সিড়ি ভাঙতে ভাঙতে জীবন ভাঙছেন না তো?

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬, ১১:০৯ এএম
আপডেট: ০৫ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৫৫ পিএম
Main News Image

প্রতিদিনের চলাফেরায় বা অফিসে যাওয়ার পথে দু-এক তলা সিঁড়ি বেয়ে উঠতে গিয়ে কি আপনি হাঁপিয়ে উঠছেন? কিংবা একটু দ্রুত হাঁটলেই কি বুক ধড়ফড় আর প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট অনুভব করছেন? অনেকেই হয়তো ভাবেন—"বয়স বাড়ছে," "ওজন একটু বেশি," অথবা "শরীরচর্চা করা হয় না বলেই এমনটা হচ্ছে।" কিন্তু এই সামান্য অবহেলাই কি ডেকে আনছে বড় কোনো বিপদ?

বিশেষজ্ঞদের মতে, শারীরিকভাবে ফিট না থাকলে সিঁড়ি ভাঙার সময় কিছুটা ক্লান্তি বা শ্বাসকষ্ট হওয়া স্বাভাবিক। তবে এই সমস্যা যদি নতুন করে শুরু হয়, দিন দিন বাড়তে থাকে, কিংবা সামান্য কায়িক শ্রমেই দেখা দেয়—তবে তা বয়স বা অলসতার অজুহাতে এড়িয়ে যাওয়া মারাত্মক ভুল হতে পারে।

হৃদরোগের গোপন নীরব সংকেত : চিকিৎসকদের মতে, কায়িক পরিশ্রমের সময় হঠাৎ শ্বাসকষ্ট হওয়া হতে পারে হৃদরোগের প্রাথমিক ও নীরব লক্ষণ। বিশেষ করে নারী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে বুক ব্যথার মতো প্রথাগত লক্ষণ দেখা না-ও দিতে পারে।

অনেক সময় হৃদরোগের মূল আক্রমণ বা 'হার্ট অ্যাটাক'-এর আগেই শরীর শ্বাসকষ্টের মাধ্যমে এই আগাম সতর্কবার্তা দেয়। ডায়াবেটিস রোগীদের 'সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাক'-এর ঝুঁকি বেশি থাকায়, তাদের ক্ষেত্রে এই উপসর্গকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা উচিত।

শ্বাসকষ্টের নেপথ্যে লুকিয়ে থাকা সম্ভাব্য কারণ : শুধুমাত্র লক্ষণ দেখে শ্বাসকষ্টের মূল কারণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এটি বিভিন্ন শারীরিক জটিলতার ফল হতে পারে। হৃদরোগ ও হার্ট ফেলিওর, হৃৎপিণ্ডের রক্ত পাম্প করার ক্ষমতা কমে গেলে শরীর পর্যাপ্ত অক্সিজেন পায় না। ফুসফুসের জটিলতা, ফুসফুসের ধমনীতে রক্ত জমাট বাঁধা (পালমোনারি এমবোলিজম) বা দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগ। রক্তাল্পতা (Anemia); রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কমে গেলে শরীরে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়। থাইরয়েডের ভারসাম্যহীনতা, কিডনি বা লিভারের জটিলতা, এবং অতিরিক্ত স্থূলতা।

যেসব লক্ষণ দেখলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন

শ্বাসকষ্টের সাথে যদি নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখতে পান, তবে দেরি না করে জরুরি চিকিৎসা সেবা বা কার্ডিওলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত-

বুকে চাপ অনুভব করা বা তীব্র ব্যথা

অনিয়মিত হৃদস্পন্দন বা বুক ধড়ফড় করা

অতিরিক্ত ঘাম হওয়া এবং মাথা ঘোরা

বিশ্রাম নেওয়ার পরও শ্বাসকষ্ট কম না হওয়া

পায়ে ফোলাভাব দেখা দেওয়া বা ঠোঁটে নীলচে ভাব আসা

রোগ নির্ণয়ে যা করণীয় ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা

সঠিক সময়ে রোগ ধরা পড়লে বড় ধরনের জটিলতা বা হার্ট ফেলিওর রোধ করা সম্ভব। চিকিৎসকদের মতে, শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে নিম্নলিখিত পরীক্ষাগুলো করানো জরুরি। প্রাথমিক রক্ত পরীক্ষা, সিবিসি (কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট), ব্লাড সুগার, থাইরয়েড প্রোফাইল, লিভার ও কিডনি ফাংশন টেস্ট। কার্ডিয়াক ও চেস্ট টেস্ট, ইসিজি (ECG), চেস্ট এক্স-রে এবং কার্ডিয়াক বায়োমার্কার টেস্ট। বিশেষায়িত হার্ট টেস্ট, ইকোকার্ডিওগ্রাফি (Echocardiography): হৃৎপিণ্ডের গঠন, ভালভ ও পাম্পিং প্রকোষ্ঠের অবস্থা দেখা। ট্রেডমিল স্ট্রেস টেস্ট (TMT); হাঁটা বা পরিশ্রমের সময় হার্ট কীভাবে কাজ সামলাচ্ছে তা পরীক্ষা করা। সিটি করোনারি অ্যাঞ্জিওগ্রাফি: হৃদযন্ত্রের ধমনীতে কোনো ব্লক বা প্লাক রয়েছে কি না তা নিশ্চিত হওয়া।

আপনার হৃদযন্ত্র কতটা ফিট?

কার্ডিওভাসকুলার স্বাস্থ্যের একটি সাধারণ কিন্তু কার্যকর নির্দেশক হলো প্রতিদিনের স্বাভাবিক কাজগুলো অনায়াসে করতে পারা। যেমন—প্রচণ্ড ক্লান্তি বা শ্বাসকষ্ট ছাড়া এক বা দুই তলা সিঁড়ি বেয়ে উঠে যাওয়া কিংবা টানা ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটার ক্ষমতা থাকা ভালো শারীরিক ফিটনেসের লক্ষণ।

নিজে নিজে ওষুধ খাওয়া বা সমস্যাকে বয়সের দোহাই দিয়ে চেপে রাখা বিপজ্জনক। সামান্য শ্বাসকষ্টকে হেলাফেলা না করে সময়মতো সঠিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান। আপনার সচেতনতাই পারে আপনার হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখতে এবং জীবনকে সুরক্ষিত রাখতে।