রক্তিম ঘাস, অশ্রুভেজা বুট ও পুড়তে থাকা সাদা ফুল
ইতিহাসে কিছু কিছু মুহূর্ত আছে, যেগুলো যেন অদ্ভুতভাবে সময়ের দুই প্রান্তকে এক সুতোয় বেঁধে দেয়। একদিকে থাকে যুদ্ধের অন্ধকার, অন্যদিকে মানুষের হৃদয়ে লুকিয়ে থাকা শান্তির আকাঙ্ক্ষা। ফুটবল কখনো কখনো সেই দুই প্রান্তের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়ে। একটি বল, কিছু তরুণ খেলোয়াড়, আর কোটি মানুষের দৃষ্টি। এমনই এক বিস্ময়কর মুহূর্ত জন্ম নিয়েছিল ১৯৯৮ সালের গ্রীষ্মে, যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র মুখোমুখি হয়েছিল ১৯৯৮ ফিফা বিশ্বকাপের মঞ্চে।
সেই ম্যাচটি ছিল কেবল একটি ফুটবল খেলা নয়; সেটি ছিল ইতিহাসের বহু বছরের উত্তেজনা, ক্ষোভ ও সন্দেহের প্রতীকী সাক্ষাৎ। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ভেঙে পড়ে। তেহরানের মার্কিন দূতাবাসে জিম্মি সংকট, দীর্ঘ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক অবিশ্বাস সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক যেন জমাট বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে ছিল। বহু বছর ধরে কূটনীতির পথ বন্ধ ছিল, যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন। তাই যখন বিশ্বকাপের ড্রয়ে দুই দল একই গ্রুপে পড়ে, তখন পৃথিবীর চোখ এক মুহূর্তে সেই ম্যাচের দিকে ঘুরে যায়। যেন ফুটবল মাঠে ইতিহাসের দুই দীর্ঘ ছায়া এসে দাঁড়িয়েছে।
ফ্রান্সের লিওঁ শহরের সেই সন্ধ্যায় স্টেডিয়ামের বাতাসে অদ্ভুত এক উত্তেজনা ছিল। শুধু গ্যালারির দর্শক নয়, পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ টেলিভিশনের পর্দার সামনে অপেক্ষা করছিল। ম্যাচের আগে নানা কূটনৈতিক আলোচনাও হয়েছিল। এমনকি করমর্দনের প্রোটোকল নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। কারণ ইরানের ভেতরের রাজনৈতিক বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি করমর্দন অনেকের চোখে স্পর্শকাতর বিষয় ছিল। অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, এই ম্যাচ হয়তো ফুটবলের সৌন্দর্যকে ছাপিয়ে যাবে রাজনৈতিক উত্তেজনায়।
কিন্তু ঠিক তখনই ফুটবল যেন নিজস্ব ভাষায় একটি উত্তর দিয়েছিল। ম্যাচ শুরুর আগে ইরানের খেলোয়াড়রা এগিয়ে এলেন হাতে সাদা ফুল নিয়ে। তারা সেই ফুল তুলে দিলেন মার্কিন খেলোয়াড়দের হাতে। তারপর দুই দল পাশাপাশি দাঁড়িয়ে একটি ছবি তুলল। সেই ছবিতে ছিল না রাজনৈতিক ভাষণ, ছিল না কূটনৈতিক চুক্তি, ছিল কেবল এক মুহূর্তের মানবিকতা। পৃথিবীর কোটি মানুষ সেই দৃশ্য দেখে যেন এক অদ্ভুত স্বস্তি অনুভব করেছিল। যেন মনে হচ্ছিল, মানুষ চাইলে যুদ্ধের ভাষা ছাড়াও কথা বলতে পারে।
এরপর শুরু হয় ম্যাচ। মাঠে তখন আর কূটনীতি নয়, কেবল ফুটবল। গ্যালারির গর্জন, উত্তেজনার ঢেউ, খেলোয়াড়দের চোখে আগুন, সব মিলিয়ে ম্যাচটি পরিণত হয়েছিল এক ঐতিহাসিক লড়াইয়ে। সেই ৯০ মিনিটের লড়াইয়ে ইরান ২-১ গোলে জয়ী হলেও দিনশেষে জয় হয়েছিল ফুটবলের ঐন্দ্রজালিক শক্তির, যা রাজনীতিকদের দীর্ঘ ২০ বছরের অচলায়তনকে এক তুড়িতে উড়িয়ে দিয়েছিল।
কিন্তু হায়, সময়ের নিষ্ঠুর পরিহাসে সেই তুষারশুভ্র গোলাপের সুবাস আজ ইতিহাসের ভাগাড়ে নিক্ষিপ্ত। আজ ২০২৬ সালের দ্বারে দাঁড়িয়ে পৃথিবী দেখছে এক বীভৎস অগ্নিকুণ্ড। যে লস অ্যাঞ্জেলেস বা নিউইয়র্কের আকাশে বিশ্বকাপের রঙিন আবির ঝরার কথা ছিল, আজ সেখানে উড়ছে ঘাতক ড্রোনের কর্কশ ছায়া। সাম্রাজ্যবাদের সেই লেলিহান শিখা আজ কেবল সীমান্তে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা আছড়ে পড়েছে ইরানের পবিত্র জনপদে।
মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক জোটের অশুভ আঁতাতে আজ তেহরানের আকাশ মেঘলা নয়, বরং বারুদে আচ্ছন্ন। আজ কেবল ভূ-রাজনীতির দাবা খেলা নয়, বরং এক জাতির অস্তিত্বের মূলে কুঠারাঘাত করা হয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ওপর প্রাণঘাতী হামলার হীন চক্রান্ত আর পারমাণবিক দোহাই দিয়ে চাপিয়ে দেওয়া এই অন্যায্য যুদ্ধ আজ এক স্বাধীন দেশের সার্বভৌমত্বকে বুটের তলায় পিষ্ট করতে চাইছে।
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি রচিত হচ্ছে সেই ছোট ছোট প্রাণগুলোকে নিয়ে, যাদের চোখে ছিল আগামীর রঙিন স্বপ্ন। আজ মার্কিন মিসাইল আর ইসরায়েলি গোলার আঘাতে গুঁড়িয়ে গেছে শিশুদের পাঠশালাও। যে কলম দিয়ে শিশুদের ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন লেখার কথা ছিল, সেই কলম আজ ধ্বংসস্তূপের নিচে রক্তে ভেজা। হাজার হাজার তাজা প্রাণ, যাদের শৈশব কাটার কথা ছিল খেলার মাঠে, তারা আজ নিথর দেহ হয়ে শুয়ে আছে কবরের নিস্তব্ধতায়। স্কুলের বারান্দায় যেখানে খিলখিল হাসির সুর থাকার কথা, সেখানে আজ কেবল বোমার আঘাতে ঝামা হয়ে যাওয়া ইটের স্তূপ আর পড়ে থাকা রক্তাক্ত স্কুলব্যাগ।
এই কি সেই সভ্যতা? এই কি সেই পৃথিবী যার জন্য সাদা গোলাপের বিনিময় হয়েছিল?
এই অস্থির সময়ের মধ্যেই আবার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে ফুটবলের সবচেয়ে বড় উৎসব। ফিফা বিশ্বকাপ। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই আসরে প্রথমবারের মতো অংশ নেবে ৪৮টি দল। আয়োজকদের অন্যতম আবার সেই দেশ, যার সঙ্গে ইরানের দীর্ঘ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব - যুক্তরাষ্ট্র।
প্রশ্ন উঠেছে, যুদ্ধের উত্তেজনার মাঝখানে ফুটবল কি আবারও সেই পুরোনো সেতু হয়ে উঠতে পারবে?
কিন্তু বিশ্বকাপের বাঁশি শোনা যাচ্ছে এক বিষাদময় রাগিণীর মতো। ইরানের ক্রীড়ামন্ত্রী আহমদ দোনজামালি এরমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছেন, যে দেশ তাদের সর্বোচ্চ নেতাকে মেরেছে, সেই দেশে গিয়ে বিশ্বকাপ খেলা নয়। তার কণ্ঠ আজ আর কোনো প্রশাসনিক ঘোষণা নয়, বরং তা এক লড়াকু জাতির হৃদয়ের রক্তক্ষরণ। তিনি যখন মার্কিন মাটিতে পা রাখতে অস্বীকৃতি জানান, তখন সেই বাক্যের প্রতিটি অক্ষরে মিশে থাকে হাজারো শহীদের আর্তনাদ।
যে রাষ্ট্র ইরানের শিশুদের শৈশবকে শ্মশানে পরিণত করেছে, যারা ক্ষুধার্ত মানুষের পেটে লাথি মেরে অর্থনৈতিক অবরোধের শেকল পরিয়েছে, তাদের উৎসবে যোগ দেওয়াকে তেহরান আজ কেবল বর্জন নয়, বরং ‘শহীদদের রক্তের সাথে বেইমানি’ বলে মনে করছে। দোনজামালির এই প্রত্যাখ্যান আসলে সেই মায়েদের কান্নার প্রতিধ্বনি, যারা আজ শূন্য কোল নিয়ে আকাশের দিকে বিচার চেয়ে চেয়ে ক্লান্ত।
ফুটবলকে বলা হয় ‘দ্য বিউটিফুল গেম’, কিন্তু আজ সেই সৌন্দর্যের গায়ে মেখে দেওয়া হয়েছে সাম্রাজ্যবাদের বিষাক্ত কালি। ১৯৯৮ সালের সেই শুভ্র সুবাস ২০২৬-এ এসে এক বীভৎস আগ্নেয়গিরির উত্তাপে ভস্মীভূত। আজ মাঠের সবুজ ঘাস হয়তো আগের মতোই মসৃণ থাকবে, কিন্তু সেই ঘাসের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে থাকবে বিচারহীন যুদ্ধের এক করুণ আর্তি।
মার্কিন ড্রোন যখন তেহরানের শান্ত পাড়ায় মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে ঘোরে, তখন ফুটবলের ‘ফেয়ার প্লে’র বুলি স্রেফ এক নিষ্ঠুর রসিকতা ছাড়া আর কিছুই নয়। ইতিহাসের চাকা ঘুরেছে ঠিকই, কিন্তু শান্তির সেই গন্তব্য আজ এক মরীচিকা। আজ আর কোনো সাদা গোলাপ নেই; আজ আছে কেবল ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া এক পঙ্গু মানবিকতা আর এক তেজস্বী জাতির হার না মানা প্রতিরোধের মহাকাব্য।