যে নামে লুকিয়ে আছে দুই অচেনা মানুষের ভালোবাসা

সহিদুল আলম স্বপন, জেনেভা, সুইজারল্যান্ড
প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৯:৪৩ পিএম
আপডেট: ০৩ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৪৮ এএম
Main News Image

সব মানুষ ইতিহাসের পাতায় নাম লেখাতে পারে না। কেউ আলোয় দাঁড়ায়, কেউ আলো জ্বালিয়ে দেয়। কেউ করতালি পায়, আবার কেউ নীরবে এমন একটি জীবন গড়ে দেয়, যার গল্প একদিন কোটি মানুষের মুখে মুখে ফেরে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিস্ময়গুলোর একটি হলো অনেক বড় মানুষের জীবনের শুরুটা হয় খুব সাধারণ, খুব নীরব কিছু মানুষের হাত ধরে।

হয়তো বিশ্বকাপের ফাইনালের সেই রাতেও এমনটাই হবে। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ যখন স্পেনের লাল জার্সি পরা লামিন ইয়ামালকে দেখবে, তখন স্টেডিয়ামের কোনো এক কোণে হয়তো দুজন মানুষ চুপচাপ বসে থাকবেন। তাদের জন্য ক্যামেরা ঘুরবে না, ধারাভাষ্যকার তাদের নাম বলবেন না, কোনো সংবাদপত্র তাদের ছবি ছাপবে না।

তবু তারা হাসবেন। কারণ মাঠে যে ছেলেটি দৌড়াচ্ছে, তার নামের ভেতর আজও তারা বেঁচে আছেন।

২০০৭ সালের জুলাই মাস। স্পেনের মাতারোর রোকাফন্ডা। অভিবাসীদের ছোট্ট এক জনপদ। ভাঙাচোরা বাড়ি, সরু গলি, অনিশ্চিত আগামী আর প্রতিদিনের জীবনযুদ্ধ। এখানে মানুষ বড় স্বপ্ন দেখে না, বরং প্রতিদিনের জীবনটাকেই বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করে। সেই জনপদেরই একটি ছোট্ট ঘরে জন্ম নিল এক শিশু।

মা শিলা এবানার তখন মাত্র ষোল বছর বয়স। পৃথিবীর কাছে তিনি তখনও একজন কিশোরী। কিন্তু ভাগ্য তাকে এক মুহূর্তেই মা বানিয়ে দিল। বাবা মুনির নাসরাউইয়ের কাঁধেও তখন সংসারের ভার। প্রতিদিন বেরোতে হতো কাজের খোঁজে। কখনো কাজ মিলত, কখনো মিলত না। সন্ধ্যায় ঘরে ফেরার সময় তার চোখে থাকত একটাই প্রশ্ন আজ পরিবারের জন্য কী নিয়ে ফিরব?

অভাবের দিনগুলো বড় নিষ্ঠুর। সেই সময় মানুষ সবচেয়ে বেশি বুঝতে পারে, টাকা বড় নয়, মানুষের পাশে মানুষ দাঁড়ানোই সবচেয়ে বড় সম্পদ। ঠিক তখনই এগিয়ে এসেছিলেন দুজন বন্ধু। তাদের পরিচয় কেউ জানে না। তারা হয়তো ধনী ছিলেন না, ক্ষমতাবানও ছিলেন না। কিন্তু মানুষের দুঃসময়ে যে মানুষ হাত বাড়িয়ে দেয়, তার চেয়ে বড় পরিচয় আর কী হতে পারে? হয়তো তারা কিছু টাকা দিয়েছিলেন। হয়তো একবেলা খাবার।

হয়তো শুধু বলেছিলেন, “ভয় পেও না, আমরা আছি।” অনেক সময় একটি বাক্যও একটি পরিবারকে বাঁচিয়ে দেয়। সেই ঋণ কোনো দিন শোধ হয় না।

তাই সন্তানের নাম রাখতে গিয়ে শিলা আর মুনির কোনো বিখ্যাত মানুষের নাম খুঁজলেন না। তারা বেছে নিলেন সেই দুই বন্ধুর নাম। একজন ছিলেন লামিন। অন্যজন ইয়ামাল।

দুটি নাম এক হয়ে জন্ম নিল এক নতুন পরিচয়- লামিন ইয়ামাল। কেউ জানল না সেই দুই মানুষের গল্প। কিন্তু পৃথিবী আজ প্রতিদিন উচ্চারণ করছে তাদের নাম।

সময় নদীর মতো। সে কখনো একই জায়গায় থেমে থাকে না। রোকাফন্ডার ধুলোমাখা গলি ছেড়ে ছোট্ট লামিন একদিন পৌঁছে গেল বার্সেলোনার লা মাসিয়ায়। অন্য ছেলেদের মতো তার কাছেও একটি বল ছিল, একটি স্বপ্ন ছিল। কিন্তু একটি জিনিস ছিল একটু বেশি অভাবকে হারানোর জেদ।

যে শিশু ছোটবেলায় কষ্টের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে ফেলে, পৃথিবীর কোনো বড় মঞ্চই তাকে সহজে ভয় দেখাতে পারে না। দিনের পর দিন অনুশীলন। ব্যর্থতা। আবার উঠে দাঁড়ানো। আবার দৌড়।

এইভাবেই ধীরে ধীরে এক কিশোরের ভেতর জন্ম নিতে লাগল একজন শিল্পী। আজ তার পায়ের ছোঁয়ায় বল কথা বলে। স্টেডিয়াম গর্জে ওঠে। বিশ্বের বড় বড় ক্লাব তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে। কোটি কোটি ইউরোর চুক্তি হয়।

বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলো তার হাসির মূল্য দেয়। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে দামি জিনিসটি তিনি কখনো বিক্রি করেননি। সেটি হলো নিজের শেকড়।

গোল করার পর লামিন ইয়ামাল যখন দুই হাতে “৩০৪” দেখান, অনেকেই সেটিকে শুধু একটি উদযাপন মনে করেন। আসলে সেটি একটি চিঠি। নিজের শৈশবের উদ্দেশে লেখা একটি নীরব চিঠি। রোকাফন্ডার উদ্দেশে লেখা একটি ভালোবাসার চিঠি।

তিনি যেন বলতে চান,
“আমি চলে গেছি, কিন্তু তোমাদের ছেড়ে যাইনি।”
এই পৃথিবীতে মানুষ বড় হলে অনেক কিছু বদলে যায়।
বাড়ি বদলে যায়।
পোশাক বদলে যায়।
বন্ধু বদলে যায়।
কিন্তু যারা সত্যিই বড় হয়, তারা কখনো নিজের শুরুটা বদলায় না।

একদিন এক সাক্ষাৎকারে নিজের জীবনের কথা বলতে গিয়ে ইয়ামালের চোখ ভিজে উঠেছিল।তিনি বলেছিলেন, “আমার মা ১৬ বছর বয়সে আমাকে জন্ম দিয়েছিলেন। আমার বাবাকে পরিবারের খাবারের জন্য রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। এটাই আমার কাছে আসল চাপ। মাঠের ফুটবলের চাপ তার কাছে কিছুই না।”

এই কথাগুলো শুধু একজন ফুটবলারের স্মৃতি নয়। এ যেন পৃথিবীর প্রতিটি সংগ্রামী সন্তানের গল্প। যারা বাবার ঘাম দেখে বড় হয়েছে। মায়ের না-বলা কান্না দেখে মানুষ হয়েছে। তাদের কাছে সাফল্য কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়; সাফল্য হলো প্রতিটি অন্ধকার রাত পার হয়ে ভোর পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার নাম।

হয়তো বিশ্বকাপের সেই ফাইনালে আবারও গোল করবেন লামিন ইয়ামাল। পৃথিবী তার নাম ধরে চিৎকার করবে। ক্যামেরা তার মুখে থেমে থাকবে। ইতিহাস তার গল্প লিখবে।

কিন্তু ইতিহাসের পাতায় হয়তো লেখা থাকবে না সেই দুই অচেনা মানুষের নাম, যারা একদিন নিঃস্বার্থভাবে একটি দরিদ্র পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তবু তাতে কী আসে যায়? সব ফুলের নাম মানুষ জানে না, কিন্তু তার সুবাস ঠিকই বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। সব প্রদীপের গল্প কেউ লেখে না, কিন্তু তার আলোয় মানুষ পথ খুঁজে পায়। ঠিক তেমনই, পৃথিবীর কোথাও হয়তো আজও নীরবে বেঁচে আছেন সেই দুই মানুষ, লামিন আর ইয়ামাল। তারা হয়তো কোনোদিন বিখ্যাত হবেন না।

কিন্তু যতদিন ফুটবল থাকবে, যতদিন মানুষ ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতার গল্প শুনবে, ততদিন তাদের দুটি নাম এক তরুণের স্বপ্নের সঙ্গে, এক মায়ের চোখের জলের সঙ্গে, এক বাবার সংগ্রামের সঙ্গে, আর এক অসাধারণ জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে।

কারণ পৃথিবীতে কিছু নাম উচ্চারণ করা হয় খ্যাতির জন্য নয় মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসার অমর স্মৃতি হয়ে থাকার জন্য।