ভাড়াটে কিশোর ভয়ংকর

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৬, ১০:৩৫ এএম
আপডেট: ০৩ আগস্ট ২০২৬, ১২:২৮ পিএম
Main News Image

ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে এক নতুন ও ভয়াবহ অপরাধ প্রবণতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অনলাইন গেমের আড়ালে শখের বশে সময় কাটানো কিশোর-তরুণরা জড়িয়ে পড়ছে আন্তঃরাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড ও আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রে। টাকার প্রলোভনে অল্প বয়সী তরুণদের ভাড়াটে খুনি বা হিটম্যান হিসেবে ব্যবহার করছে অপরাধী গোষ্ঠীগুলো, যা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে ‘ভায়োলেন্স-অ্যাজ-এ-সার্ভিস’ (VaaS) নামে পরিচিতি পেয়েছে। 


অনলাইন গেমিংয়ের ধাঁচে খুনের চুক্তিইউরোপোলের তথ্য অনুযায়ী, অপরাধী চক্রগুলো অসচ্ছল বা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত কিশোরদের টার্গেট করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে নিয়োগ দিচ্ছে। হত্যাকাণ্ড ও হামলার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে ভিডিও গেমের মতো ‘গ্যামিফায়েড’ বা ধাপে ধাপে মিশন দেওয়ার স্টাইলে ডিজিটাল নির্দেশনা: ‘সিগন্যাল’ এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে কিশোরদের ফ্লাইট টিকিট কেটে দেওয়া হয়। ভিডিও গেমের ছদ্মনাম: হ্যান্ডলারদের সাংকেতিক নাম থাকে গেমের চরিত্রের মতো—যেমন ‘এজেন্ট ৪৭’ বা ‘ওয়ান’।অস্ত্র ও অর্থের সন্ধান: গুগল ম্যাপ, ভিডিও ও ছবির মাধ্যমে কোনো নির্জন বন বা আন্ডারপাসের ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে রাখা অস্ত্র ও নগদ অর্থ সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়। 

অ্যান্ডি ক্রাগ (প্রধান, ইউরোপিয়ান সিরিয়াস অ্যান্ড অর্গানাইজড ক্রাইম সেন্টার) বলেন, "এটি আর কেবল অপরাধচক্রের নিজস্ব সদস্য দিয়ে অপরাধ করানো নয়; বরং দুর্বল তরুণদের কাছে পরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ড আউটসোর্স করা।"২. ফক্সট্রট নেটওয়ার্ক ও ইরান কানেকশনএই ভয়াবহ নেটওয়ার্কের নেপথ্যে রয়েছে সুইডেনভিত্তিক সংঘবদ্ধ অপরাধী গোষ্ঠী ‘ফক্সট্রট নেটওয়ার্ক’। ২০২২ সাল থেকে এই চক্রটি ইউরোপে প্রায় ৩৫টি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে ধারণা করা হয়।রাষ্ট্রীয় মদদ ও উদ্দেশ্য:রাওয়া মাজিদের পলায়ন: ফক্সট্রট নেতা রাওয়া মাজিদ বর্তমানে ইরানের রাজধানী তেহরানে অবস্থান করছেন।ইরান সরকারের সঙ্গে সমঝোতা: নিরাপদে তেহরানে থাকার বিনিময়ে মাজিদ তার নেটওয়ার্ককে ব্যবহার করে ইরানি শাসকগোষ্ঠীর শত্রু—যেমন রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বী, সাংবাদিক এবং ইউরোপে অবস্থিত ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাচ্ছেন।হামলার ধরন: কোপেনহেগেনে ইসরায়েলি দূতাবাসে হ্যান্ড গ্রেনেড হামলা থেকে শুরু করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কিলার স্কোয়াড পাঠানোর পেছনে রয়েছে এই চক্রের হাত।৩. ট্র্যাজিক পরিণতি: ভুল লক্ষ্যবস্তু ও ধরা পড়া তরুণরাঅভাবনীয় হলেও সত্য, এই কিশোর ঘাতকদের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো টাকা দেওয়া হয় না; কারণ মিশন শেষ করার আগেই তারা ধরা পড়ে বা ভুল মানুষকে হত্যা করে বসে।ঘাতক 

পরিণতিআতিলা আজিমভ১৮টাকার লোভে স্টকহোমের ম্যাকডোনাল্ডসের শিফট শেষে বাড়ি ফেরা ২০ বছর বয়সী নির্দোষ শিক্ষার্থী মুরাদ আবদেলকাদেরকে ভুল করে মাথায় গুলি করে হত্যা করে।ইয়োহানেস নাটল্যান্ড১৮নরওয়ের এক স্বচ্ছল পরিবারের সন্তান। মাদকে আসক্ত হয়ে অনলাইন হ্যান্ডলার ‘এজেন্ট ৪৭’-এর মাধ্যমে যুক্তরাজ্যে ২৪ হাজার পাউন্ডের বিনিময়ে খুনের চুক্তি নেয়। অস্ত্র সংগ্রহের পরপরই ধরা পড়ে যায়।৪. 

ইউরোপোলের অধীনে যুক্তফ্রন্ট গঠন করেছে বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, আইসল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, স্পেন, সুইডেন ও যুক্তরাজ্য সহ ১১টি দেশ।যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞা: ফক্সট্রট নেটওয়ার্ক এবং এর শীর্ষ নেতা রাওয়া মাজিদের ওপর আনুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাজ্য সরকার।অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও পুলিশ কর্তৃপক্ষের মতে, কেবল আইন প্রয়োগ করে এই সংকট মেটানো কঠিন। প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ এবং কিশোর-তরুণদের সামাজিক নিরাপত্তার পরিধি না বাড়ালে ডিজিটাল মাধ্যমে ছড়ানো এই ‘ভাড়াটে খুনি’ বানানোর প্রক্রিয়া থামানো কঠিন হয়ে পড়বে।