তুমি যাহা চাও
ফুলের সঙ্গে মানুষের একটি মৌলিক পার্থক্য আছে। মানুষ কথা বলে, অথচ তার অন্তরের অধিকাংশ কথাই অব্যক্ত থেকে যায়। আর ফুল কোনো কথা বলে না, তবু তার প্রতিটি পাপড়িতে লেখা থাকে হাজারো নীরব গল্প। মানুষকে মনে রাখার জন্য অসংখ্য কারণের প্রয়োজন হয়, কিন্তু একটি ফুলকে ভালোবাসার জন্য কোনো যুক্তির দরকার হয় না। সৌন্দর্য কখনো কখনো যুক্তির ঊর্ধ্বে অবস্থান করে।
যে মানুষ আপনাকে তার জীবনের কিছু সময় উপহার দেয়, সে আসলে তার জীবনেরই একটি অংশ আপনার হাতে তুলে দেয়। সময়ই মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ; কারণ একবার চলে গেলে তা আর ফিরে আসে না। তাই সময় দেওয়া মানেই বিশ্বাসের একটি অংশ অর্পণ করা।
প্রেম কিংবা ভালোবাসা যে নামেই ডাকি না কেন তার পরিণতি যদি সমর্পণে না পৌঁছায়, তবে তা পূর্ণতা পায় না। আমার কাছে প্রেম কেবল একটি আবেগ নয়; এটি এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশীলন, আত্মিক পরিশীলন এবং অস্তিত্বের গভীর উপলব্ধি। সবাই প্রেমে পড়তে পারে, কিন্তু সবাই ভালোবাসতে পারে না। কারণ ভালোবাসা অধিকার শেখায় না, শেখায় আত্মসমর্পণ।
ফুল যেমন সৌন্দর্যের প্রতি পক্ষপাতী, মানুষও তেমনি সৌন্দর্যের মোহে আবদ্ধ। আর একজন নারী যখন সত্যিকার অর্থে প্রেমে পড়েন, তখন তার অনুভূতির গভীরতা অনেক সময় যুক্তির সীমানা অতিক্রম করে যায়। তিনি তখন কেবল একজন নারী নন; তিনি রাধা, তিনি মীরাবাঈ প্রেমের এক চিরন্তন প্রতীক। নারীর মন তার শরীরের মতোই রহস্যময় ও জটিল। সেই রহস্যের কারণেই প্রাচীন শাস্ত্রে বলা হয়েছে “দেবা ন জানন্তি, কুতো মনুষ্যাঃ” দেবতারাও যার অন্তর সম্পূর্ণরূপে উপলব্ধি করতে পারেন না, সেখানে মানুষের সীমাবদ্ধতা তো অনিবার্য।
তবে ফুলের মতো নির্মল বন্ধুত্ব কিংবা ভালোবাসার মর্যাদা সবাই রক্ষা করতে পারে না। এ সত্য যতটা বেদনাদায়ক, ততটাই অনিবার্য। জীবনের এই পর্যায়ে এসে আমি বুঝেছি অনেকের কাছে কাঙ্ক্ষিত হওয়া আর কারও অধিকারে চলে যাওয়া এক বিষয় নয়। আমাকে সম্পূর্ণভাবে আয়ত্ত করা সহজ নয়, কারণ আমি শিখেছি ঘোলা চোখে স্বপ্ন দেখতে নেই। আমি এটাও জানি, সব সম্পর্ক আশ্রয় দেয় না, সব গল্প সুখের পরিসমাপ্তি পায় না, আর সব প্রতিশ্রুতির শেষ প্রান্তে অপেক্ষা করে না বিশ্বস্ততা।
ইদানীং আকাশ আমাকে অদ্ভুতভাবে টানে। কোনো নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই দীর্ঘ সময় তার দিকে তাকিয়ে থাকি। হয়তো এটি বয়সের পরিবর্তন নয়, বরং উপলব্ধির বিবর্তন। বাস্তবতার সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে আমার নীরব প্রতিবাদ।
আমাদের মস্তিষ্ক চিন্তার জন্ম দেয়, কিন্তু সত্য সৃষ্টি করে না। সত্য মানুষের আবিষ্কারের অপেক্ষায় থাকে; মস্তিষ্ক কেবল সেই সত্যকে চিনে নেওয়ার ক্ষমতা দেয়। সিদ্ধান্ত, শেষ পর্যন্ত, মানুষকেই নিতে হয়।
পাথর সবাই দেখে, কিন্তু একজন ভূতত্ত্ববিদ তার স্তরে স্তরে লক্ষ বছরের ইতিহাস পড়ে ফেলেন। আকাশ সবাই দেখে, কিন্তু একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী সেখানে মহাবিশ্বের ভাষা শোনেন। পার্থক্য চোখে নয়, দৃষ্টিতে; জ্ঞানে নয়, উপলব্ধিতে।
মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য হলো, যা তার হাতে আছে তার মূল্য বোঝার আগেই সে যা নেই তার হিসাব কষতে শুরু করে। অপূর্ণতার এই অনন্ত অঙ্ক কষতে কষতেই জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান প্রাপ্তিগুলো অদৃশ্য হয়ে যায়। তখন মনে পড়ে সেই চিরন্তন সত্য শেষ হয়ে গিয়েও অনেক কিছু যেন শেষ হয় না।
একটি গোলাপের সৌন্দর্যে কেউ মুগ্ধ হয়, আবার কেউ তার কাঁটা নিয়ে অভিযোগ তোলে। অথচ গোলাপ কখনোই প্রতিশ্রুতি দেয়নি যে সে কাঁটাহীন হবে। মানুষও ঠিক তেমনি। শত গুণের ভেতর আমরা একটি ত্রুটিকেই বড় করে দেখি। এই একপেশে দৃষ্টিভঙ্গিই হয়তো মানুষের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।
নিখুঁত মানুষ খুঁজতে গিয়ে মানুষ আসলে কোনো মানুষকে খোঁজে না; সে খোঁজে নিজের কল্পনায় নির্মিত এক অবাস্তব চরিত্রকে। অথচ অসম্পূর্ণতাই মানুষের সবচেয়ে স্বাভাবিক এবং সবচেয়ে সুন্দর পরিচয়।
জীবনও ফুলের বাগানের মতো। সব ফুল সুগন্ধ ছড়ায় না, সব তারা পথ দেখায় না। তেমনি সব মানুষও আমাদের জন্য আসে না। কেউ আসে আনন্দের ঋতু হয়ে, কেউ আসে বেদনার শিক্ষক হয়ে। কিন্তু প্রত্যেকেই কিছু না কিছু রেখে যায় একটি শিক্ষা, একটি স্মৃতি কিংবা একটি উপলব্ধি।
শেষ পর্যন্ত ভালোবাসার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় অধিকার নয়, মুক্তিতে। তাই বিদায়ের মুহূর্তেও যার মঙ্গল কামনা করা যায়, সেই ভালোবাসাই হয়তো সবচেয়ে নির্মল ভালোবাসা।
এই কারণেই বারবার ফিরে আসতে ইচ্ছে করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই অমর পঙ্ক্তিতে-
“যদি আর কারে ভালোবাস,
যদি আর ফিরে নাহি আস,
তবে তুমি যাহা চাও,
তাই যেন পাও।”