মেসির কান্না ও কোটি ভক্তের হৃদয় ভাঙার গল্প
বিশ্বকাপের মঞ্চে তখন বিষাদের কালো ছায়া। পর পর দু’বার বিশ্বজয়ের সোনালী স্বপ্ন চোখের সামনে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। স্পেনের কাছে ফাইনালে হেরে মাঠ ছেড়েছে আর্জেন্টিনা, আর সেই পরাজয়ের বেদনায় স্তব্ধ হয়ে গেছেন ফুটবল জাদুকর লিয়োনেল মেসি। ম্যাচজুড়ে নিষ্প্রভ থাকা মেসি অবশেষে সব নীরবতা ভেঙে মুখ খুললেন, ভাগ করে নিলেন তার ভেতরের গভীর ক্ষত।
হার স্বীকার ও কষ্টের অকপট প্রকাশ
ম্যাচ শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে নিজের ভেতরের কষ্টটা আর চেপে রাখতে পারেননি আর্জেন্টিনার অধিনায়ক। অত্যন্ত বিনয়ের সাথে স্পেনের শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিয়ে তিনি বলেন, "খুব দুঃখ হচ্ছে। তবে এ কথা বলতে পারি যে, আমরা আমাদের সেরাটা দিয়েছি। সত্যি বলতে, ওরা আমাদের থেকে ভালো খেলেছে। আমরা হেরেছি এবং এই হার স্বীকার করছি। তবে তার মানে এই নয় যে এতদিন যে ফুটবলটা আমরা খেলেছি, তা ভুলে যাব।"
পরাজয়ের চরম মুহূর্তেও নিজের সতীর্থদের এবং আর্জেন্টিনার সমস্ত নাগরিককে ধন্যবাদ জানাতে ভোলেননি ৩৯ বছর বয়সী এই মহানায়ক।
"তোমার কান্না আমাদেরও কাঁদায়..."
মেসি নিজের মুখে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎ বা অবসর নিয়ে সরাসরি কিছু না বললেও, আর্জেন্টিনা ফুটবল সংস্থার (AFA) একটি বার্তা বিশ্বজুড়ে কোটি ভক্তের চোখ ভিজিয়ে দিয়েছে। গলায় রানার্সের পদক ঝুলিয়ে, চোখে জল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মেসির একটি আবেগঘন ছবি পোস্ট করে তারা লিখেছে, "অধিনায়ক, তোমার কান্না আমাদেরকেও কাঁদায়। তুমি আমাদের জীবনের সেরা আনন্দ দিয়েছ। তোমার নিষ্ঠা, জাদু এবং দেশের হয়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তোমার লড়াইকে সেলাম। তোমাকে সারা জীবন আমরা ভালোবাসব লিয়ো। সব কিছুর জন্য ধন্যবাদ।"
ফুটবল সংস্থার এই পোস্ট ভক্তদের মনে গভীর শঙ্কা জাগিয়ে দিয়েছে—তবে কি আকাশি-সাদা জার্সিতে নিজের শেষ ম্যাচটি খেলে ফেললেন লিও? দেশের মাটিতে একটি প্রীতি ম্যাচ খেলে বিদায় নেওয়ার গুঞ্জন শোনা গেলেও, ভক্তদের হৃদয় এখন শুধুই এক বুক শূন্যতায় ভরা।
কোচের চোখে "সর্বকালের সেরা"
দলের এই চরম বিপর্যয়ের দিনেও শিষ্যের পাশ থেকে সরেননি মাস্টারমাইন্ড কোচ লিয়ানেল স্কালোনি। মেসিকে সান্ত্বনা দিয়ে এবং তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, বয়স শুধুই সংখ্যা: "এখন ওর ৩৯ বছর বয়স। ও এক কথায় অবিশ্বাস্য।"
চিরন্তন স্বাধীনতা: "মেসি যতদিন চায় খেলে যেতে পারে। সব সমর্থক ও সতীর্থ ওর পাশে থাকবে।"
সর্বকালের সেরা: "আমি নিশ্চিত প্রত্যেকে ওকে নিয়ে গর্বিত। ও যা অর্জন করেছে, তাতে ও নিঃসন্দেহে বিশ্বের সর্বকালের সেরা ফুটবলার।"
ইতিহাসের এক বেদনাবিধুর অধ্যায়
ফুটবলের খাতা হয়তো ট্রফি আর মেডেলের হিসাব রাখে, কিন্তু মানুষের হৃদয় হিসাব রাখে ভালোবাসার। আমেরিকার মাটিতে ফাইনালে হেরে হয়তো ট্রফি উঁচিয়ে ধরা হলো না, ট্রাম্পের উপস্থিতিতে বিশ্বমঞ্চে হয়তো শেষটা হলো কান্না দিয়ে; কিন্তু ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে লিয়োনেল মেসি চিরকাল এক অপরাজেয় সম্রাট হয়েই থাকবেন। তাঁর এই অশ্রু কোনো পরাজয়ের গ্লানি নয়, বরং ফুটবলের ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর ও বেদনাবিধুর এক মহাকাব্যের সমাপ্তি।