ব্রিকসের দোরগোড়ায় বাংলাদেশ: অর্থনৈতিক সুযোগ ও কূটনীতির পরীক্ষা
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সামনে আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মুহূর্ত এসে দাঁড়িয়েছে। আগামী ১২–১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে অংশগ্রহণের জন্য বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণ নিছক একটি কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনীতি এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কৌশলগত অবস্থান নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ কি শুধু এই সম্মেলনে অংশ নেবে, নাকি ভবিষ্যতে ব্রিকসের পূর্ণ সদস্যপদের দিকেও এগোবে? আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো এতে বাংলাদেশের লাভ কতটা, ঝুঁকি কতটা এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, এই সিদ্ধান্তকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে?
বিশ্ব অর্থনীতির মানচিত্র দ্রুত বদলাচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী যে অর্থনৈতিক কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা বিশ্বের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছে, তার পাশাপাশি এখন নতুন অর্থনৈতিক কেন্দ্র তৈরি হচ্ছে। ব্রিকস সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক। সম্প্রসারিত ব্রিকস আজ বিশ্বের প্রায় ৪৬ শতাংশ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে এবং ক্রয়ক্ষমতা সমতা (PPP) অনুযায়ী বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৩৬ শতাংশেরও বেশি এই জোটের আওতায়। বিশ্বের বৃহৎ জ্বালানি উৎপাদক, বিশাল ভোক্তা বাজার এবং দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির একটি বড় অংশ এখন ব্রিকস কাঠামোর মধ্যে অবস্থান করছে।
বাংলাদেশের মতো একটি রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এই বাস্তবতা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (LDC) তালিকা থেকে উত্তরণের পর শুল্ক সুবিধার একটি বড় অংশ হারাবে। ফলে নতুন বাজার, নতুন বিনিয়োগ এবং বিকল্প উন্নয়ন অর্থায়নের উৎস খুঁজে বের করা জাতীয় অর্থনৈতিক প্রয়োজন হয়ে দাঁড়াবে। ব্রিকসের নতুন উন্নয়ন ব্যাংকে (New Development Bank) বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই সদস্য হিসেবে যুক্ত হয়েছে, যা দেখায় পূর্ণ ব্রিকস সদস্য না হয়েও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করা সম্ভব।
ব্রিকস এখন শুধু বাণিজ্যের প্ল্যাটফর্ম নয়; এটি বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান সংস্কার এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর বৃহত্তর প্রতিনিধিত্বের দাবিরও একটি মঞ্চ। ফলে ব্রিকসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা অনেক সময় পশ্চিমা বিশ্বে রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে। এখানেই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের অর্থনীতির দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ। বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের বড় অংশ আসে পশ্চিমা দেশ, জাপান ও অন্যান্য উন্নত অর্থনীতি থেকে। আবার বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে চীন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার, ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী অর্থনৈতিক সহযোগী এবং জাপান দীর্ঘদিনের উন্নয়ন অংশীদার। অর্থাৎ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি নিজেই বহুমাত্রিক।
এমন বাস্তবতায় ব্রিকসে যোগদান যদি পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় দূরত্ব সৃষ্টি করে, তবে তার মূল্য বাংলাদেশের অর্থনীতিকে দিতে হতে পারে। আবার ব্রিকসকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করলেও নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ হারানোর ঝুঁকি থাকবে। তাই বাংলাদেশের সামনে প্রশ্নটি ‘পূর্ব না পশ্চিম’ এমন সরল পছন্দের নয়; বরং ‘কীভাবে উভয় দিকের সুযোগকে সর্বোচ্চ কাজে লাগানো যায়’ সেটিই মূল প্রশ্ন।
ভারত একই সঙ্গে ব্রিকস, জি-২০, কোয়াড এবং যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম কৌশলগত অংশীদার। নয়াদিল্লি কখনোই একটিমাত্র জোটের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং প্রতিটি প্ল্যাটফর্মকে নিজের জাতীয় স্বার্থে ব্যবহার করে।
শ্রীলঙ্কা চীনা ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ফলে যে অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছিল, তা পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি সতর্কবার্তা। অন্যদিকে ভিয়েতনাম যদিও দক্ষিণ এশিয়ার দেশ নয় চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের সঙ্গেই সম্পর্ক সম্প্রসারণ করে অর্থনৈতিক সাফল্যের একটি কার্যকর উদাহরণ তৈরি করেছে। বাংলাদেশের জন্যও শিক্ষা একটাই কোনো একটি শক্তিকেন্দ্রের ওপর অতিনির্ভরতা নয়, বরং বহুমাত্রিক অংশীদারিত্বই দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ পথ।
অনেকেই মনে করেন, বাংলাদেশ ব্রিকসের কাছাকাছি গেলে যুক্তরাষ্ট্র অসন্তুষ্ট হবে। বাস্তবতা অবশ্য আরও জটিল।
ওয়াশিংটন অবশ্যই ব্রিকসের সম্প্রসারণ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বিশেষ করে ডলারনির্ভর আর্থিক ব্যবস্থার বিকল্প উদ্যোগ, স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান সংস্কারের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত আগ্রহ রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সাম্প্রতিক প্রবণতা দেখায়, যুক্তরাষ্ট্র এখন দেশগুলোকে কেবল একটি জোটের সদস্যপদ দিয়ে মূল্যায়ন করে না; বরং দেখে সেই দেশ আন্তর্জাতিক আইন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, বাণিজ্যিক উন্মুক্ততা এবং কৌশলগত ভারসাম্য কতটা বজায় রাখছে।
ভারতের উদাহরণই যথেষ্ট। একদিকে ভারত ব্রিকসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, মহাকাশ এবং ইন্দো-প্যাসিফিক সহযোগিতার সম্পর্কও অভূতপূর্ব উচ্চতায় পৌঁছেছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও একই সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্ব এবং ব্রিকস উভয় ক্ষেত্রেই সক্রিয়। ফলে ব্রিকসে সম্পৃক্ততা মানেই যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থান এমন ধারণা বর্তমান আন্তর্জাতিক বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বাংলাদেশের উচিত হবে একই কৌশল অনুসরণ করা। ব্রিকসকে রাজনৈতিক অবস্থান নয়, অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতার একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে উপস্থাপন করা। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোনো জোটকেন্দ্রিক নয়; এটি স্বার্থকেন্দ্রিক।
আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই বিমসটেক, ডি-৮, ওআইসি, কমনওয়েলথ, জাতিসংঘ এবং অন্যান্য বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মে সক্রিয়। ব্রিকসের সঙ্গেও যদি কার্যকর সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তবে বাংলাদেশ কার্যত পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে একটি সেতুবন্ধনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে। বঙ্গোপসাগর, উত্তর-পূর্ব ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ভারত মহাসাগরকে ঘিরে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ভবিষ্যতের বাণিজ্য ও সংযোগ রাজনীতিতে আরও মূল্যবান হয়ে উঠবে।
তবে পূর্ণ সদস্যপদের আগে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জরুরি। ব্রিকসের সদস্য হলে বাংলাদেশের রপ্তানি কতটা বাড়বে? নতুন উন্নয়ন ব্যাংক থেকে অর্থায়নের সুযোগ কতটা সম্প্রসারিত হবে? প্রযুক্তি স্থানান্তর ও শিল্পায়নে কী বাস্তব সুবিধা মিলবে? ডলারনির্ভর লেনদেনের বিকল্প ব্যবস্থা বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে কী প্রভাব ফেলবে? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এতে পশ্চিমা বাজার, উন্নয়ন সহযোগিতা বা বিনিয়োগে কোনো নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে কি না?
এই প্রশ্নগুলোর সুস্পষ্ট অর্থনৈতিক মূল্যায়ন ছাড়া শুধুমাত্র রাজনৈতিক আবেগের ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া বিচক্ষণতার পরিচয় হবে না।
বাংলাদেশের ইতিহাস বলে, আমাদের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সম্পদ হলো ভারসাম্য রক্ষার সক্ষমতা। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন বৈশ্বিক মেরুকরণের মধ্যেও বাংলাদেশ সাধারণত সেই ভারসাম্য বজায় রেখেছে। আজকের বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে সেই নীতির গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
নয়াদিল্লির ব্রিকস আউটরিচ সম্মেলনে অংশগ্রহণ বাংলাদেশের জন্য অবশ্যই একটি ইতিবাচক সুযোগ। সেখানে উপস্থিত থেকে বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি সম্প্রসারণ, জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক সংযোগের বিষয়গুলোকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা সম্ভব। কিন্তু অংশগ্রহণ এবং পূর্ণ সদস্যপদ এই দুই বিষয়কে এক করে দেখা উচিত হবে না।
রাষ্ট্র পরিচালনায় আবেগ নয়, বাস্তবতাই শেষ কথা। ব্রিকসে যোগ দেওয়া বাংলাদেশের লক্ষ্য হতে পারে না; লক্ষ্য হওয়া উচিত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন রক্ষা এবং বহুমুখী আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বকে আরও শক্তিশালী করা।
বিশ্ব রাজনীতি দ্রুত বদলাচ্ছে। এই পরিবর্তনের যুগে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পথ একটিই কোনো শক্তিকেন্দ্রের ছায়ায় আশ্রয় নেওয়া নয়, বরং সব প্রধান শক্তির সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তুলে নিজের কূটনৈতিক স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে আরও সুদৃঢ় করা। ব্রিকস সেই দীর্ঘ যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হতে পারে, কিন্তু কখনোই একমাত্র গন্তব্য নয়।
লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি