রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ: রাষ্ট্রের রূপান্তরের এক সন্ধিক্ষণ, নাকি দ. এশিয়ার গণতান্ত্রিক পুনর্বিন্যাস?

সহিদুল আলম স্বপন
প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬, ০৭:০৮ পিএম
আপডেট: ০৩ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৩৫ পিএম
Main News Image

মো. সাহাবুদ্দিন। ছবি: সংগৃহীত

রাষ্ট্রের ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যেগুলোকে কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যা করলে তার প্রকৃত তাৎপর্য ধরা পড়ে না। একটি পদত্যাগ, একটি নিয়োগ কিংবা একটি নির্বাচন অনেক সময় রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ শক্তির ভারসাম্য, সাংবিধানিক দর্শন এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীর পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগও সেই ধরনের একটি ঘটনা। এটি কেবল একজন রাষ্ট্রপ্রধানের বিদায় নয়; বরং এমন এক সন্ধিক্ষণ, যেখানে রাষ্ট্র, সংবিধান, গণতন্ত্র এবং জনগণের প্রত্যাশা নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।

তবে এই ঘটনাকে মূল্যায়নের আগে একটি মৌলিক নীতি স্মরণ রাখা জরুরি। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে রাজনৈতিক অভিযোগ, গোয়েন্দা সূত্রভিত্তিক দাবি বা জনপরিসরে প্রচলিত বক্তব্যকে বিচারিকভাবে প্রমাণিত সত্যের সমার্থক হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। রাষ্ট্রের নৈতিক শক্তি নির্ভর করে এই সক্ষমতার ওপর যে, সে অভিযোগ ও প্রমাণ, রাজনৈতিক বক্তব্য ও বিচারিক সিদ্ধান্তের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য বজায় রাখতে পারে। এই নীতিই আইনের শাসনের ভিত্তি এবং এই নীতির সুরক্ষাই একটি সভ্য গণতন্ত্রের প্রথম শর্ত।

এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের তাৎপর্য ব্যক্তিকে ঘিরে নয়; বরং রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা, রাজনৈতিক পরিপক্বতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকে কেন্দ্র করে মূল্যায়ন করা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ।

রাষ্ট্র কী, আর রাষ্ট্রপতি কে?: রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রাচীনতম আলোচনাগুলোতে একটি মৌলিক ধারণা বারবার ফিরে আসে রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তি নয়; রাষ্ট্র একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠান। ব্যক্তি আসে, ব্যক্তি যায়; কিন্তু রাষ্ট্র টিকে থাকে তার সংবিধান, প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিকদের সম্মিলিত চুক্তির ওপর।

রাষ্ট্রপতির পদ সেই স্থায়িত্বের প্রতীক। বাংলাদেশের সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত হলেও তাঁর সাংবিধানিক অবস্থান সীমিত নয়। তিনি রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতার প্রতীক, সংবিধানের রক্ষক হিসেবে শপথ গ্রহণকারী এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক মর্যাদার অধিকারী।

অতএব, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের প্রশ্নটি কেবল একটি পদ শূন্য হওয়ার প্রশ্ন নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা স্থিতিশীল, কতটা নিরপেক্ষ এবং কতটা সাংবিধানিকভাবে পরিণত তারও একটি পরীক্ষা।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে বলা যায় প্রাতিষ্ঠানিক সহনশীলতার পরীক্ষা। একটি রাষ্ট্রের শক্তি তখনই প্রমাণিত হয়, যখন গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পরিবর্তন সংঘাত ছাড়া, সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই সম্পন্ন হয়।

গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি নির্বাচন নয়, প্রতিষ্ঠান : দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাস একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয় নির্বাচন গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ, কিন্তু গণতন্ত্রের পূর্ণতা নয়।

গণতন্ত্র টিকে থাকে তখনই, যখন বিচারব্যবস্থা স্বাধীন থাকে, নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য হয়, সংবাদমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, বিরোধী মতের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ঊর্ধ্বে অবস্থান করে।

এই কারণেই বিশ্বের পরিণত গণতন্ত্রগুলোতে ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা বেশি।একজন রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে পারেন, একজন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন হারাতে পারেন, একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতার বাইরে যেতে পারে কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো যদি অক্ষুণ্ণ থাকে, তাহলে রাষ্ট্র দুর্বল হয় না। বরং শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরই রাষ্ট্রের শক্তির প্রমাণ হয়ে ওঠে।

দক্ষিণ এশিয়ার অভিজ্ঞতা: মিল ও অমিল : বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্রই গত কয়েক দশকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে বড় ধরনের পরীক্ষার মধ্য দিয়ে গেছে।

পাকিস্তানে বহুবার রাষ্ট্রপতি, সামরিক বাহিনী এবং নির্বাচিত সরকারের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতাকে বাধাগ্রস্ত করেছে। ফলে প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়েছে এবং জনগণের আস্থা বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

শ্রীলঙ্কা অর্থনৈতিক সংকটের সময় রাষ্ট্রপ্রধানের পদত্যাগ প্রত্যক্ষ করেছে। সেখানে দেখা গেছে, রাজনৈতিক বৈধতা হারালে সাংবিধানিক কাঠামো টিকিয়ে রাখা কত কঠিন হয়ে পড়ে।

নেপাল দীর্ঘ রাজনৈতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে নতুন সংবিধান ও নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে। তাদের অভিজ্ঞতা দেখায়, রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া সাংবিধানিক স্থিতিশীলতা অর্জন করা সম্ভব নয়।

ভারতের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। সেখানে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত হলেও সাংবিধানিক নিরপেক্ষতার ঐতিহ্য রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতাকে শক্তিশালী করেছে। ব্যক্তি নয়, প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থাই সেই ব্যবস্থার মূল ভিত্তি।

বাংলাদেশের সামনে এখন প্রশ্ন কোন পথটি অনুসরণ করবে? ব্যক্তি-কেন্দ্রিক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পথ, নাকি প্রতিষ্ঠান-কেন্দ্রিক গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পথ?

রাজনৈতিক বৈধতার নতুন সংজ্ঞা : আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে রাজনৈতিক বৈধতা কেবল ক্ষমতা অর্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং ক্ষমতার ব্যবহার কতটা সংবিধানসম্মত, জবাবদিহিমূলক এবং জনগণের আস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ তার ওপরও নির্ভর করে। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা কেবল উন্নয়ন বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে টিকে থাকে না। নাগরিকরা দেখতে চায় সকল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সমানভাবে আইনের অধীন কি না, সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা আছে কি না এবং রাজনৈতিক মতভেদের মধ্যেও সংবিধানের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকছে কি না। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ সেই বৃহত্তর প্রশ্নগুলোকেই সামনে নিয়ে এসেছে।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের গুরুত্ব : আজকের বিশ্বে বাংলাদেশের গুরুত্ব কেবল দক্ষিণ এশিয়ার একটি রাষ্ট্র হিসেবে নয়; বরং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদার হিসেবে ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সমুদ্রবন্দর, আঞ্চলিক যোগাযোগ, উৎপাদনশিল্প, জনসংখ্যাগত শক্তি এবং ভূ-কৌশলগত অবস্থানের কারণে বাংলাদেশকে ঘিরে আন্তর্জাতিক আগ্রহও বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই বাস্তবতায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কেবল অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক আস্থা, বৈদেশিক বিনিয়োগ, রপ্তানি, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং কূটনৈতিক সম্পর্কেরও অন্যতম ভিত্তি।

সুতরাং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে পরিবর্তন কীভাবে সম্পন্ন হয়, সেটি দেশের সীমানার বাইরেও গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষিত হওয়া স্বাভাবিক।

বাংলাদেশের সামনে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সুযোগ : প্রতিটি রাজনৈতিক পরিবর্তন একদিকে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে, অন্যদিকে সংস্কারের সুযোগও এনে দেয়। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ যদি কেবল একটি ব্যক্তি পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সীমিত হবে।

কিন্তু যদি এই ঘটনাকে উপলক্ষ করে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা, নিয়োগপ্রক্রিয়া, জবাবদিহিতা, নিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে একটি জাতীয় সংলাপ শুরু হয়, তাহলে সেটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে।

গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী সংসদ, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা, কার্যকর সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হয়।

রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ: ব্যক্তি নয়, নীতি : ইতিহাসে যেসব রাষ্ট্র দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা অর্জন করেছে, তাদের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে সেখানে ব্যক্তির চেয়ে নীতির মর্যাদা বেশি।ক্ষমতা পরিবর্তন হয়েছে, নেতৃত্ব পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু সংবিধান ও প্রতিষ্ঠান টিকে থেকেছে।

বাংলাদেশও যদি আগামী দিনে এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা নির্মাণ করতে পারে, যেখানে কোনো সাংবিধানিক পদ ব্যক্তি-নির্ভর নয়, বরং নীতি, প্রক্রিয়া এবং আইনের শাসনের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তাহলে এই পদত্যাগ একটি ইতিবাচক মোড় হিসেবে ইতিহাসে মূল্যায়িত হতে পারে।

ইতিহাস আমাদের কীভাবে স্মরণ করবে? : রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের তাৎপর্য শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে না তিনি কেন পদত্যাগ করলেন, কিংবা তার স্থলাভিষিক্ত কে হলেন এসব প্রশ্নে। ইতিহাস বরং মূল্যায়ন করবে, এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ তার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কতটা শক্তিশালী করতে পারল। আমরা কি ব্যক্তি-কেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে প্রতিষ্ঠান-কেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় এগোতে পারলাম?

আমরা কি রাজনৈতিক মতভেদের মধ্যেও সংবিধানকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিতে শিখলাম? আমরা কি আইনের শাসন, জবাবদিহিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতাকে রাজনৈতিক সুবিধার ঊর্ধ্বে স্থান দিতে পারলাম? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের আগামী অধ্যায়।

কারণ ইতিহাস কখনো কেবল ক্ষমতার পালাবদলকে স্মরণ করে না; ইতিহাস স্মরণ করে সেইসব জাতিকে, যারা সংকটের মুহূর্তকে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিতে রূপান্তর করতে পেরেছিল।

আজ বাংলাদেশের সামনে সেই সুযোগ উপস্থিত। এই সুযোগকে কতটা প্রজ্ঞা, সংযম এবং সাংবিধানিক দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজে লাগানো যায়, তার ওপরই নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কী ধরনের রাষ্ট্র উত্তরাধিকার হিসেবে পাবে।