ভ্রমণের বৈজ্ঞানিক উপকারিতা

ওমর ফারুক
প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ০৫:৫৯ পিএম
আপডেট: ১৯ জুন ২০২৬, ০৪:০১ পিএম
Main News Image

শরীর ও মনকে সতেজ রাখতে ভ্রমণের জুড়ি নেই। সফরকালে মস্তিস্কের কার্যক্ষমতা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ভালো কাজে স্পৃহা জাগে। ব্যক্তিত্বে ভাবগাম্ভীর্য সৃষ্টি হয়। ইতিহাস থেকে জানা যায়, সভ্যতার আদি মানুষেরা জীবিকা অন্বেষণে দেশান্তরে ছুটে বেড়িয়েছেন। সমাজ গঠনে তেপান্তরে ঘুরেছেন। আর অর্জন করেছেন নতুন নতুন সংস্কৃতি। সৃষ্টি করেছেন ঐতিহাসিক পটভূমি। কবি সাহিত্যিকরা্ও লিখে গেছেন নানা কাব্য আর গল্পগাঁথা। ট্রাভেল বা ট্যুর ইংরেজি এ দুই শব্দের প্রতিশব্দ হলো ভ্রমণ বা সফর। ভ্রমণ নিয়ে রয়েছে আশ্চর্য কিছু বৈজ্ঞানিক ব্যাখা। সমুদ্র, নদী-নালা, পাহাড়, বন আর মরুভূমি দিয়ে সজ্জিত এ বসুন্ধরা। একেক দিকে রয়েছে একেক নিয়ামত। মন ও মগজেও জাগায় নানা প্রতিক্রিয়া। এসব নিয়েই লেখকের এবারের আলোচনা।   

সমুদ্রপাড়ে গেলে কি বলে মন?

সমুদ্রের উর্মিমালার আছে নিজস্ব ছন্দ-তাল-লয়। যখন তরঙ্গের শব্দগুচ্ছ কানে লাগে, তখন শরীরে প্রশান্তি দোলা দেয়। মনে প্রেম জাগায়। সমুদ্র বিজ্ঞানী ওয়ালেস জে. নিকোলাস এ মুহূর্তকে ব্লু মাইন্ড হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তার ভাষায়, পানির কাছে থাকলে মস্তিষ্কে ডোপামিন, সেরোটোনিন ও অক্সিটোক্সিনের মত 'ফিল-গুড' হরমোন বাড়ে এবং কর্টিসোল বা স্ট্রেস হরমোন কমে যায়। শুধু সমুদ্র নয়, নদী-নালা, ঝরণা বা স্বচ্ছজলরাশির কাছে গেলে নিজের মধ্যে সুখী অনুভব হয়। 

শক্ত মাংসপেশী গঠনে পাহাড়ে ট্রেকিং

পাহাড়ে ট্রেকিং করলে শারীরিক ও মানসিকভাবে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। এটি এমন একটি ব্যায়াম, যা হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। হৃৎপিণ্ডকে করে মজবুত। বাড়ায় ফুসফুসের কার্যক্ষমতা। একইসঙ্গে পেশী ও হাড়ের ঘনত্ব বৃদ্ধি করে। এছাড়া, মানসিক চাপ কমিয়ে আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। শরীরের উদ্বেগ কমে। দুশ্চিন্তা শত হাত দূরে সরে যায়। প্রকৃতির মাঝে শরীরচর্চা করলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যায়। এতে ভালো ঘুম হয় এবং সৃজনশীল কাজে মনযোগ সৃষ্টি হয়।

ঘনবনে সজিব নিঃশ্বাস

ইটের পর ইট তার ভেতর মানুষ যেন কীট। চার দেয়ালের মাঝে দীর্ঘ বসবাস একঘেয়েমি করার পাশাপাশি মানুষের মেজাজকে করে তোলে খিটখিটে। এসির হিম বাতাস আর সোডিয়ামের বাতি যেন বিষণ্ণতার ডাক পিয়ন। যান্ত্রিক ক্লান্তি থেকে মুক্তি পেতে যেতে হবে সবুজের সান্নিধ্যে। ঘন বন প্রফুল্ল করে মন। সবুজ পাতায় মিশে আসা স্নিগ্ধ বাতাসে আছে সজিব নিঃশ্বাস। ন্যাশনাল হার্ট, লাং অ্যান্ড ব্লাড ইনস্টিটিউটের মতে, বনের মাঝে দীর্ঘ সময় হাঁটলে রক্তচাপকে ৪ থেকে ১০ পয়েন্ট কমিয়ে দিতে পারে এবং যাদের উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসের ঝুঁকি আছে, সেই আশঙ্কাও কমে যায়। বনাঞ্চলকে বলা হয় পৃথিবীর কার্বন-ডাই অক্সাইডের সংরক্ষণাগার। জীববৈচিত্র্যকে অক্সিজেন উপহার দেয় বন। সজিব নিঃশ্বাস পেতে যেকোন উদ্যান বা ঘনবনে ঘুরতে যাওয়া যেতে পারে। 

মরুভূমির সফর আধ্যাকিতার নিয়ামক

মরুভূমিতে উটের পিঠে চড়া, জিপ সাফারি বা স্যান্ডবোর্ডিংয়ের মতো রোমাঞ্চকর খেলাগুলো আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। কর্মক্ষম করে শরীরকে। অসাধারণ সূর্যাস্ত, সূর্যোদয় এবং রাতের আকাশের তারা দেখার অনন্য দৃশ্য মুগ্ধ করে, যা অন্য কোথাও পাওয়া কঠিন। এছাড়া, মরুভূমিতে বাস করা আদি বেদুইনদের জীবনযাপন সম্পর্কে উপলব্ধি করা যায়। আরবের প্রাচীন ইতিহাসে নিজেকে সমৃদ্ধ করা যায়। 


প্রত্নতত্ত্ব ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী

প্রত্নতত্ত্ব হচ্ছে অতীতের ধ্বংসাবশেষ সম্পর্কিত পাঠ। এ নিদর্শন জ্ঞানকে প্রসারিত করে। অতীতের সংস্কৃতি আর প্রাগৈতিহাসিক নিয়ে অধ্যয়নের সুযোগ পাওয়া যায়। পুরনোকে নতুন করে জানলে মনের মধ্যে চনমনে ভাব সাড়া দেয়। কারণ, ব্রেইনে রিওয়ার্ড সিস্টেম সিগনাল দেয়। এতে মানসক তৃপ্তি আসে। আমেরিকান আর্কিওলজিক্যাল ইনস্টিটিউট এবং বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, কৌতূহল চেতনা মস্তিষ্কের ভেন্ট্রাল স্ট্রায়াটাম অংশকে সক্রিয় করে, এতে শরীরে আলোর বেগে দৌড়াতে থাকে সুখী হরমন। তখন মানুষ হয়ে ওঠে আরও প্রাণবন্ত।

শুধু স্থান নয়, ভ্রমণের বাহনটিও হতে পারে সাময়িক সুখের চাবিকাঠি। আধুনিক সভ্যতার মতো প্রাচীন যুগে ছিলো না যন্ত্র বা মোটরচালিত কোনো বাহন। পায়ে হাঁটা ছিলো চলার প্রথম ও প্রধান অনুষঙ্গ। তবে নৌপথে পালতোলা নৌকা আর স্থলভাগে ঘোড়া বা উটের পিঠে চড়ে শত মাইল পাড়ি দিতে হয়েছে পূর্বপুরুষদের। গবেষণায় দেখা গেছে, ঘোড়া বা উটের পিঠে চড়লে এন্ডোরফিন এবং অক্সিটসিন হরমোন নিঃসরণ হয়। ঘোড়া বা উটের মতো প্রাণীর সাথে মানুষের একটি সামাজিক ও আবেগীয় সম্পর্ক তৈরি হয়। প্রাণীর স্পর্শ এবং তার সাথে তাল মিলিয়ে চলার ফলে শরীরে অক্সিটোসিন বা 'বন্ডিং হরমোন' তৈরি হয়। এছাড়া, অন্যান্য পরিবহনে চড়লেও আলাদা আনন্দ যোগ হয়। মানসিক অবসাদ দূর হয়। স্নিগ্ধ কোমল হৃদয়ের অধিকারী হওয়া যায়।

ওমর ফারুক গণমাধ্যমকর্মী, সময় টিভি