বাংলাদেশে আমেরিকা: স্ববিরোধিতার রাজনৈতিক অর্থনীতি
বাংলাদেশের সমাজে একটি দৃশ্যত অদ্ভুত কিন্তু বাস্তবে অত্যন্ত অর্থবহ প্রবণতা লক্ষ করা যায়। একদিকে আমেরিকার তীব্র সমালোচনা, অন্যদিকে সেই আমেরিকায় যাওয়ার প্রবল আকাক্সক্ষা। রাজনৈতিক বক্তৃতা, সামাজিক আড্ডা কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সব জায়গায়ই এই দ্বৈত মনোভাব স্পষ্ট। কেউ আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি, সাম্রাজ্যবাদী আচরণ কিংবা মুসলিম বিশ্বের প্রতি নীতির সমালোচনা করেন, আবার সেই ব্যক্তিই সুযোগ পেলে আমেরিকায় স্থায়ী হওয়ার চেষ্টা করেন। এই বৈপরীত্যকে অনেকেই “ভÐামি” বা “স্ববিরোধিতা” হিসেবে চিহ্নিত করেন। কিন্তু গভীরে গেলে দেখা যায়, এটি কেবল ব্যক্তিগত নৈতিক দুর্বলতার ফল নয়; বরং এটি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন।
বাংলাদেশের ওপর আমেরিকার প্রভাব সরাসরি ঔপনিবেশিক শাসনের মতো নয়, বরং এটি “নরম ক্ষমতা” ও “কাঠামোগত ক্ষমতা” -এর মাধ্যমে কাজ করে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় আমেরিকা সরাসরি হস্তক্ষেপ না করলেও, বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের অবস্থান গুররু¡পূর্ণ হয়ে ওঠে। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, নির্বাচন এই বিষয়গুলোতে তারা নিয়মিত বক্তব্য দেয়, কখনো ক‚টনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে, কখনো ভিসা নীতি বা নিষেধাজ্ঞার মতো পদক্ষেপ নেয়। এর ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি অনেক সময় আন্তর্জাতিক বৈধতা অর্জনের প্রশ্নে আমেরিকার দিকে তাকিয়ে থাকে। অর্থাৎ, দেশের রাজনীতি কেবল অভ্যন্তরীণ শক্তির লড়াই নয়, বরং আন্তর্জাতিক শক্তির সাথে সম্পর্কের ওপরও নির্ভরশীল।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আমেরিকার প্রভাব আরও গভীর। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি বাজার, তৈরি পোশাক শিল্প অনেকাংশে পশ্চিমা বাজারের ওপর নির্ভরশীল, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নীতিতে আমেরিকার প্রভাব রয়েছে। এই অর্থনৈতিক কাঠামো বাংলাদেশকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে যায়, যেখানে দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন হলেও বাস্তবে বৈশ্বিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার একটি অংশ হিসেবে কাজ করে। ফলে আমেরিকার অর্থনৈতিক অবস্থান ও নীতির পরিবর্তন সরাসরি বাংলাদেশের শ্রমবাজার, শিল্প ও উন্নয়নকে প্রভাবিত করে।
আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রভাব সম্ভবত সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে। হলিউড সিনেমা, ইংরেজি ভাষা, প্রযুক্তি ও সোশ্যাল মিডিয়া, জীবনধারা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার ধারণা এই সবকিছু মিলিয়ে আমেরিকা একটি স্বপ্নের প্রতীক হয়ে ওঠে বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও শিক্ষিত তরুণদের কাছে। এই স্বপ্ন কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি সামাজিক মর্যাদা, স্বাধীনতা এবং উন্নত জীবনের প্রতীক।
তারপরেও বাংলাদেশে আমেরিকা-বিরোধী মনোভাবেরও শক্তিশালী ভিত্তি রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য, আফগানিস্তান, ইরাক এইসব অঞ্চলে আমেরিকার সামরিক হস্তক্ষেপ অনেক মানুষের কাছে অন্যায় ও আগ্রাসী মনে হয়। বিশেষ করে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের মানুষ হিসেবে বাংলাদেশের জনগণের একটি অংশ এই ঘটনাগুলোকে ধর্মীয় ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে। অনেকে মনে করেন, আমেরিকা উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে একটি আধুনিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে কাজ করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি মূলত বামপন্থী রাজনীতি ও তৃতীয় বিশ্বের বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য থেকে এসেছে। বাংলাদেশের একটি অংশের কাছে আমেরিকার সমালোচনা আসলে জাতীয়তাবাদের প্রকাশ। বিদেশি শক্তির প্রভাবকে প্রতিহত করার মানসিকতা থেকে এই সমালোচনা তৈরি হয়।
সমালোচনা থাকা সত্তে¡ও মানুষ কেন আমেরিকায় যেতে চায়? এর পেছনে মূলত রয়েছে উন্নত জীবনের হাতছানি। কল্পবাস্তবিক সুখের সন্ধানে মানুষের এখান থেকে সেখানে ছুটে চলা নতুন কিছু নয়, গ্রেট মাইগ্রেশনের ধারাবাহিকতা মাত্র। এজন্যই রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন ‘ হেথা নয়, হোথা নয়, অন্য কোথা অন্য কোনথানে... মূলত আমেরিকায় উচ্চ আয়, স্থিতিশীল চাকরি, উন্নত জীবনযাত্রা এসবই সবার কাছে বড় আকর্ষণ। বাংলাদেশের সীমিত সুযোগের তুলনায় এটি অনেক বড় বাস্তব সুবিধা। তাছাড়া উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে আমেরিকা বিশ্বে অগ্রগামী। অনেক শিক্ষার্থী সেখানে গিয়ে নিজেদের ক্যারিয়ার গড়তে চায়। আইনের শাসন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এই বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এখন আমরা মূল প্রশ্নে আসি এটি কি সত্যিই স্ববিরোধিতা? মানুষ একদিকে নৈতিক অবস্থান নেয়, অন্যদিকে নিজের জীবন উন্নত করার চেষ্টা করে। এটি স্ববিরোধিতা এবং মানবিক বাস্তবতার এক নিবিড় নিঠুর সমন্বয়। একজন ব্যক্তি একই সাথে বলতে পারেন “আমেরিকার নীতি ভুল” এবং “আমি সেখানে গেলে আমার জীবন উন্নত হবে।” মূলত ঔপনিবেশিক ইতিহাসের কারণে আমাদের সমাজে পশ্চিমের প্রতি এক ধরনের মানসিক নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। ফলে আমরা একদিকে প্রতিরোধ করি, অন্যদিকে আকৃষ্ট হই। বিশ্বব্যবস্থায় উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে যে বৈষম্য রয়েছে, সেটিই এই দ্বৈত মনোভাবের মূল কারণ। যেখানে সুযোগ বেশি, মানুষ সেদিকেই যেতে চায় এটাই স্বাভাবিক।
এই দ্বৈত মনোভাব তৈরিতে মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবীদেরও ভূমিকা রয়েছে। রাজনৈতিক বক্তৃতায় আমেরিকা বিরোধিতা, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে পশ্চিমমুখী আকাক্সক্ষা এই দ্বৈত অবস্থান সমাজে একটি বিভ্রান্তিকর বার্তা তৈরি করে। এই পুরো বিষয়টি বুঝতে হলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতাও পর্যবেক্ষণ করতে হবে। বিশেষ করে, বেকারত্ব, দুর্বল, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, দুর্নীতি এই সমস্যাগুলো মানুষকে বিকল্প খুঁজতে বাধ্য করে। অর্থাৎ, আমেরিকার আকর্ষণ যতটা না তাদের শক্তির কারণে, তার চেয়ে বেশি আমাদের দুর্বলতার কারণে।
সবকিছু মিলিয়ে বলা যায় বাংলাদেশে আমেরিকা সম্পর্কে মনোভাব তিনটি স্তরে কাজ করে, প্রথমত সমালোচনা নৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থান, দ্বিতীয়ত নির্ভরতা অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত বাস্তবতা
তৃতীয়ত আকাক্সক্ষা ব্যক্তিগত স্বপ্ন ও উন্নত জীবনের ইচ্ছা। এই তিনটি স্তর একসাথে মিলে যে চিত্র তৈরি করে, সেটিই আমাদের “স্ববিরোধিতা” বলে মনে হয়।
বাংলাদেশের মানুষ আমেরিকার সমালোচনা করে কিন্তু সেখানে যেতে মরিয়া এই ঘটনাকে সরলভাবে ভÐামি বা আত্মপ্রতারনা বলে ব্যাখ্যা করা যায়। তবে এটি একটি জটিল সামাজিক বাস্তবতা, যেখানে ব্যক্তি, রাষ্ট্র এবং বৈশ্বিক শক্তির সম্পর্ক একে অপরের সাথে জড়িয়ে আছে। এই দ্বৈত মনোভাব আসলে বর্তমান সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য, একদিকে নৈতিক প্রতিরোধ, অন্যদিকে উন্নত জীবনের হাতছানি। সুতরাং, এই বিষয়টি বুঝতে হলে আমাদের ব্যক্তিকে দোষারোপ না করে, বরং সেই বৃহত্তর কাঠামোকে বিশ্লেষণ করতে হবে, যা মানুষকে একই সাথে সমালোচক ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী করে তোলে।
(রাশেদ রাব্বি একজন গণমাধ্যম কর্মী)