কেন মেরিন ল্য পেনের প্রার্থিতা ফরাসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে আমূল বদলে দিচ্ছে

সহিদুল আলম স্বপন, জেনেভা, সুইজারল্যান্ড
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৮:১৮ এএম
আপডেট: ০৩ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৫১ এএম
Main News Image

ইউরোপীয় তহবিল আত্মসাতের মামলায় ১ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলেও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারছেন মেরিন ল্য পেন। ফলে এমনও হতে পারে যে নির্বাচনী প্রচারের শেষ পর্যায়ে তাঁর পায়ে ইলেকট্রনিক নজরদারি-ব্রেসলেট (ইলেকট্রনিক অ্যাঙ্কল মনিটর) থাকবে। এর রাজনৈতিক তাৎপর্য কী?

আইনি রায়, শাস্তি ও প্রার্থিতা নিশ্চিত হওয়া

চরম ডানপন্থী দল র‍্যাসঁব্লমঁ নাসিওনাল (RN)-এর নেত্রী মেরিন ল্য পেন দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছিলেন যে তাঁকে নির্বাচনে অংশ নিতে বাধা দেওয়ার জন্য একটি ষড়যন্ত্র চলছে।

তবে আপিল আদালত ইউরোপীয় সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে ১ বছরের কারাদণ্ড বহাল রাখে। একই সঙ্গে অযোগ্যতার সাজা কমিয়ে ১৫ মাসে নামিয়ে আনা হয়, যা তিনি ইতোমধ্যেই ভোগ করেছেন। ফলে আইনি বাধা কাটিয়ে তিনি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান।

রায় ঘোষণার সন্ধ্যাতেই তিনি আগামী ১৮ এপ্রিল ও ২ মে অনুষ্ঠিতব্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নিজের প্রার্থিতা ঘোষণা করেন। এই পরিস্থিতি এমন এক নজির তৈরি করেছে, যেখানে একজন দণ্ডিত রাজনীতিক সক্রিয়ভাবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

নৈতিকতা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংকট

এই প্রার্থিতা রাজনৈতিক নৈতিকতার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে । বিচারকেরা তাঁকে ‘গুরুতর’ অর্থ আত্মসাতের জন্য দায়ী সাব্যস্ত করেছেন, তবুও তা তাঁর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষুণ্ন করছে না।

একজন সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতির ফৌজদারি রেকর্ড থাকা, যা তাঁকে অন্য পেশায় অযোগ্য করে তুলতে পারত, সেটিও যেন গুরুত্ব হারিয়েছে। এমনকি নির্বাচনী প্রচারের শেষ দিকে তাঁর পায়ে ইলেকট্রনিক নজরদারি-ব্রেসলেট থাকার সম্ভাবনাও রাজনৈতিক বাস্তবতায় তেমন প্রভাব ফেলছে না।

এই প্রেক্ষাপটে ফ্রান্সের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবক্ষয় এবং নৈতিক মানদণ্ডের পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

অতীতের মানদণ্ড বনাম বর্তমান বাস্তবতা

২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারে ফ্রাঁসোয়া ফিয়োঁ প্রশ্ন তুলেছিলেন, “কে কল্পনা করতে পারে যে জেনারেল দ্য গল কখনও বিচারাধীন হতেন?” এই প্রশ্ন আজ আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

দ্য গল ছিলেন এমন এক নেতা, যিনি ব্যক্তিগত সততার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। এলিসে প্রাসাদে থাকাকালেও তিনি নিজের বিদ্যুতের বিল নিজেই পরিশোধ করতেন। তাঁর নেতৃত্বে ফ্রান্স আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পুনরায় শক্তিশালী অবস্থান অর্জন করেছিল।

এই ঐতিহাসিক মানদণ্ডের সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতার তুলনা করলে দেখা যায়, রাজনৈতিক নেতৃত্বের নৈতিক প্রত্যাশা উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে।

সমর্থকদের দৃষ্টিভঙ্গি ও জনমতের বাস্তবতা

তবে মেরিন ল্য পেনের সমর্থকেরা এই বিষয়গুলো ভিন্নভাবে দেখেন। তাঁদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে মূলধারার রাজনীতিতে “সবাই দুর্নীতিগ্রস্ত”, এবং চরম ডানপন্থীরাই এর ব্যতিক্রম।

তাঁর বাবা জঁ-মারি ল্য পেনের “হাত পরিষ্কার, মাথা উঁচু” স্লোগান এখনও এই রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে আইনি দণ্ড বা নৈতিক প্রশ্ন তাঁর সমর্থকদের কাছে তেমন প্রভাব ফেলছে না।

প্রতিদ্বন্দ্বীদের দৃষ্টিতে শক্তি ও ঝুঁকি

মেরিন ল্য পেনের প্রার্থিতা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। অনেকেই মনে করেন, তুলনামূলকভাবে অনভিজ্ঞ জর্দান বারদেলার চেয়ে তিনি অনেক বেশি দক্ষ ও বিপজ্জনক প্রতিদ্বন্দ্বী।

মধ্য-ডানপন্থীরা তাঁর জনমত বোঝার ক্ষমতা স্বীকার করলেও তাঁর নীতির সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন। অন্যদিকে, ডানপন্থী রিপাবলিকানদের কিছু অংশ এখনও তাঁকে ‘সমাজতন্ত্রী’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে, যদিও এই বিশ্লেষণ ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

নির্বাচনী সমীকরণ ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

এই প্রার্থিতা নির্বাচনী সমীকরণকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করছে। চরম বামপন্থীদের কাছে তাঁর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফার লড়াই ‘ফ্যাসিবাদ’-এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বামপন্থীরা তাঁর আইনি দণ্ড এবং ল্য পেন পরিবারের রাজনৈতিক ইতিহাস তুলে ধরতে প্রস্তুত। তবে শুধুমাত্র অতীতের সমালোচনা দিয়ে তাঁকে পরাজিত করা কঠিন হবে।

সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, সম্ভাব্য যেকোনো প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধেই তিনি এগিয়ে আছেন, যা নির্বাচনের ফলাফলকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।

সামনে চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাব্য কৌশল

মেরিন ল্য পেনকে পরাজিত করতে হলে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীদের আরও সুসংগঠিত ও বাস্তবভিত্তিক রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ করতে হবে।

তাঁর কর্মসূচির অস্পষ্টতা ও অসংগতিগুলো তুলে ধরা জরুরি, বিশেষ করে যেখানে অভিবাসনবিরোধিতাকে দেশের সব সমস্যার একমাত্র সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

একই সঙ্গে তাঁর ব্যয়বহুল অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং ঋণে জর্জরিত রাষ্ট্রের বাস্তবতার মধ্যে অসামঞ্জস্য তুলে ধরা প্রয়োজন।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও তাঁর অবস্থান যা ভ্লাদিমির পুতিন বা ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি অনুগত বলে সমালোচিত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রশ্ন তোলা গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে, আইনি বিতর্ক থেকে শুরু করে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এবং নির্বাচনী বাস্তবতা সবকিছু মিলিয়ে মেরিন ল্য পেনের প্রার্থিতা ফরাসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের গতিপথকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে।

(লেখক: সহিদুল আলম স্বপন, সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি। ইমেইল: shahidul.alam@bluewin.ch)