দক্ষিণ এশিয়ার নতুন ভূরাজনীতি: বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্রে উঠে আসার লড়াই
বিশ্ব রাজনীতি এখন আর কেবল ইউরোপ বা আটলান্টিকের অক্ষে আবর্তিত হচ্ছে না। ইন্দো-প্যাসিফিকের উত্তাল জলরাশি, দক্ষিণ চীন সাগরের ভূকৌশলগত টানাপোড়েন এবং বঙ্গোপসাগরের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত গুরুত্ব মিলিয়ে এশিয়া আজ বৈশ্বিক অর্থনীতি ও কূটনীতির নতুন মাধ্যাকর্ষণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এই বৃহত্তর রূপান্তরের মাঝে দক্ষিণ এশিয়া একটি বিচিত্র অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে সম্ভাবনায় সমৃদ্ধ, অথচ কাঠামোগত দুর্বলতায় জর্জরিত; জনশক্তিতে বিশাল, অথচ প্রাতিষ্ঠানিক সংহতিতে ক্ষীণ। প্রশ্ন হলো, এই অঞ্চল কি কেবল বৈশ্বিক রাজনীতির দর্শক হয়ে থাকবে, নাকি নিজেই একটি সক্রিয় কৌশলগত অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হবে?
দক্ষিণ এশিয়ার মোট জনসংখ্যা প্রায় দুই বিলিয়নের কাছাকাছি। ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ এবং আফগানিস্তান মিলিয়ে এই অঞ্চলটি পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ ভূখণ্ডগুলোর একটি। এর মধ্যে রয়েছে বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতি ভারত, যার জিডিপি ইতোমধ্যে তিন ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে এবং যে দেশটি ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হওয়ার পথে দৃঢ়পদে এগিয়ে চলেছে। রয়েছে বাংলাদেশ, যার গার্মেন্টস শিল্প বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক এবং যার তরুণ জনগোষ্ঠী আগামী দশকে এশিয়ার শ্রমবাজারে নির্ণায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। তবু এই বিশাল সম্ভাবনার অঞ্চলটি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তার প্রাপ্য ওজন বহন করতে পারছে না। কারণটি কেবল অর্থনৈতিক নয়, এটি মূলত কাঠামোগত ও রাজনৈতিক।
সার্ক কার্যত অচল। ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব এই আঞ্চলিক সংস্থাটিকে দশকের পর দশক ধরে একটি নিষ্প্রাণ ঘোষণাপত্রে পরিণত করে রেখেছে। বিমসটেক কিছুটা প্রাণবন্ত হওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু তার রাজনৈতিক শক্তি এখনো পূর্ণ রূপ নেয়নি। এই প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতার মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশ যেন নিজের মতো করে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক গড়ে তুলছে কখনো আমেরিকার দিকে হেলে, কখনো চীনের দিকে ঝুঁকে, কখনো ভারতের সঙ্গে সমতা রক্ষার চেষ্টা করে। এই বিচ্ছিন্ন কূটনীতির ফলে অঞ্চলটি যৌথভাবে কোনো বৈশ্বিক আলোচনায় নিজের শর্ত নির্ধারণ করতে পারছে না।
বাংলাদেশের আসিয়ানমুখী কূটনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে না দেখলে তার গভীরতা বোঝা যাবে না। বাংলাদেশ যখন আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হওয়ার পথ খুঁজছে, তখন সে কেবল একটি বাণিজ্যিক সুবিধা চাইছে না। সে চাইছে দক্ষিণ এশিয়ার ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে একটি বৃহত্তর কৌশলগত পরিচয় নির্মাণ করতে। বঙ্গোপসাগর এই পরিচয়ের কেন্দ্রে। চট্টগ্রাম, মাতারবাড়ী, পায়রা ও মোংলা বন্দর কেবল বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পদ নয়, এগুলো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সম্ভাব্য সংযোগের ভৌত ভিত্তি। ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের যুগে, যেখানে সামুদ্রিক বাণিজ্য পথ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং নৌ সংযোগ ভূরাজনীতির নতুন মুদ্রা, সেখানে বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী একটি দেশের কৌশলগত মূল্য অস্বীকার করা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা প্রয়োজন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বহু বছর ধরে ভূরাজনৈতিক সম্ভাবনার ভাষায় কথা বলেছে, কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতায় রূপান্তরিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। ভারত ও চীনের মধ্যকার কৌশলগত প্রতিযোগিতা দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশগুলোকে একটি অস্বস্তিকর অবস্থানে ফেলে দিয়েছে। শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দর নিয়ে যা ঘটেছে, নেপালের বিপিএম করিডোর নিয়ে যে টানাপোড়েন চলছে, বাংলাদেশের সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে যে কূটনৈতিক জটিলতা তৈরি হয়েছিল এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে এই অঞ্চলের দেশগুলো বৈশ্বিক শক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক দাবার বোর্ডে ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
এই ঝুঁকি থেকে বের হওয়ার পথ একটাই: কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন। এর অর্থ এই নয় যে চীন বা আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা। এর অর্থ হলো, প্রতিটি বৈশ্বিক অংশীদারিত্বকে জাতীয় উন্নয়নের শর্তে মূল্যায়ন করা, এবং কোনো একটি শক্তির কৌশলগত কক্ষপথে স্থায়ীভাবে আটকে না পড়া। ভারত এই ক্ষেত্রে তার আকারের কারণে কিছুটা বেশি স্বাধীনতা ভোগ করে। কিন্তু বাংলাদেশ, নেপাল বা শ্রীলঙ্কার মতো মাঝারি ও ছোট দেশগুলোর জন্য এই স্বায়ত্তশাসন অর্জন করতে হলে প্রয়োজন বহুমাত্রিক অংশীদারিত্ব, শক্তিশালী আঞ্চলিক সংহতি এবং অভ্যন্তরীণ প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা।
বিশ্ব অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, দক্ষিণ এশিয়া এখন একটি ঐতিহাসিক সুযোগের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে। চীনের উৎপাদন খরচ বাড়ছে। বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন পুনর্বিন্যস্ত হচ্ছে। পশ্চিমা কোম্পানিগুলো চীননির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র খুঁজছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ, ভারত এবং ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো বৈশ্বিক উৎপাদন মানচিত্রে নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে। কিন্তু এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে কেবল সস্তা শ্রম যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন প্রযুক্তিগত দক্ষতা, ডিজিটাল অবকাঠামো, বিনিয়োগবান্ধব আইনি কাঠামো এবং শুল্ক ও বাণিজ্য সুবিধার প্রাতিষ্ঠানিক নিশ্চয়তা।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জ দুটোই একসঙ্গে উপস্থিত। ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হওয়ার পর বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি প্লাস সুবিধা হারাবে। এই রূপান্তর সামলাতে হলে বাংলাদেশকে তার রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে, নতুন বাজার খুঁজতে হবে এবং কূটনৈতিকভাবে নতুন বাণিজ্য চুক্তির দিকে অগ্রসর হতে হবে। আসিয়ানের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক এই কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। কারণ আসিয়ানের মোট জিডিপি তিন ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি এবং এই অঞ্চলটি বৈশ্বিক বাণিজ্যের একটি গতিশীল কেন্দ্র।
কিন্তু কূটনীতি কেবল অর্থনীতির হিসাব-নিকাশ দিয়ে চলে না। রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা, আইনের শাসন, নীতির ধারাবাহিকতা এবং গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা এগুলো দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারিত্বের ভিত্তি। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এই ক্ষেত্রে বারবার হোঁচট খেয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, ঘন ঘন সরকার পরিবর্তন, দুর্নীতি এবং নীতির অনিশ্চয়তা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট করেছে এবং কূটনৈতিক সম্পর্ককে ভঙ্গুর করে তুলেছে। একটি দেশ যত বড় বাজারই হোক না কেন, যদি তার অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা অনির্ভরযোগ্য হয়, তাহলে বৈশ্বিক অংশীদাররা সেই দেশকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে নয়, ঝুঁকি হিসেবে দেখে।
তাই দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ কূটনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্তটি বাইরে নয়, ভেতরে। অভ্যন্তরীণ সংস্কার, প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিবর্ধন এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা ছাড়া বৈশ্বিক মঞ্চে দর-কষাকষির ক্ষমতা তৈরি হয় না। বাংলাদেশ যদি সত্যিই আসিয়ানের দরজায় কড়া নাড়তে চায়, যদি সে বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত কেন্দ্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, যদি সে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সেতুর ভূমিকা পালন করতে চায় তাহলে সেই সেতুর ভিত্তি হতে হবে একটি কার্যকর রাষ্ট্র, একটি স্বচ্ছ অর্থনীতি এবং একটি বিশ্বাসযোগ্য গণতন্ত্র।
বিশ্ব রাজনীতির নতুন যুগে দুর্বলরা কেবল ভূগোলের কারণে গুরুত্ব পায় না। গুরুত্ব পায় তারা, যারা নিজেদের অপরিহার্য করে তুলতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার সামনে সেই সুযোগ এখনো খোলা আছে। প্রশ্ন হলো, এই অঞ্চল কি সেই সুযোগকে ইতিহাসের পাতায় লেখা একটি হারানো মুহূর্ত হিসেবে রেখে যাবে, নাকি তাকে একটি কৌশলগত অর্জনে পরিণত করবে?
(লেখক: সহিদুল আলম স্বপন, সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি। ইমেইল: shahidul.alam@bluewin.ch)