রুগ্ন শিল্পে নতুন প্রাণ: রাষ্ট্রের উদ্যোগের সঙ্গে ব্যবসায়ী সমাজের দায়িত্ববোধের সময় এখনই
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার ইতিহাসে শিল্প খাত সবসময়ই একটি প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদন বৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিভিন্ন সময় নানা কারণে দেশের অনেক শিল্প কারখানা রুগ্ন হয়ে পড়েছে অথবা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এই রুগ্ন ও বন্ধ শিল্প কারখানাগুলো পুনরায় চালু করার উদ্যোগ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে নির্দেশনা দিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে দেশের শিল্পখাতকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
বাংলাদেশে বহু শিল্প প্রতিষ্ঠান নানা কারণে কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। কোথাও আর্থিক সংকট, কোথাও দুর্বল ব্যবস্থাপনা, কোথাও প্রযুক্তিগত পিছিয়ে থাকা, আবার কোথাও বাজার প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পারার কারণে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে রুগ্ন হয়ে পড়ে। এর ফলে শুধু শিল্প প্রতিষ্ঠানই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, বরং হাজার হাজার শ্রমিক তাদের কর্মসংস্থান হারায় এবং স্থানীয় অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই এই রুগ্ন ও বন্ধ শিল্প কারখানাগুলো পুনরায় চালু করা মানে শুধু শিল্প পুনরুজ্জীবন নয়, বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক উন্নয়নের পথকে আরও সুদৃঢ় করা।
বাংলাদেশে রুগ্ন শিল্প কারখানার উদাহরণ খুব কম নয়। এক সময় দেশের বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল খুলনার খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলস। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় ধরে এই প্রতিষ্ঠান দেশের সংবাদপত্র শিল্পের জন্য কাগজ উৎপাদন করত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের অভাব, আর্থিক সংকট এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে এই মিল ধীরে ধীরে রুগ্ন হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়। এই মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে শুধু শত শত শ্রমিক কর্মহীন হয়নি, বরং পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
একইভাবে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের মধ্যে অন্যতম ছিল আদমজী জুট মিলস, যা এক সময় বিশ্বের বৃহত্তম পাটকল হিসেবে পরিচিত ছিল। হাজার হাজার শ্রমিক সেখানে কাজ করতেন এবং দেশের পাটশিল্পের একটি শক্তিশালী ভিত্তি ছিল এই প্রতিষ্ঠান। কিন্তু ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পারার কারণে এই মিল বন্ধ হয়ে যায়। যদিও পরে সেখানে শিল্প পার্ক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, তবুও এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় সঠিক সময়ের সঠিক সিদ্ধান্ত না নিলে একটি বড় শিল্পও ধীরে ধীরে অচল হয়ে যেতে পারে।
চট্টগ্রামের কালুরঘাট হেভি ইন্ডাস্ট্রিজ কিংবা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থিত অনেক চিনি কলের অবস্থাও প্রায় একই রকম। বহু রাষ্ট্রায়ত্ত চিনি কল বছরের পর বছর লোকসানের কারণে বন্ধ হয়ে আছে বা সীমিত আকারে চলছে। অথচ এসব শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজার হাজার কৃষক, শ্রমিক এবং স্থানীয় ব্যবসায়ী। যদি সঠিক পরিকল্পনা ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এসব শিল্পকে নতুনভাবে সংগঠিত করা যায়, তাহলে এগুলো আবারও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
তবে শুধুমাত্র সরকারের উদ্যোগই এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য যথেষ্ট নয়। এখানে ব্যবসায়ী সমাজের সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের শিল্প ও বাণিজ্য খাতের অভিজ্ঞ উদ্যোক্তারা যদি এই রুগ্ন শিল্পগুলো পুনরুজ্জীবনের কাজে এগিয়ে আসেন, তাহলে তা বাস্তবায়ন আরও সহজ ও কার্যকর হবে। অনেক সময় দেখা যায়, একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে রুগ্ন হয়ে পড়ে, কিন্তু একই প্রতিষ্ঠান দক্ষ উদ্যোক্তার হাতে নতুনভাবে পরিচালিত হলে তা আবারও লাভজনক হয়ে উঠতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রথম যে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন তা হলো রুগ্ন শিল্প কারখানাগুলোর প্রকৃত অবস্থা সঠিকভাবে নিরূপণ করা। কোন শিল্প কারখানা কেন রুগ্ন হয়েছে, তার মূল কারণ কী, বাজার সম্ভাবনা কতটা রয়েছে, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কেমন এসব বিষয় গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি। কারণ, সব শিল্প প্রতিষ্ঠান একই কারণে রুগ্ন হয়ে পড়ে না। কোথাও আর্থিক পুনর্গঠন প্রয়োজন, কোথাও প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন দরকার, আবার কোথাও ব্যবস্থাপনা পরিবর্তনই যথেষ্ট হতে পারে।
সরকার যদি এই রুগ্ন শিল্প কারখানাগুলোর একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করে এবং প্রতিটির সম্ভাবনা ও সমস্যা বিশ্লেষণ করে একটি বাস্তবসম্মত পুনরুজ্জীবন পরিকল্পনা প্রণয়ন করে, তাহলে উদ্যোক্তাদের জন্যও সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে। একই সঙ্গে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতা নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ অনেক সময় ঋণের বোঝা ও আর্থিক দায়বদ্ধতার কারণে একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন পুনঃতফসিলকরণ, সুদের হার কমানো কিংবা নতুন বিনিয়োগ সুবিধা প্রদান।
ব্যবসায়ী সমাজের পক্ষ থেকেও দায়িত্বশীল মনোভাব প্রয়োজন। শুধুমাত্র দ্রুত লাভের চিন্তা না করে দীর্ঘমেয়াদি শিল্প উন্নয়নের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। একটি রুগ্ন শিল্প কারখানা পুনরুজ্জীবিত করা কখনোই সহজ কাজ নয়। এতে ধৈর্য, পরিকল্পনা এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন হয়। কিন্তু সফলভাবে পুনরুজ্জীবিত হলে সেই শিল্প প্রতিষ্ঠান শুধু লাভজনকই হয় না, বরং একটি নতুন উদাহরণও সৃষ্টি করে।
এখানে প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। অনেক পুরনো শিল্প কারখানা কেবল প্রযুক্তিগতভাবে পিছিয়ে থাকার কারণেই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারেনি। তাই এসব শিল্প পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন, উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি এবং মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। ব্যবসায়ী সমাজ যদি নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে এসব শিল্পকে আধুনিক রূপ দিতে পারে, তাহলে তা দেশের শিল্প খাতের সামগ্রিক মান উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে।
শ্রমিকদের বিষয়টিও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বহু শ্রমিক রুগ্ন শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে দীর্ঘদিন কর্মহীন অবস্থায় রয়েছে। এসব শিল্প পুনরায় চালু হলে তারা আবারও কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে। তবে একই সঙ্গে শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণের বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প পরিচালনার জন্য দক্ষ মানবসম্পদ অপরিহার্য।
সরকার, উদ্যোক্তা এবং শ্রমিক এই তিন পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া রুগ্ন শিল্প পুনরুজ্জীবন সফল হবে না। সরকারকে নীতি সহায়তা দিতে হবে, উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ ও ব্যবস্থাপনায় এগিয়ে আসতে হবে এবং শ্রমিকদেরও দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে হবে। এই সমন্বয় তৈরি করতে পারলে রুগ্ন শিল্প পুনরুজ্জীবন একটি সফল জাতীয় কর্মসূচিতে পরিণত হতে পারে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। অতীতে অনেক সময় দেখা গেছে, শিল্প পুনরুজ্জীবনের নামে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও সেগুলো কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি। তাই এবার এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। কোন শিল্প কারখানা কীভাবে পুনরায় চালু হচ্ছে, কে বিনিয়োগ করছে, কতজন কর্মসংস্থান পাচ্ছে এসব বিষয় জনগণের সামনে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী, ক্রমবর্ধমান বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সুযোগ সব মিলিয়ে শিল্প খাতের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হলে রুগ্ন শিল্পগুলোকে নতুনভাবে চিন্তা করতে হবে। শুধু পুরনো কাঠামো পুনরুজ্জীবিত করাই নয়, বরং এগুলোকে আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক শিল্পে রূপান্তর করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় রুগ্ন ও বন্ধ শিল্প কারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগ তাই কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই উদ্যোগ সফল করতে হলে প্রয়োজন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, উদ্যোক্তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, আর্থিক সহায়তা, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন এবং সর্বোপরি একটি সমন্বিত জাতীয় প্রচেষ্টা।
যদি সরকার, ব্যবসায়ী সমাজ এবং শ্রমজীবী মানুষ একসঙ্গে কাজ করতে পারে, তাহলে আজকের রুগ্ন শিল্পই আগামী দিনের শক্তিশালী উৎপাদন কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। আর সেই সফলতা শুধু শিল্প খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
এই মুহূর্তে প্রয়োজন একটি ইতিবাচক মানসিকতা এবং যৌথ উদ্যোগ। কারণ একটি শিল্প কারখানা পুনরায় চালু হওয়া মানে কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের পুনর্জন্ম নয় বরং একটি নতুন সম্ভাবনার সূচনা। বাংলাদেশের শিল্প খাত যদি এই সুযোগকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে, তাহলে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে এগিয়ে যাবে।
(লেখক: সহিদুল আলম স্বপন, সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি। ইমেইল: shahidul.alam@bluewin.ch)