তাদের টিকে থাকা আমাদের হাতে
“তাদের টিকে থাকা আমাদের হাতে”—এটি কেবল কোনো স্লোগান নয়, বরং সভ্যতার জন্য একটি চূড়ান্ত নৈতিক পরীক্ষা। ২০১০ সালের ‘সেন্ট পিটার্সবার্গ টাইগার সামিট’-এ গৃহিত সিদ্ধান্তের আলোকেই প্রতি বছর ২৯ জুলাই আন্তর্জাতিক ব্যাঘ্র দিবস পালিত হয়। বছরের পর বছর ধরে অনিয়ন্ত্রিত শিকার, বনভূমি ধ্বংস এবং মানব-বন্যপ্রাণী দ্বন্দ্বের কারণে বিশ্বজুড়ে বাঘের অস্তিত্ব আজ মারাত্মক হুমকির মুখে।
বাঘ সংরক্ষণ কেবল একটি সুন্দর প্রাণীকে টিকিয়ে রাখার লড়াই নয়; এটি পুরো বাস্তুতন্ত্রকে বাঁচানোর সংগ্রাম। বাঘ বনের ওপর নির্ভরশীল, আর বন টিকিয়ে রাখতে বাঘের ভূমিকা অপরিহার্য। এই শীর্ষ শিকারী বিলুপ্ত হলে তা প্রকৃতির ওপর এক ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে। তাই স্থানীয় সংরক্ষণ উদ্যোগ এবং বৈশ্বিক কাঠামোগত নীতিমালার জরুরি সংস্কার এখন সময়ের দাবি।
এক শতকের ক্ষয় এবং একটি ভঙ্গুর প্রত্যাবর্তন
বিড়াল প্রজাতির সর্ববৃহৎ ও আকর্ষণীয় বিপন্ন প্রাণী বাঘ প্রায় ২০ লাখ বছর ধরে টিকে আছে। জাভায় পাওয়া এদের ১৬-১৮ লাখ বছরের প্রাচীন জীবাশ্ম সত্ত্বেও, এশিয়ায় এদের বিচরণক্ষেত্র এখন মারাত্মকভাবে সংকুচিত।
ডব্লিউডব্লিউএফ (WWF) ও গ্লোবাল টাইগার ফোরাম (জিটিএফ) (GTF) -এর তথ্যমতে, ১৯০০ সালের ১,০০,০০০ থেকে বাঘের সংখ্যা ৯৫ শতাংশ কমে ২০১০ সালে সর্বকালের সর্বনিম্ন ৩,২০০-এ নামে। তবে ‘Tx2’ উদ্যোগের মাধ্যমে বৈশ্বিক বন্য বাঘ অসাধারণভাবে ঘুরে দাঁড়ায়। ফলে ২০২৩–২০২৬ সালের মধ্যে এদের সংখ্যা প্রায় ৭৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে আনুমানিক ৫,৫৭৪-এ দাঁড়িয়েছে।
২০১০ সালের মূল ভিত্তি (Baseline) বনাম ২০২৬ সালের বাস্তবতা
২০১০ সালে সেন্ট পিটার্সবার্গ টাইগার সামিটে যখন ১৩টি বাঘ-পরিসরভুক্ত দেশ (Tiger-range countries) উচ্চাভিলাষী Tx2 লক্ষ্য গ্রহণ করে, তখন আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ, আইইউসিএন (IUCN) এবং (WWF)-এর প্রাথমিক তথ্যে দেশভিত্তিক একটি চিত্র উঠে এসেছিল: ভারত (১,৪১১), মালয়েশিয়া (৫০০), বাংলাদেশ (৪৪০), রাশিয়া (৩৬০), ইন্দোনেশিয়া (৩২৫), থাইল্যান্ড (১৭০), নেপাল (১২১), মিয়ানমার (৮৫), ভুটান (৭৫), চীন (৪৫), লাওস (২৫), এবং ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া (১০টি করে)।
এক দশকেরও বেশি সময় পর, ২০২৬ সালের বর্তমান তথ্য—যা IUCN এবং WWF দ্বারা স্বীকৃত—দেখাচ্ছে যে, বৈশ্বিক মোট সংখ্যা বাড়লেও জাতীয় বাস্তবতাগুলোতে আকাশ-পাতাল তফাত রয়ে গেছে:
২০২৬ সালের IUCN এবং WWF-এর মূল্যায়ন অনুসারে, ২০১০ সালের বেসলাইনের তুলনায় বৈশ্বিক বাঘ পুনরুদ্ধারে আঞ্চলিক বৈষম্য স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। ভারত অবিশ্বাস্যভাবে শীর্ষে রয়েছে, যেখানে বাঘের সংখ্যা ১,৪১১ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩,৬৮২-তে (সীমা ৩,১৬৭–৩,৯২৫)—যা বিশ্বের মোট বাঘের প্রায় ৭৫%। নেপাল (১২১ থেকে ৩৫৫), ভুটান (৭৫ থেকে ১৫১) এবং রাশিয়া (৩৬০ থেকে ৪৮০–৫৪০) উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, অন্যদিকে চীন ধীর অগ্রগতি ধারণ করছে (৪৫ থেকে ২০–৬০)।
বিপরীতভাবে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া মারাত্মক সংকটের মুখোমুখি। চরম হুমকির মধ্যেও ইন্দোনেশিয়ায় ৩৭১–৪০০টি বাঘ রয়েছে এবং থাইল্যান্ডে ১৭০ থেকে সামান্য কমে ১৪৮–১৮৯টিতে নেমে এসেছে। বাংলাদেশে বাঘের সংখ্যা ১০৬–১১৪ (২০২৪ সালের শুমারি অনুযায়ী ১২৫), যা মূলত বিজ্ঞানসম্মত পুনর্গণনার ফল, ২০০৪ সালের ৪৪০টির অবৈজ্ঞানিক বেসলাইনের তুলনায় হ্রাস নয়। উদ্বেগের বিষয় হলো, মালয়েশিয়ায় বাঘের সংখ্যা ৫০০ থেকে কমে ১২০–১৫০-এ নেমে এসেছে এবং মিয়ানমারে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২২টিতে। দুঃখজনকভাবে কম্বোডিয়া, লাওস এবং ভিয়েতনামে বাঘ এখন কার্যকরীভাবে বিলুপ্ত (০)—যেখানে ২০১০ সালের বেসলাইলে যথাক্রমে ১০, ২৫ এবং ১০টি করে বাঘ ছিল।
আইইউসিএন এসএসসি ক্যাট স্পেশালিস্ট গ্রুপ এবং ডব্লিউডব্লিউএফ-এর জুলাই ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, বাঘ এখন তাদের ঐতিহাসিক মূল বিচরণক্ষেত্রের ৭ শতাংশ-এরও কম এলাকায় অবস্থান করছে। বর্তমানে মাত্র ১০টি রেঞ্জ কান্ট্রিতে প্রজননক্ষম বাঘের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
দেশগুলো হলো— ভারত, বাংলাদেশ, ভুটান, নেপাল, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, রাশিয়া, চীন এবং মায়ানমার।
অংশীদারিত্বমূলক বাস্তুতন্ত্র এবং পদ্ধতির সঠিকতা
বিশ্বের প্রায় ৭৫ শতাংশ বন্য বাঘের আবাসস্থল ভারত সংরক্ষণে মূখ্য ভূমিকা রাখছে। ১৯৭৩ সালে ৯টি সংসংরক্ষিত এলাকা নিয়ে শুরু হওয়া ‘প্রজেক্ট টাইগার ২০২৬ সালে ৫৮টিতে প্রসারিত হয়েছে।
ভারত ও বাংলাদেশ ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট সুন্দরবন সুরক্ষায় সম্পৃক্ত। জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আন্তঃসরকারি প্যানেল আইপিসিসি (IPCC)-র ষষ্ঠ প্রতিবেদন এবং ২০২৬ সালের স্যাটেলাইট তথ্যমতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বার্ষিক ৩.৮ মিমি বাড়ছে। উচ্চ-নির্গমন পরিস্থিতিতে ২১০০ সালের মধ্যে সুন্দরবনে বাঘের ৯৬ শতাংশ আবাসন প্লাবিত হতে পারে। এর প্রভাব কমাতে ও মানুষ-বন্যপ্রাণী দ্বন্দ্ব নিরসনে সরকার দীর্ঘমেয়াদী আবাসন পদক্ষেপসহ মাটির ঢিবি নির্মাণ করছে।
এই বাসস্থানগুলো রক্ষার জন্য গণনা পদ্ধতির ঐতিহাসিক স্পষ্টতাও প্রয়োজন। ২০০৪ সালের এক পদচিহ্ন (Pugmark) জরিপে বাংলাদেশের সুন্দরবনে ৪৪০টি বাঘের দাবি করা হয়েছিল, তবে বিশেষজ্ঞ ড. মোনাকিরুল এইচ. খান উল্লেখ করেছেন: "২০০৪ সালের বাঘ শুমারিটি পুরোপুরি অবৈজ্ঞানিক ছিল... তাই বাঘের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে, কিন্তু এটি ৪৪০ থেকে ১০৬-এ নেমে এসেছে বিষয়টি এমন নয়।" তাঁর নিজের ২০০৬ সালের জরিপে বাঘের সংখ্যা আনুমানিক ২০০টি বলা হয়েছিল, যা প্রমাণ করে যে পূর্বের হিসাবগুলো বাড়িয়ে বলা হয়েছিল।
ঐতিহাসিক হিসাবও এই অসামঞ্জস্য দেখায়: ১৯৬৩ সালে গিমাউন্ট ফোর্টের হিসাবে ১০০, ১৯৭৫ সালে হেনড্রিখের হিসাবে ৩৫০, ১৯৯১ সালে ৪৫৯, ১৯৯২ সালে ৪৫৩, ১৯৯৩ সালে তামাঙ্কের হিসাবে ৩৬২ ও ১৯৯৩ সালেরই আরেক জরিপে ৩০০–৪৭৯ এবং ১৯৯৪ সালে ৩৬৯। ফলে স্পষ্ট—নীতিনির্ধারণে বৈজ্ঞানিক নজরদারির বিকল্প নেই।
অপূরণীয় ক্ষতি এবং কাজাখস্তানে পুনর্প্রবর্তন
বিলুপ্ত হওয়া উপপ্রজাতিগুলোর বর্তমান রেড লিস্ট স্ট্যাটাস অপরিবর্তিত রয়েছে। গত শতাব্দীতে তিনটি উপপ্রজাতি চিরতরে হারিয়ে গেছে:
বালি বাঘ (Panthera tigris balica): ১৯৪০/১৯৫০-এর দশকের মধ্যে বিলুপ্ত (সর্বশেষ রেকর্ড: সেপ্টেম্বর ১৯৩৭; সিডেনস্টিকার, ১৯৮৭)।
কাস্পিয়ান বাঘ (Panthera tigris virgata): ১৯৭০-এর দশকের শুরুর দিকে বিলুপ্ত (সর্বশেষ রেকর্ড: তুরস্ক ১৯৭০, ইউএসএসআর ১৯৭৩; জ্যাকসন, ১৯৯৩)।
জাভান বাঘ (Panthera tigris sondaica): ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিকে বিলুপ্ত (সর্বশেষ রেকর্ড: ১৯৭৬ সালে মেরু বেতিরি ন্যাশনাল পার্ক; তিলসন এবং নাইহুস, ২০১০)।
ইল-বালখাশে আশার আলো
বিলুপ্ত কাস্পিয়ান বাঘের ঐতিহাসিক বাসস্থানে পুনরায় বাঘ ফিরিয়ে আনতে কাজাখস্তান সরকার, WWF ও IUCN যৌথ উদ্যোগ নিয়েছে। ২০০৯ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, আমুর বাঘ জিনগতভাবে কাস্পিয়ান বাঘের প্রায় অভিন্ন।
বুখারা হরিণের সংখ্যা বৃদ্ধির পর, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে নেদারল্যান্ডস থেকে একজোড়া এবং ২০২৬-এর শুরুতে রাশিয়া থেকে আরও চারটি আমুর বাঘ আনা হয়। UNDP-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী বাঘগুলো নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিচ্ছে। ২০৩৫ সালের মধ্যে ৫০টি বাঘের একটি স্বনির্ভর দল গড়ে তুলে কাজাখস্তানকে ১৪তম বাঘ-পরিসরভুক্ত দেশ হিসেবে গড়ে তোলাই এ প্রকল্পের লক্ষ্য।
২০২৬ এবং তার পরবর্তী সময়ের প্রয়োজনীয়তা
২০২৬ সালে হুমকির ধরণ বদলেছে। ঐতিহ্যগত চীনা ওষুধে বাঘের অঙ্গের চাহিদা কমলেও অবৈধ খামার ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত আবাসের বিনাশ মানুষ-বাঘ দ্বন্দ্ব বাড়াচ্ছে। বর্তমানে এআই-চালিত পর্যবেক্ষণ, ড্রোন ও আন্তঃসীমান্ত তহবিলের সমন্বিত বন্যপ্রাণী নজরদারি অত্যন্ত জরুরি, যাতে বিলুপ্ত উপপ্রজাতিগুলোর মতো বাঘের অস্তিত্ব চিরতরে মুছে না যায়।
২০২৬ সালের বিশ্ব ব্যাঘ্র দিবসের স্লোগান—“তাদের টিকে থাকা আমাদের হাতে”—একটি অনিবার্য নৈতিক দায়িত্ব। পৃথিবীর সার্বিক পরিবেশগত ভারসাম্য ও বাস্তুতন্ত্রের পতন রোধে শীর্ষ এই শিকারীকে রক্ষা করা অপরিহার্য।