৩৬ জুলাই’-এর শিক্ষা: গণতন্ত্র, রাষ্ট্রনীতি ও দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভবিষ্যৎ
‘৩৬ জুলাই’ কোনো বাস্তব ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়। এটি এমন এক প্রতীকী রাজনৈতিক রূপক, যা রাষ্ট্র ও জনগণের সম্পর্কের সংকট, গণতান্ত্রিক প্রত্যাশা, পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা এবং ইতিহাসের সন্ধিক্ষণকে ধারণ করে। এই নিবন্ধে ‘৩৬ জুলাই’কে একটি প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা, দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনীতি এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বভিত্তিক কূটনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হয়েছে।
ইতিহাসের ক্যালেন্ডারে এমন অনেক দিন আছে, যেগুলো শুধু একটি ঘটনার স্মারক নয়; বরং একটি জাতির রাজনৈতিক চেতনা, রাষ্ট্রদর্শন এবং ভবিষ্যৎ পথচলার মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে। আবার এমন কিছু প্রতীকও আছে, যেগুলো কোনো বাস্তব তারিখ নয়, কিন্তু সমাজের অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক উপলব্ধিকে ধারণ করার ক্ষমতায় ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে। ‘৩৬ জুলাই’ সেই ধরনের একটি রূপক। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে রাষ্ট্রের শক্তি কখনোই কেবল প্রশাসনিক কাঠামো বা অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না; তার প্রকৃত ভিত্তি হলো জনগণের আস্থা, গণতান্ত্রিক বৈধতা এবং ন্যায়ভিত্তিক শাসন।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি ছিল স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার। এই আদর্শের ওপর দাঁড়িয়েই স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম। কিন্তু স্বাধীনতার পর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিযাত্রায় আমরা যেমন উন্নয়নের উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখেছি, তেমনি রাজনৈতিক মেরুকরণ, আস্থার সংকট, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সীমাবদ্ধতাও প্রত্যক্ষ করেছি। ফলে আজকের বাংলাদেশকে বোঝার জন্য শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান যথেষ্ট নয়; রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সক্ষমতা, সামাজিক সংহতি এবং নাগরিক অংশগ্রহণের গভীরতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশ্ব রাজনীতিও এখন এক নতুন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী একমেরুকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ক্রমশ বহুমেরুকেন্দ্রিক কাঠামোয় রূপ নিচ্ছে। প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা, সরবরাহ শৃঙ্খলের পুনর্বিন্যাস, জ্বালানি নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, সাইবার নিরাপত্তা এবং সামুদ্রিক যোগাযোগপথের গুরুত্ব রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্রনীতিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুগুলোর একটি হলো দক্ষিণ এশিয়া ও বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান তাকে একই সঙ্গে সুযোগ এবং দায়িত্ব দুই-ই দিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থান, বঙ্গোপসাগরের প্রবেশদ্বার, ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি এবং তরুণ জনগোষ্ঠী এই চারটি উপাদান বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক শক্তি এবং বহির্বিশ্বে কৌশলগত কূটনীতির মধ্যে একটি অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।
অনেক সময় উন্নয়ন ও গণতন্ত্রকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। বাস্তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। টেকসই উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন অর্থনৈতিক অগ্রগতি, আইনের শাসন, জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যম এবং নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পরস্পরকে শক্তিশালী করে। উন্নয়নের অবকাঠামো নির্মাণ করা যায় তুলনামূলকভাবে দ্রুত; কিন্তু গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণ একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। এই কারণেই রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা গণতন্ত্রকে কোনো গন্তব্য নয়, বরং একটি চলমান যাত্রা বলে অভিহিত করেন।
দক্ষিণ এশিয়ার অভিজ্ঞতাও একই শিক্ষা দেয়। এই অঞ্চলের বিভিন্ন রাষ্ট্রে কখনো রাজনৈতিক পরিবর্তন, কখনো সাংবিধানিক সংকট, কখনো অর্থনৈতিক রূপান্তর আবার কখনো জনআন্দোলন প্রতিটি ঘটনাই একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে: জনগণের অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক আস্থা ছাড়া স্থিতিশীল উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হয় না। অর্থনীতি রাষ্ট্রকে সমৃদ্ধ করতে পারে, কিন্তু গণতন্ত্র রাষ্ট্রকে বৈধতা দেয়। আর এই দুইয়ের সমন্বয়ই একটি দেশের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার মূল ভিত্তি।
‘৩৬ জুলাই’-এর প্রতীকী শিক্ষা তাই কেবল অতীতের কোনো অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন নয়; এটি ভবিষ্যতের রাষ্ট্রচিন্তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। এই শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি নাগরিকের সম্মতিতে, প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতায় এবং এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নিহিত, যেখানে মতপার্থক্য সংঘাতের কারণ নয়, বরং নীতিনির্ধারণের সম্পদ।
আজ বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো কীভাবে অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক শক্তিকে আরও সুসংহত রেখে পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় একটি কার্যকর, ভারসাম্যপূর্ণ এবং দূরদর্শী পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তোলা যায়। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আমাদের ফিরে তাকাতে হবে দক্ষিণ এশিয়ার অভিজ্ঞতার দিকে, মূল্যায়ন করতে হবে আমাদের নিজস্ব রাজনৈতিক যাত্রাকে এবং বুঝতে হবে যে গণতন্ত্র ও কূটনীতি একে অপরের বিকল্প নয়; বরং পরস্পরের শক্তিবর্ধক দুটি স্তম্ভ।
গণতন্ত্রের শক্তি: রাষ্ট্রের বৈধতা ও জনগণের আস্থা
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি মৌলিক সত্য হলো রাষ্ট্রের ক্ষমতা শুধু সংবিধান, আইন কিংবা প্রশাসনিক কাঠামো থেকে আসে না; তার প্রকৃত বৈধতা আসে জনগণের সম্মতি থেকে। নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠিত হতে পারে, কিন্তু গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি নিহিত থাকে নাগরিকের আস্থা, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন এবং মতপ্রকাশের নিশ্চয়তায়। এই চারটি ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়লে অর্থনৈতিক সাফল্যও দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা দিতে পারে না।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী ইতিহাসে গণতন্ত্র কখনো বিকশিত হয়েছে, কখনো বাধাগ্রস্ত হয়েছে। সামরিক শাসন, রাজনৈতিক সংঘাত, নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস এসব বাস্তবতা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশকে বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। একই সময়ে দেশের অর্থনীতি, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং অবকাঠামো খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিও হয়েছে। এই দ্বৈত বাস্তবতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয় উন্নয়ন ও গণতন্ত্রকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, বরং পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে দেখতে হবে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণআন্দোলন, যে দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখা হোক না কেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি শুধু একটি নির্দিষ্ট ইস্যুকে ঘিরে জনসমাবেশ ছিল না; বরং তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা, নাগরিক অংশগ্রহণ এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক নিয়ে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করেছিল। গণআন্দোলনের প্রতিটি পর্বেই যেমন আবেগ থাকে, তেমনি থাকে রাষ্ট্র পরিচালনা, ন্যায়বিচার, জবাবদিহি এবং অংশগ্রহণমূলক শাসন নিয়ে গভীর বার্তা। সেই অর্থেই ‘প্রতীকী ৩৬ জুলাই’ আমাদের মনে করিয়ে দেয় কোনো রাষ্ট্র যদি তার নাগরিকদের কণ্ঠ যথাসময়ে শুনতে না পারে, তাহলে সেই কণ্ঠ একসময় বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়।
তবে গণতন্ত্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো জনআকাঙ্ক্ষাকে টেকসই নীতিতে রূপান্তর করতে হলে প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। আন্দোলন পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে, কিন্তু স্থায়ী পরিবর্তন নিশ্চিত করে সংবিধানসম্মত প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, দক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং রাজনৈতিক সংলাপের সংস্কৃতি। এই কারণেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তি বা দলের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের সামনে আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক আস্থা পুনর্গঠন। আস্থা শুধু সরকারের প্রতি নয়, বিরোধী রাজনীতি, নির্বাচন, বিচারব্যবস্থা, গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের প্রতিও সমানভাবে প্রযোজ্য। কারণ রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন নাগরিক বিশ্বাস করেন যে ভিন্নমত প্রকাশ করলেও আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য থাকবে এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হবে।
দক্ষিণ এশিয়ার অভিজ্ঞতা: সংকট থেকে শিক্ষা
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বিচ্ছিন্ন নয়। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ গত কয়েক দশকে রাজনৈতিক অস্থিরতা, গণআন্দোলন, সাংবিধানিক পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে। কোথাও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয়েছে, কোথাও আবার রাজনৈতিক মেরুকরণ নতুন সংকট সৃষ্টি করেছে। তবে একটি অভিন্ন শিক্ষা স্পষ্ট যেসব দেশ অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থা, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক সংলাপকে গুরুত্ব দিয়েছে, তারা দীর্ঘমেয়াদে তুলনামূলকভাবে বেশি স্থিতিশীলতা অর্জন করেছে।
দক্ষিণ এশিয়ার সামনে আজ যে চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য নিরাপত্তা, জ্বালানি সংকট, কর্মসংস্থান, অভিবাসন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিগত বৈষম্য সেগুলোর কোনোটিই একক রাষ্ট্রের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। তাই আঞ্চলিক সহযোগিতা এখন আর কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; এটি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভৌগোলিক অবস্থান, জনমিতিক সুবিধা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক সম্ভাবনা বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা দুই-ই সমানভাবে জরুরি।
গণতন্ত্র ও উন্নয়ন: দ্বন্দ্ব নয়, সমন্বয়
অনেক সময় বলা হয়, উন্নয়নের জন্য শক্তিশালী রাষ্ট্র দরকার, আর শক্তিশালী রাষ্ট্র মানেই কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা। বাস্তবে ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে। বিশ্বের সফল রাষ্ট্রগুলোর অভিজ্ঞতা দেখায়, টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন দক্ষ প্রশাসনের পাশাপাশি জবাবদিহিমূলক শাসন, নীতির ধারাবাহিকতা এবং আইনের শাসন। যেখানে নাগরিকের অধিকার সুরক্ষিত থাকে, বিনিয়োগকারীরা আস্থা পায়, বিচারব্যবস্থা নিরপেক্ষ থাকে এবং নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা থাকে সেখানেই অর্থনৈতিক অগ্রগতি দীর্ঘস্থায়ী হয়।
বাংলাদেশ আগামী এক দশকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য শুধু অবকাঠামো নির্মাণ বা শিল্পায়ন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ, যেখানে নীতি দীর্ঘমেয়াদি হবে, প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হবে এবং বিনিয়োগকারী ও নাগরিক উভয়েই ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আস্থা রাখতে পারবেন।
সেই অর্থে ‘প্রতীকী ৩৬ জুলাই’-এর শিক্ষা হলো গণতন্ত্রকে কেবল ভোটের দিনে সীমাবদ্ধ না রেখে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে অংশগ্রহণ, জবাবদিহি এবং ন্যায়বিচারের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। কারণ রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার নাগরিকদের বিশ্বাসে, আর সেই বিশ্বাস অর্জনের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, সংবিধানসম্মত এবং জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা।
ভূরাজনীতির নতুন বাস্তবতা: বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান
একবিংশ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক রাজনীতি আর কেবল সামরিক শক্তির প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ নয়। এখন প্রতিযোগিতা হচ্ছে বাণিজ্যপথ, প্রযুক্তি, জ্বালানি, সমুদ্র, তথ্যপ্রবাহ, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ঘিরে। দক্ষিণ এশিয়া এবং বিশেষ করে বঙ্গোপসাগর এই পরিবর্তিত ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এখন শুধু মানচিত্রের একটি অবস্থান নয়; এটি একটি কৌশলগত সম্পদ।
বাংলাদেশ এমন এক অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত। এই অবস্থান দেশের জন্য যেমন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে, তেমনি পররাষ্ট্রনীতিকে আরও বিচক্ষণ, ভারসাম্যপূর্ণ এবং দূরদর্শী করার প্রয়োজনীয়তাও বাড়িয়েছে। কারণ বর্তমান বিশ্বে ছোট ও মাঝারি আকারের রাষ্ট্রগুলোর সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করে তারা কতটা দক্ষতার সঙ্গে বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে পারে।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক ঐতিহ্য ছিল সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়। এই নীতির মূল শক্তি ছিল ভারসাম্য। আজও সেই ভারসাম্যের গুরুত্ব কমেনি। তবে বর্তমান বাস্তবতায় এর অর্থ আরও বিস্তৃত। এখন ভারসাম্য বলতে বোঝায় অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের বৈচিত্র্য, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, আঞ্চলিক সংযোগ, জলবায়ু কূটনীতি, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতাকে একসূত্রে গাঁথা।
বাংলাদেশকে তাই এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে হবে, যেখানে জাতীয় স্বার্থ হবে একমাত্র স্থির নির্দেশক। কোনো বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতায় পক্ষ হয়ে নয়, বরং সবার সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রেখে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, শিক্ষা, জলবায়ু অভিযোজন এবং অবকাঠামো উন্নয়নে সর্বোচ্চ সুবিধা অর্জনই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
কৌশলগত অংশীদারিত্ব: প্রতিযোগিতা নয়, সহযোগিতার দর্শন
বর্তমান বিশ্বে কৌশলগত অংশীদারিত্বের অর্থ শুধু প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নয়। এটি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, গবেষণা, জ্বালানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের একটি সমন্বিত কাঠামো। বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত অংশীদারিত্বের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি বহুমাত্রিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, যা দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক স্বাধীনতাকে আরও শক্তিশালী করবে।
দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতা দীর্ঘদিন নানা রাজনৈতিক কারণে প্রত্যাশিত গতি পায়নি। অথচ এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে আন্তঃবাণিজ্যের পরিমাণ বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এখনও কম। যোগাযোগ অবকাঠামো, বিদ্যুৎ বিনিময়, রেল ও নৌসংযোগ, ডিজিটাল অর্থনীতি, পর্যটন এবং শিক্ষা সহযোগিতার মাধ্যমে এই ঘাটতি অনেকাংশে পূরণ করা সম্ভব। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এই সহযোগিতার অন্যতম কেন্দ্র হতে পারে।
একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে নীল অর্থনীতির সম্ভাবনা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সামুদ্রিক সম্পদ, টেকসই মৎস্য ব্যবস্থাপনা, সমুদ্রভিত্তিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সামুদ্রিক গবেষণা এবং বন্দরকেন্দ্রিক অর্থনীতি এসব ক্ষেত্র আগামী কয়েক দশকে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির নতুন ভিত্তি হতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন দক্ষ নীতিনির্ধারণ, আঞ্চলিক সমন্বয় এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব।
জলবায়ু কূটনীতি ও মানবিক নেতৃত্ব
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। কিন্তু একই সঙ্গে জলবায়ু অভিযোজন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক সহনশীলতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছে। এই অভিজ্ঞতাকে কূটনৈতিক সম্পদে পরিণত করা সম্ভব।
ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশগত ইস্যু থাকবে না; এটি খাদ্য নিরাপত্তা, অভিবাসন, অর্থনীতি এবং নিরাপত্তার প্রশ্নেও কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করবে। তাই জলবায়ু কূটনীতিতে বাংলাদেশ আঞ্চলিক নেতৃত্বের একটি কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। একইভাবে মানবিক সহায়তা, শান্তিরক্ষা কার্যক্রম এবং টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের ইতিবাচক ভূমিকা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পারে।
ভবিষ্যতের বাংলাদেশ: গণতন্ত্র ও কূটনীতির সমন্বিত দর্শন
‘প্রতীকী ৩৬ জুলাই’-এর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো রাষ্ট্রের শক্তি ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণে নয়, বরং নাগরিকের আস্থা অর্জনে। একটি আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র সমালোচনাকে ভয় পায় না; বরং তা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেকে আরও শক্তিশালী করে। গণতন্ত্রের উদ্দেশ্য শুধু সরকার গঠন নয়; এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা, যেখানে মতভিন্নতা সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই সমাধানের পথ খুঁজে পায়।
বাংলাদেশের আগামী দিনের রাষ্ট্রনীতি তিনটি মৌলিক ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারে। প্রথমত, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে আরও কার্যকর, স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক করা। দ্বিতীয়ত, জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা বৃদ্ধি। তৃতীয়ত, ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়া ও বৃহত্তর এশিয়ায় সহযোগিতা, সংযোগ এবং পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ গড়ে তোলা।
জাতীয় ঐকমত্যও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনৈতিক রূপান্তর, জলবায়ু অভিযোজন, শিক্ষা এবং রাষ্ট্রের মৌলিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশ্নে দলীয় প্রতিযোগিতার ঊর্ধ্বে একটি ন্যূনতম ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা গেলে বাংলাদেশের উন্নয়নের ভিত্তি আরও সুদৃঢ় হবে। উন্নত গণতন্ত্রগুলোর অভিজ্ঞতা বলে, সরকার পরিবর্তিত হলেও রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল অপরিবর্তিত থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেই রাজনৈতিক পরিপক্বতা অর্জন সময়ের দাবি।
‘প্রতীকী ৩৬ জুলাই’ কোনো অতিরিক্ত ক্যালেন্ডারের দিন নয়; এটি একটি রাজনৈতিক আত্মসমালোচনার আয়না। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে জনগণের আকাঙ্ক্ষা, রাষ্ট্রের বৈধতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এই তিনটি একে অপরের পরিপূরক। একটিকে দুর্বল করে অন্যটিকে দীর্ঘস্থায়ী করা যায় না।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণআন্দোলনের অভিজ্ঞতা, যে ব্যাখ্যাতেই দেখা হোক না কেন, বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ককে আরও আস্থাভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং জবাবদিহিমূলক করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তুলতে হবে, যা জাতীয় স্বার্থকে সর্বাগ্রে রেখে বহুমাত্রিক কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তুলবে।
বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনার অভাব নেই। ভৌগোলিক অবস্থান, তরুণ জনগোষ্ঠী, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা সব মিলিয়ে দেশটি আগামী দশকগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে গণতন্ত্রকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক, উন্নয়নকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং কূটনীতিকে আরও দূরদর্শী করতে হবে।
রাষ্ট্রের ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত আসে, যা কেবল অতীতকে স্মরণ করার জন্য নয়, ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ‘প্রতীকী ৩৬ জুলাই’ তেমনই একটি মুহূর্ত। যদি আমরা এর শিক্ষা গ্রহণ করে গণতন্ত্র, সুশাসন, জাতীয় ঐকমত্য এবং কৌশলগত দূরদর্শিতার সমন্বয়ে একটি আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারি, তবে সেটিই হবে সেই প্রতীকের প্রকৃত সার্থকতা যেখানে ইতিহাস কেবল স্মৃতি নয়, ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনাও হয়ে ওঠে।
(লেখক: সহিদুল আলম স্বপন, সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি। ইমেইল: shahidul.alam@bluewin.ch)