নোটাম: আকাশপথের দিকনির্দেশিকা

মুহাম্মদ মাহতাব উদ্দীন
প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬, ১২:৩৬ পিএম
আপডেট: ০৩ আগস্ট ২০২৬, ১১:১২ এএম
Main News Image

আধুনিক বিমান চলাচল ব্যবস্থায় নিরাপত্তা, পথ, কার্যক্রম সমন্বয় এবং তাৎক্ষণিক তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে ‘নোটাম’; বা নোটিশ ট্যু এয়ারমেন (Notice to Airmen) এক অনিবার্য বাস্তবতা। আকাশপথে প্রতিটি উড্ডয়ন যেন নির্ভুল, নিরাপদ এবং যথাপরিকল্পিত হয় সেটা নিশ্চিত করার জন্যই নোটাম এর ব্যবহার। এটি মূলত বৈমানিকদের জন্য একপ্রকার সতর্কবার্তা বা নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করে। তবে সময়ের সাথে সাথে এর ব্যবহার, ব্যপ্তি ও রাজনৈতিক তাৎপর্যও বিস্তৃত হয়েছে।

শব্দ সংক্ষেপণ ও পরিবর্ধন

প্রথাগতভাবে NOTAM শব্দটি মূলত ‘Notice to Airmen’ থেকে এসেছে। তবে ২০২১ সালে লিঙ্গ-সমতার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ) এটিকে ‘Notice to Air Missions’ করেছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি এফএএ আবার ‘Notice to Airmen’-এ ফিরে গেছে। এছাড়া ICAO-এর আন্তর্জাতিক নির্দেশিকায় এখনও ‘Notice to Airmen’ প্রচলিত। সে যাইহোক শব্দসংক্ষেপণটি অপরিবর্তিত থেকে গেছে সেই আগের মতোই ঘঙঞঅগ হিসেবে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

নোটামের উৎপত্তি বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে, যখন বিমান চলাচল দ্রুত সম্প্রসারিত হতে থাকে এবং বিভিন্ন দেশের আকাশসীমা ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের প্রয়োজন দেখা দেয়। প্রথমদিকে এটি ছিল শুধুই টেলিগ্রাফ বা রেডিও বার্তার মাধ্যমে প্রেরিত সংক্ষিপ্ত তথ্য যা কিনা বিমানচালক বা পাইলটদের জন্য জরুরি সতর্কতা হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

১৯৪৭ সালে আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (ICAO) গঠনের পর আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড নির্ধারণ করা হয় (অহহবী ১৫ অনুসারে)। এর মধ্যদিয়েই পরবর্তীতে নোটাম একটি আন্তর্জাতিক মানসম্মত কাঠামো পায়। সেই থেকেই এটি বিশ্বব্যাপী বিমান চলাচলের একটি অভিন্ন দিকনির্দেশিকা হিসেবে রূপ পায়। বিভিন্ন সামরিক ও বেসামরিক কারণে বিমানচলাচল কর্তৃপক্ষ নোটামের মাধ্যমে বিমানচালক ও বিমানপরিচালনা প্রতিষ্ঠান সমূহকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা, আকাশপথের সম্ভাব্য অবস্থা, ব্যবস্থায় পরিবর্তন, বিভিন্ন পরিকল্পনা ইত্যাদি বিষয়ে অবগত করে। এই নির্দেশনা সাধারণত ৯০ দিনের বেশি মেয়াদি হয় না।

নোটামের উদ্দেশ্য ও কারণ

নোটাম জারি করার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

● বিমানবন্দর বা রানওয়ে সাময়িক বন্ধ রাখা

● সাময়িক বিমান চলাচল বন্ধ ঘোষণা বা বিধিনিষেধ জারি

● ন্যাভিগেশন সিস্টেমের ত্রুটি বা রক্ষণাবেক্ষণ

● আবহাওয়া সংক্রান্ত হঠাৎ পরিবর্তন

● সামরিক মহড়া বা বিশেষ নিরাপত্তা কার্যক্রম

● নতুন স্থাপনা বা বাধা (যেমন: টাওয়ার, ক্রেন)

● জরুরি পরিস্থিতি যেমন: প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আগুন লাগা, বিভিন্ন সময়ে বিমান চলাচলের পথে পাখির চলাচল।)

এই সব তথ্য পাইলট, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তাৎক্ষণিকভাবে জানানো হয় যাতে করে তারা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারেন।

প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব

নোটাম মূলত একটি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা। আকাশপথে ক্ষুদ্রতম ত্রুটিও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তাই ফ্লাইট পরিকল্পনার পূর্বেই পাইলটরা নোটাম পর্যালোচনা করেন, যাতে তারা সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে আগে থেকেই অবগত থাকেন।

ফলে নোটাম শুধু আকাশপথের নিরাপত্তাই নিশ্চিত করে না, বরং অপারেশনাল দক্ষতাও বৃদ্ধি করে। সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে ফ্লাইট রুট পরিকল্পনা, পরিবর্তন, সময়সূচি সামঞ্জস্য ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনাও সহজ হয়।

বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ((Civil Aviation Authority of Bangladesh ev CAAB) বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ যারা নোটাম জারি করে থাকে।

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দেশে এর ব্যবহার

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নোটাম শুধু প্রযুক্তিগত বা নিরাপত্তাজনিত কারণে নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও ব্যবহৃত হচ্ছে।

ইরান: আঞ্চলিক উত্তেজনার সময় ইরান প্রায়ই তার আকাশসীমার কিছু অংশে সীমাবদ্ধতা আরোপ করে নোটাম জারি করেছে, বিশেষ করে সামরিক মহড়া বা নিরাপত্তা ঝুঁকির সময়। বিশেষ করে বিমান হামলা, রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণের কারণে সম্প্রতি ইরান নিজের আকাশ একাধিকবার পূর্ণ বা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছিল।

রাশিয়া: ইউক্রেন সংকটের পর রাশিয়া বিস্তৃত আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণে নোটাম ব্যবহার করেছে। এতে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট রুট পুনর্র্নিধারণ করতে হয়েছে।

পাকিস্তান: সীমান্ত উত্তেজনার সময় পাকিস্তান একাধিকবার তার আকাশসীমা আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করে নোটাম জারি করেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার বিমান চলাচলে বড় প্রভাব ফেলেছে।

গতবছর ভারতের সাথে উত্তেজনার কারণে পাকিস্তান নিজ আকাশসীমা ভারতের বিমানের জন্য বন্ধ করে দিয়েছিল।

ভারত: একইভাবে ভারতও সামরিক মহড়া, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির চলাচলের সময় নোটাম ব্যবহার করে থাকে।

এই উদাহরণগুলোই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে ব্যবহারিক দিক থেকে নোটাম এখন শুধু আর প্রযুক্তিগত বার্তা বা দিকনির্দেশিকা হিসেবে নয় বরং কৌশলগত কারণেও ব্যবহৃত হচ্ছে।

অপব্যবহার ও রাজনীতি

নোটামের অপব্যবহার নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বিস্তর আলোচনা রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, একটি দেশ রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি বা কৌশলগত সুবিধা অর্জনের লক্ষ্যে অপ্রয়োজনীয় বা অতিরিক্ত নোটাম জারি করে।

উদাহরণস্বরূপ অযৌক্তিকভাবে আকাশসীমা বন্ধ রাখা, দীর্ঘমেয়াদি সীমাবদ্ধতা আরোপ ও বাণিজ্যিক বিমান চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে।

এসব পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন খাতে অর্থনৈতিক ক্ষতি ডেকে আনে এবং কখনও কখনও কূটনৈতিক উত্তেজনাও বাড়ায়। ফলে নোটামের স্বচ্ছতা ও যৌক্তিকতা নিশ্চিত করা এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শেষ কথা

নোটাম আধুনিক বিমান চলাচলের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। নোটাম একটি নীরব কিন্তু শক্তিশালী যোগাযোগ ব্যবস্থা যা আকাশপথকে নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল রাখতে সহযোগিতা করে। তবে এর ব্যবহার যেমন প্রয়োজনীয় তেমনি দায়িত্বশীল হওয়াও জরুরি।

প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে নোটাম ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, কার্যকর ও রাজনীতিমুক্ত রাখা সম্ভব।

লেখক: মুহাম্মদ মাহতাব উদ্দীন