রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বনাম ‘বিশ্বকবি’
যাঁরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একনিষ্ঠ অনুরাগী, তাঁদের কাছে এই লেখার বক্তব্য অস্বস্তিকর মনে হতে পারে। তাঁরা চাইলে লেখাটি এড়িয়ে যেতে পারেন। তবে সাহিত্যিক মূল্যায়নে ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কোনো কবি বা লেখক যত বড়ই হোন, তাঁকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখা সাহিত্যচর্চার জন্য স্বাস্থ্যকর নয়।
রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র কিংবা তলস্তয়ের সাহিত্য একই সামাজিক বাস্তবতা বা সৃজনশীল শক্তির প্রকাশ নয়। প্রত্যেক লেখকের রচনা তাঁর সময়, শ্রেণি, পরিবেশ ও অভিজ্ঞতার ছাপ বহন করে। রবীন্দ্রনাথের রচনায় জমিদারি সমাজের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যে গ্রামীণ জীবন ও প্রকৃতি, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখায় অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও শ্রেণিসংকট এবং শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসে সামাজিক অনুশাসন ও নৈতিক দ্বন্দ্ব বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
সমকালীন সাহিত্যেও নিজস্ব বাস্তবতার অভাব নেই। প্রকৃতি ও জলবায়ুর সংকট, ডিজিটাল সভ্যতা, অভিবাসন, যুদ্ধ, শরণার্থীজীবন, মধ্যরাতের চা, বাড়িভাড়া, ফ্ল্যাটের সরু বারান্দা, অপ্রত্যাশিত অতিথি, ছিনতাই, পরকীয়া, আত্মীয়তার চাপ, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, লোকবিশ্বাস, পীর ফকির, তাবিজ কবচ এবং গ্রামীণ হাস্যরস, সবই আজকের কবিতা ও কথাসাহিত্যে উপস্থিত।
তারপরও তলস্তয় কিংবা হোমারের মতো লেখকেরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যে বিপুল আন্তর্জাতিক পাঠকসমাজ গড়ে তুলেছেন, সমকালীন বাংলা সাহিত্যের অধিকাংশ লেখক তা পারেননি। এর দায় কেবল লেখকদের নয়। বর্তমানের অনেক তরুণ পাঠক দীর্ঘ রচনা পড়তে অনাগ্রহী। অর্থনৈতিক চাপ, হতাশা, মনোযোগের বিচ্ছিন্নতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব, মানসম্পন্ন অনুবাদের অভাব এবং কখনো কখনো লেখকের দুর্বল নির্মাণ, সবকিছুই এর পেছনে ভূমিকা রাখে।
আমার আজকের প্রশ্ন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে। তিনি নোবেলজয়ী কবি এবং বাঙালির কাছে বহুল পরিচিত ‘বিশ্বকবি’ অভিধায়। কিন্তু ‘বিশ্বকবি’ বলতে আমরা ঠিক কী বুঝি? পৃথিবীর বহু দেশ ভ্রমণ করাই কি বিশ্বকবি হওয়ার শর্ত? তা হলে রবীন্দ্রনাথের চেয়ে বেশি দেশ ভ্রমণকারী অনেক লেখক, কবি ও সাধারণ মানুষকেও সেই অভিধায় ভূষিত করতে হয়। ভ্রমণের পরিধি নিশ্চয়ই কোনো কবির সাহিত্যিক বিশ্বজনীনতার একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না।
রবীন্দ্রনাথ ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেছেন। বক্তৃতা দিয়েছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ মনীষীদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। কিন্তু ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার সাধারণ পাঠকসমাজে তিনি কি গ্যেটে, তলস্তয়, কাফকা, টি এস এলিয়ট, র্যাবো কিংবা বোদলেয়ারের মতো নিয়মিত পাঠ্য? আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা অন্তত সে কথা বলে না।
যুক্তরাষ্ট্রে অনেককে আমি জিজ্ঞাসা করেছি, রবীন্দ্রনাথ কেমন কবি ছিলেন। তাঁদের অনেকেই বলেছেন, “আমরা জানি না, কারণ তাঁকে চিনি না এবং পড়িনি।” অবশ্য সীমিত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে কোনো কবির বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতার চূড়ান্ত বিচার করা যায় না। তারপরও এ অভিজ্ঞতা একটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন তোলে। ‘বিশ্বকবি’ অভিধাটি কি বিশ্বব্যাপী সাহিত্যিক স্বীকৃতির প্রতিফলন, নাকি মূলত বাঙালির আবেগ ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের অংশ?
আমি জানি, এই প্রশ্নের ব্যাখ্যা অনেকের কাছেই আলাদা কিংবা অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। তাতে আমার আপত্তি নেই। বরং ভিন্নমতকে আমি স্বাধীন বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার অংশ হিসেবেই দেখি। কোনো মহান ব্যক্তিকে নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানেই তাঁকে অসম্মান করা নয়। তাঁর জীবন, সাহিত্য ও রাজনৈতিক অবস্থানকে নতুনভাবে বিচার করাও গবেষণা ও সমালোচনার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে সাম্প্রদায়িকতা, জমিদারি শোষণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা, শান্তিনিকেতনে মুসলমান শিক্ষার্থীদের প্রবেশাধিকার এবং ইসলাম সম্পর্কে তাঁর কথিত মন্তব্য নিয়ে বহু অভিযোগ প্রচলিত রয়েছে। কিন্তু এসব অভিযোগের সব কটির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রাথমিক দলিল পাওয়া যায় না।
বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতায় রবীন্দ্রনাথের সম্পৃক্ততার পক্ষে শক্ত ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন। ১৯১২ সালের ২৮ মার্চ কলকাতার গড়ের মাঠে অনুষ্ঠিত কথিত প্রতিবাদ সভায় তাঁর সভাপতিত্ব করার যে দাবি প্রচলিত রয়েছে, তার সমর্থনে নির্ভরযোগ্য সমকালীন নথি পাওয়া যায়নি। পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি লিট ডিগ্রিও দিয়েছিল। ফলে তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতাকারী হিসেবে উপস্থাপন করার আগে অকাট্য ঐতিহাসিক প্রমাণ প্রয়োজন।
শান্তিনিকেতনে মুসলমানদের প্রবেশাধিকার ছিল না, এমন দাবিও প্রশ্নাতীত নয়। সৈয়দ মুজতবা আলী বিশ্বভারতীর প্রথম দিকের মুসলমান শিক্ষার্থীদের অন্যতম ছিলেন। সেখানে ইসলামি সংস্কৃতি ও ফারসি ভাষা অধ্যয়নের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। ফলে এসব বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচলিত বক্তব্য উদ্ধৃত করার আগে মূল দলিল, সময়কাল ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট পরীক্ষা করা জরুরি।
রবীন্দ্রনাথের কোনো নাটক বা প্রবন্ধের একটি বিচ্ছিন্ন বাক্য দিয়ে তাঁর সমগ্র রাজনৈতিক ও মানবিক দর্শনের বিচার করাও যথেষ্ট নয়। উদ্ধৃতিটি কোন চরিত্রের মুখে, কী পরিস্থিতিতে এবং লেখক তার মাধ্যমে কোন দ্বন্দ্ব তুলে ধরেছেন, সেসব বিবেচনা করা প্রয়োজন। নাটকের কোনো চরিত্রের বক্তব্য সব সময় নাট্যকারের ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশ করে না।
একইভাবে ‘কণ্ঠরোধ’ প্রবন্ধে মুসলমানদের নিয়ে ব্যবহৃত কোনো বাক্যের বিচার করতে হলে পুরো প্রবন্ধ, তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনার প্রেক্ষাপট বিবেচনা করতে হবে। একটি বাক্য উদ্ধৃত করে কোনো লেখকের সারাজীবনের চিন্তা ও দর্শন নির্ধারণ করা গবেষণাসম্মত পদ্ধতি নয়।
ইসলাম ও মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের নামে প্রচলিত কিছু মন্তব্যের নির্ভরযোগ্য উৎস নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ‘বিতণ্ডা’ নামের একটি কথিত সূত্রের উল্লেখ করা হলেও বইটির লেখক, প্রকাশক, প্রকাশকাল ও নির্ভরযোগ্য সংস্করণের তথ্য স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা হয় না। প্রামাণ্য উৎস ছাড়া এমন সংবেদনশীল বক্তব্য কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তির নামে চালিয়ে দেওয়া উচিত নয়।
তবে রবীন্দ্রনাথকে তাঁর সামাজিক ও শ্রেণিগত অবস্থানের বাইরে রেখে মূল্যায়ন করাও ঠিক হবে না। তিনি একটি প্রভাবশালী জমিদার পরিবারের সন্তান ছিলেন এবং জমিদারি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। সেই ব্যবস্থায় কৃষক ও প্রজাদের ওপর যে অর্থনৈতিক চাপ ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা সম্পূর্ণ বৈধ।
জমিদার হিসেবে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা হতে পারে এবং হওয়া উচিত। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে বছরে দুবার খাজনা আদায় কিংবা কালীপূজার নামে আলাদা অর্থ আদায়ের অভিযোগ তুলতে হলে নির্ভরযোগ্য জমিদারি নথি, খাজনার হিসাব, সমকালীন সাক্ষ্য ও গবেষণার আশ্রয় নেওয়া প্রয়োজন। প্রমাণ ছাড়া কোনো অভিযোগের পুনরাবৃত্তি সমালোচনাকে শক্তিশালী করে না, বরং দুর্বল করে।
রবীন্দ্রনাথ ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। প্রচলিত একটি ধারণা হলো, তিনি বাংলা ‘গীতাঞ্জলি’র জন্য নয়, কেবল তার ইংরেজি অনুবাদের জন্য পুরস্কার পেয়েছিলেন। বিষয়টি আরও সূক্ষ্ম।
ইংরেজি ‘গীতাঞ্জলি, সং অফারিংস’ নোবেল পুরস্কারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। তবে ইংরেজি সংকলনটি বাংলা ‘গীতাঞ্জলি’র হুবহু অনুবাদ ছিল না। বাংলা ‘গীতাঞ্জলি’ ছাড়াও রবীন্দ্রনাথের অন্য কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ থেকে নির্বাচিত কবিতা এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। তিনি নিজেই কবিতাগুলো ইংরেজিতে রূপান্তর করেছিলেন। নোবেল কমিটি তাঁর ইংরেজিতে প্রকাশিত কবিতার সংবেদনশীলতা, সৌন্দর্য ও সাহিত্যগুণের স্বীকৃতি দিয়েছিল। কাজেই তিনি শুধু একটি অনুবাদের জন্য নোবেল পেয়েছিলেন, এমন সরলীকৃত বক্তব্য পুরো সত্য প্রকাশ করে না।
রবীন্দ্রনাথ নিঃসন্দেহে অসাধারণ কবি, গীতিকার, সুরকার, কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক ও চিত্রশিল্পী ছিলেন। তাঁর সৃষ্টির ব্যাপ্তি বাংলা সংস্কৃতিতে প্রায় তুলনাহীন। তাঁর লেখা ‘আমার সোনার বাংলা’ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত এবং ‘জন গণ মন’ ভারতের জাতীয় সংগীত হিসেবে গৃহীত হয়েছে। শ্রীলঙ্কার জাতীয় সংগীতের ওপরও রবীন্দ্রসংগীতের প্রভাব নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
তাঁকে একজন সার্বজনীন শিল্পী ও বহুমাত্রিক প্রতিভা বলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কিন্তু ‘বিশ্বকবি’ অভিধাটি যদি বৈশ্বিক পাঠকপ্রিয়তা ও সমসাময়িক আন্তর্জাতিক উপস্থিতির দাবি করে, তবে সেই দাবিকে নতুনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
বাংলা ভাষায় বিশ্বমানের কবি ও সাহিত্যিকের অভাব নেই। শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, হুমায়ুন আজাদ, হুমায়ূন আহমেদ, হেলাল হাফিজ, নির্মলেন্দু গুণ এবং হাসান হাফিজুর রহমানের সাহিত্যিক গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। লালন শাহ, শাহ আবদুল করিম ও জীবনানন্দ দাশকে নিয়েও বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক আগ্রহ দেখা যায়। কিন্তু তাঁদের রচনার নির্ভরযোগ্য অনুবাদ, সম্পাদিত সংকলন, গবেষণামূলক দলিল ও আন্তর্জাতিক বিপণন পর্যাপ্ত নয়।
অন্যদিকে জাপানের হারুকি মুরাকামি, দক্ষিণ কোরিয়ার হান কাং, ফিলিস্তিনের মাহমুদ দারবিশ, ভিয়েতনামের নগুয়েন দু, ইরানের ফোরুগ ফাররোখজাদ এবং পশতু কবি খুশহাল খান খট্টক আন্তর্জাতিক সাহিত্যাঙ্গনে দৃশ্যমান। তাঁদের ভাষা, ইতিহাস ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা বিশ্বের পাঠকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য অনুবাদ, প্রকাশনা এবং গবেষণার শক্তিশালী অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে সেই কাজটি এখনো প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক প্রাসঙ্গিকতা নেই, এমন কথাও পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য নয়। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতা, দুর্ভিক্ষ, সামরিক শাসন, নদীভাঙন, অভিবাসন, তৈরি পোশাকশিল্প, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বিপুল জনগোষ্ঠীর টিকে থাকার সংগ্রাম, সবই আন্তর্জাতিকভাবে প্রাসঙ্গিক বিষয়।
সমস্যা প্রাসঙ্গিকতার অনুপস্থিতি নয়। সমস্যা হলো, আমাদের সাহিত্য ও ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাকে বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতার ঘাটতি। মানসম্পন্ন অনুবাদ, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা, সাহিত্যভিত্তিক গবেষণা এবং শক্তিশালী সাংস্কৃতিক কূটনীতি ছাড়া কোনো দেশের সাহিত্য সহজে বিশ্বপরিসরে জায়গা করে নিতে পারে না।
উন্নত অনুবাদ, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা, গবেষণা, সাহিত্য উৎসব এবং প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ থাকলে বিশ্ববাসী লালন, শাহ আবদুল করিম, জীবনানন্দ দাশ, সৈয়দ শামসুল হক, হুমায়ুন আজাদ ও হুমায়ূন আহমেদকে আরও ব্যাপকভাবে চিনতে পারত। টাইমস, দ্য গার্ডিয়ান কিংবা অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে তাঁদের নিয়ে নিয়মিত আলোচনা হতে পারত।
রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিত করার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছেন। এ সত্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু তাঁর সাফল্যের প্রকৃত পরিসর নিয়ে প্রশ্ন তোলাও অপরাধ নয়। রুমি আজ বিশ্বের বহু ভাষায় যেভাবে পঠিত হন, রবীন্দ্রনাথ সেই মাত্রায় সাধারণ আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে পৌঁছাতে পারেননি। এটিও আলোচনার যোগ্য বাস্তবতা।
‘বিশ্বকবি’ কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কিংবা আন্তর্জাতিকভাবে প্রদত্ত উপাধি নয়। এটি মূলত বাংলা ভাষাভাষী মানুষের দেওয়া সম্মানসূচক অভিধা। এই অভিধার মধ্যে বাঙালির আবেগ, শ্রদ্ধা ও সাংস্কৃতিক গৌরব রয়েছে। কিন্তু আবেগের সঙ্গে বাস্তবতার পার্থক্য করাও প্রয়োজন।
রবীন্দ্রনাথকে ছোট করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। বরং তাঁকে আবেগের বেদি থেকে গবেষণা, যুক্তি ও সমালোচনার আলোয় ফিরিয়ে আনাই উদ্দেশ্য। একজন মহান কবিকে সম্মান করার অর্থ তাঁকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখা নয়। তাঁর সাহিত্য, দর্শন, শ্রেণিগত অবস্থান, সীমাবদ্ধতা ও ঐতিহাসিক ভূমিকা নিয়ে নির্ভয়ে আলোচনা করাই প্রকৃত সাহিত্যচর্চা।
‘বিশ্বকবি’ অভিধাটি বাঙালির শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার প্রতীক হতে পারে। কিন্তু এটিকে প্রশ্নাতীত আন্তর্জাতিক সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে আরও বিস্তৃত বৈশ্বিক পাঠকগ্রহণ, অনুবাদ ও গবেষণার প্রয়োজন। একজন মহান কবির মর্যাদা রক্ষার জন্য পৌরাণিক দাবি দরকার হয় না। তাঁর সাহিত্যই তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়।