হাতিরঝিল : ঢাকার বুকে এক টুকরো জলাশয়ের সঙ্কট ও সম্ভাবনা
বিকেলের শেষ আলো যখন ঢাকার আকাশে ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসে, তখন শহরের কোলাহলের মাঝখানে এক বিস্তৃত জলরেখা নিঃশব্দে ঝলমল করে ওঠে। চারপাশে কংক্রিটের দেয়াল, ব্যস্ত সড়ক, অবিরাম যানজট তবু তাদের মাঝখানে শান্তভাবে শুয়ে আছে প্রশান্ত এক জলাশয় হাতিরঝিল। যেন এক ক্লান্ত মহানগরের বুকের উপর রাখা শীতল জলপট্টি।
সন্ধ্যা নামলে সেতুগুলোর আলো একে একে জ্বলে ওঠে। সেই আলো জলের বুকে ভেঙে পড়ে হাজার টুকরো হয়ে। বাতাসে ভেসে আসে মানুষের হাসি, গল্প, পদচারণার শব্দ। মনে হয় এই শহর এখনও পুরোপুরি কঠিন হয়ে যায়নি; তার ভেতরে কোথাও পানি আছে, আলো আছে, স্বপ্ন আছে।
তবে হাতিরঝিলের গল্প শুধু সৌন্দর্যের নয়। এর ভেতরে আছে ইতিহাস, নগর পরিকল্পনার বাস্তবতা, পরিবেশগত সংকট ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনার দীর্ঘ কাহিনী।
ইতিহাসের ভাঁজে এক জলাভূমি
ঢাকার ইতিহাসে জলাশয়ের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একসময় এই অঞ্চল ছিল বিস্তৃত জলাভূমি ও খাল-নদীর জালের অংশ। বর্ষার সময় এই জলাভূমি শহরের অতিরিক্ত পানি ধারণ করত, আবার ধীরে ধীরে সেই পানি বুড়িগঙ্গা নদীর দিকে প্রবাহিত হতো। ঐতিহাসিক জনশ্রুতি বলছে, মুঘল আমলে রাজধানীর রাজকীয় হাতিদের এখানে এনে গোসল করানো হতো। সেই স্মৃতিই নাম হয়ে রয়ে গেছে হাতিরঝিল।
কালের প্রবাহে শহর বড় হতে থাকে। ১৯৬০-৭০-এর দশকের পর ঢাকার দ্রুত নগরায়নের ফলে জলাভূমিগুলো ধীরে ধীরে দখল ও ভরাটের শিকার হয়। খালগুলো সংকুচিত হতে থাকে, প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে বর্ষা এলেই শহরের নানা এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিতে শুরু করে।
নগর পরিকল্পনার মাইলফলক
জলাবদ্ধতার সংকট মোকাবিলার জন্য সরকার ও নগর পরিকল্পনাবিদরা হাতিরঝিল এলাকাকে পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। দীর্ঘ গবেষণা ও পরিকল্পনার পর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে হাতিরঝিল উন্নয়ন প্রকল্প শুরু হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কাজ করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থা। প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল তিনটি
১. ঢাকার মধ্যাঞ্চলের জলাবদ্ধতা কমানো
২. আধুনিক নগর যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা
৩. একটি নান্দনিক নগর জলাশয় ও বিনোদন কেন্দ্র সৃষ্টি করা প্রায় ৩০০ একরেরও বেশি এলাকাজুড়ে বিস্তৃত হাতিরঝিলে নির্মিত হয়েছে একাধিক সেতু, উড়ালপথ, সড়ক ও জলাধার। ২০১৩ সালে প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে জনসাধারণের জন্য খুলে দেয়া হয়। গুলশান, তেজগাঁও, মগবাজার, রামপুরা ও বনশ্রী এলাকাকে সংযুক্ত করে এটি ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
শহরের ফুসফুস হয়ে ওঠা
আজ হাতিরঝিল শুধু একটি জলাধার নয়,এটি ঢাকার নাগরিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অবকাশস্থল। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এখানে আসে হাঁটতে, ছবি তুলতে, কিংবা শুধু কিছুক্ষণ শান্তভাবে বসে থাকতে।
ভোরের সময় দেখা যায় স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের হাঁটার দল। সকালের আলো পানির উপর পড়ে সোনালি রেখা আঁকে।
এখানে রয়েছে নৌবিহারের সুযোগ, উন্মুক্ত হাঁটার পথ, সাইক্লিংয়ের স্থান ও নান্দনিক সেতু। শহরের কংক্রিটের ভিড়ে এটি যেন এক ছোট্ট মুক্ত আকাশ।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, এ ধরনের জলাশয় একটি শহরের ইকোলজিক্যাল বাফার হিসেবে কাজ করে। এটি বৃষ্টির পানি ধারণ করে, তাপমাত্রা কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করে ও শহরের পরিবেশে আর্দ্রতাসহ ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
দূষণের ছায়া
তবে হাতিরঝিলের এই স্বপ্নময় চিত্রের ভেতরেই লুকিয়ে আছে কিছু অস্বস্তিকর বাস্তবতা। আশপাশের বিভিন্ন এলাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা এখনও পুরোপুরি উন্নত না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে বর্জ্য ও দূষিত পানি এসে ঝিলের সঙ্গে মিশে যায়। ফলে পানির স্বচ্ছতা অনেক সময় কমে যায় ও তীব্র দুর্গন্ধও তৈরি হয়। পরিবেশবিদদের মতে, যদি নিয়মিত পানি পরিশোধন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করা হয়, তবে ভবিষ্যতে এই জলাশয়ের পরিবেশগত ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ
হাতিরঝিল পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। তবে এত বড় এলাকা নিয়মিত পরিচ্ছন্ন রাখা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ কাজ নয়। কখনো কখনো অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন চলাচল, অবৈধ দোকান বা অপরিকল্পিত ব্যবহার এই সৌন্দর্যের পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাছাড়া পর্যাপ্ত সবুজায়নের অভাবও অনেক বিশেষজ্ঞের মতে একটি সীমাবদ্ধতা।
সম্ভাবনার নতুন পথ
সব সীমাবদ্ধতার মাঝেও হাতিরঝিলের সম্ভাবনা এখনও বিশাল। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা থাকলে এটি হতে পারে ঢাকার অন্যতম নগর পরিবেশ পুনরুদ্ধার প্রকল্প। আধুনিক পানি পরিশোধন ব্যবস্থা, উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক সচেতনতা বাড়ানো গেলে ঝিলের পরিবেশ অনেক উন্নত করা সম্ভব। শেষের কথা রাত বাড়লে হাতিরঝিলের পানিতে শহরের আলো নিঃশব্দে দুলতে থাকে। দূরে সেতুর উপর দিয়ে গাড়ি ছুটে যায়, বাতাসে ভেসে আসে শহরের মৃদু শব্দ। ঢাকা তখনও ব্যস্ত, তখনও ক্লান্ত। তবু তার বুকের মাঝখানে এই জলরেখা শান্তভাবে বলে যায়-একটি শহর শুধু ইট-পাথরে তৈরি হয় না; তার ভেতরে দরকার পানি, বাতাস, আর মানুষের একটু স্বপ্ন। হাতিরঝিল সেই স্বপ্নেরই এক টুকরো প্রতিচ্ছবি, যেখানে সংকট আছে, আবার পানির মতোই গভীর সম্ভাবনা এখনও জেগে আছে।
যদি হাতিরঝিলকে যতেœ আগলে রাখা যায়,তবে একদিন এই জলরেখাই হয়তো ঢাকার ক্লান্ত বুকে বইয়ে দেবে নতুন প্রাণের স্রোত। পানির আয়নায় ঝলমল করবে শহরের স্বপ্ন,আর ব্যস্ত ইট কংক্রিটের ভিড়ে এই জলাশয়ই ধীরে ধীরে ঢাকাকে করে তুলবে আরও প্রাণবন্ত, আরও মানবিক।
মোহাম্মদ রবিউল্লাহ : সাংবাদিক