অ্যারিস্টটলের দর্শন কেন আজও প্রাসঙ্গিক এবং কেন চিরকাল প্রাসঙ্গিক থাকবে
সামগ্রিকভাবে অ্যারিস্টটলের সমাজ ও রাজনৈতিক দর্শনের মূল কথা হলো "মধ্যপন্থা" বা গোল্ডেন মিন। তিনি যেকোনো বিষয়ের চরমপন্থী রূপকে বর্জন করতে বলেছেন। রাষ্ট্রে চরম ধনী বা চরম দরিদ্র যেমন বিপজ্জনক, তেমনি শাসন ব্যবস্থায় চরম একনায়কতন্ত্র বা চরম হুজুগে গণতন্ত্রও ক্ষতিকর। ব্যালেন্স বা ভারসাম্যই একটি সমাজকে টিকিয়ে রাখে।
মধ্যপন্থা মানে মাঝামাঝি নয়
অ্যারিস্টটলের দর্শনের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যে ধারণাটি যুক্ত, তা হলো সুবর্ণ মধ্যপন্থা। তবে এর অর্থ দুই চরম অবস্থার ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা নয়। অ্যারিস্টটলের কাছে নৈতিক গুণ হলো পরিস্থিতি, ব্যক্তি, উদ্দেশ্য ও বাস্তবতার বিচারে যথাযথ মাত্রা খুঁজে পাওয়ার ক্ষমতা।
অতিরিক্ত সাহস যেমন বেপরোয়া দুঃসাহসে পরিণত হতে পারে, তেমনি সাহসের অভাব কাপুরুষতায় পরিণত হয়। যথার্থ সাহস হলো ভয়কে অস্বীকার করা নয়, বরং ন্যায়সঙ্গত কারণে ভয়কে অতিক্রম করে যথাযথভাবে কাজ করা। তাই মধ্যপন্থা কোনো দুর্বল আপস নয়। এটি হলো বিচারবুদ্ধির মাধ্যমে সঠিক মাত্রা নির্ধারণের শিল্প।
আজকের পৃথিবীতে এই শিক্ষা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমাদের সময়ের অন্যতম বড় সংকট হলো চরমতা। চরম রাজনৈতিক বিভাজন, চরম জাতীয়তাবাদ, চরম বাজারনির্ভরতা, চরম রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, চরম ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, চরম ভোগবাদ, চরম আদর্শিক উগ্রতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চরম প্রতিক্রিয়া আমাদের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক বিচারবোধকে ক্রমাগত দুর্বল করছে।
অ্যারিস্টটল আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন, কোনো ভালো নীতিও যখন সীমাহীনভাবে প্রয়োগ করা হয়, তখন সেটিই অন্য রূপের বিপদ সৃষ্টি করতে পারে। তাই প্রজ্ঞা হলো শুধু কোনটি ভালো তা জানা নয়। কখন, কতটুকু এবং কীভাবে ভালো জিনিসটি প্রয়োগ করতে হবে, সেটিও জানা।
মানুষের প্রকৃতি বদলায়নি
অ্যারিস্টটল মানুষের চরিত্রকে রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের কেন্দ্রস্থলে স্থাপন করেছিলেন। তিনি মানুষকে এমন এক সত্তা হিসেবে দেখেছিলেন যে স্বভাবতই সমাজ ও রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে বসবাস করে। তাঁর বিখ্যাত ধারণা হলো মানুষ স্বভাবতই সামাজিক ও রাজনৈতিক জীব।
আজকের পৃথিবীতে এই সত্য আরও স্পষ্ট। মানুষ একা অর্থনীতি তৈরি করতে পারে না। একা আইন তৈরি করতে পারে না। একা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। একা অবকাঠামো নির্মাণ করতে পারে না। একা একটি আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারে না। মানুষের জীবন পরিবার, প্রতিষ্ঠান, বাজার, রাষ্ট্র, আইন, সংস্কৃতি এবং সামাজিক আস্থার একটি জটিল ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
তাই একটি রাষ্ট্র শুধু রাস্তা, সেতু, ব্যাংক, আদালত, সংসদ বা সরকারি ভবনের সমষ্টি নয়। রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে তার মানুষের চরিত্র, প্রতিষ্ঠানের মান, আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের বিশ্বাসে।
প্রযুক্তি সভ্যতার বাহ্যিক কাঠামো বদলাতে পারে। কিন্তু মানুষের মধ্যে ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা, নিরাপত্তার প্রয়োজন, মর্যাদার আকাঙ্ক্ষা, স্বার্থের সংঘাত এবং ন্যায়বিচারের অনুসন্ধান থেকে যায়। এই কারণেই অ্যারিস্টটলের মানবদর্শন সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয়ে যায়নি।
ভালো রাষ্ট্র মানেই শুধু ভালো আইন নয়
অ্যারিস্টটলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, একটি ভালো রাজনৈতিক ব্যবস্থা কেবল তার সংবিধান বা আইনের কাঠামো দিয়ে বিচার করা যায় না। দেখতে হবে সেই ব্যবস্থা মানুষের মধ্যে কেমন চরিত্র তৈরি করছে এবং নাগরিকদের কী ধরনের জীবনযাপনের সুযোগ দিচ্ছে।
এই জায়গাটিই তাঁর রাজনৈতিক দর্শনকে আজও অসাধারণভাবে প্রাসঙ্গিক করে তোলে। আধুনিক রাষ্ট্র প্রায়ই তার সাফল্য মাপে অর্থনৈতিক উৎপাদন, প্রবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয়, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ কিংবা মাথাপিছু আয় দিয়ে। এসব অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এগুলোই রাষ্ট্রের সাফল্যের সম্পূর্ণ মাপকাঠি নয়।
প্রশ্ন হলো, এই উন্নয়নের মধ্য দিয়ে মানুষ কেমন মানুষ হয়ে উঠছে?
যদি অর্থনীতি বড় হয় কিন্তু ন্যায়বিচার দুর্বল হয়, তাহলে সমাজ কতটা সফল? যদি প্রযুক্তি উন্নত হয় কিন্তু মানুষের চরিত্র দুর্বল হয়, তাহলে সভ্যতা কতটা নিরাপদ? যদি সম্পদ বৃদ্ধি পায় কিন্তু সামাজিক আস্থা ধ্বংস হয়, তাহলে সেই উন্নয়ন কতটা টেকসই? যদি রাষ্ট্র শক্তিশালী হয় কিন্তু নাগরিকের স্বাধীনতা ও মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সেই শক্তির প্রকৃত মূল্য কী?
অ্যারিস্টটল আমাদের মনে করিয়ে দেন, রাষ্ট্রের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য কেবল টিকে থাকা নয়। রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য এমন একটি সামাজিক পরিবেশ সৃষ্টি করা যেখানে মানুষ একটি ভালো ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপন করতে পারে।
অতিধনী ও অতিদরিদ্র সমাজের বিপদ
অ্যারিস্টটল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে মধ্যবিত্ত শ্রেণির গুরুত্বকে বিশেষভাবে বিবেচনা করেছিলেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ ছিল, যখন সমাজে অত্যন্ত ধনী ও অত্যন্ত দরিদ্রের মধ্যে বিভাজন অতিরিক্ত বেড়ে যায়, তখন রাজনৈতিক সংঘাত ও অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
আজকের বৈশ্বিক বাস্তবতায় এই চিন্তা নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ। সম্পদের কেন্দ্রীভবন কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়। এটি রাজনৈতিক ক্ষমতা, সামাজিক সুযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গণমাধ্যম, নীতি প্রভাব এবং প্রজন্মগত বৈষম্যের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
অন্যদিকে ব্যাপক দারিদ্র্য মানুষের মধ্যে হতাশা, বঞ্চনা, নিরাপত্তাহীনতা ও রাজনৈতিক ক্ষোভ সৃষ্টি করতে পারে। যখন একটি সমাজের বড় অংশ মনে করে যে রাষ্ট্রের সুযোগ ও সম্পদ কেবল একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর জন্য, তখন রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা দুর্বল হতে শুরু করে।
অ্যারিস্টটলের শিক্ষা তাই ধনীকে দরিদ্র করে দেওয়া বা দরিদ্রকে কোনো সরল পদ্ধতিতে ধনী করে দেওয়ার কথা নয়। তাঁর গভীর উদ্বেগ ছিল সামাজিক ভারসাম্য নিয়ে। এমন একটি সমাজ প্রয়োজন যেখানে একটি শক্তিশালী মধ্যস্তর সমাজকে সংযুক্ত রাখে এবং নাগরিকরা নিজেদের রাষ্ট্রের অংশ বলে অনুভব করে।
গণতন্ত্রের ক্ষেত্রেও ভারসাম্য প্রয়োজন
অ্যারিস্টটলের রাজনৈতিক শ্রেণিবিন্যাসকে আধুনিক গণতন্ত্রের সঙ্গে সরাসরি এক করে দেখা ঠিক নয়। তাঁর যুগের রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং আধুনিক প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। তবু তাঁর একটি মৌলিক প্রশ্ন আজও অমর।
ক্ষমতা কার হাতে এবং সেই ক্ষমতা কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে?
কোনো একজন ব্যক্তি যদি সীমাহীন ক্ষমতা পায়, তাহলে স্বৈরতন্ত্রের ঝুঁকি তৈরি হয়। কোনো ক্ষুদ্র গোষ্ঠী যদি রাষ্ট্রকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে, তাহলে ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের সমস্যা তৈরি হয়। আবার সংখ্যাগরিষ্ঠতার ক্ষমতা যদি ন্যায়, আইন, সংখ্যালঘুর অধিকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক সীমারেখাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে, তাহলে গণতন্ত্রও নিজের ভিত দুর্বল করতে পারে।
এখানেই অ্যারিস্টটলের রাজনৈতিক চিন্তার গভীরতা। শুধু ক্ষমতার উৎস গুরুত্বপূর্ণ নয়। ক্ষমতার ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু নির্বাচন থাকলেই ভালো শাসন নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজন আইনের শাসন, জবাবদিহিতা, নৈতিক নেতৃত্ব, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, দায়িত্বশীল নাগরিকত্ব এবং ক্ষমতার পারস্পরিক নিয়ন্ত্রণ।
গণতন্ত্রের স্থায়িত্ব তাই শুধু ভোটের ওপর নির্ভর করে না। এটি নির্ভর করে প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং নাগরিক চরিত্রের ওপরও।
স্বাধীনতা এবং শৃঙ্খলা
আধুনিক মানুষ স্বাধীনতাকে অত্যন্ত মূল্যবান মনে করে। সেটি যথার্থ। কিন্তু স্বাধীনতা যদি দায়িত্ব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়, তাহলে তা স্বেচ্ছাচারে পরিণত হতে পারে। আবার শৃঙ্খলা যদি স্বাধীনতাকে সম্পূর্ণ গ্রাস করে, তাহলে তা দমনমূলক রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে।
অ্যারিস্টটলের দর্শন আমাদের শেখায়, সভ্যতার কাজ হলো এই দুইয়ের মধ্যে একটি ন্যায়সংগত সামঞ্জস্য তৈরি করা। স্বাধীনতা ছাড়া মানুষ পূর্ণ মানুষ হতে পারে না। কিন্তু দায়িত্ব ছাড়া স্বাধীনতাও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।
একটি পরিণত সমাজ তাই শুধু নাগরিককে অধিকার দেয় না। নাগরিককে দায়িত্বশীল হওয়ার শিক্ষাও দেয়। একইভাবে রাষ্ট্র শুধু আইন প্রয়োগ করে না। রাষ্ট্রকে এমন প্রতিষ্ঠানও তৈরি করতে হয় যেখানে আইন ন্যায়সংগত, পূর্বানুমানযোগ্য এবং সবার জন্য সমভাবে প্রযোজ্য।
স্বাধীনতা ও শৃঙ্খলার এই সম্পর্ক কোনো নির্দিষ্ট যুগের সমস্যা নয়। এটি মানবসভ্যতার স্থায়ী প্রশ্ন।
আবেগের যুগে অ্যারিস্টটল
আজ মানুষ তথ্যের যুগে বাস করে, কিন্তু একই সঙ্গে এটি আবেগেরও যুগ। একটি দৃশ্য কয়েক মিনিটে কোটি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। একটি গুজব একটি প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট করতে পারে। একটি উত্তেজক বক্তব্য বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে। একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রকাশনা রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে।
এই পৃথিবীতে অ্যারিস্টটলের ব্যবহারিক প্রজ্ঞা অসাধারণভাবে প্রাসঙ্গিক।
জ্ঞান থাকা এক বিষয়। কিন্তু সঠিক সময়ে সঠিক জ্ঞান সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। সব সত্য সব সময় একইভাবে বলা যায় না। সব সিদ্ধান্ত একই সূত্রে নেওয়া যায় না। সব সমস্যার একই সমাধানও নেই।
সিদ্ধান্তের গুণ নির্ভর করে পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতা, সম্ভাব্য পরিণতি অনুমান করার ক্ষমতা এবং নৈতিক বিচারের ওপর। এই বাস্তববুদ্ধিই মানুষকে কেবল জ্ঞানী নয়, বিচক্ষণ করে তোলে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে সুবর্ণ মধ্যপন্থা
আজকের পৃথিবীতে মানুষ প্রায় প্রতিটি বিষয়ে দুটি চরম শিবিরে বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে। হয় সম্পূর্ণ সমর্থন, নয় সম্পূর্ণ বিরোধিতা। হয় নায়ক, নয় খলনায়ক। হয় বন্ধু, নয় শত্রু। হয় আমার সত্য, নয় তোমার মিথ্যা।
অ্যারিস্টটলের দর্শন এই মানসিকতাকে চ্যালেঞ্জ করে।
বাস্তব জীবন এত সরল নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে ভালো এবং ভুল করতে পারে। একটি নীতি এক পরিস্থিতিতে কার্যকর এবং অন্য পরিস্থিতিতে ক্ষতিকর হতে পারে। একটি প্রতিষ্ঠান একই সঙ্গে সফল এবং ত্রুটিপূর্ণ হতে পারে। একটি সরকার একই সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে দক্ষ এবং অন্য ক্ষেত্রে ব্যর্থ হতে পারে।
একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সম্পদ সৃষ্টি করতে পারে এবং একই সঙ্গে বৈষম্যও বাড়াতে পারে। একটি প্রযুক্তি মানুষের জীবন সহজ করতে পারে এবং একই সঙ্গে নতুন ধরনের ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
পরিণত চিন্তার কাজ হলো বাস্তবতাকে সাদা ও কালোর মধ্যে বন্দী না করা। সত্যকে নিজের পছন্দের রঙে রাঙিয়ে নেওয়া নয়, বরং সত্যের জটিলতাকে বোঝার চেষ্টা করা।
অ্যারিস্টটল এবং নেতৃত্ব
অ্যারিস্টটলের দর্শনের সবচেয়ে ব্যবহারিক শিক্ষা সম্ভবত নেতৃত্বের ক্ষেত্রে। নেতৃত্ব শুধু ক্ষমতা নয়। নেতৃত্ব হলো চরিত্রের পরীক্ষা।
একজন নেতা কতটা কথা বলেন তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। তিনি ক্ষমতা পেলে কী করেন সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি প্রশংসা পেলে যেমন থাকেন, সমালোচনা পেলে তেমন থাকেন কি না। তিনি নিজের স্বার্থ ও প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের মধ্যে পার্থক্য করতে পারেন কি না। তিনি ভুল স্বীকার করতে পারেন কি না। তিনি বিরোধী মত শুনতে পারেন কি না।
তিনি জনপ্রিয় সিদ্ধান্তের পরিবর্তে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারেন কি না। তিনি ক্ষমতার সীমা বুঝতে পারেন কি না। তিনি নিজের চারপাশে শুধু প্রশংসাকারী মানুষ রাখেন, নাকি সত্য কথা বলার মানুষও রাখেন। এসব প্রশ্নের উত্তর একজন নেতার প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে। ক্ষমতা মানুষকে বড় করে না। ক্ষমতা মানুষটি আসলে কেমন, সেটিকে আরও দৃশ্যমান করে।
ব্যক্তিগত জীবনেও অ্যারিস্টটল
অ্যারিস্টটল কেবল রাষ্ট্রের জন্য প্রাসঙ্গিক নন। তিনি ব্যক্তিজীবনের জন্যও গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। অতিরিক্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষা মানুষকে গ্রাস করতে পারে। অতিরিক্ত ভোগ মানুষকে শূন্য করতে পারে। অতিরিক্ত ভয় মানুষকে থামিয়ে দিতে পারে। অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস মানুষকে অন্ধ করতে পারে। অতিরিক্ত সন্দেহ মানুষকে সম্পর্কহীন করতে পারে।
অতিরিক্ত কাজ মানুষকে ক্লান্ত করে দিতে পারে। অতিরিক্ত আরাম মানুষকে দুর্বল করে দিতে পারে। অতিরিক্ত অর্থের আকাঙ্ক্ষা জীবনকে অর্থহীন করে দিতে পারে। তাই ভালো জীবন মানে সবকিছু বেশি পাওয়া নয়। ভালো জীবন মানে প্রয়োজন, আকাঙ্ক্ষা, দায়িত্ব, সম্পর্ক, কাজ, বিশ্রাম এবং নৈতিকতার মধ্যে একটি সুস্থ সামঞ্জস্য তৈরি করা।
অ্যারিস্টটলের কাছে সুখ কেবল আনন্দের মুহূর্ত নয়। মানুষের উৎকর্ষের জীবন হলো এমন জীবন যেখানে মানুষ তার যুক্তি, চরিত্র ও সক্ষমতাকে যথার্থভাবে বিকশিত করে। এই ধারণা আজকের ভোগবাদী পৃথিবীতে বিশেষভাবে শক্তিশালী একটি প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। আমরা কি শুধু সুখী হতে চাই, নাকি সত্যিই ভালোভাবে বাঁচতে চাই?
কেন অ্যারিস্টটল ভবিষ্যতেও প্রাসঙ্গিক থাকবেন
প্রযুক্তি মানুষের বাহ্যিক জীবনকে যতই পরিবর্তন করুক, মানুষের কিছু মৌলিক প্রশ্ন থেকে যাবে। আমি কীভাবে ভালো মানুষ হব? ন্যায় কী? কীভাবে ভালোভাবে বাঁচব? কীভাবে ক্ষমতা ব্যবহার করা উচিত? কীভাবে সমাজকে স্থিতিশীল রাখা যায়? কীভাবে স্বাধীনতা ও দায়িত্বের ভারসাম্য তৈরি করা যায়? কীভাবে সম্পদ ও ন্যায়ের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করা যায়? কীভাবে ব্যক্তিগত সুখ ও সামষ্টিক কল্যাণকে একসঙ্গে দেখা যায়? যতদিন মানুষ থাকবে, এই প্রশ্নগুলো থাকবে। আর যতদিন এই প্রশ্নগুলো থাকবে, অ্যারিস্টটল প্রাসঙ্গিক থাকবেন।
কারণ তাঁর দর্শন কোনো নির্দিষ্ট প্রযুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে নেই। কোনো নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে নেই। কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। এটি দাঁড়িয়ে আছে মানুষের চরিত্র, নৈতিকতা, যুক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্রের মৌলিক সমস্যার ওপর।
মুলত: অ্যারিস্টটলের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো এই নয় যে আমাদের সব সময় মাঝামাঝি অবস্থান নিতে হবে। বরং তাঁর গভীর শিক্ষা হলো, সঠিক জীবন হলো অন্ধ চরমতার জীবন নয়। সাহস চাই, কিন্তু বেপরোয়া সাহস নয়। স্বাধীনতা চাই, কিন্তু দায়িত্বহীন স্বাধীনতা নয়। শৃঙ্খলা চাই, কিন্তু দমন নয়। সম্পদ চাই, কিন্তু সীমাহীন লোভ নয়। ক্ষমতা চাই, কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহার নয়। গণতন্ত্র চাই, কিন্তু প্রতিষ্ঠান ধ্বংসকারী সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ নয়। রাষ্ট্র চাই, কিন্তু সর্বগ্রাসী রাষ্ট্র নয়। ব্যক্তিস্বাধীনতা চাই, কিন্তু সমাজের প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীনতা নয়। উন্নয়ন চাই, কিন্তু মানুষকে বিসর্জন দিয়ে নয়। অ্যারিস্টটল আমাদের শেখান, সভ্যতার সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো চরমতার মধ্যে সঠিক সীমা খুঁজে বের করা। আর সেই সীমা কোনো যান্ত্রিক হিসাব নয়। তার জন্য প্রয়োজন জ্ঞান, চরিত্র, ন্যায়বোধ, সংযম, বাস্তববুদ্ধি এবং নিজের ভুল দেখার সাহস।
এই কারণেই আড়াই হাজার বছর পরেও অ্যারিস্টটল পুরোনো হয়ে যাননি। বরং পৃথিবী যত বেশি ক্ষমতাবান, দ্রুতগামী, বিভক্ত এবং চরমপন্থী হচ্ছে, তাঁর একটি শিক্ষা তত বেশি মূল্যবান হয়ে উঠছে। সভ্যতার শক্তি শুধু কত দূর যেতে পারে তাতে নয়। সভ্যতার প্রজ্ঞা প্রকাশ পায় সে কোথায় থামতে জানে তাতে। আর মানুষের উৎকর্ষ শুধু সে কত কিছু অর্জন করেছে তার মধ্যে নয়। সে কতটা ভারসাম্য, ন্যায়, প্রজ্ঞা ও চরিত্রের সঙ্গে সেই অর্জনকে ব্যবহার করতে শিখেছে, তার মধ্যেই একটি সভ্যতার প্রকৃত মহত্ত্ব। এই কারণেই অ্যারিস্টটল অতীতের একজন দার্শনিক নন। তিনি মানুষের অসমাপ্ত প্রশ্নগুলোর একজন চিরন্তন সহযাত্রী।
অ্যারিস্টটলের দর্শনের সামনে দাঁড়ালে সবচেয়ে গভীর যে উপলব্ধিটি আসে, তা হলো মানুষ যতই উন্নত প্রযুক্তি, বিপুল সম্পদ ও অসীম ক্ষমতা অর্জন করুক, তার প্রকৃত উৎকর্ষ নির্ভর করে সে নিজেকে কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তার ওপর।
আমরা প্রায়ই জীবনে আরও বেশি কিছু চাই। আরও ক্ষমতা, আরও অর্থ, আরও সাফল্য, আরও স্বাধীনতা, আরও স্বীকৃতি। কিন্তু অ্যারিস্টটল আমাদের অন্য একটি প্রশ্ন করতে শেখান। যা কিছু অর্জন করছি, তা কি আমাকে সত্যিই একজন ভালো মানুষ করে তুলছে?
এই প্রশ্নটি ব্যক্তিজীবন থেকে রাষ্ট্রজীবন পর্যন্ত সর্বত্র প্রযোজ্য। ব্যক্তি যখন সীমা হারায়, উচ্চাকাঙ্ক্ষা লোভে পরিণত হয়। নেতা যখন সীমা হারান, ক্ষমতা আধিপত্যে পরিণত হয়। রাষ্ট্র যখন সীমা হারায়, শাসন দমনে পরিণত হয়। সমাজ যখন সীমা হারায়, স্বাধীনতা বিশৃঙ্খলায় পরিণত হতে পারে।
তাই ভারসাম্য দুর্বলতার নাম নয়। অনেক সময় ভারসাম্যই সবচেয়ে কঠিন শক্তি। ক্রোধ করা সহজ, সংযত থাকা কঠিন। প্রতিশোধ নেওয়া সহজ, ন্যায়বিচার করা কঠিন। নিজের মত চাপিয়ে দেওয়া সহজ, অন্যের কথা শোনা কঠিন। ক্ষমতা পাওয়া সহজ হতে পারে, কিন্তু ক্ষমতার সীমা জানা অনেক কঠিন।
অ্যারিস্টটল যেন আমাদের নীরবে একটি আয়না ধরেন। সেই আয়নায় শুধু সমাজ বা রাষ্ট্রকে নয়, নিজেদেরও দেখতে হয়।
আমি কি যা করতে পারি, তাই করছি, নাকি যা করা উচিত, তা করছি?
সম্ভবত এখানেই অ্যারিস্টটলের দর্শনের চিরন্তন শক্তি। তিনি আমাদের বেশি কিছু হওয়ার আগে ভালো কিছু হওয়ার কথা মনে করিয়ে দেন।
কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষের মহত্ত্ব তার কতটা ক্ষমতা ছিল তাতে নয়, বরং সেই ক্ষমতার সামনে দাঁড়িয়ে সে কতটা সংযম, ন্যায়, প্রজ্ঞা ও মানবিকতা ধরে রাখতে পেরেছিল তাতেই।
(লেখক একজন বিশিষ্ট ব্যাংকার)