ভারতে রেকর্ড ছুঁয়েছে পরিবেশবান্ধব গাড়ির বিক্রি
পশ্চিম এশিয়ার চলমান ভূ-রাজনৈতিক সংকট, ইউরোপে অতিরিক্ত উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের সরবরাহে অনিশ্চয়তার কারণে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ভারতের জ্বালানি খাতে। ফলে গত কয়েক মাসে ভারতে পেট্রল ও ডিজেলের বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক (ইভি), সিএনজি এবং হাইব্রিড গাড়ির বিক্রি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতের গাড়ি ডিলারদের সংগঠন 'ফাডা' (FADA) প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এই চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ফাডা-র তথ্য অনুযায়ী, ভারতের অটোমোবাইল বাজারে গত মাসে একটি বড় মাইলফলক অর্জিত হয়েছে। এই প্রথমবারের মতো দেশটির দুই চাকার গাড়ির বাজারে বৈদ্যুতিক যানের অংশীদারিত্ব দুই অঙ্কের ঘর অর্থাৎ ১০ শতাংশের সীমা অতিক্রম করেছে। জুলাই মাসে বিক্রি হওয়া মোট দুই চাকার গাড়ির ১০.৬০ শতাংশই ছিল বৈদ্যুতিক। অন্যদিকে, যাত্রীবাহী গাড়ির বাজারে ইভি, সিএনজি ও হাইব্রিড মডেলের গাড়ি বিক্রির হার দাঁড়িয়েছে ৪০.৩৫ শতাংশে। অর্থাৎ, বর্তমানে বিক্রি হওয়া প্রতি ১০০টি যাত্রীবাহী গাড়ির মধ্যে ৪০টিরও বেশি গাড়ি পরিবেশবান্ধব বিকল্প জ্বালানির। এর বিপরীতে পেট্রলচালিত গাড়ির বাজার অংশীদারিত্ব কমেছে প্রায় ২ শতাংশ। সার্বিকভাবে, গত বছরের জুনের তুলনায় এ বছর মোট গাড়ি বিক্রি প্রায় ২২ শতাংশ বেড়ে ২৫,৫৭,২৩৪ টিতে পৌঁছেছে, যা দেশটির ইতিহাসে একটি নতুন রেকর্ড।
এই পরিবর্তনের পেছনে মূল কারণ হিসেবে কাজ করছে জ্বালানি আমদানির ওপর ভারতের অতিরিক্ত নির্ভরতা। ভারত তার প্রয়োজনীয় জীবাশ্ম জ্বালানির ৮০ শতাংশেরও বেশি বিদেশ থেকে আমদানি করে। ফলে ইসরায়েল, ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার সংঘাতের মতো কোনো আন্তর্জাতিক অস্থিরতা তৈরি হলে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা ও সরবরাহ ব্যবস্থা ঝুঁকিতে পড়ে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি এবং ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির অবমূল্যায়ন দেশের রাষ্ট্রীয় কোষাগার ও সার্বিক অর্থনীতির ওপর বিপুল চাপ সৃষ্টি করে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বৈদ্যুতিক ও সিএনজি চালিত গাড়ির ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে। একই সাথে ক্রেতাদের মধ্যেও হাইব্রিড গাড়ির (যা একই সাথে বিদ্যুৎ ও পেট্রলে চলে) জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে।
পাশাপাশি, দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজারে পেট্রল ও ডিজেলের ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষকে বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকতে বাধ্য করছে। ভারতের কয়েকটি রাজ্যের নির্বাচন শেষ হওয়ার পর গত মে মাস থেকে কয়েক দফায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল। যদিও বর্তমানে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কিছুটা কমেছে, কিন্তু স্থানীয় বাজারে তেলের দাম না কমায় ক্রেতারা পরিবেশবান্ধব গাড়ির দিকেই বেশি আকৃষ্ট হচ্ছেন।
তবে আগামী দিনগুলোতে এই প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখার ক্ষেত্রে গাড়ি বিক্রেতাদের প্রধান ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে মৌসুমী বায়ু বা বর্ষার আচরণ। গত মাসে ভারতের কিছু অঞ্চলে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় গ্রামীণ বাজারে গাড়ি বিক্রি সামান্য কমেছে। ব্যবসায়ীদের আশা, আগামী দিনগুলোতে বর্ষার ঘাটতি পূরণ হলে গ্রামীণ অর্থনীতি আবার চাঙ্গা হবে, যার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে সামগ্রিক গাড়ি বাজারে।