সৌদির নেতৃত্বে বহুজাতিক জোটে বাংলাদেশ : কৌশলগত গুরুত্ব ও ঝুঁকি

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬, ০২:১৮ পিএম
আপডেট: ০২ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৫৫ এএম
Main News Image

লোহিত সাগর হয়ে সমুদ্র পথ। ছবি : সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্য নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান রুট হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহৃত লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এক নজিরবিহীন আন্তর্জাতিক সংকট তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সামুদ্রিক নৌরুট নিরাপদ রাখতে সৌদি আরবের উদ্যোগে ১৩টি দেশের সমন্বয়ে একটি বহুজাতিক নৌ সামরিক জোট গঠিত হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এই জোটে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তটি কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অত্যন্ত কৌশলগত। একদিকে এটি জ্বালানি নিরাপত্তা ও প্রবাসীদের শ্রমবাজার সুরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, অন্যদিকে ইরানের সাথে সম্পর্ক এবং ঐতিহ্যগত নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি ধরে রাখার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহনের রুট হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো লোহিত সাগরকে প্রধান বিকল্প হিসেবে ব্যবহার শুরু করে।

লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সাথে যুক্ত করা এই ৩০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সরু চ্যানেলটি দিয়ে বৈশ্বিক বাণিজ্যের ১০-১২ শতাংশ এবং প্রতিদিন ৪-৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়।
হুথি বিদ্রোহীরা বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে সামুদ্রিক অবরোধের মতো পরিস্থিতি তৈরি করায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধির ভয় দেখা দিয়েছে, যা বাংলাদেশের মতো আমদানি-নির্ভর দেশের জন্য মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন এই জোটে তুরস্ক, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, মিশর, কুয়েত, কাতার, জর্ডান, বাহরাইন, জিবুতি, সোমালিয়া, ইয়েমেন, সুদান ও কোমোরোস রয়েছে। তবে লক্ষণীয়ভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান এতে যুক্ত হয়নি।

১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে সামরিক সহযোগিতা এবং পরবর্তীতে কুয়েত পুনর্গঠনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকার ধারাবাহিকতায় এই অংশীদারিত্বকে দেখা হচ্ছে। এর প্রধান লাভজনক দিকও রয়েছে। সৌদি আরবে বর্তমানে ২৫ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি কর্মরত আছেন। মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় এই শ্রমবাজার রক্ষা এবং সৌদির সাথে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সুসংহত রাখতে তাদের এই কৌশলগত উদ্যোগে ইতিবাচক সাড়া দেওয়া ঢাকার জন্য প্রয়োজন ছিল।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও আমদানি-রপ্তানি পণ্যবাহী জাহাজ লোহিত সাগর ব্যবহার করে ইউরোপ ও আমেরিকায় যায়। এই নৌরুট নিরাপদ থাকলে বাংলাদেশের বাণিজ্যের খরচ ও ঝুঁকি কমবে।
পাকিস্তান, তুরস্ক ও মিশরের মতো সামরিকভাবে দক্ষ নৌবাহিনীর সাথে যৌথ টহল, সাবমেরিন-বিধ্বংসী কৌশল চর্চা এবং আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর আধুনিকায়ন দ্রুততর হবে।
লোহিত সাগর ও পূর্ব আফ্রিকা উপকূলে নৌবাহিনীর উপস্থিতির ফলে জিবুতি ও সোমালিয়াসহ পার্শ্ববর্তী আফ্রিকান দেশগুলোতে বাংলাদেশের নতুন রপ্তানি বাজার এবং জনশক্তি পাঠানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। ইরান এই বহুজাতিক জোটকে সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র অক্ষের অংশ হিসেবে মনে করতে পারে। ভবিষ্যতে ইরান আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হলে সামরিক জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ঢাকার জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে "সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়" নীতি অনুসরণ করে আসছে। সক্রিয় সামরিক প্রেক্ষাপটে গঠিত কোনো জোটে যুক্ত হলে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিসমূহের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যে বাংলাদেশের অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
যেহেতু এটি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন নয়, তাই সংঘাতপূর্ণ এলাকা বাব আল-মান্দেবে হামলা হলে বাংলাদেশি নৌ-সদস্যদের জীবনের সুরক্ষার ঝুঁকি থেকে যায়। বিমান প্রতিরক্ষা নিশ্চিতকরণ, ক্ষতিপূরণ এবং ইন্স্যুরেন্স সুবিধার সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা জরুরি।

নীতিগত সুপারিশ : ঢাকাকে অবশ্যই কৌশলগতভাবে ইরানের কাছে পরিষ্কার করতে হবে যে, এই জোটে যোগদান কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান নয়; এটি কেবল মুক্ত নৌ চলাচল ও বাণিজ্যিক জাহাজের সুরক্ষায় একটি রক্ষণাত্মক (Defensive) পদক্ষপে।
বহুজাতিক জোটে নৌবাহিনীর ভূমিকা কী হবে, ক্ষয়ক্ষতির দায়ভার কে নেবে এবং আর্থিক ও নিরাপত্তা সুবিধা কেমন হবে—তা আগেই লিখিত চুক্তি বা সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে স্পষ্ট করা প্রয়োজন। তেহরান ও রিয়াদ—উভয় রাজধানীর সাথেই কূটনীতির উন্মুক্ত চ্যানেল বজায় রেখে নিরপেক্ষতার ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন এই সামুদ্রিক জোটে যুক্ত হওয়া বাংলাদেশের জন্য একটি দ্বি-মুখী তলোয়ারের মতো। একদিক থেকে প্রবাসীদের স্বার্থ, জ্বালানি নিরাপত্তা ও সামরিক দক্ষতা বৃদ্ধির বড় সুযোগ রয়েছে; অন্যদিকে সংঘাতের আগুনে জড়িয়ে পড়ার ও ইরানের মতো আঞ্চলিক শক্তির বিরোধিতা মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। সুচিন্তিত কূটনৈতিক পদক্ষেপ ও বিচক্ষণতার সাথেই বাংলাদেশকে এই আঞ্চলিক সংকটে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে হবে।