হাসিনা কি ভারতের ‘ট্রাম্পকার্ড’, নাকি আস্থার পরীক্ষায় নয়াদিল্লি?

*সহিদুল আলম স্বপন, জেনেভা, সুইজারল্যান্ড *
প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬, ০৩:১৮ পিএম
আপডেট: ০৫ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৫৫ পিএম
Main News Image

একটি এআই নির্মিত ছবি

কূটনীতির একটি অলিখিত নিয়ম আছে প্রতিবেশীকে কখনো অস্বস্তিতে ফেলে স্থায়ী বন্ধুত্ব গড়ে তোলা যায় না। সাময়িক রাজনৈতিক সুবিধা হয়তো অর্জন করা যায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তার মূল্য দিতে হয় আস্থার সংকট, জনমতের দূরত্ব এবং কৌশলগত সম্পর্কের অবক্ষয়ের মাধ্যমে। বাংলাদেশ ও ভারতের বর্তমান সম্পর্ক ঠিক এমনই এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে গেছে। নতুন রাজনৈতিক পরিবেশে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রকাশ্য উপস্থিতি নিয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা নিছক একটি ব্যক্তিকে ঘিরে বিতর্ক নয়; বরং এটি দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের পারস্পরিক আস্থা, সার্বভৌমত্ব এবং কূটনৈতিক সংবেদনশীলতার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। এ কারণেই বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে ভারতের ভূখণ্ড যেন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্র না হয়।

এই অবস্থানকে কেবল রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি প্রতিষ্ঠিত নীতির প্রতিফলন। একটি রাষ্ট্রের ভূখণ্ড অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা তৈরির জন্য ব্যবহৃত হবে না এ প্রত্যাশা আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক চেতনাকেও প্রতিফলিত করে। বাংলাদেশ আজ সেই নীতিরই পুনরুচ্চারণ করেছে।

তবে এই ঘটনার আরেকটি মাত্রাও রয়েছে। বাংলাদেশের জনপরিসরে বারবার একটি প্রশ্ন ফিরে আসে ভারত কি শেখ হাসিনাকে একটি কৌশলগত সম্পদ বা রাজনৈতিক ‘ট্রাম্পকার্ড’ হিসেবে ধরে রাখতে চায়? প্রশ্নটির উত্তর প্রকাশ্যে হয়তো কেউ দেবে না। কিন্তু কূটনীতিতে অনেক সময় উত্তর শব্দে নয়, আচরণে প্রকাশ পায়। যদি কোনো পদক্ষেপ বা বার্তা প্রতিবেশী দেশের জনগণের মধ্যে এই ধারণা তৈরি করে যে তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পরোক্ষ প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা হচ্ছে, তবে সেটি দুই দেশের সম্পর্কের জন্য শুভ লক্ষণ নয়।

ভারতের সামনে আজ এক নতুন বাস্তবতা। গত এক দশকে নয়াদিল্লি ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির কথা বলেছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক দক্ষিণের নেতৃত্ব, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল এবং আঞ্চলিক সংযোগে নিজের ভূমিকা শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছে। এই বৃহত্তর কৌশল সফল করতে হলে প্রতিবেশীদের আস্থা অর্জন অপরিহার্য। কারণ প্রভাবশালী হওয়া আর বিশ্বাসযোগ্য হওয়া এক বিষয় নয়; দীর্ঘমেয়াদে বিশ্বাসযোগ্যতাই কৌশলগত শক্তির ভিত্তি।

বাংলাদেশও আগের বাংলাদেশ নয়। দ্রুত অর্থনৈতিক রূপান্তর, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক ভূকৌশলগত গুরুত্ব এবং বহুমাত্রিক বৈদেশিক সম্পর্কের কারণে দেশটি এখন আঞ্চলিক সমীকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ককে রাষ্ট্রের স্বার্থেই পরিচালিত করতে হবে।

এই বাস্তবতায় ভারতেরও একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে। তারা কি অতীতের রাজনৈতিক সমীকরণ ধরে রাখবে, নাকি বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সম্পর্ককে নতুন ভিত্তিতে দাঁড় করাবে? কারণ ইতিহাস বলে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের জনগণের আস্থা হারিয়ে কোনো আঞ্চলিক শক্তি দীর্ঘদিন প্রভাব ধরে রাখতে পারেনি।

অন্যদিকে বাংলাদেশেরও আবেগের পরিবর্তে আত্মবিশ্বাসী কূটনীতি অনুসরণ করা প্রয়োজন। প্রতিবেশী সম্পর্ক কখনোই একমুখী নয়। মতপার্থক্য থাকবে, স্বার্থের সংঘাতও থাকবে। কিন্তু সংলাপ, পারস্পরিক সম্মান এবং প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ অব্যাহত থাকলে সেই মতপার্থক্যকে সংকটে পরিণত হতে হয় না। বরং সেখান থেকেই নতুন সমঝোতার পথ তৈরি হয়।

বাংলাদেশ ও ভারতের সামনে আজ অভিন্ন চ্যালেঞ্জও কম নয়। সীমান্ত নিরাপত্তা, আন্তঃদেশীয় অপরাধ, জ্বালানি সহযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তন, আঞ্চলিক বাণিজ্য, নদী ব্যবস্থাপনা এবং বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক নিরাপত্তা এসব ক্ষেত্রেই দুই দেশের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা প্রয়োজন। এসব বাস্তব চ্যালেঞ্জের তুলনায় কোনো একক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে ঘিরে সম্পর্ককে আবর্তিত করা দুই দেশেরই কৌশলগত স্বার্থকে সংকুচিত করবে।

বিশ্ব রাজনীতিও দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান এবং মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিগুলো দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের সম্পৃক্ততা বাড়াচ্ছে। এই প্রতিযোগিতার মধ্যে বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে। ভারতের জন্যও একটি স্থিতিশীল, আত্মবিশ্বাসী ও সহযোগিতামূলক বাংলাদেশ কৌশলগতভাবে বেশি মূল্যবান, অবিশ্বাসে আক্রান্ত একটি বাংলাদেশ নয়।

দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাসে যেমন মতবিরোধ রয়েছে, তেমনি উল্লেখযোগ্য সাফল্যও রয়েছে। সীমান্ত চুক্তি, নিরাপত্তা সহযোগিতা, বিদ্যুৎ বাণিজ্য, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক সংযোগ এসব অর্জন প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে জটিল সমস্যারও সমাধান সম্ভব। এখন প্রয়োজন সেই সদিচ্ছাকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া।

কূটনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু বলে কিছু নেই; স্থায়ী থাকে জাতীয় স্বার্থ। সেই স্বার্থই আজ বাংলাদেশ ও ভারতকে আবারও একই টেবিলে বসার আহ্বান জানাচ্ছে। পারস্পরিক সন্দেহ নয়, পারস্পরিক আস্থা এই নীতিই হতে পারে ভবিষ্যতের সম্পর্কের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।

প্রশ্নটি তাই শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনাকে ঘিরে নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো দক্ষিণ এশিয়ার দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী রাষ্ট্র কি অতীতের রাজনৈতিক প্রতীকগুলোর বাইরে এসে ভবিষ্যতের কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে পারবে?

যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে শেখ হাসিনা বা অন্য কোনো ব্যক্তি আর কখনোই দুই দেশের সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু হবেন না। সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু হবে জনগণের স্বার্থ, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং পারস্পরিক সম্মান। আর সেটিই হবে বাংলাদেশ ও ভারতের জন্য সবচেয়ে টেকসই, সবচেয়ে পরিণত এবং সবচেয়ে দূরদর্শী পথ।