আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে শুরু হলো সারাহ জাবিনের চৌকাঠ প্রদর্শনী

হেরাল্ড প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬, ০৬:০৯ পিএম
আপডেট: ০২ আগস্ট ২০২৬, ১১:০০ এএম
Main News Image

ঢাকাভিত্তিক বহুমাধ্যম শিল্পী সারা জাবীন-এর দ্বিতীয় একক শিল্পপ্রদর্শনী চৌকাঠ শুক্রবার, আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকার লা গ্যালারিতে উদ্বোধন করা হয়। এই প্রদর্শনীতে উপস্থাপিত শিল্পকর্মগুলোতে নারী, গৃহস্থালি পরিসর, স্মৃতি, পরিচয় এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বাঙালি পরিবারগুলোর মধ্যে প্রবাহিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পারস্পরিক সম্পর্ককে অনুসন্ধান করা হয়েছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট শিল্পী ও লেখক মুস্তফা জামান এবং বাংলাদেশে ফ্রান্স দূতাবাসের কালচারাল অ্যাটাশে বাতিস্ত ল্যব্রে।

গবেষণানির্ভর শিল্পচর্চার মাধ্যমে সারা জাবীন নারীদের আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের নীরব ধারক ও সংরক্ষক হিসেবে দেখেছেন। তাঁর কাজের কেন্দ্রে রয়েছে স্মৃতি, গৃহস্থালি পরিসর, পরিচয় এবং বস্তুসংস্কৃতির পারস্পরিক সম্পর্ক। চৌকাঠ প্রদর্শনীতে বিভিন্ন মাধ্যমের শিল্পকর্মের মধ্য দিয়ে বাঙালি পরিবারের প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা জীবনযাপন, ঐতিহ্য ও ইতিহাসের সেইসব গল্প উঠে এসেছে, যেগুলো অনেক সময় নীরবে আমাদের চারপাশে থেকে যায়।

প্রদর্শনীতে চারটি স্বতন্ত্র শিল্পধারার কাজ রয়েছে, যেখানে প্রতিটি পর্বে ভিন্ন উপকরণ ও শিল্পভাষার মাধ্যমে বিষয়গুলোকে তুলে ধরা হয়েছে। বন ভয়েড সিরিজে লিনোকাট প্রিন্টের মাধ্যমে শৈশব থেকে প্রাপ্তবয়স্কতা পর্যন্ত নারীর পরিবর্তনশীল পরিচয়কে অনুসন্ধান করেছেন শিল্পী। বিয়োগ সময় (The Diminished Time) সিরিজে সাবানকে ভাস্কর্যের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করে ১৯৫০ থেকে ১৯৯০-এর দশক পর্যন্ত পুরান ঢাকার বাড়িঘরের স্থাপত্য ও গৃহস্থালি পরিসরের স্মৃতিকে পুনরায় দেখার চেষ্টা করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়া পরিচিত ঘর ও পরিসরের প্রতি এক ধরনের স্মৃতিমেদুরতা ফুটে উঠেছে।

টেক্সটাইলনির্ভর শার্শি সিরিজে শিল্পী ঘরের অভ্যন্তরীণ পরিসর এবং সেখানে নারীর দীর্ঘস্থায়ী অথচ প্রায়শই অদৃশ্য উপস্থিতিকে তুলে ধরেছেন। প্রদর্শনীর আরেকটি অংশে সূক্ষ্ম তামার তারের রেখাচিত্রের মাধ্যমে আচার-অনুষ্ঠান, ঐতিহ্য এবং সময়ের সঙ্গে ক্রমশ ম্লান হয়ে যাওয়া এক সাংস্কৃতিক ভূদৃশ্যের নানা খণ্ডচিত্র ফুটে উঠেছে।

নিজেকে একটি পরিবর্তনশীল সমাজের পর্যবেক্ষক ও সাক্ষী হিসেবে দেখেন সারা জাবীন। তাঁর শিল্পকর্মে বস্তু, পরিসর ও স্মৃতি একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রজন্মের মধ্যে তৈরি করে এক অন্তর্গত সংযোগ। বয়োজ্যেষ্ঠ দর্শকদের কাছে এসব কাজ পরিচিত ঘর, আচার ও জীবনযাপনের স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে পারে। অন্যদিকে, তরুণ দর্শকদের জন্য এগুলো হয়ে উঠতে পারে তাঁদের মা, দাদী ও নানীদের যাপিত জীবনের সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হওয়ার একটি জানালা।

প্রদর্শনীর শিরোনাম চৌকাঠ এখানে শুধু একটি দরজার সীমারেখা নয়; বরং এটি হয়ে ওঠে স্মৃতি ও ইতিহাস, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সামষ্টিক উত্তরাধিকারের মধ্যবর্তী এক প্রতীকী পরিসর। এই ‘চৌকাঠ’-এর মধ্য দিয়ে দর্শককে শিল্পী ভাবতে আহ্বান জানান—কীভাবে কিছু স্মৃতি ও ঐতিহ্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে টিকে থাকে, আবার সময়ের প্রবাহে কিছু গল্প ও পরিসর ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।

নারীত্ব, গৃহজীবন, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের প্রতি গভীর মনোযোগের মধ্য দিয়ে চৌকাঠ বাঙালি জীবনের পরিবর্তনশীল বাস্তবতাকে দেখার এক সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে। একই সঙ্গে, প্রদর্শনীটি আমাদের ঘর, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সেইসব গল্পের দিকে ফিরে তাকানোর সুযোগ তৈরি করে, যা ব্যক্তিগত হলেও শেষ পর্যন্ত আমাদের সম্মিলিত ইতিহাসেরই অংশ।

প্রদর্শনীটি ৩১ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।