীর অমত সত্ত্বেও তার বিয়ে হয় মাসুমের বন্ধু বিজয়ের সঙ্গে। বিজয় জানত না মাসুম ও মাধবীর সম্পর্কের কথা। যখন জানতে পারে, তখন সে সিদ্ধান্ত নেয়, ওদের দুজনের পথ থেকে সে সরে দাঁড়াবে। কিন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় সে অন্ধ হয়ে পড়ে। মাসুম তার নিজের একটি চোখের কর্নিয়া দিয়ে বিজয়ের চোখের আলো ফিরিয়ে দেয়। তার অনুরোধে মাধবীও বিজয়কে স্বামী হিসেবে অন্তর থেকে মেনে নেয়। আর মাসুম তার কলিগ ডাক্তার রাবেয়া (সুজাতা)-র হাত ধরে ঢাকা থেকে অন্য জায়গায় পাড়ি জমায়।
ছবিটি শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পরেই দেখা যায় হাসপাতাল। সিনিয়র ডাক্তার ও শিক্ষক (খলিল) অভিনন্দন জানান প্রিয় ছাত্র মাসুমকে, এমবিবিএস পরীক্ষায় ফার্স্ট হওয়ার জন্য। প্রত্যাশা করেন, একদিন সে অনেক বড় ডাক্তার হবে।...স্যারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মাসুম হাসপাতালের করিডরে এসে দেখে, মামা (সাইফুদ্দিন)-কে নিয়ে বিজয় (শওকত আকবর) এসেছে। সে ছুটে গিয়ে বন্ধুকে জড়িয়ে ধরে। বিজয় অভিনন্দন জানায় মাসুমকে। এ সময় মাসুমকে অভিনন্দন জানানোর জন্য রাবেয়াও আসে হাতে ফুল নিয়ে। তার কলিগ ও বান্ধবী নাজমাকেও দেখা যায়। মাসুম ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বিজয় ও মামার সঙ্গে হাসপাতাল ত্যাগ করে।...শেষ পর্যায়ে হাসপাতালের সিকোয়েন্স আবার দেখা যায়, যখন সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয় বিজয়। সে তখন বেডে শুয়ে আছে। অজ্ঞান। তাকে ঘিরে আছে স্ত্রী মাধবীসহ স্বজনেরা, বন্ধু মাসুম, ডাক্তার-নার্সসহ রাবেয়া। জানা যায়, কিছুক্ষণ পরে বিজয়ের জ্ঞান ফিরলেও সে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে। সে আর কোনো দিন দেখবে না। শুনে মাসুম দৃঢ় স্বরে জানায়, যেভাবেই হোক সে বিজয়ের দৃষ্টি ফিরিয়ে দেবে।...দৃশ্যান্তরে দেখা যায়, মাসুম তার স্যারকে অনুনয় করে বলছে, তিনি যেন ওর দৃষ্টির বিনিময়ে বিজয়ের দৃষ্টি ফিরিয়ে দেন, অপারেশন করে। শুরুতে সিনিয়র ডাক্তার রাজি না হলেও পরে তিনি রাজি হন এই শর্তে যে, তিনি মাসুমের একটি চোখের কর্নিয়া বিজয়ের চোখে যুক্ত করবেন। মাসুম সায় জানিয়ে বলে, ব্যাপারটি যেন কেউ না জানে।...রাবেয়া বান্ধবী নাজমার কাছে মাসুমের খোঁজ করে। প্রথমে নাজমা কিছু বলে না, পরে সে বিজয়ের জন্য মাসুমের কর্নিয়া দানের কথা বলে। শুনে রাবেয়া পাগলের মতো অপারেশন থিয়েটারের সামনে যায়। দরজায় করাঘাত করতে থাকে। কেউ দরজা খোলে না। রাবেয়া কান্নায় ভেঙে পড়ে।...রাবেয়ার কান্নার শব্দ আর মাসুমের যন্ত্রণাকাতর মুখ। পাশাপাশি বেডে সে আর বিজয়। অপারেশনে মগ্ন হয়ে পড়েন সিনিয়র ডাক্তার।...কিছুক্ষণ পর হাসপাতালের করিডরে ট্রলিতে অজ্ঞান অবস্থায় দেখা যায় বিজয়কে। আরও কিছুক্ষণ পরে আরেক ট্রলিতে মাসুমকে। মাধবী উৎকণ্ঠিত হয়ে ওঠে এবং জানতে পারে সবকিছু। সে তার বাবা আর শ্বশুরের উদ্দেশে বলে, মাসুম প্রমাণ করল মানুষ হিসেবে সে আমাদের চেয়ে অনেক বড়। আজ আমি চিৎকার করে বলতে চাই, সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।...মাসুমের জ্ঞান ফিরে। এক চোখে ব্যান্ডেজ, অন্য খোলা চোখে সে দেখে তার দুই পাশে মাধবী ও রাবেয়া। দুজনের চোখেই অশ্র“। মাসুম ব্যস্ত হয়ে জানতে চায়, বিজয় দেখতে পাচ্ছে কি না ? তখন রাবেয়া তা জানতে চলে যায়। এদিকে মাধবী কথা দেয় মাসুমকে, সে বিজয়কে ভালোবাসবে, ওকে সুখী করবে।...হ্যাঁ, বিজয় দেখতে পাচ্ছে। বিজয় ও মাধবীর সুখী দাম্পত্য জীবন কামনা করে মাসুম চলে যায়। বিজয় নিষেধ করে। মাধবী বলে, না, ওকে বাধা দিয়ো না। যেতে দাও।
‘অবুঝ মন’-এর হাসপাতাল সিকোয়েন্সগুলোতে মাসুম-বিজয়-মাধবী-রাবেয়াকে ঘিরেই সবকিছু ঘুরপাক খেয়েছে। তাদের হৃদয়ঘটিত ব্যাপারস্যাপার ও দুই বন্ধুর চোখের অপারেশন দেখানো হয়েছে। সেখানে অন্য কোনো রোগী ও তাদের স্বজনদের দেখা যায়নি। বিষয়টি অদ্ভুতই বটে।
১৯৭৮ সালে মুক্তি পায় সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘ডুমুরের ফুল’। দুই বাংলার পরিপ্রেক্ষিতেই বলা যায়, এ ছবিতে হাসপাতাল-কেন্দ্রিক নানা ঘটনা ও বিষয় বাস্তবতার সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই ফুটে উঠেছে। এখানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের একটি ওয়ার্ডের চিত্র উঠে এসেছে। হাসপাতালটির ভেতর ও বাইরের বিভিন্ন ফুটেজ যুক্ত হয়ে সেটে তৈরি ওয়ার্ডটি যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
আশরাফ সিদ্দিকীর গল্প ‘গলির ধারের ছেলেটি’ অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে ‘ডুমুরের ফুল’। লাড়ু (মাস্টার শাকিল) নামের এক কিশোর মা ও ভাগ্নের মৃত্যুর পর ঢাকা শহরে আসে। ওর একটি হাত জন্ম থেকে বাঁকা বলে অস্তিত্বের প্রয়োজনে সে ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করে। একদিন প্রবল জ্বরে লাড়ু অজ্ঞান হয়ে পথের মাঝে পড়ে থাকে। জ্ঞান হওয়ার পর সে নিজেকে হাসপাতালে আবিষ্কার করে। কে যে সেখানে তাকে পৌঁছে দিয়েছে, সে জানে না।
আসলে লাড়ুর আসল সমস্যা হলো, খাদ্য। সকাল, দুপুর ও রাতে পুষ্টিকর সব খাবার খেয়ে সে খুবই খুশি। আর নার্স রোকেয়া (ববিতা)-র হ্লে-ভালোবাসা পেয়ে তো তার একেবারে পোয়াবারো। সে মহানন্দে হাসপাতালে দিন কাটায়। লোকজ ছড়া ও গান গেয়ে, ক্যারিকেচার করে লাড়ু ওয়ার্ডের রোগীদের আনন্দ দেয়। সবাই তাকে পছন্দ করে। লাড়ুর শারীরিক অবস্থা উন্নতি হলে, সে সুস্থ হলেও নার্স রোকেয়া কর্তব্যরত ডাক্তারকে জানায়, লাড়ু পুরোপুরি ফিট নয়। এদিকে লাড়ু সবাইকে বলে বেড়ায়, কেউ আসবে, কেউ যাবে, সে কোনোদিনই হাসপাতাল থেকে যাবে না। কারণ কী ? খাবার। বলা যায়, হাসপাতাল নয়, সে বেহেশতে আছে। এমন চমৎকার সব খাবার বিনা পয়সায় আর কোথায় পাবে সে ? তাই সে ঘুমের মাঝেও সুস্বাদু খাবার খাওয়ার স্বপ্ন দেখে। এভাবে হাসপাতালে সহায়সম্বলহীন অনাথ কিশোরটির যাপিত জীবন ফুটে উঠেছে চলচ্চিতে। ফুটে উঠেছে ওয়ার্ডটির অন্য সব রোগীর জীবন এবং নার্স ও চিকিৎসকের কার্যক্রম। এমনকি কোনো কোনো রোগীর নার্সদের প্রতি আসক্ত হওয়ার বিষয়টিও।
রোকেয়া একদিন লাড়ুর হাতে তুলে দেয় বাল্যশিক্ষার একটি বই, যেন সে কিছুটা শিক্ষালাভ করে। ওর ভবিষ্যৎ জীবন সুন্দর হয়। লাড়ুও ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখে। কিন্ত একদিন হাসপাতালের সিনিয়র ডাক্তার (সিরাজ) ওয়ার্ডে লাড়ুকে ক্যারিকেচার করতে দেখেন এবং শারীরিক অবস্থার খোঁজ-খবর নিয়ে ওয়ার্ডের কর্তব্যরত ডাক্তারকে জানান, পরদিন সকালে লাড়ুকে ডিসচার্জ করে দেওয়ার জন্য। শুনে লাড়ু বাল্যশিক্ষার বই ছিঁড়ে সেটি ফেলার জন্য যায় বাইরে। সেখানে একটি কাচের টুকরা দেখতে পেয়ে সেটি তুলে নিজের ডান পা জখম করে। বেশ রক্ত বের হয়। ফলে তার হাসপাতালে থাকা ঠেকায় কে!
লাড়ুর বিষয়টি নিয়ে ওয়ার্ডের চিকিৎসকদের রুমে কথা বলে জুনিয়র ডাক্তার ও নার্স রোকেয়া। তাদের কথা হলো, লাড়ুর মতো কিশোরদের পুনর্বাসন করা উচিত সরকারের। তাদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা উচিত। যাহোক, এই পর্যায়ে লাড়ুর পা ভালো হয়ে গেলে রোকেয়া তাকে লুকিয়ে রাখে নার্সদের কামরায়, সিনিয়র ডাক্তারের ভিজিটের সময়। কিন্ত একদিন আবার সিনিয়র ডাক্তারের নজর পড়ে লাড়ুর ওপর। তিনি আবার লাড়ুকে ডিসচার্জ করে দিতে বলেন। লাড়ু তখন উপায় খুঁজতে থাকে, কীভাবে চিরদিন হাসপাতালে থাকা যায়। পরদিন সকালে নার্সরা যখন বিভিন্ন ওষুধ ও রাসায়নিক পদার্থের ট্রলিকে ঠেলে ঠেলে রোগীদের চিকিৎসা করছে, তখন লাড়ু সেইসব ওষুধের কার্যকারিতা জানতে চায় রোকেয়ার কাছে। ওর ক্রমাগত জিজ্ঞাসায় এক পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে একটি কালো বর্ণের ওষুধের বোতলের দিকে চেয়ে লাড়ুকে রোকেয়া বলে, ওই ওষুধটি খেলে লাড়ুকে আর যেতে হবে না। চিরদিনের জন্য থাকতে পারবে। গভীর রাতে সেই ওষুধটির কালো তরল পদার্থ পান করে লাড়ু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। পরদিন তাকে মৃত অবস্থায় দেখে ওয়ার্ডের সব রোগীরা কষ্ট পায়। কাঁদে। ওরা ভাবে, লাড়ু আত্মহত্যা করেছে। কিন্ত রোকেয়া কাঁদতে কাঁদতে বলে, লাড়ু আত্মহত্যা করেনি। সে এখানে থাকতে চেয়েছিল, চিরদিনের জন্য।
শুধু বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ এশিয়ায় এইডস-বিষয়ক প্রথম কাহিনিচিত্র ‘মেঘলা আকাশ’ (২০০২)। পরিচালক নারগিস আক্তার। এখানে এইচআইভি ভাইরাস, এইডস কী, কেন এইডস হয়, এইডস রোগের প্রতিকার সবই ফুটে উঠেছে এই ছবির মধ্য দিয়ে। সংগত কারণেই এখানে হাসপাতালেরও ভূমিকা রয়েছে, তবে তা খুবই সামান্য অংশ। আর এই হাসপাতালটি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল। এখানকার ডাক্তার ও শিক্ষক হিসেবে যাকে দেখা যায়, সেই চরিত্রে অভিনয় করেছেন ভারতের বলিউডের প্রথিতযশা অভিনেত্রী শাবানা আজমী। পর্দায় তার আবির্ভাব এভাবে যে, ল্যাবরেটরিতে তিনি রোগের জীবাণু পরীক্ষা করছেন। মাইক্রোসকপের নিচে তার চোখ। এক সময় তিনি চোখ তুলে তাকিয়ে বললেন, নেগেটিভ। এরপর তাকে দেখা যায়, অল্প বয়সী রোগিনীকে পরীক্ষা করতে, স্বামী যাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে। মেয়েটি সন্তানসম্ভবা। ডাক্তারের সঙ্গে তার কথোপকথনে জানা যায়, মেয়েটির স্বামীর বিরুদ্ধে তার বাবা ও ভাই মামলা করতে গেলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। কেননা মৌলভি ডেকে বিয়ে পড়ানো হয়েছে, রেজিস্ট্রি করা হয়নি। বাল্যবিবাহ, অল্প বয়সে মা হওয়া, রেজিস্ট্রিবিহীন বিয়ের কুফল সম্পর্কে সামাজিক বার্তা দেওয়া হয়েছে এই চলচ্চিত্রে। অতঃপর শাবানা আজমীকে লেকচার দিতে দেখা যায়, মেডিকেল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশে। আবার তাকে সিনেমার শেষ পর্যায়ে দেখা যায় হাসপাতালে। মেঘলা (মৌসুমী) নামের এক রোগিনী এসেছে পতিতালয় থেকে। ডাক্তার শাবানা আজমী মেয়েটির সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন, গত তিন মাস ধরে সন্ধ্যার দিকে মেয়েটির জ্বর হয়। হয় পেট খারাপও। সব শুনে মেয়েটির রক্তের সেম্পেল পাঠানো হয় পিজি হাসপাতালে। সেই পরীক্ষার রেজাল্ট দেখে ডাক্তার বলেন, মেঘলা এইডসে আক্রান্ত। এদিকে ছোট বোনের (পূর্ণিমা) প্রেমিক (শাকিল খান)-এর কাছে মেঘলার সন্ধান পেয়ে আকাশ (আইয়ুব খান) আসে হাসপাতালে। তার সঙ্গে ডাক্তার শাবানা আজমী কথা বলে বুঝতে পারেন, আকাশের মাধ্যমেই মেঘলার দেহে এইডসের জীবাণু ঢোকে, যখন গ্রামে প্রথম পরিচয়ের পর মেঘলাকে সে রক্ত দান করে। আর ঘটনাচক্রে মেঘলা পতিতালয়ে এলে সেখানে শুধু আকাশের সঙ্গেই তার শারীরিক সম্পর্ক হয়। শুনে আকাশ অবাক হয়। কেননা তার মধ্যে এইডসের কোনো লক্ষণ নেই। ডাক্তার বলেন, সে ধনী বলে ভালো খাওয়াদাওয়া করে, তাই তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মেঘলার থেকে অধিক। আর মেঘলাই তার জীবনের প্রথম নারী কি না যার শারীরিক সংস্পর্শে সে গিয়েছে ? তখন আকাশ কবুল করে, বিদেশে থাকার সময় এমন এক নারীর সঙ্গে তার শারীরিক সম্পর্ক হয়েছিল যে ছিল বহুবল্লভা। আর সেই ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে সে কনডম ব্যবহার করেনি। ডাক্তার জানান, এইডস মানেই জীবন শেষ হয়ে যাওয়া নয়। তাই আকাশ বিয়ে করতে পারে মেঘলাকে। তবে কিছু বিষয় তাদের মেনে চলতে হবে। তাহলে বেশ কয়েক বছর তারা বাঁচবে। তবে তাদের কোনো সন্তান হবে না। ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে আর মেঘলার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আকাশ হাসপাতাল ত্যাগ করে। পরে মেঘলাকে সে বিয়ে করে।
মোহাম্মদ হোসেন জেমী পরিচালিত ‘হৃদয় থেকে পাওয়া’ (২০০৯)। ছবিটির দুই-তৃতীয়াংশে হাসপাতালচিত্র রয়েছে। এখানে দেখা যায়, স্ত্রী কবিতা (মৌসুমী), ছেলে রত্ন ও সম্ভাবনাময় তরুণ সংগীতশিল্পী ছোটভাইকে নিয়ে শোয়েব (মান্না)-এর সংসার। কিশোর বয়সী ছেলে র রত্নকে ক্রিকেটার বানাতে চায় শোয়েব। তাই ছেলেকে এ বিষয়ে উৎসাহিত করে সে। একদিন র রত্ন একটি ম্যাচে অংশ নেয়। দর্শক হিসেবে শোয়েব ও কবিতাও সেখানে যায়, ছেলেকে অনুপ্রাণিত করার জন্য।...মাঠে দারুণ খেলছিল রত্ন । সমর্থকরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছিল, শোয়েব ও কবিতা তো বটেই। এক সময় চমৎকার একটি চার মারে র রত্ন। তারপর দৌড় দিতে গিয়ে মাঠে হঠাৎ পড়ে যায় সে। শোয়েব ও কবিতা ছুটে আসে। দেখে র রত্ন’র শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। অ্যাম্বুলেন্সে করে তারা ছেলেকে এক হাসপাতালে নিয়ে যায়। কার্ডিওলজি হাসপাতাল হিসেবে এটির বেশ সুনাম রয়েছে। র রত্ন কে পরীক্ষা করে হাসপাতালটির চিকিৎসকরা জানান, ওর হার্ট অকেজো হয়ে গেছে। অন্য কারো সুস্থ হার্ট ওর বুকে প্রতিস্থাপন করা গেলে র রত্ন সুস্থ হয়ে যাবে। তবে এর জন্য খরচ পড়বে এক কোটি দশ লাখ টাকা। ত্রিশ পার্সেন্ট টাকা জমা দিলে রোগী হিসেবে র রত্ন’র নাম তালিকাভুক্ত করা হবে। শোয়েব বিষয়টিকে পাত্তা দেয় না। কেননা যে অফিসে সে চাকরি করে, সেখানে প্রতি মাসে ওর বেতন থেকে টাকা তুলে নেওয়া হয় স্বাস্থ্যবীমা হিসেবে। কিন্ত বীমা কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করার পর শোয়েব জানতে পারে যে, হার্ট ও লাংসের চিকিৎসা এই বীমার অন্তর্ভুক্ত নয়। তারা বড় জোর বিশ লাখ টাকা দেবে। সেই টাকা নিয়েই হাসপাতালে ছুটে যায় শোয়েব। অনুরোধ করে কর্তৃপক্ষকে রতœকে হার্টের রোগী হিসেবে তালিকাভুক্ত করতে। কিন্ত হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক শাকিলা রেজা (চম্পা) রাজি হয় না। শোয়েব তখন হাসপাতালটির আয়ের একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরে। বলে বছরে শুধু হার্টের চিকিৎসা-বাবদ হাসপাতালটি পনেরো কোটি টাকা আয় করে। সেক্ষেত্রে মানবিক বিবেচনায় র রত্নের চিকিৎসা কি করতে পারে না ? পরে শোয়েব সেই টাকা দিয়ে দিবে। শাকিলা রেজা রাজি হয় না। অগত্যা এক ছুটির দিনে হাসপাতালটির প্রধান কার্ডিওলজিস্ট ডাক্তার রেজা (বাপ্পারাজ)সহ ইমার্জেন্সি বিভাগের সমস্ত ডাক্তার, নার্স ও রোগীদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে শোয়েব। সেই সময় ডাক্তারদের কাছ থেকে সে জানতে পারে, সেই হাসপাতালসহ দেশের নামকরা হাসপাতালগুলোতে রোগীর অর্থকেই প্রাধান্য দেয় কর্তৃপক্ষ ও ডাক্তাররা। জরুরি বিভাগে কোনো গরিব রোগী এলে তার কপালে চিকিৎসা জোটে না। জোটে শুধু এক প্যাকেট স্যালাইন এবং একটি সিভিট। তখন শোয়েব জানতে চায়, তার পুরো পরিবারের সদস্যই তো চেকআপ করে বছরে একাধিকবার, স্বাস্থ্য বীমার অধীনে। তাহলে কেন ডাক্তাররা রত্নের রোগটি ধরতে পারেন নি ? তখন ডাক্তার বলে, তারা বীমা কর্তৃপক্ষের স্বার্থ দেখে। তাই এইসব বিষয় এড়িয়ে যায়। ফলে কুরবানির ঈদের সময় একটি খাম পায় বীমা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে।
এদিকে প্রথমে ডিবি এবং পরে পুলিশেরা হাসপাতালকে ঘিরে ফেলে। অতঃপর নানা ঘটনার পরে এক মৃত নারীর দান করা হার্ট স্থাপন করা হয় রত্নে’র শরীরে। আর বেআইনিভাবে হাসপাতালের লোকজনকে জিম্মি করেছিল বলে শোয়েবকে গ্রেপ্তার করা হয়। বলা যেতে পারে, কিছুটা হলেও এদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ত্রুটি, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির বিষয়টি ফুটে উঠেছে এ চলচ্চিত্রে। আর চিকিৎসা অন্যতম মৌলিক অধিকার হলেও কঠিন ও দুরারোগ্য রোগের সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয় এদেশের গরিব ও স্বল্প আয়ের মানুষেরা, এই বার্তাও রয়েছে চলচ্চিত্রটিতে।
এস এ হক অলিক পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘হৃদয়ের কথা’ (২০০৬)। একটি প্রেমের ছবি। এখানে দেখা যায়, অনিক (রিয়াজ) জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী ও ভায়োলিনবাদক। তার ক্রেজি ফ্যান অধরা (পূর্ণিমা)। শুরুতে অনিক তাকে পাত্তা দেয় না। পরে ঘটনাচক্রে সে দুর্বল হয়ে পড়ে অধরার প্রতি। কিন্ত তাদের মধ্যে হৃদয়ঘটিত সম্পর্ক গড়ে ওঠার পর অধরা পসেসিভ হয়ে পড়ে অনিককে ঘিরে। অনিক মজা পায়। কিন্ত অসুস্থ বাবাকে অনিক দেখতে যেতে চাইলেও অধরা বাধা দেওয়ায় বিষয়টি জটিল আকার ধারণ করে। অধরা খারাপ ব্যবহার করে অনিকের সঙ্গে। এমনকি জন্মদিনেও। সেদিন রাতে অধরা এক গাদা ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। কিন্ত তারপরই সে নিজের ভুল বুঝতে পারে। বাঁচতে চায়। ওকে হাসপাতালে নেয়ার পর সে অনিকের কাছে আবদার করে, অনিকের ভায়োলিন বাদন শুনতে চায়। অনিক অপারগতা জানিয়ে বলে, সে ভায়োলিনের তার ছিঁড়ে ফেলেছে।...অধরার চিকিৎসা শুরু হয়। কিন্ত সে কোমায় চলে যায়। ওকে লাইফ সাপোর্টের মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখা হয়। চার বছর কেটে যায়। একদিন হাসপাতালের ডাক্তার জানায়, অধরার হৃদকম্পন ক্রমাগত কমে যাচ্ছে। আর বড় জোর আটচল্লিশ ঘণ্টা। এর মধ্যেই বিদায়ের ঘণ্টা বেজে উঠবে। তারপর অধরার লাইফ সাপোর্টের সরঞ্জাম প্রত্যাহার করা হবে। এর একদিন পর, অধরার জন্মদিনে, ওর কাছে যায় স্বজনেরা। অনিকও। একটি কেক কাটে অনিক। কোমার মধ্যে থাকা অধরার পাশে বসে ভায়োলিন বাজায় অনিক। এক সময় অধরার হৃৎকম্পন থেমে যায়। কেঁদে ওঠে অনিক। রুমের বাইরে অধরা ও অনিকের মা’ও। অধরার মা হাসপাতালের পেপারে সই করে। অনুমতি দেয় লাইফ সাপোর্ট প্রত্যাহারের। এরপর ঘটে এক অলৌকিক ঘটনা। অধরার হৃৎকম্পন শুরু হয় আবার। সে কোমা থেকে ফিরে আসে। চোখ মেলে তাকায়। অনিকের মুখ আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। সে গভীর আবেগে অধরার বুকে মাথা রাখে। রুমের বাইরে দণ্ডায়মান অন্যরাও মুখে হাসি আর সজল চোখে এই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে। উল্লেখ্য, এদেশে এই ছবিতেই প্রথম কোমায় আক্রান্ত কোনো রোগীকে দেখা যায়। তবে এখানে সেই রোগী বৈজ্ঞানিক কোনো কারণে নয়, আল্লাহর কাছে প্রার্থনা এবং মাজার ও পীরের কাছে ধর্ণা দেওয়ার কারণে কোমা থেকে ফিরে আসে স্বাভাবিক জীবনে। অবশ্য এক্ষেত্রে প্রেম তথা ভালোবাসারও একটি ভূমিকা রয়েছে। যদিও হাসপাতালে চার বছর অধরার লাইফ সাপোর্টে থাকার খরচ কে জোগালো, এর উত্তর পুরোপুরি মেলে না।
গৌতম ঘোষের চলচ্চিত্র ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ (১৯৯৩)।মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাসের চলচ্চিত্ররূপ। এখানে কুবের (রাইসুল ইসলাম আসাদ) ও মালা (চম্পা)-র মেয়ে গোপী (মুক্তি)-র পায়ে সমস্যা দেখা দেয়। তার জ্বর হয়। যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকে। এই অবস্থায় ধনুষ্টংকারের ভয়ে গোপীকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। মফস্বল শহরের সেই হাসপাতালচিত্র এখানে উঠে এসেছে।
শুরুতে গোপীকে পরীক্ষা করে রাসুকে গোপীর বাপ মনে করে ডাক্তার ওকে বকাঝকা করে, দেরিতে নিয়ে আসার জন্য। তার আশঙ্কা হয়তো গোপীর একটি পা কেটে ফেলতে হবে। আর জানায়, গোপীকে বেশ কয়েকদিন হাসপাতালে রাখতে হবে।
সবাই গ্রামে চলে যায়। কুবের ও কপিলা (রূপা চক্রবর্তী) থাকে। বিকালে হাসপাতালের বারান্দায় কপিলা ও কুবেরের কথোপকথন থেকে জানা যায়, অপারেশনের সময় গোপীর পা থেকে বাঁশের একটি গোঁজ বের করেছে ডাক্তার আর ওর পাখানা বেঁধে দিয়েছে কাঠের তক্তা দিয়ে। ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে এখন গোপী ঘুমাচ্ছে। রাতে কপিলা ও কুবের হোটেলে থাকে। পরদিন সকালে বাড়ি যায়। এরপর গোপীকে হাসপাতালে দেখতে আসে কুবের। দেখা যায়, কাঠের পাটাতন দিয়ে গোপীর পা বাঁধা। মুখে ক্লান্তির ছাপ। চোখ বন্ধ। কুবের ওর কপালে হাত রাখে। গোপী চোখ খুলে বাবার দিকে তাকিয়ে থাকে।
মেহের আফরোজ শাওনের চলচ্চিত্র ‘কৃষ্ণপক্ষ’ (২০১৬)। হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত। এখানে দেখা যায়, মুহিব ও অরু পরস্পরকে ভালোবেসে কাজী অফিসে গিয়ে বিয়ে করে। অরুর পবিরারের কেউ তা জানে না। এদিকে এক সড়ক দুর্ঘটনায় মুহিব গুরুতরভাবে আহত হয়। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রাখা হয় ইনটেনসিভ কেয়ারে। মুহিবের বন্ধু বজলু হাসপাতালে গিয়ে খোঁজখবর নেয়। জানে যে মুহিবের অবস্থা স্টেবল ছিল কিন্তু এখন খারাপ হতে শুরু করেছে। বজলু ডাক্তার ও নার্সদের কাছে অনুরোধ করে, তার রক্ত নেওয়ার জন্য। তাকে জানানো হয়, রক্ত লাগবে না।...মুহিবের বড় বোন জেবা আসে হাসপাতালে। সে বজলুর কাছে অরুর ঠিকানা জিজ্ঞেস করে। জানায়, সে অরুকে নিয়ে আসবে হাসপাতালে।...বৃষ্টি হচ্ছে। ইনটেসিভ কেয়ার ইউনিট থেকে একজন ডাক্তার বের হলেন। দুজন ডাক্তার নিয়ে ফিরলেন। জেবা চুপচাপ দেখে। কিছু বলে না। বজলু ওর পাশে এসে দাঁড়ায়। বন্ধু লেয়াকতের আনা চা দেয় জেবাকে। জেবা তা পান করে। বলে, মৃত্যু দেখতে দেখতে ওর অভ্যাস হয়ে গেছে। বাবা-মা-ছোট বোন, একে একে সবাইকে হারিয়েছে। ওর মনে হচ্ছে, বাবা-মা পরকালে একটা সংসার পেতেছে। ছোট বোন রেবার পরে এখন তারা অপেক্ষা করছেন মুহিবের জন্য।...জেবা আরেক কাপ চা পান করে। বজলুকে বলে, ওর ধারণা বাবা-মা-রেবা এসেছে। তারা মুহিবের খাটের পাশে বসে আছে। বজলু বলে, মুহিবের বিশ্বাস ছিল জেবার মতো ভালো মেয়ে অতীতে জন্মায়নি, ভবিষ্যতেও জন্মাবে না। ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট থেকে দুজন ডাক্তার মলিন মুখে বের হয়। জেবা ভেতরে যায়, মুহিবকে দেখার জন্য।...জেবার স্বামী শফিক আসে মেয়ে প্রিয়দর্শিনীকে নিয়ে। মেয়ে মামাকে দেখতে ভেতরে যায়। শফিক বলে, অরুর হাসপাতালে না আসাই উচিত। আর মুহিবের সঙ্গে ওর বিয়ের বিষয়টিও গোপন থাকা ভালো। নইলে অরুর নতুন করে জীবন শুরু করা সহজ হবে না। কিন্তু জেবা জানায়, মৃত্যুর সময় স্ত্রীকে পাশে পাবার অধিকার মুহিবের রয়েছে।...অরু হাসপাতালে আসে। সঙ্গে ওর বাবা-মা-বোন।
ছবিটির শেষ সিকোয়েন্সটি এখানে উল্লেখ করা হলো:
রাত। আইসিইউ-র বাইরে ডাক্তারের পাশে জেবা দাঁড়িয়ে ছিল। অরুকে দেখে এগিয়ে এল।
জেবা (ব্যাগ থেকে একটি শাড়ি বের করে): আমার মায়ের বিয়ের শাড়ি। মুহিব তোমাকে দিতে চেয়েছিল।
অরুর হাতে শাড়িটা দিয়ে জেবা চলে যায়। কাচের জানালা দিয়ে অরু আইসিইউ’র ভেতরের দিকে তাকায়। দেখে সারা গায়ে যন্ত্র লাগানো অবস্থায় মুহিব।
অরু (চাপা গলায়): ডাক্তার সাহেব, আমি কি ভেতরে গিয়ে ওর হাতটা একটু ধরতে পারি ?
ডাক্তার (কোমল গলায়): অবশ্যই ধরতে পারো মা, অবশ্যই পারো।
অরু: আমি যদি ওকে কোনো কথা বলি, তাহলে ও কি তা শুনবে ?
ডাক্তার: জানি না মা। কোমার ভেতর আছে, তবে মস্তিষ্ক সচল, শুনতেও পারে। মৃত্যু এবং জীবনের মাঝামাঝি জায়গাটা খুব রহস্যময়। আমরা ডাক্তাররা এই জায়গা সম্পর্কে তেমন কিছু জানি না।
অরু ধীরে ধীরে আইসিইউতে ঢোকে। সেখানে কর্তব্যরত ডাক্তারের উদ্দেশে বলে—
অরু: ডাক্তার সাহেব, আমি ওকে কয়েকটা কথা বলব। আপনি কি আমাকে কিছুক্ষণের জন্য ওর পাশে একা থাকতে দেবেন ?
আইসিইউতে থাকা ডাক্তার বের হয়ে যায়। অরু মুহিবের বেডের কাছে গিয়ে দাঁড়ানো অবস্থাতেই একটু ঝুঁকে পড়ে। ওর সমস্ত শরীর থরথর করে কাঁপছে। চোখে অশ্র“। সে মুহিবের একটি হাত ধরে কথা বলতে থাকে, মৃদু স্বরে।
ঘরে অরু একা। ছোট্ট ঘরটা সমুদ্রের মতো বড় হয়ে যায়। মুহিবের বিছানার সাদা চাদর হয়ে যায় সমুদ্রের ফেনা। ঢেউয়ের মতো দোলে।
উলে¬খ্য, ‘কৃষ্ণপক্ষ’-র প্রধান দুটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন রিয়াজ ও মাহিয়া মাহী।
এদেশের প্রথম থ্রিডি চলচ্চিত্র ‘অলাতচক্র’। সাহিত্যের এই চলচ্চিত্ররূপে হাসপাতাল রয়েছে সিনেমাটির সিংহভাগজুড়ে। এই সিনেমাটি সম্পর্কে তরুণ কথাসাহিত্যিক, শিল্প সমালোচক ও চলচ্চিত্র গবেষক সৈকত দে’র ভাষ্য হচ্ছে: “সরকারি অনুদানের অর্থে ২০২১ সালে নির্মিত হয় ‘অলাতচক্র’। আহমদ ছফা’র উপন্যাস অবলম্বনে থ্রি ডি তে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন হাবিবুর রহমান। প্রথমত, কাহিনি অনুযায়ী থ্রিডিতে নির্মাণের যৌক্তিকতা খুঁজে পাওয়া যায়নি দ্বিতীয়ত, উপন্যাস ও চলচ্চিত্রের প্রায় সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপটই হাসপাতাল। আহমেদ রুবেল সহৃদয় ডাক্তারের ভূমিকায় যথাযথ হলেও সিনেমার দরকারে বানানো হাসপাতালের সেট খানিকটা দৃষ্টিকটু লেগেছে। লম্বা করিডর, সাদা পর্দা, হাসপাতালের বেড—এই সবকিছুর সমন্বয়ে প্রায় জোর করেই যেন নির্মাতাকে বোঝাতে হয়েছে তিনি হাসপাতালের গল্প বলছেন। তৃতীয়ত, সরকারি অর্থ বলে উপন্যাসের তো বটেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ধারাক্রম ধ্বস্ত করে সরকারি দলকে তুষ্ট করবার প্রচেষ্টা দৃশ্যমান।” চলচ্চিত্রটির দুটি প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন আহমেদ রুবেল ও জয়া আহসান।
একটি বিশেষ চলচ্চিত্রের প্রসঙ্গ টেনে এই নিবন্ধের ইতি টানছি। চলচ্চিত্রটির নাম ‘গোপন কথা’ (১৯৭৬)। আজাদ রহমান পরিচালিত এ চলচ্চিত্রটির বিষয় সেক্সোলজি। তাই এখানে হিউম্যান প্রোডাকশন, যৌন শিক্ষা, যৌন বিজ্ঞান, যৌন ব্যাধি, পরিবার পরিকল্পনা এইসব বিষয় উঠে এসেছে। সংগত কারণেই মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, দুটির চিত্রই ফুটে উঠেছে। এখানে একটি শিশুর ভ্রƒণ থেকে শুরু করে প্রসবমুহূর্ত পর্যন্ত গর্ভাবস্থায় বেড়ে ওঠার নানা পর্যায় নিয়ে একটি অ্যানিমেশন ব্যবহার করা হয়েছে। এর সঙ্গে ন্যারেশনটা পড়েছিলেন এদেশের একজন শ্রেষ্ঠ চিকিৎসক প্রয়াত ড. বি. চৌধুরী।
শেষ কথা
দুই বাংলার কাহিনিচিত্রে হাসপাতালচিত্রের প্রসঙ্গে বলা যায়, কাহিনির প্রয়োজনেই কাহিনিচিত্রে হাসপাতালকে ব্যবহার করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য এমন কোনো চলচ্চিত্র নির্মিত হয়নি যেখানে হাসপাতালই মুখ্য বিষয়, প্রধান চরিত্র, হাসপাতালকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে পুরো চলচ্চিত্র। সত্যি কথা বলতে কী, সেটি সম্ভবও নয়, যদি সরকারি অনুদান না পাওয়া যায়। আর সেক্ষেত্রেও প্রয়োজন একটি চমৎকার চিত্রনাট্য এবং একজন দক্ষ ও সৃজনশীল পরিচালক। নইলে চলচ্চিত্র যেহেতু ব্যয়বহুল শিল্প মাধ্যম সেহেতু সদিচ্ছা থাকলেও প্রযোজক ফেরত চাইবেন তার বিনিয়োগকৃত অর্থ। তাই সেই চলচ্চিত্রে বিনোদনের কিছু উপাদান থাকবেই। ফলে সেটি বাণিজ্যিক না হলেও মধ্যধারার চলচ্চিত্র তো হবেই। দুই বাংলাতেই এমন চলচ্চিত্রের দেখা মেলে। যেগুলো ‘না ঘরকা না ঘাটকা’।
এবার আমার একটি স্বপ্নের চলচ্চিত্রের কথা বলি। সেটি হলো, হেমায়েতপুরের পাবনা মানসিক হাসপাতালকে ঘিরে যদি একটি কাহিনিচিত্র নির্মিত হতো, তাহলে বেশ হতো। সেই চলচ্চিত্রে মূর্ত হয়ে উঠবে মানসিক হাসপাতালটির সমস্যা, দুর্নীতি, রোগীদের অবস্থা, চিকিৎসাপদ্ধতি ইত্যাদি। আশা করি, আগামীতে একজন সৃজনশীল চলচ্চিত্রকার আমার এই স্বপ্নকে বড়পর্দায় ফুটিয়ে তোলার জন্য এগিয়ে আসবেন। এগিয়ে আসবেন সরকারও, আর্থিক ও প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের সদিচ্ছা নিয়ে। তাহলেই আমার মতো অগণিত চলচ্চিত্রপ্রেমীর স্বপ্ন পূরণ হবে।
লেখক: মোমিন রহমান