শক্তির ভাণ্ডার

শরীফুল আলম
প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬, ১২:৩৭ এএম
আপডেট: ০৪ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৩৬ পিএম
Main News Image

ভালোবাসার নাটক আমরা সবাই করি। কখনো নিজের সঙ্গে, কখনো অন্যের সঙ্গে। অথচ প্রশ্নটি থেকেই যায় এই পৃথিবীতে ভালোবাসা বলে সত্যিই কি কোনো কিছুর অস্তিত্ব আছে, নাকি আমরা প্রত্যেকে তার নিজস্ব একটি কল্পিত সংস্করণ বহন করে বেড়াই?

মানুষ আসক্তি থেকে বেরিয়ে আসতে পারে, অভ্যাসও ভাঙতে পারে। তবে তার জন্য প্রয়োজন নির্ভরতার কাঠামো বদলে যাওয়া। কারণ মানুষ কখনো কেবল মানুষকে আঁকড়ে ধরে না; সে আঁকড়ে ধরে স্মৃতি, নিরাপত্তা, প্রত্যাশা এবং নিজের ভেতরে তৈরি করে নেওয়া এক অদৃশ্য পৃথিবীকে।

আমার প্রায়ই মনে হয়, কিছু মানুষকে দেখলেই যেন জীবনের আহ্বান শোনা যায়। আবার কিছু মানুষকে দেখলেই মনে হয়, তারা নিঃশব্দ এক নিষেধের ভাষা বহন করছে। মানুষকে চেনার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় সম্ভবত তার মুখ নয়, তার ভঙ্গি। মানুষ তার উচ্চারণের চেয়ে বেশি প্রকাশিত হয় তার নীরবতায়, তার দৃষ্টিতে, তার থেমে যাওয়ার ভেতরে। এটি কোনো চূড়ান্ত সত্য নয়, কেবল দীর্ঘদিনের একটি ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ।

আবার কিছু মানুষ আছে, যারা অর্ধেক ইশারা করেই থেমে যায়। তাদের কথার ব্যাকরণ বোঝা কঠিন। তাদের বাক্যে যেন দাঁড়ির আধিক্য, কিন্তু কমার অনুপস্থিতি। মনে হয় তারা কথা শেষ করে না, শুধু অসমাপ্ত রেখে চলে যায়। আর অসমাপ্ত বাক্যের মতো অসমাপ্ত সম্পর্কও মানুষের ভেতরে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে।

একটি জীবন আমাদের হাতে এসেছে। এই এক জীবনের ভেতর বহু জীবন বাঁচার সুযোগ নেই। তাই কিছু মানুষ হারিয়ে যাবে, কিছু সম্পর্ক বদলে যাবে, কিছু স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে যাবে এটাই জীবনের স্বাভাবিক নিয়তি। সব গল্পের সমাপ্তি একসঙ্গে লেখা হয় না।

ভালোবাসা শুধু আকর্ষণের নাম নয়; ভালোবাসা আশ্রয়েরও নাম, প্রশান্তিরও নাম। যে সম্পর্ক আপনাকে শান্তি দেয় না, সে সম্পর্ক যতই উজ্জ্বল হোক, তার ভেতরে পূর্ণতা থাকে না।

আমার পর্যবেক্ষণে, ভালোবাসা এখনো পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর শক্তিগুলোর একটি। কিন্তু যে ভালোবাসার কোনো প্রকাশ নেই, সে ভালোবাসা শেষ পর্যন্ত নিজের অস্তিত্বই প্রশ্নবিদ্ধ করে। অনুভূতি প্রকাশের মধ্যেই তার প্রাণ। যদিও বাঙালির ভালোবাসা অনেক সময় উচ্চারিত হয় না; নীরবতায়, অপেক্ষায়, কিংবা অনুচ্চারিত যত্নের মধ্যেই তার উপস্থিতি টের পাওয়া যায়।

জাপানি লেখক হারুকি মুরাকামির একটি উপন্যাসে পড়েছিলাম “কিছু মানুষ ভালোবেসে কুয়ার তলে হারিয়ে যায়, আবার কিছু মানুষ ভালোবেসে হঠাৎ উধাও হয়ে যায়; তারা এমন এক নারীর প্রেমে পড়ে, যার কোনো অস্তিত্বই নেই।” এই কথার ভেতরে হয়তো ভালোবাসার সবচেয়ে গভীর ট্র্যাজেডি লুকিয়ে আছে। মানুষ কখনো বাস্তবকে নয়, নিজের কল্পনাকেই ভালোবেসে বসে।

তবু ভালোবাসা কখনো পুরোপুরি পরিত্যক্ত হয় না। যাকে ছেড়ে এসেছি, তাকে ভুলতে না পারার মধ্যেও এক ধরনের নির্মল ভালোবাসা থেকে যায়। স্মৃতি কখনো কখনো বিচ্ছেদের চেয়েও দীর্ঘজীবী হয়।

আপনি যদি ভালোবাসতেই জানেন, তবে ভালোবাসার ভাষা জানবেন না এটি বিশ্বাস করা কঠিন। কারণ অনুভূতি প্রকাশ না করলে তা ধীরে ধীরে নিজের ভেতরেই নিঃশেষ হয়ে যায়। মৃত মানুষকে দিয়ে যেমন নতুন সংলাপ শুরু করানো যায় না, তেমনি দীর্ঘ নীরবতা অনেক সম্পর্ককেও ধীরে ধীরে মৃত করে ফেলে।

আমি লক্ষ্য করেছি, কিছু মানুষ সামান্য সময়েই মনোযোগ আকর্ষণ করে, আবার কিছু মানুষ অদ্ভুত গভীরতায় মানুষের ভেতরে জায়গা করে নেয়। এখানেই বোঝা যায়, প্রত্যেক মানুষ প্রত্যেক মানুষের জন্য উপযুক্ত নয়। সম্পর্কে মনোযোগ এক ধরনের বিনিয়োগ। যেখানে মনোযোগ নেই, সেখানে সম্পর্কও ধীরে ধীরে অবমূল্যায়িত হয়।

ঔদ্ধত্য সম্পর্কের সবচেয়ে নীরব দূরত্ব। আর ভালোবাসা মানে কেবল উপস্থিত থাকা নয়; প্রয়োজনের সময় সময় দেওয়া, ক্লান্তির মধ্যেও পাশে দাঁড়ানো। অনেক সময় নিজের ক্লান্তিকেও অতিক্রম করতে হয় সেই অতিক্রমণের নামই সম্পর্ক, সেই অতিক্রমণের নামই ভালোবাসা।

অর্ধেক মন দিয়ে কোনো সম্পর্ক টিকে না। পূর্ণ মন দিতে না পারলে ভালোবাসার দাবিও করা উচিত নয়। নিজেকে দুষ্প্রাপ্য প্রমাণ করা, চিরব্যস্ত থাকার অভিনয় করা কিংবা সময়ের অভাবকে অহংকারে পরিণত করা এসব কোনো পরিণত সম্পর্কের ভাষা নয়। এগুলো কেবল দূরত্ব তৈরির কৌশল।

আমরা প্রায় সবাই নিজের ভুল স্বীকার করতে অনীহ। অথচ নির্ভুল মানুষ বলে কেউ নেই। “আমি ভুল করি না” এই বাক্যের চেয়ে বড় আত্মপ্রবঞ্চনা খুব কমই আছে।

শেষ পর্যন্ত আমাদের সবার জীবনই সীমিত। আমাদের শক্তির ভাণ্ডারও অফুরন্ত নয়। তাই শক্তি, সময়, মনোযোগ এবং ভালোবাসা এই চারটি সম্পদ অপচয় করার মতো বিলাসিতা আমাদের নেই। যাদের সত্যিই প্রয়োজন, যাদের উপস্থিতিতে জীবন অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে, তাদের জন্যই এই শক্তি সযত্নে ব্যয় করা উচিত।

হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় প্রজ্ঞা এখানেই সবাইকে ভালোবাসা সম্ভব নয়, কিন্তু যাকে ভালোবাসি, তাকে পূর্ণ মন দিয়ে ভালোবাসা সম্ভব। আর যে ভালোবাসা আমাদের ভেতরে শান্তি, মর্যাদা এবং মানবিকতার আলো জ্বালিয়ে রাখে, সেই ভালোবাসাই শেষ পর্যন্ত আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তির ভাণ্ডার।