তর্ক কুতর্ক ও একজন হাসান হাফিজুর রহমান

ঢাকার নবজাগরণ

কাজল রশীদ শাহীন
প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ০৩:২৮ পিএম
আপডেট: ১৯ জুন ২০২৬, ০২:৪৯ পিএম
Main News Image

ঢাকায় কি নবজাগরণ বা রেনেসাঁ সংঘটিত হয়েছিল? ইতালীয় রেনেসাঁ বা বঙ্গীয় রেনেসাঁর আলোকে এই প্রশ্নের উত্তর অন্বেষণে রয়েছে সংশয়িত হওয়ার সমূহ ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ। যেমন সংশয় রয়েছে বঙ্গীয় রেনেসাঁ বা কলকাতার নবজাগরণকে ঘিরে। কেউ কেউ ইতালীয় রেনেসাঁর আলোকে বঙ্গীয় রেনেসাঁর প্রতিতুলনা দিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ করেন, অন্তর্গত শক্তিকে উপেক্ষা করেন এবং বঙ্গীয় রেনেসাঁকে রেনেসাঁ বলতে গররাজি প্রকাশ করেন। যদিও উনবিংশ শতকে উদ্ভূত বঙ্গীয় রেনেসাঁ বা কলকাতার নবজাগরণ প্রতিষ্ঠিত এক সত্য। যার চেতনায় বঙ্গীয় সমাজ, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের সমাজ ও নাগরিক পরিসর আলোকায়িত। 

লেখার শুরুতেই বলা হয়েছে, ঢাকার নবজাগরণকে যদি ইতালীয় রেনেসাঁ কিংবা বঙ্গীয় রেনেসাঁর আলোকে অন্বেষণ করা হয়, তাহলে এই রেনেসাঁ সম্পর্কেও সংশয় ও বিভ্রান্ত হওয়ার অবকাশ রয়েছে। বিদ্বৎ সমাজ কেন, এই নবজাগরণকে এখন পর্যন্ত শনাক্ত ও মূল্যায়ন করেনি, তা মস্তো বড়ো এক হেঁয়ালি বা প্রহেলিকা বিশেষ। ঢাকার বিংশ শতকে সংঘটিত নবজাগরণ বা রেনেসাঁ বিশেষভাবে স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত। ইতালীয় রেনেসাঁ যেমন পুরো ইউরোপকে আলোড়িত করেছিল। বঙ্গীয় রেনেসাঁ কলকাতায় সংঘটিত হলেও তার ছোঁয়া লাগেনি পুরো বঙ্গে, পূর্ববঙ্গে তো নয়ই। বলা হয়, বঙ্গীয় রেনেসাঁ বা বাংলার নবজাগরণ কলকাতার নয় মাইলের মধ্যেই সীমবদ্ধ ছিল। অন্যদিকে, ঢাকার রেনেসাঁ বা নব জাগরণ ঢাকায় সংঘটিত হলেও তার বিস্তার ঘটে প্রথম পর্বে সেই সময়ের পূর্ববঙ্গ জুড়ে। এবং দ্বিতীয় পর্বে তদানীন্তন পুরো পূর্ব পাকিস্তানে।

হাসান হাফিজুর রহমানের এক লেখায় এই একথার কিছুটা ইংগিত মেলে। তিনি ‘সমকাল’ পত্রিকার প্রকাশের কারণ সম্পর্কিত এক লেখায় উল্লেখ করেছেন, ‘পাকিস্তানের আগে বাঙালী মুসলমান স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠায় উত্তেজিত ছিল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরে পরেই দেখা গেল স্বাতন্ত্র্যই মুক্তি নয়। দুর্বল বাঙালী ন্যাশনালেটি প্রবল পাঞ্জাবী ন্যাশনালেটির বন্ধনে বাঁধা পড়েছে। স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠার জায়গায় নতুনভাবে দেখা দিল আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রশ্ন।’

এই ‘আত্মপ্রতিষ্ঠা’য় হল ঢাকার বা বাংলাদেশের নবজাগরণের বিরল বৈশিষ্ট্য। যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল মানবতাবাদ, ইহজাগতিকতা, উদারনৈতিক সমাজ ব্যবস্থা, ধর্মীয় কুসংস্কার ও শাস্ত্রের দাসত্ব থেকে মুক্তি, আধুনিকতা ও প্রগতিশীলতার চর্চা, ন্যায্যতাভিত্তিক রাষ্ট্র নির্মাণ ও সম্পদের সুষম বন্টনের প্রত্যাশা। রেনেসাঁ বা নবজাগরণ কীভাবে একটা স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম দিতে পারে তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো ঢাকার নবজাগরণ। যেখান উপ্ত হয়েছিল পুরো জাতিকে স্বাধীনতা ও মুক্তিসংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করার বীজমন্ত্র।

এক. ঢাকার নবজাগরণের শুরু ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর। এই সূত্রে সেই সময়ের বিদ্বৎ সমাজের একট বড়ো অংশের এখানে বসবাস ও একত্রিত হওয়ার সুযোগ ঘটে। যার কল্যাণে ১৯২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’। তাদের মুখপাত্র ছিল ‘শিখা’ পত্রিকা। সংগঠনের শ্লোগান ছিল, ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব’। উল্লেখ্য, ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজের আদর্শ ছিল, ‘ইউরোপের নবজাগরণ-ইতালীয় রেনেসাঁ, উনিশ শতকের নবজাগরণ-বঙ্গীয় রেনেসাঁ, তুরস্কের নবজাগরণ-কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে সংঘটিত মুসলিম রেনেসাঁ।

‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ এর নেতৃত্বে ছিলেন আবুল হুসেন। সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন অনেকেই। উল্লেখযোগ্যরা হলেন : ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল ফজল, আবদুল কাদির, মোতাহার হোসেন চৌধুরী, মোহাম্মদ আবদুর রশীদ প্রমুখ।

‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’কে খুব বেশিদিন আলো ছড়াতে দেওয়া হয়নি। ১৯৩৬ সালে প্রায় সকল কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলেও আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তি ঘটে ১৯৩৮ সালে। আবুল হুসেনের মৃত্যুর পর অনুষ্ঠিত স্মরণানুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে। ‘শিখা’ পত্রিকার সংখ্যা বেরিয়েছিল পাঁচটি। প্রথম সখ্যার সম্পাদক ছিলেন আবুল হুসেন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় সংখ্যার সম্পাদক হন কাজী মোতাহার হোসেন। চতুর্থ ও পঞ্চম সংখ্যায় সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন যথাক্রমে মোহাম্মদ আবদুর রশীদ ও আবুল ফজল।

ঢাকার রেনেসাঁ কতোটা আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল ও ধর্মের ধ্বজাধারী কূপমণ্ডুকদের ধাক্কা দিতে পেরেছিল তা আবুল হুসেনের ওপর নেমে আসা খড়গ থেকেই বোঝা যায়। চার্চের কাছে কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও হয়ে উঠেছিলেন যেমন ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ এর বিরোধী ও প্রতিক্রিয়াশীলদের কাছে তিনিও হয়ে উঠেছিলেন ঠিক তেমন।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, আত্মপ্রকাশের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ ত্রিমুখী ষড়যন্ত্র ও আক্রমনের শিকার হন। এরা হলোÑ এক. ঢাকার আশরাফতন্ত্রী আলেম সমাজ, দুই. ঢাকার নবাব পরিবার, তিন. কলকাতার ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকা গোষ্ঠী।

আবুল হুসেন একটা লেখায় সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে চাকরি সংরক্ষণের বিরোধীতা করেছিলেন। সাপ্তাহিক ‘মোহাম্মদী’তে গোলাম মোস্তফা ওই লেখার তীব্র সমালোচনা করেন, যা ব্যক্তিগত আক্রমনের পর্যায়ে পড়ে এবং অশোভন ও আপত্তিকর। তিনি বলেন, মুসলমানদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা থাকার কারণেই আবুল হুসেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে চাকরি পেয়েছেন। এতে ভীষণ অপমান বোধ করেন আবুল হুসেন এবং শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে দিয়ে আইন ব্যবসায় যোগ দেন। 

মাসিক ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকার পরপর চারটি সংখ্যায় কাজী আবদুল ওদুদের লেখা নিয়ে আক্রমনাত্মক সমালোচনা করেন মাওলানা আকরম খাঁ। এই বিতর্কের ইতি টানতে কাজী আবদুল ওদুদ ও আবুল হুসেন পৃথক ‘ঘোষণাপত্র’ দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের মুসলিম হলে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজের সভা বন্ধ পর্যন্ত করে দেয়া হয়। বাধ্য হয়ে পরবর্তী সভা অনুষ্ঠিত হয় জগন্নাথ ও লিটন হলে।

আবুল হুসেন এর ওপর ক্ষিপ্ত ও বিরাগ হওয়ার নেপথ্যের কারণ বুঝতে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’র দফাগুলোর দিকে মনোনিবেশ করা প্রয়োজন। মুসলিম সাহিত্য সমাজের ১৯২৯ সালের তৃতীয় বার্ষিক অধিবেশন শেষে গ্রহণ করা হয়েছিল সমাজ সংস্কারের পাঁচ দফা প্রস্তাবÑ

এক. এই সভা বাংলার মুসলমান নর-নারীকে বিশেষভাবে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সমস্ত বাঙ্গালীকে কোরানের সহিত পরিচিত হইবার অনুরোধ জানাইতেছে।

দুই. এই সভা বাংলার পল্লীর বিভিন্ন কেন্দ্রে পাঠাগার ও গ্রন্থাগারের প্রতিষ্ঠায় বিশেষভাবে উদ্যোগী হইবার জন্য দেশের কর্মীদের প্রতি অনুরোধ জানাইতেছে।

তিন. এই সভা বাংলার বিভন্ন মক্তব ও মাদ্রাসায় যাহাতে বাধ্যতামূলকভাবে ব্যায়াম শিক্ষার ব্যবস্থা হয় তজ্জন্য গভর্নমেন্টকে অনুরোধ জানাইতেছে।

চার. এই সভা বাঙ্গালী মুসলমান সমাজের নেতৃবৃন্দকে পর্দাপ্রথা দূরীকরণার্থে আদর্শ স্থাপন করিতে অনুরোধ জানাইতেছে।

পাঁচ. এই সভা সাহিত্য সমাজের কর্মীবৃন্দকে মুসলিম ইতিহাস, দর্শন ও ধর্মবিষয়ক আরবী ও ফার্সি গ্রন্থ সমূহ অনুবাদ করিবার জন্য একটি অনুবাদ কমিটি গঠন করিতে অনুরোধ জানাইতেছে।

উল্লিখিত দফাসমূহেই স্পষ্ট হয় যে, ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ কতোটা প্রগতিশীল ও উদারনৈতিক ছিল। 

দুই.শুধু দফা দিয়েই তারা আলোকিত সমাজ গঠণের দায়িত্ব শেষ করেন নাই। লেখালেখি করেছেন এইসব উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যসমূহ বাস্তবায়ন করার নিমিত্তে। যার কয়েকটি লেখার নমুনা এখানে উল্লেখ হলো।

এক. ‘বাঙালি মুসলমানের শিক্ষা সমস্যা প্রবন্ধে আবুল হুসেন লিখেছেন, ‘কেন মুসলমানের এই দুর্গতি? এই প্রশ্নের উত্তর এককথায় দিতে গেলে বলতে হবে আমাদের শিক্ষা নাই-জ্ঞানের সঙ্গে বহুদূর ক্ষতি ও বিরোধ করে বসেছি এবং বিজ্ঞান ও আর্টকে আমাদের শিক্ষা কেন্দ্র হতে গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছি-এই ভয়ে, পাছে তাতে আমাদের ধর্ম নষ্ট হয়। ধর্ম আমাদের এতই নাজুক।’

দুই. কাজী মোতাহার হোসেনের ‘আনন্দ ও মুসলমান গৃহ’ প্রবন্ধটির অংশবিশেষ এখানে উল্লেখের দাবি রাখে। তিনি লিখেছেন : ‘মুসলমান গান গাইবে না, ছবি আঁকবে না, এককথায় মনোরঞ্জনকর ললিতকলার কোনো সংশ্রবেই থাকবে না। মুসলমান পুরুষেরা কেবল কাজ করবে, আর ঘর শাসন করবে; মেয়েরা কেবল রাঁধবে, বাড়বে, আর ব’সে ব’সে স্বামীর পা টিপে দিবে; তা’ছাড়া খেলাধুলা, হাসি-তামাসা বা কোনও প্রকার আন্নদ তারা করবে না। সব সময় আদব-কায়দা নিয়ে দুরস্ত থাকবে।

আনন্দ? কোথায় আনন্দ? কি হবে আনন্দে? মুসলমান তো বেঁচে থাকতে আনন্দ করে না, সে মরে গিয়ে বেহেশতে প্রবেশ করে পেট ভরে খাবে, আর হুরপরীদের নিয়ে অনন্তকাল ধরে আনন্দ করবে। ব্যস! এই তার সান্ত্বনা! গৃহে যখন আমাদের থাকতেই হবে, তখন আমরা এর সংস্কারে লেগে যাই না কেন? সমাজকে যখন আমরা বাদ দিতে পারি না, তখন একে সরস শোভন এবং আনন্দময় করেই গড়ে তুলি না কেন?’

মুসলিম সাহিত্য সমাজের মুখপত্র ‘শিখা’ সম্পর্কে আবুল ফজল বলেছেন, ‘শিখার টাইটেল পৃষ্ঠায় একটি ক্ষুদ্র রেখাচিত্র ছিল, শুনেছি তা-ও এঁকেছিলেন আবুল হুসেন সাহেব। একটি খোলা কোরান শরিফ-মানব বুদ্ধিও আলোর স্পর্শে কোরানের বাণী প্রদীপ্ত হয়ে উঠেছে, এই ছিল রেখাচিত্রটির মর্ম। কিন্তু এর একটা কদর্থ বের করতে বিরুদ্ধবাদীদের বেগ পেতে হয়নি। তাঁরা এর অর্থ রটালেন মুসলিম সাহিত্য সমাজের সমর্থকরা কোরানকে পুড়িয়ে ফেলে শুধু মানব বুদ্ধিকেই দাঁড় করাতে চাচ্ছে। বলাই বাহুল্য, গোড়া থেকেই গোঁড়ারা মুসলিম সাহিত্য সমাজের বিরোধী ছিল।’

মুসলিম সাহিত্য সমাজের এক সভায় কাজী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘আজ আমি দেখছি এখানে মুসলমানের নতুন অভিযান শুরু হয়েছে। আমি এই বার্তা চতুর্দিকে ঘোষণা করে বেড়াবে। আর একটা কথা- এতদিন আমি মনে করতাম আমি একাই কাফের, কিন্তু আজ দেখে আমি আশ্বস্ত হলাম যে, মৌলভী আনোয়ারুল কাদির প্রমুখ কতগুলি গুণী ব্যক্তি দেখছি আস্ত কাফের। আমার দল বড় হয়েছে, এর চেয়ে বড় সান্ত্বনা আর আমি চাই না।’

বলা প্রয়োজন, কেবল মুসলিমরাই ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজের সভ্য ছিলেন এমন নয়। কবি মোহিতলাল মজুমদার, ঔপন্যাসিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বিপিনচন্দ্র পাল, চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতো বহু অমুসলিম মনীষী সভায় অংশ নিতেন এবং তাদের মুখপত্র ‘শিখা’য় লিখতেন।

‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ এর প্রাণ ছিলেন আবুল হুসেন। শুধু বৌদ্ধিকভাবে নয়,আর্থিকভাবেও। ‘শিখা’ পত্রিকা প্রকাশের পুরো ব্যয়ভার বহন করতেন নিজে। ফলে, অনেকেরই জানা ছিল যে, আবুল হুসেনকে কোনোভাবে পর্যুদস্ত কিংবা বাধাগ্রস্ত করতে পারলেই ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ ও তার ‘শিখা’কে নিভিয়ে দেয়া সম্ভব হবে। এলক্ষ্যে তাদের সকল ষড়যন্ত্র অব্যাহত ছিল। যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটায় ঢাকার নবাব পরিবারের সভ্যরা।

১৯২৯ সালের ৮ ডিসেম্বর রাতে ঢাকার নবাব বাড়িতে আবুল হুসেনকে নিয়ে বসেছিল এক সভা। যার সমাপ্তি ঘটে এভাবে-নবাব হাবিবুল্লাহ ঘোষণা দেন, ‘আপনি (আবুল হুসেন) জীবনে আর কখনো কিছু লিখবেন না- এই শর্তে মুচলেকা লিখে দিন, তবেই আপনার দণ্ড শিথিল হতে পারে বা আপনাকে ক্ষমা করা যেতে পারে।’ উত্তরে আবুল হুসেন বলেন, ‘আমি ধর্মীয় বিষয় নিয়ে কিছু লিখব না, কিন্তু অন্যান্য বিষয়ে লিখব-এই শর্তে আমাকে মুক্তি দেওয়া হেক।’ ক্ষমাপত্র লিখে দেয়ার বিনিময়ে ভোর রাত সাড়ে চারটায় আবুল হুসেনকে ছেড়ে দেয়া হয়।’ 

ঢাকার নবজাগরণের প্রধান পুরুষ আবুল হুসেনকে এভাবেই সরিয়ে দেয়া হয়, প্রকারান্তরে ঠেলে দেয়া হয় মৃত্যুর দিকে। গ্যালিলিওকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছিল। আবুল হুসেনকে করা হলো দেশান্তরী। ব্রুনোকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। আবুল হুসেনকে এমন ব্যবস্থার মধ্যে ঠেলে দেওয়া হলো যাতে মৃত্যু নিশ্চিত হয়ে যায়। বাস্তবে হয়েছিলও তাই। এই ঘটনার এক দশকের মধ্যেই মারা যান তিনি। ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’এর সবচেয়ে প্রতিভাবান, সবচেয়ে কর্মঠ, সবচেয়ে সুঠাম দেহের অধিকারী মানুষটাই মারা যান সবার আগে। যদিও স্বল্পায়ুর জীবনেই ঢাকার রেনেসাঁয় যে দীপশিখা তিনি জ¦ালিয়ে যান, তা কখনোই নিভে যাওয়ার নয়।

তিন. ঢাকার নবজাগরণের দ্বিতীয় পর্বের সবচেয়ে সাহসী ও বৌদ্ধিকভাবে সবার থেকে এগিয়ে থাকা ব্যক্তিত্ব হলেন হাসান হাফিজুর রহমান। বাঙালির বুদ্ধিজীবীতায় ধ্রুপদী এক নাম। জন্মেছিলেন এই ভূখণ্ডের মানুষের এক মাহেন্দ্রক্ষণে ১৯৩২ সালের ১৪ জুন, মারা যান ১৯৮৩ সালের ১ এপ্রিল। মাত্র একান্ন বছরের স্বল্পরেখার জীবন। কিন্তু এই জীবন ক্ষণকে তিনি রাঙায়িত করে গেছেন নানাভাবে, যার নজির ছিল না সমসময়ে, এমনকি আজও নয়। স্বল্পরেখার জীবনকে সৃজন ও মননশীলতায় নিয়ে গেছেন মহাকালের অসীমতায়। 

ঢাকার রেনেসাঁয় হাসান্য অনন্য এক চরিত্র। বাঙালির পুনর্জন্ম ও বাংলাদেশের জন্ম-ইতিহাসকে আলোকবিস্তারী করতে পালন করে গেছেন অসামান্য এক বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা। ইতিহাসের সঙ্গে থেকেছেন শিরদাঁড়া সোজা করে। ইতিহাসের বিনির্মাণে নির্মাণ করেছেন তুলনারহিত সব উদাহরণ। যা থেকে রয়েছে দীপিত হওয়ার ঐশ^র্য। আগুনের পরশমণি সম এক প্রাণ ছিল তাঁর। যার ছোঁয়ায় আলোকিত করা সম্ভব নিজেকে-আলোকিত করার সুযোগ রয়েছে দেশ ও জাতিকে। বাঙালিত্বের জন্য বাজি রেখেছিলেন আপন জীবন, বিক্রি করেছিলেন মায়ের গহনা। যদিও হাসান জানতেন আবুল হুসেনের পরিণতি। সঙ্গে এটাও জানতেন যে, হুসেনের সময়ে সমাজ ও তার নীতি নির্ধারকরা প্রতিপক্ষ ছিলেন, এখন যুক্ত হয়েছে রাষ্ট্রও। সাংবাদিকতার নীতি ও নৈতিকতাকে উচ্চকিত করতে, মহিমা ও মর্যাদা দিতে চাকরিচ্যুত হতে হয়েছে। তারপরও জীবনের পুরোটা সময় হাসান এসবকে পায়ের তলার ভৃত্যই মনে করেছেন। এ যেন পরাজয়ে ডরে না বীর!

হাসানের জন্ম অবিভক্ত ভারতে-ব্রিটিশ শাসিত সময়ে। ব্রিটিশ যখন নিচ্ছে বিদায় এবং ভারত হচ্ছে স্বাধীন ও খণ্ডিত, তখন সদ্য কিশোর তিনি। পাকিস্তান নামক অদ্ভুত এক রাষ্ট্রের যাত্রা ও এক কিশোরের যৌবনযাত্রা একই দ্বৈরথে তবে বিপরীত মাত্রায়, ঝাঁকের কৈ হয়ে নয়। 

কেউ যায় যুদ্ধে কেউ যায় ভিক্ষায়। কৈশোরোত্তীর্ণ বয়সেই হাসান বেছে নেয় যুদ্ধের জীবন। ক্ষমতাবলয়ের-ক্ষমতাকাঠামোর লোভ লালসার ঊর্ধ্বে থেকে জীবনকে দেখার, সমাজ-রাষ্ট্র-বৃহত্তর মানুষের মঙ্গলাকাক্সক্ষার লক্ষ্যে কবির ধর্ম পালন পালনের ব্রত। এ পথই হাসানকে রাজনীতি সংলগ্ন করে তোলে। হয়ে ওঠেন পাকিস্তান রাষ্ট্রের খাসলত বোঝার আতসীকাঁচ বিশেষ। হাঁটি হাঁটি পা পা বয়সেই দেশটির শাসকবর্গ সাম্প্রদায়িকতাকে পুঁজি করে ক্ষমতার সিঁড়ি হিসেবে। কলমের শক্তিকে পুঁজি করে রুখে ওঠেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে। প্রকাশ করেন দাঙ্গাবিরোধী পাঁচটি গল্পের সংকলন। বয়স তখন মাত্র বছর আঠারোর মতো। যে বয়সকে সাক্ষী রেখে সুকান্ত লিখেছিলেন, ‘আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ/ স্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি,/ আঠারো বছর বয়সেই অহরহ বিরাট দুঃসাহসেরা দেয় যে উঁকি। এ বয়স জেনো ভীরু, কাপুরুষ নয়/ পথ চলতে এ বয়স যায় না থেমে,/ এ বয়সে তাই নেই কোনো সংশয়- এ দেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে।’ হাসান কবির প্রত্যাশা পূরণ করেছিলেন যোগ্য উত্তরসূরী হয়ে, দায় মিটিয়েছিলেন ইতিহাসের। 

হাসানের আঠারো রূপে যে যাত্রা বিশে এসে তা হয়ে উঠেছিল কিম্ভূত রাষ্ট্র পাকিস্তানের জন্য সমূহ মাথা ব্যথার কারণ। তখন বায়ান্নো, বাঙালির নব জাগরণ ও পুনর্জন্মের ক্ষণ। ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ। হাসান ও অলি আহাদ আলাপরত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে। অলি আহাদ বললেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ওখানে যেতে। কিছু ছাত্র তখন ইট পাটকেল ছুড়ছে পুলিশের অন্যায় আচরণের প্রতিবাদে। অলি আহাদ বললেন, ‘ওখানে গিয়ে ওদের থামতে বলো। তা না হলে ওরা গুলি করতে পারে।’ হাসান গেলেন-নিষেধও করলেন, কিন্তু ওরা শুনল না। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল হাসান নিজেও ইট পাটকেল ছোড়া শুরু করেছেন। একটা টিয়ারশেল এসে সামনে পড়ে। ফাটে না। কিন্তু ওটাই যখন উল্টোদিকে ছুড়ে মারেন, ফাটে। গোলাগুলি শুরু হয়। বরকত যখন গুলিবিদ্ধ হয়, হাসান তখন ওখানকার গেটে। হাসান এবং মুর্তজা বশীর অন্য একজন আহতকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।

হাসান এক্ষণে হয়ে ওঠেন ইতিহাসের অংশ। যদিও ইতিহাসের আরেক কালপর্ব অপেক্ষা করছিল তখনও। ইতিহাসের ভেতর থেকে নাকি ইতিহাসকে অবলোকন করা যায় না। ইতিহাসের আগাপাশতলায় চাপা পড়ে যায় প্রকৃত ঘটনা। নানা চাপানউতোরে হোঁচট খায় মূলস্রোত। কিন্তু হাসানকে এসবের কিছুই ছুঁঁতে পারে না। কারণ, আঠারোয় হাসান ঠিক করে ফেলেছিলেন তাঁর ভূগোল ও ভগবান। হাসান কিবলা চিনেছিলেন, একজন প্রকৃত প্রতিভার সহজাতগুণে, ধ্রুপদী বুদ্ধিজীবীর ওজস্বীতায়। সম্পাদনা করেন একুশে ফেব্রুয়ারি সংকলন।

হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ সংকলন গ্রন্থে উল্লিখিত হয়েছে, ‘একটি মহৎ দিন হঠাৎ কখনো জাতির জীবনে আসে যুগান্তরের সম্ভাবনা নিয়ে। পূর্ব পাকিস্তানের ইতিহাসে একুশে ফেব্রুয়ারি এমনি এক যুগান্তকারী দিন। শুধু পাক-ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে নয়, একুশে ফেব্রুয়ারি সারা দুনিয়ার ইতিহাসে এক বিস্ময়কর ঘটনা। দুনিয়ার মানুষ হতচকিত বিস্ময়ে স্মম্ভিত হয়েছে মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার জন্য পূর্ব-পাকিস্তানের জনতার দুর্জয় প্রতিরোধের শক্তিতে, শ্রদ্ধায় মাথা নত করেছে ভাষার দাবীতে পূর্ব পাকিস্তানের তরুণদের এই ঐতিহাসিক আত্মত্যাগে। জাতিগত অত্যাচারের বিরুদ্ধে, জনতার গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য দুনিয়াজোড়া মানুষের যুগ যুগ ব্যাপী যে সংগ্রাম, একুশে ফেব্রুয়ারি তাকে এক নতুন চেতনায় উন্নীত করেছে।’ 

কী সাংঘাতিক কথা, একুশের ঘটনার এক বছরের মধ্যে হাসানের সম্পাদিত গ্রন্থে বলা হচ্ছে, ‘একুশে ফেব্রুয়ারি সারা দুনিয়ার ইতিহাসে এক বিস্ময়কর ঘটনা।’ একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে এসে ওই সত্য আক্ষরিকভাবেই প্রতিভাত হয়েছে। কিন্তু আজ থেকে সত্তর বছর আগে পরাধীনভূমে দাঁড়িয়ে কতোটা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হলে ওরকম সোনায় মোড়ানো কথা বলা যায়? সত্যিই সেদিন একবিন্দু বাড়িয়ে বলা হয়নি, করা হয়নি সত্যের অপলাপ। একুশে আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার মর্যাদায় স্বীকৃত-বিশ্বজুড়ে সম্মানিত। যে একুশের বৌদ্ধিক বীজ রোপিত হয়েছিল হাসানের পৌরহিত্যে। একুশে বাঙালির প্রাণের বাতিঘর-বাংলাদেশের জন্মের পবিত্র ভ্রুণ, হাসান হলেন এসবের বৌদ্ধিক নায়ক। হাসান শুধু নিজে লেখেননি, অন্যের লেখা সংগ্রহ করে ক্ষান্ত হননি, অর্থনৈতিক দিক সামলাতেও রেখেছিলেন সাহসী এক ভূমিকা-তুলনারহিত উদাহরণ।

একুশে ফেব্রুয়ারি সংকলনের প্রকাশক মোহাম্মদ সুলতান লিখেছেন, ‘তেপান্ন সালের প্রথমদিকে হাসান প্রস্তাব দিল, ’৫২-এর উত্তাল ভাষা-আন্দোলনের সময়ে আমাদের দেশের সুধী লেখকসমাজ তুলির কলমের আঁচড়ে যা লিপিবদ্ধ করেছেন, পুস্তকাকারে তা প্রকাশ করা যায় কিনা। সেই সময়ে একুশে ফেব্রুয়ারি বইটা বের করতে সেই মুহূর্তেই ৫০০ টাকার প্রয়োজন। আমার আর হাসানের হাতে ৫০ টাকাও নেই। সমাধান করে দিল হাসান। বাড়িতে গিয়ে জমি বেচে সে টাকা নিয়ে আসবে। যা ইচ্ছা তাই করল হাসান। কথা দিলাম বই বিক্রি করে তার টাকা ফেরত দেবো। বই আমরা ছেপেছিলাম, বইয়ের প্রচারও যথেষ্ট হয়েছিল, ক্রেতারও ভিড়ও হয়েছিল। বইটার দাম রেখেছিলাম আড়াই টাকা। ১৯৫৩ সালের মার্চের শেষদিকে বইটা বেরুল আর সে বছরই বাজেয়াপ্ত হয়ে গেল। ১৯ তারিখের দুপুরে লালবাগ থানার দুই ট্রাক পুলিশ এসে দোকান তছনছ করে দিয়ে গেল। ছাপান্ন সাল পর্যন্ত বইটি সরকার কর্তৃক বেআইনি ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছিল। (আবদুল মান্নান সৈয়দ, ‘একুশের প্রথম সংকলন’)।

হাসানের সহোদর খালেদ খালেদুর রহমানের জবানিতে পরে জানা যায়, জমি নয় মায়ের গহনা বিক্রি করে ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ সংকলনের টাকা যুগিয়েছিলেন। 

চার.হাসান হাফিজুর রহমান কেবল কবি নন। কেবল সাংবাদিক নন। কেবল সম্পাদক নন। এসবেরও অধিক ছিলেন। আর এখানেই হাসানের বুদ্ধিজীবীতার মহোত্তম উদাহরণ, অদ্বিতীয় অর্জন।

সৈয়দ শামসুল হক লিখেছেন, ‘১৯৫৩ সালেই হাসান ছাড়া আর কে ভাবতে পারতেন আমাদের ভেতরে যে, একুশে ফেব্রুয়ারি আসলে তো বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের বীজ, তার বপন, তার লালন, তার পরিচর্যায় লেখকদের প্রত্যক্ষ অংশ নিতে হবে।’

একুশে ঘিরে যে দায় পালন করেছিলেন হাসান, তা জারি ছিল মৃত্যু অবধি। বায়ান্নোর পূর্ব এবং পর তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গনে হাসান ছিলেন সক্রিয় যোদ্ধা-সাংগঠনিকভাবে প্রধান নেতৃত্বে। বায়ান্নো থেকে একাত্তরের সময়পর্ব হাসান শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চায় নিজেকে শুধু বিকশিত করেননি, বৌদ্ধিক লড়াইটাও জারি রেখেছিলেন সর্বতোভাবে। সেই সময় এমন কোনো সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ছিল না, যারা প্রগতিপন্থায় সমর্পিত অথচ হাসানের সেখানে উজ্জ্বল উপস্থিতি নেই। 

মুক্তিযুদ্ধে হাসান হারিয়েছিলেন দুই সহোদর। স্বাধীন দেশে স্বপ্ন দেখেছিলেন সবকিছু নতুন করে সাজানোর। মানুষের দুঃখমোচনের জন্য যে লড়াই জারি রেখেছিলেন দুই যুগ ধরে। এবার সবকিছু উসুল হবে। হাসি ফুটবে সাধারণ মানুষের মুখে। বৈষম্য দূর হবে সমাজ-রাষ্ট্রের সব জায়গা থেকে। জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে। বাক্ স্বাধীনতা রক্ষিত হবে। বিকশিত হবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা। আমলারা সত্যিই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে নিজেদের দায়িত্ব পালন করবে অন্যের তরে-জনগণের সেবায়। সমাজ রাষ্ট্রে অন্যায়কে অন্যায় বলার সুযোগ তৈরি হবে। প্রশ্ন করার অধিকার থাকবে সবার। স্বাধীনতার সুফল কেবল ক্ষমতাসীনদের একচেটিয়া অধিকার হয়ে উঠবে না, আম জনতার সমঅধিকারকেও নিশ্চিত করবে। স্বাধীনতার অর্জন কেবল পাকিস্তানের জায়গায় বাংলাদেশ লেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পাকিস্তানের চব্বিশ বছরে-ব্রিটিশের একশ নব্বই বছরে যতো অপ্রাপ্তি ঘটেছে-অন্যায় অবিচার দুর্নীতি হয়েছে সেসব রুখে দিয়ে শুদ্ধতাকে নিশ্চিত করবে। কেবল ভৌগলিক স্বাধীনতা নয়, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক-ধর্মীয় স্বাধীনতাকেও নিশ্চিত করা হবে। কিন্তু স্বাধীনতার এক বছরের মাথায় হোঁচট খেলো হাসানের ব্যক্তিগত খোয়াব-প্রত্যাশিত স্বপ্নের বাংলাদেশ।   

হাসান নানারকম পেশায় যুক্ত ছিলেন। তবে সাংবাদিকতায় ছিলেন অনেকটা সময় জুড়ে। পাকিস্তান আমলে নানা পত্রিকায় চাকরি করে থিতু হয়েছিলেন দৈনিক পাকিস্তান-এ। সরকারী পত্রিকা কিন্তু মাথা বিকোননি কখনো। হাসানের ধাতেও নেই সেটা। দেশ স্বাধীনের পর হাসান দৈনিক বাংলা’র সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি হন-শুরু হয় বাংলাদেশ অধ্যায়ের কর্মজীবন। এসময় তিনি সাপ্তাহিক বিচিত্রার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদকও হন।

ঊনিশশ’ তিয়াত্তর সালের ১লা জানুয়ারি রাজধানীতে ঘটে অভূতপূর্ব এক ঘটনা। ভিয়েতনামে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী এক শোভাযাত্রা বের কর সমাজতন্ত্রীদের ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়ন। মার্কিন তথ্যকেন্দ্রের সামনে যখন ওরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করে তখন পুলিশ আচমকা গুলি করে। এতে মতিউল কাদেরসহ দুজন নিহত হন। পাঠকের কাছে দ্রুত এ খবর প্রকাশের লক্ষ্যে ‘দৈনিক বাংলা’ বিশেষ টেলিগ্রাম প্রকাশ করে। সম্পাদকীয়তে হাসান লেখেন, ‘এত বড় একটি মর্মান্তিক ঘটনা কী করে ঘটতে পারল স্বাধীনতা-উত্তর পটভূমিতে, এ আমাদের বুদ্ধির অগম্য। এত শোকের মধ্যেও আবার নতুন শোকের আঘাত সইতে হবে, কী করে তা বিশ্বাস করা সম্ভব।’

গণমাধ্যমের নৈতিকতার জায়গা থেকে জাতির প্রতি দায় পালনের এই সাংবাদিকতাকে ভাল ভাবে নেওয়া হয় না। তাঁকে চাকুরিচ্যুত করা হয়। কিন্তু তিনি যে নির্ভীকতা, দায়িত্ববোধ, জনহিতৈষণার পরিচয় দেন, তা অনন্য-সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার জন্য গর্ব ও গৌরবের ধন-পরম সম্পদ। একুশে ফেব্রুয়ারি সংকলকের সম্পাদকের দায় যে শেষ হওয়ার নয়, বুদ্ধিজীবীর ছাতা যে সুযোগ বুঝে বন্ধ হওয়ার নয়, হাসান সেটা প্রমাণ করেছেন চাকুরি খুইয়ে-অন্যদের বিরাগভাজন হয়ে। বায়ান্নো থেকে বাহাত্তরের এই যাত্রা হাসানকে পূর্ণতা দেয় বুদ্ধিজীবীর ধ্রুপদী তালিকায় নাম লেখায় সোনার হরফে।

‘একুশে ফেব্রুয়ারি’র সংকলনের সম্পাদককে স্বাধীন চিন্তা প্রকাশের দায়ে করা হয় দেশান্তরী। সারা জীবন যিনি কবিতা চর্চায়-সাংবাদিকতায় লেখালেখিতে-সম্পাদকের দায়িত্ব পালনে-সাংগঠনিক ভূমিকায় ও জনকল্যাণের প্রশ্নে দেশপ্রেমের চূড়ান্ত পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন তাঁকেই পেশাগত জীবনে অবনমন দিয়ে চেনা মানুষ-চেনা চৌহদ্দী থেকে দূরে পাঠিয়ে হতাশাগ্রস্ত এক জীবনের দিকে রাষ্ট্রের প্রযত্নে ছুঁড়ে ফেলে হয়। এ ঘটনায় শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি, দেহে দূরারোগ্য রোগ বাসা বাঁধে। কিন্তু হাসান বৃন্তচ্যুত হয় না। 

স্বল্পরেখার জীবনের একেবারে শেষাশেষি এসে হাসান আরেক দায়িত্ব পালন করে, যা কেবল তাঁকেই মানায়। একি কাকতাল নাকি ইতিহাসের অনিবার্য দায় পালন, তা জানার উপায় নেই। হাসানের সম্পাদনায় প্রকাশিত বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: দলিলপত্র বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। ষোলোখণ্ডের এই কাজকে হাসান প্রজ্ঞা ও সাংগঠনিক ক্ষমতা দিয়ে অন্য এক মর্যাদায় উচ্চকিত করে। এই কাজে স্পষ্ট হয়েছে এবং দালিলিকভাবে এই সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, নিরপেক্ষতায় তিনি ছিলেন সত্যই তুলনারহিত এক নাম। নির্মোহ ও অবিচল থাকার গুণে স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। একুশে ফেব্রুয়ারি সংকলনের সম্পাদকের প্রযত্ন ও পৌরহিত্যে যখন বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের ঘটনাপঞ্জি ও দলিলপত্র প্রকাশিত হয় তখন মনে হয় এ বুঝি ইতিহাসেরই চাওয়া। ইতিহাস তার নায়ককে পূর্ণতা দেন এভাবেই।

স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র সম্পাদনার অভিজ্ঞতা থেকে হাসান লিখেছেন, ‘সাড়ে তিন লাখ পৃষ্ঠার মতো দলিল ও তথ্যাদি সংগ্রহ সংখ্যার দিক থেকে বিপুল বলতে হবে। তবু আমাদের ধারণা এই যে, বহু দলিল ও তথ্য এখনো সংগ্রহের বাইরে রয়েছে। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি লোকই কোন না কোন ভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধের সংগে জড়িত ছিলেন। গ্রামে গ্রামে, বস্তিতে বস্তিতে বহু ঘটনার উদ্ভব হয়েছে, বহু বীরত্বগাথা, বহু ত্যাগ, বিশ^াসঘাতকতা, অত্যাচার, নিপীড়নের কাহিনী স্তরে স্তরে গড়ে উঠেছে। এর পরিমাণ অনুধাবন করা কঠিন। তাছাড়া সারা বিশ^ জুড়েও ছিল এ সম্পর্কে সমর্থন ও প্রতিক্রিয়া এবং প্রবাসী বাঙালীদের ব্যাপক তৎপরতা। তাই সংগ্রহের কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে, তা বলা যায় না। দেশ ও বিদেশের তথ্য সংগ্রহের কাজ তাই কেবল বাড়তে পারে। শেষ সীমায় পৌঁছানোর ঘোষণা দেয়া এখনই সম্ভব নয়। এর জন্য দীর্ঘ পরিক্রমা ও সক্রিয়তা প্রয়োজন।’

আবদুল মান্নান সৈয়দ লিখেছেন, ‘তারুণ্যের যে অগ্নি সেদিন প্রজ্বলিত করেছিলেন হাসান হাফিজুর রহমান আর তার সাথীরা, আজো তা অনির্বাণ, অনির্বাণই থাকবে চিরকাল। (সূত্র : আবদুল মান্নান সৈয়দ, ‘একুশের প্রথম সংকলন’।) একরত্তি মিথ্যে নেই সৈয়দের এই উবাচে। দুঃখ হলো, হাসানের উত্তরসূরীদের দেখা নেই, আতশকাঁচেও তালাশ হচ্ছে না তাদের অবয়ব।

হাসানের লেখা থেকেই শেষ করব এই লেখা। ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ সংকলনের একুশে ফেব্রুয়ারির সামগ্রিক অবদান সম্পর্কে তাঁর লেখায় উল্লিখিত হয়েছে, ‘একুশে ফেব্রুয়ারি পূর্ব পাকিস্তানে শুধু গণতান্ত্রিক আন্দোলনেরই জোয়ার সৃষ্টি করেনি, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ক্ষেত্রেও এনেছে দিগন্ত-বিস্তারী প্লাবন। প্রতিক্রিয়ার নির্মম হিংসা ও লোভের আগুন থেকে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে বাঁচাবার জন্য দেশ জুড়ে জনতার যে দুর্জয় ঐক্য গড়ে উঠেছে, পূর্ব পাকিস্তানের ইতিহাসে তার কোন নজির নেই। ... একুশে ফেব্রুয়ারি দেখিয়েছে জনতার সকল শ্রেণীর প্রগতিশীল শক্তি ঐক্যবদ্ধ হলে প্রতিক্রিয়ার সমস্ত ষড়যন্ত্রকে পরাজিত করা সম্ভব।

একুশে ফেব্রুয়ারি পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির প্রথম ব্যাপক পশ্চাদপসরণের সূচনা করেছে। সূচনা করেছে জনতার ঐক্যবদ্ধ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিজয়াভিযান এবং সুদূরপ্রসারী সাংস্কৃতিক নবজাগরণের।’

আমরা মনে করি,হাসান হাফিজুর রহমান যে ‘সাংস্কৃতিক নবজাগরণ’র কথা বলেছেন সেটা শুধু সংস্কৃতিতে লাগেনি-সর্বত্রই লেগেছিল। এবং এটাই হলো ঢাকার রেনেসাঁ, যার শুরু হয়েছিল ১৯২১, চূড়ান্ত পরিণতি ১৯৭১ এ। এই রেনেসাঁকে যারা নানাভাবে ঋদ্ধ করেছেন প্রথম পর্বের সেইসব পথিকৃতদের অন্যতম ছিলেন আবুল হুসেন। দ্বিতীয় পর্বের নায়কদের অন্যতম হাসান হাফিজুর রহমান। ঢাকার রেনেসাঁকে পরিস্কারভাবে বুঝতে এঁদের এবং আরও অনেকের জীবন ও কর্মের প্রতি বিশেষভাবে আলোকপাত করা প্রয়োজন। এই লেখায় সেই প্রচেষ্টার সূচনা কিংবা গৌরচন্দ্রিকামাত্র।

পাঁচ.নবজাগরণ বা রেনেসাঁ বললেই আমাদের মনে পড়ে ইউরোপীয় নবজাগরণ কিংবা ইতালীয় নবজাগরণের কথা। এরপর হাজির হয় বেঙ্গল রেনেসাঁ। বেঙ্গল রেনেসাঁ বা বাংলার নবজাগরণ যখন নানাবিধ সীমাবদ্ধতার ঘেরাটোপে অস্তায়মান তখন শুরু হয় বাংলাদেশের নবজাগরণ। যার ভরকেন্দ্র ছিল ঢাকা। পরিধি ছিল ১৯০৫-এর বঙ্গ বিভাজন কালের পূর্ববঙ্গ। যে পূর্ববঙ্গ ও আসামকে নিয়ে লর্ড কার্জন চেষ্টা করেছিলেন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সী থেকে বেরিয়ে পৃথক একটা প্রদেশ গঠনের। যে চেষ্টা রহিত হয় ১৯১১-তে। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের নবজাগরণের সূচনা কখন শুরু হয় তা নির্দিষ্ট করে বলা মুস্কিল। আমরা মনে করি, এর উন্মেষ ঘটতে থাকে ঊনিশ শতকের শেষাশেষিতে। বঙ্গ বিভাজনের চেষ্টা ও রদ করার ঘটনা এর উন্মেষকে দ্রুততর ও অনিবার্য করে তোলে। যার প্রেক্ষাপটে পূর্ববাংলার বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় ও বিকাশের দিকটা এই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর মধ্যে জাগ্রত হতে থাকে। এই জাগ্রত হওয়ার সময় ১৯২১-এ প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়। যা বাংলাদেশের নবজাগরণের যথার্থ উন্মেষ ও বিকাশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। আমরা মনে করি, সেদিনের পূর্ববঙ্গের ঢাকায় খ্রিস্টাব্দ ১৯২১ থেকে বাংলাদেশের নবজাগরণ শুরু হয় এবং তিন পর্বে সেটা ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পায়। 

মনে রাখা প্রয়োজন, ১৯২১-এ বাংলাদেশের নবজাগরণের শুরু হলেও সলতে পাকানোর কাজটা শুরু হয় ঊনবিংশ শতকের শেষাশেষি থেকে। বাংলাদেশের নবজাগরণ তিনটা পর্ব বা পর্যায়ে সংঘটিত হয়।

প্রথম পর্ব ১৯২১ থেকে ১৯৪৭ অবধি।

দ্বিতীয় পর্ব ১৯৪৮ থেকে ১৯৬৬ অবধি।

তৃতীয় পর্ব ১৯৬৭ থেকে ১৯৭১।

প্রথম পর্বে বেশ কয়েকজন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এই নবজাগরণকে শক্তভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর পাশাপাশি প্রয়োজনানুগ নেতৃত্ব দিয়ে এর কার্যক্রমকে এগিয়ে নিয়েছেন। বাংলাদেশের নবজাগরণের প্রথম পর্বের নায়করা সংগঠিত হন ‘শিখা’ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে মুসলিম সাহিত্য সমাজের সংঘবদ্ধতায়। দ্বিতীয় ধাপের নায়করা সংগঠিত হন ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে, বাংলা ভাষার ন্যায্য মর্যাদার প্রশ্নে। তৃতীয় ধাপের নায়করা সংগঠিত হন স্বাধীকার আন্দোলনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের স্বাধীনতা বাস্তবায়নের আকাক্সক্ষায়।

মধ্যযুগে বা চতুর্দশ শতকে ইতালীয় বা ইউরোপের নবজাগরণের প্রেক্ষাপটে ইউরোপ জুড়ে অনেকগুলো স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। অবশ্য সেই সময়ের ঘটনাবলী ও বাস্তবতা ছিল একেবারে ভিন্ন। এ কারণে মোটাদাগে বিষয়টাতে সাদৃশ্যপূর্ণ বলে মনে হলেও বাংলাদেশের নবজাগরণের সার্থকতা ও বিরল-ব্যতিক্রমী উদাহরণ হলো, এ জাগরণ দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধোত্তর সময়ে তৃতীয় বিশে^র একটা ভূখণ্ডকে সিকি শতাব্দীর মধ্যে দুইবার এবং দ্বিতীয়বার সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে একটি স্বাধীন জাতি রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে, যার নজির পৃথিবীর ইতিহাসে তুলনারহিত। বাংলাদেশের নবজাগরণ বা রেনেসাঁকে যদি ইতালীয় বা ইউরোপীয় রেনেসাঁ ও বঙ্গীয় রেনেসাঁর আলোকে অন্বেষণ করা হয়, তাহলে এই নবজাগরণের প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করা দুরুহ হতে পারে। দেখা দিতে পারে দ্বিধান্বিত ও বিভ্রান্ত হওয়ার শঙ্কা। প্রত্যেকটা রেনেসাঁয় স্বতন্ত্র ও স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত। কোন রেনেসাঁয় অপর কোন রেনেসাঁর সঙ্গে তুল্যমূল্য বিচারে সাযুজ্য ও সঙ্গতির্পূ হবে এমন কোন কথা নেই। কেননা স্থান, সময়, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ধর্মের প্রভাব, ঐতিহ্যচেতনাসহ সবকিছুই পৃথক ও তাৎপর্যও ভিন্নতর। আমরা শুধু আলোকপাত করতে পারি তার গড়ন, গতিপ্রকৃতি, লক্ষ্য ও আকাক্সক্ষার ওপর।

ইতালীয় রেনেসাঁ যেমন পুরো ইউরোপকে আলোড়িত করেছিল। বঙ্গীয় রেনেসাঁ কলকাতায় সংঘটিত হলেও তার ছোঁয়া লাগেনি তদানীন্তন পূর্ববঙ্গ তথা আজকের বাংলাদেশে। ভারতীয় ঐতিহাসিক সুশোভন সরকার বেঙ্গল রেনেসাঁর যে তিনটি দুর্বলতার কথা বলেছেন, তার মধ্যে এটিকে প্রধানতম বলে বিবেচনা করেছেন। বাংলাদেশের নবজাগরণের শক্তি হলো এটি ঢাকায় সংঘটিত হলেও তার ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে প্র্রথম পর্বে পুরো পূর্ববঙ্গে এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্বে তদানীন্তন পুরো পূর্ব বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তানে।

আমাদের স্মরণে রাখা জরুরি যে, আমাদের আজকের যে বাংলাদেশের মানচিত্র, সেটা পাকিস্তানের সময়ের পূর্বপাকিস্তান, পূর্ববাংলা বা পূর্ববঙ্গ নামে হুবহু একই রকম ছিল। কিন্ত ব্রিটিশ শাসনের সময় বঙ্গবিভাজনের মধ্যে দিয়ে যে পূর্ববঙ্গকে চিহ্নিত করা হয়েছিল। যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল আসাম প্রদেশ। বঙ্গবিভাজন রদের মধ্যে দিয়ে আসাম আলাদা হলে ১৯১১ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত সময়ের যে পূর্ববঙ্গ আর আজকের বাংলাদেশের মানচিত্র কিন্তু হুবহু এক নয়। ফলে বাংলাদেশের নবজাগরণের সূচনায় বা উন্মেষপর্বে শুধু বাংলাদেশের বাঙালি মুসলমানরাই যুক্ত হয়নি, অবিভক্ত বঙ্গের বাঙালি মুসলমান মাত্রই যুক্ত হয়েছিল। অবশ্য, একথাও আমাদের বিশেষভাবে স্মরণে রাখতে হবে যে, বাংলাদেশের নবজাগরণ সূচনা পর্বেই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করেছিল, মুসলমান ও হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ের ইহজাগতিক মুক্তি ও কল্যাণ সাধন। 

ছয়.ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার অখণ্ড ভারতে স্বতন্ত্র রাষ্ট প্রতিষ্ঠার কথা প্রথমবারের মতো এবং জোরদারভাবে সামনে আসে পূর্ববঙ্গের তরফে, যার নেতৃত্বে ছিল এখানকার বাঙালি মুসলমান। লাহোর প্রস্তাবে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক বিষয়টা সামনে নিয়ে আসেন। মুসলিম লীগ পরবর্তীতে বহুবচনকে একবচনে পরিণত করে। পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটির মূল সভাপতির ভাষণে আবুল মনসুর আহমদ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিষয়টা সবার সামনে উপস্থাপন করেন এবং এর পক্ষে যুক্তি ও কারণ তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন রাজনৈতিক পাকিস্তান সৃষ্টির কথা, এবং এটা এখন এই সময়ের বাস্তবতা বলে উল্লেখ করেন। তিনি ১৯৪৪-এ কলকাতায় দাঁড়িয়ে কোনপ্রকার রাখঢাক ব্যতিরেকে বলেন রাজনৈতিক পাকিস্তান সৃষ্টি না হলেও সাহিত্যিক পাকিস্তান যে সৃষ্টি হবে-এ ব্যাপারে উনার কোনোপ্রকার সন্দেহ বা সংশয় নেই।

পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর এই রাষ্ট্রের ভেতর থেকেই ১৯২১-এ সূচিত ‘বাংলাদেশের নবজাগরণ’ তার ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখে। এ পর্যায়ে শুরু হয় বিকাশ পর্ব। যা সংঘটিত হয় বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনের পূর্বাপর ঘটনায়। এই সময় ‘বাংলাদেশের নবজাগরণ’-তার শক্তি সাহস ও চেতনা সঞ্চয় করে উন্মেষ পর্ব থেকে।

হাসান হাফিজুর রহমান এক লেখায় উল্লেখ করেছেন বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলন সংঘটনে ও পরবর্তীতে সেই চেতনার বিস্তারে তিনি লেখক-সম্পাদক ও সংগঠকরূপে যে ভূমিকা পালন করেন তার শক্তি পেয়েছেন প্রগতি লেখক সংঘসহ পূর্বজ বিভিন্ন সংগঠন থেকে। এ কথা অন্যদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনের অনন্য বৈশিষ্ট্য হল এই আন্দোলন কেবল পূর্ববঙ্গবাসীর মাতৃভাষা হিসেবে বাংলার মর্যাদা ও ন্যায় সঙ্গত অধিকারের কথা বলেনি। পাকিস্তানের অন্যান্য অঞ্চলের ভাষার প্রতিও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছে। নবজাগরণের বৈশিষ্ট্য হল, এই চেতনায় সমৃদ্ধ মানুষেরা অন্যের অধিকার ও মর্যাদার প্রতি যথাযথ সম্মান নিশ্চিত করবে। যেটা আমরা লক্ষ্য করি ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-র কার্যক্রম, লেখালেখি ও ঘোষিত দফাসমূহে। তাদের ঘোষিত পাঁচটি দফার প্রথম দফাতেই তারা মুসলমান ও হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ের জন্য তাদের সুপারিশ পেশ করেছে এবং করণীয় তুলে ধরেছে। তাদের প্রথম দফাতেই উল্লেখ করা হয়েছে, ‘এই সভা বাংলার মুসলমান নর-নারীকে বিশেষভাবে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সমস্ত বাঙ্গালীকে কোরানের সহিত পরিচিত হইবার অনুরোধ জানাইতেছে।’

মুসলিম সাহিত্য সমাজের বার্ষিক মুখপাত্র ‘শিখা’র লেখালেখিতে উদার-অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ^বীক্ষার দিকটা বিশেষ প্রাধান্য পেয়েছে। মুসলিম সাহিত্য সমাজ সম্পর্কে মোহিতলাল মজুমদারের পর্যবেক্ষণ হল Ñ ‘ইহা যে সমগ্র বাঙালি জাতির মিলিত সাধনার ক্ষেত্র, ইহা কখনও বিস্মৃত হইলে চলিবে না, বরং এই সাহিত্য সাধনার মধ্য দিয়াই সমগ্র জাতির হৃদয় একই স্পন্দনে স্পন্দিত হইয়া উঠিবে Ñ দুই সম্প্রদায়ের দুই বিশিষ্ট ভাবধারা একত্র প্রবাহিত হইয়া একটি পুণ্য সঙ্গমের সৃষ্টি করিবে। সাহিত্যের মধ্য দিয়াই শ্রেষ্ঠ ভাবরাশির আদান প্রদান সূত্রে যে একটি আদর্শ ফুটিয়া উঠিবে তাহা দ্বারা এই জাতির পূর্ণ মনুষ্যত্ত্ব লাভের উপায় হইবে। তখন উভয়ে উভয়কে খাঁটি বাঙালি বলিয়া চিনিবে এবং পরস্পরের গৌরবে গৌরবান্বিত হইবে। এই উদার আদর্শের সন্ধান যাঁহারা ইতিমধ্যেই পাইয়াছেন, যাঁহাদের ভাবনা ও সাধনা এই উৎকৃষ্ট জ্ঞান ও প্রেমের মন্ত্রে দীক্ষিত হইয়াছে, সেই ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজে’র কর্ম্মিগণকে সমগ্র জাতির কল্যাণকামী, সত্যবান সাহিত্য সেবকরূপে আমি কি বলিয়া অন্তরের ধন্যবাদ জানাইব তাহা জানি না; কিন্তু ইহা জানি যে, আজ যাহা অঙ্কুরিত হইয়াছে একদিন তাহাই বিশাল পাদপরূপে ছায়া বিস্তার করিয়া আমাদের প্রাণের শ্রান্তি দূর করিবে Ñ অদূর ভবিষ্যতে সেই পরমা সিদ্ধি স্মরণ করিয়া আমি তাঁহাদিগকে আন্তরিক শ্রদ্ধাসহকারে নমস্কার করি।’ (‘শিখা’, ৩য় বর্ষ : ১৯২৯)।’’

বাংলা ভাষার ন্যায়সঙ্গত দাবির পাশাপাশি পাকিস্তানের অন্যভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টা আমরা শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণেও উচ্চারিত হতে দেখি। তিনি পাকিস্তানের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে দেয়া ভাষণে এই বিষয়ের প্রতি পরিষদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

পাকিস্তান রাষ্টের ভেতর থেকে ‘বাংলাদেশের নবজাগরণ বিকাশ পর্বের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও আকাক্সক্ষা সম্পন্ন করে নির্মাণ পর্যায়ে উপনীত হয় এবং নানা ঘটনা-প্রবাহের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা ও অভ্যুদয়কে অনিবার্য করে। ১৯২১ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত ইতিহাসের গতিপথকে নানাভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এই পর্বকে, জাগরণ, সাংস্কৃতিক জাগরণ, প্রগতিশীল আন্দোলন ইত্যাদি বলে শনাক্ত করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত যত ধরণের লেখালেখি ও গবেষণা হয়েছে। প্রায় প্রত্যেকের প্রবণতা মোটামুটি একই রকম। কেবল অন্নদাশঙ্কর রায় ও শিব নারায়ণ রায়ের পর্যবেক্ষণ কিছুটা ব্যতিক্রম ও অন্যরকম। উনারা দু’জনই পুরো বিষয়টাকে নবজাগরণের আলোকে দেখেছেন। অবশ্য, এক্ষেত্রে শিবনারায়ণ রায় পর্যবেক্ষণ রেখেছেন কেবল ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর ওপর।

শিবনারায়ণ রায়ের পর্যবেক্ষণ হল : ‘‘‘উঁৎরহম রঃং নৎরবভ ‘ঝরশযধ’ নবপধসব ঃযব পবহঃৎব ড়ভ ধ ঁহরয়ঁব রহঃবষষবপঃঁধষ সড়াবসবহঃ যিরপয নড়ঃয রহ ঃযব ংপড়ঢ়ব ধহফ ারমড়ঁৎ ড়ভ রঃং বহয়ঁরৎু ধহফ রহ ঃযব রহঃবহংরঃু ড়ভ ড়ঢ়ঢ়ড়ংরঃরড়হ যিরপয রঃ মবহবৎধঃবফ ধসড়হম ঢ়ড়বিৎভঁষ ংবপঃরড়হং ড়ভ ঃযব পড়সসঁহরঃু রহ ইবহমধষ ধিং ৎবসরহরংপবহঃ ড়ভ ধহড়ঃযবৎ সড়াবসবহঃ যিরপয যধফ ঃধশবহ ঢ়ষধপব রহ ঈধষপঁঃঃধ বীধপঃষু ধ যঁহফৎবফ ুবধৎং বধৎষরবৎ. ইঁঃ যিরষব সঁপয যধং নববহ ৎিরঃঃবহ ধনড়ঁঃ উবৎড়ুরড় ধহফ যরং ঐরহফঁ ংপযড়ড়ষ ঢ়ঁঢ়রষং যিড় বিৎব শহড়হি পড়ষষবপঃরাবষু ধং ‘‘ণড়ঁহম ইবহমধষ’’, ঃযব ‘ঝরশযধ’ সড়াবসবহঃ ংঃরষষ ধিরঃং ভড়ৎ রঃং যরংঃড়ৎরধহ’’’(ঝযরনহধৎধুধহ জধু : ‘অ ঘবি জবহধরংংধহপব’. ঈধষপঁঃঃধ, ১৯৯৮; চচ.৮২-৮৩). লক্ষ্যণীয়, শিবনারায়ণ রায় ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ-র এই আন্দোলনকে ‘এ নিউ রেনেসাঁ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

অন্নদাশঙ্কর রায়ের অবলোকন এবার একটু দেখে নেয়া যাক। ‘বাংলার রেনেসাঁ’ বইয়ের ‘বাংলার রেনেসাঁস : পুনর্ভাবনা’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন : ‘‘হিন্দু কলেজের মতো ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়েরও ঐতিহাসিত ভূমিকা হলো রেনেসাঁসের উদ্বোধন। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে যে ‘বুদ্ধির মুক্তি’ গোষ্ঠীর উদয় হয় তার নজীর কলকাতার হিন্দু কলেজের ‘ইয়ং বেঙ্গল’ গোষ্ঠী। ডিরোজিও যার নেতা। মুসলমান প্রধান পূর্ববাংলার রেনেসাঁসের সূত্রপাত হয় মূল বাংলার রেনেসাঁসের শতখানেক বছর পরে। এই অস্বাভাবিক বিলম্বের একাধিক কারণ। প্রথম কারণটা হলো খ্রীস্টধর্মের সঙ্গে একাকার ভেবে ইংরেজীর প্রতি অনীহা। এটা হিন্দুদের মধ্যেও কতক পরিমাণে ছিল। ওড়িশায় এ মনোভাব বিংশ শতাব্দীর গোড়াতেও লক্ষিত হয়েছে। চিন্তামনি আচার্যের পিতা তাঁকে ইংরেজী স্কুলে পড়তে পাঠাবেন না, ছেলে পাছে খ্রীস্টান হয়ে যায়। ছেলেকে বাড়ি থেকে পালাতে হয়। অমূলক আশঙ্কা। কিন্তু এর ফলে রেনেসাঁস বিলম্বিত। সারা দুনিয়ার মুসলমান এর দরুন পশ্চাৎপদ। ইংরেজীর প্রতি অনীহা দূর হলো যদি তো বাংলার প্রতি বিরাগ কিছুতেই যায় না। বাংলা নাকি হিন্দুধর্মের সঙ্গে একাকার। পাকিস্তান সৃষ্টির পরেও বাঙালী মুসলমান বাংলার মধ্যে হিন্দুত্বের গন্ধ পায়। যে ভাষা ইসলামের ভাষা নয় সে ভাষা কি করে বাঙালী মুসলমানের ভাষা হবে? অথচ উর্দু শেখাতেও সে উৎসাহ বোধ করে না। প্রতিযোগীতায় উর্দুভাষী মুসলমানের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে না। আরবী হরফে লেখা বাংলা, আরবী ফারসী দিয়ে ‘পাক’ করা বাংলা এমনি কত রকম প্রস্তাবের পর সে বাংলাকেই তার আপন ভাষা বলে মেনে নেয় ও তার জন্যে প্রাণপর্যন্ত উৎসর্গ করে।...

এখন যাকে বাংলাদেশ বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে তার বেলা কিন্তু ভাষাই বড়ো কথা। দেশ তার পরে। পাকিস্তানের সৃষ্টি ধর্ম থেকে। বাংলাদেশের সৃষ্টি ভাষা থেকে। সেখানকার রেনেসাঁস বিলম্বিত হলেও সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে সব সময় মনে রাখতে হবে যে রিয়ালিটির সঙ্গে পা মিলিয়ে নিতে হবে নইলে বাংলাও সংস্কৃত ও ফারসীর মতো পেছনে পড়ে থাকবে।’’ উল্লেখ্য এই প্রবন্ধটি তিনি লেখেন ১৯৭৯-এ।

অন্নদাশঙ্কর রায়ের উপর্যুক্ত অন্বেষা ও অবলোকন বেশ চিত্তাকর্ষক। তিনি ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ-র আবির্ভাবকে কেবল রেনেসাঁ বা নবজাগরণ বলে শনাক্ত করেননি। ওই সময় ও তাঁদের কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় ভাষা আন্দোলনকেও যুক্ত করেছেন। যার মধ্য দিয়ে তিনি নবজাগরণের একটা ধারাবাহিকতাকে সুস্পষ্টভাবে শনাক্ত করেছেন। ‘বাংলার রেনেসাঁস’ বইয়ের ভূমিকা অংশে অন্নদাশঙ্কর রায় লিখেছেন : ‘‘এতকাল আমরা যেটাকে বাংলার রেনেসাঁস বলে ঠিক করেছি বা ভুল করেছি সেটা ছিল অবিভক্ত বাংলার ব্যাপার। পার্টিশনের পর পূর্ব বাংলাÑএখন তো বাংলাদেশÑ নতুন করে জেগে ওঠে। সেখানে দেখা দেয় দ্বিতীয় এক রেনেসাঁস। প্রথম রেনেসাঁসে নায়কদের মধ্যে ইউরোপীয় ছিলেন, খ্রিস্টান ছিলেন, কিন্তু মুসলমান ছিলেন না। দ্বিতীয় রেনেসাঁসের নায়করা প্রায় সকলেই মুসলমান। এবার তাঁরা পা মিলিয়ে নিচ্ছেন। প্রথম রেনেসাঁস ছিল কলকাতাকেন্দ্রিক। দ্বিতীয় রেনেসাঁস হচ্ছে ঢাকাকেন্দ্রিক। এর পূর্বাভাস পার্টিশনের পূর্বেই সূচিত হয়েছিল ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনতিকাল পরে। মুসলিম বুদ্ধিজীবী মহলে যখন জগৎ সম্বন্ধে, জীবন সম্বন্ধে, মানুষ সম্বন্ধে, ধর্ম সম্বন্ধে নতুন করে অনুসন্ধিৎসা জাগে, তখন একে বলা হতো ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলন। এর নায়কদের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলে আবুল হোসেন (হুসেন) ও কাজী আবদুল ওদুদ। গত শতাব্দীর ডিরোজিও ও তাঁর ‘ইয়ং-বেঙ্গল’ গোষ্ঠীর সঙ্গেই এঁদের তুলনা। এঁরাও গোঁড়াদের বিষ নজরে পড়েন। এক্ষেত্রেও প্রবাহিত হচ্ছিল রিভাইভালের স্রোত। মুসলিম রিভাইভালের। রিভাইভালই প্রবলতর। রিভাইভালের স্রোতের তোড়ে দেশ ভেঙে যায়। তারপরে যখন ভাষার প্রশ্নে একুশে ফেব্রুয়ারির শহীদের রক্তে ঢাকার মাটি রঞ্জিত হয় তখন সে মাটিতে জন্ম নেয় দ্বিতীয় রেনেসাঁস। মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের রক্ত তাকে আরো শক্তি যোগায়। ‘বাংলার রেনেসাঁস’ না বলে এর নাম রাখা যাক ‘বাংলাদেশের রেনেসাঁস’।

প্রথম রেনেসাঁস এখনো অসমাপ্ত। রবীন্দ্রনাথের অন্তর্ধানে সে নিঃশেষিত হয়নি। আমাদের মনে জগৎ সম্বন্ধে, জীবন সম্বন্ধে, মানুষ সম্বন্ধে. সমাজ সম্বন্ধে অফুরন্ত জিজ্ঞাসা। তাই আমাদের রেনেসাঁস চলছে, চলবে।’’

ভূমিকাটা তিনি লেখেন ১৯৭৪-র ১৪ আগস্ট।

অন্নদাশঙ্করের মতে, পূর্ববঙ্গের ঢাকায় সংঘটিত রেনেসাঁ হল বাংলার রেনেসাঁর ধারাবাহিকতা। তিনি অবশ্য ধারাবাহিকতাকে একটু অন্যভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। যার নাম দিয়েছেন দ্বিতীয় রেনেসাঁ। তা হলে প্রথম রেনেসাঁ কোনটা? উনি মনে করেন বাংলার রেনেসাঁ হল প্রথম রেনেসাঁ, আর ঢাকার রেনেসাঁ বা বাংলাদেশের রেনেসাঁ হল দ্বিতীয় রেনেসাঁ। অথচ উনার কথা বা যুক্তিকে যদি আমরা আমলে নিই, তা হলে দেখা যাচ্ছে বাংলার রেনেসাঁ কোন রেনেসাঁ নয়। কারণ তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন হিন্দুত্বের কোন রেনেসাঁ হয় না, হয় রেফরমেশন। বাংলাদেশের নবজাগরণ অবশ্যই নবজাগরণ কিংবা রেনেসাঁ। কারণ এটা মুসলমানের রেনেসাঁ বা নবজাগরণ নয়। এটা পূর্ববঙ্গের রেনেসাঁ, যাকে তত্ত্বায়নপূর্বক সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে বাংলাদেশের নবজাগরণ হিসেবে। অন্নদাশঙ্কর রায় আবার এই বাংলাদেশের নবজাগরণকে দ্বিতীয় রেনেসাঁ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। প্রশ্ন হল, কেন এবং কোন যুক্তিতে প্রথম-দ্বিতীয়’র প্রসঙ্গ? এটা কি বঙ্গ বিভাজনের মতো? বঙ্গ-র একপ্রান্তে পূর্ববঙ্গ, অন্যপ্রান্তে পশ্চিমবঙ্গ। যেমনভাবে এক সময় ছিল উত্তরবঙ্গ। অবশ্য বঙ্গে কখনোই শক্তিশালীরূপে দক্ষিণবঙ্গ আসেনি। কারণ বঙ্গের দক্ষিণ সীমান্ত বলতে মূলত বঙ্গোপসাগরকে বোঝায়। 

অন্নদাশঙ্কর রায়ের মতে, কলকাতাকেন্দ্রিক পশ্চিমবঙ্গের রেনেসাঁ হল প্রথম, আর ঢাকাকেন্দ্রিক পূর্ববঙ্গের রেনেসাঁ হল দ্বিতীয় । অথচ দুই নবজাগরণ বা রেনেসাঁর প্রেক্ষাপট, বিষয়, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও আকাক্সক্ষা একেবারে আলাদা। কোথাও কোন মিল নেই। সবচেয়ে বড়ো কথা হল, বাংলার রেনেসাঁর পরিণতি বা চূড়ান্ত কোনো সফলতা এখনও শনাক্ত করা হয়নি। হয়তো সেটা নেইও। কিন্তু বাংলাদেশের নবজাগরণ পুরোই স্বতন্ত্র। এবং তার পরিণতি বা চূড়ান্ত সফলতা, তার উন্মেষ-বিকাশ ও নির্মাণে রয়েছে বিস্ময়কর রকমের গর্ব ও গৌরবের অর্জন। ইতালীয় রেনেসাঁ বা নবজাগরণ যেমন ইউরোপে স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের জন্ম দেয়। বাংলাদেশের নবজাগরণ তেমন স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটায়। একারণে এই নবজাগরণ কোনভাবেই বাংলার নবজাগরণের ধারাবাহিকতা কিংবা দ্বিতীয় নবজাগরণ। এ ছাড়া অন্নদাশঙ্কর রায়ের যুক্তি মোতাবেক প্রথম রেনেসাঁতো কোন রেনেসাঁ নয়, ওটা হিন্দুত্বের রেফরমেশন। বাংলাদেশের নবজাগরণ স্বতন্ত্র এক নব জাগরণ। শিবনারায়ন রায় যাকে বলেছেন ‘এ নিউ রেনেসাঁ’।

সাত.‘বাংলাদেশ’ রাষ্ট্রের স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ঘটনা প্রবাহ সাক্ষ্য দেয় ‘বাংলাদেশের নবজাগরণ’ ছিল ঐতিহাসিক এক বাস্তবতা। যার সূচনা ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি থেকে গতশতাব্দীর প্রথম ভাগের সময়পর্বে হলেও এর সাংগঠনিক প্রকাশ ঘটে দ্বিতীয় দশকে। নবজাগরণ যখন উন্মেষিত হচ্ছে এই ভূখণ্ডের নাম-পরিচিতি তখন পূর্ববঙ্গ রূপে। সেই সময়ের পূর্ববঙ্গবাসী ও বাঙালি মুসলমানের প্রধান আকাক্সক্ষায় পরিণত হয়েছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা, সেই আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে পালন করে কেন্দ্রীয় ভূমিকা।

আবার পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর এর ভেতরেই ওই নবজাগরণের ধারাবাহিকতা চলতে থাকে, যার অনিবার্য বাস্তবতা সশস্ত্র এক স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। এ কারণে এই নবজাগরণের নাম বাংলাদেশের নবজাগরণ। এর ভেতরেই ঢাকার নবজাগরণ তারই কেন্দ্রস্থল কিংবা নাভিমূল বিশেষ।

শেষকথা, এই লেখায় যাকে ঢাকার নবজাগরণ বলা হচ্ছে, তা প্রকৃতার্থে বাংলাদেশের নবজাগরণ। বায়ান্নোর একুশে ফেব্রুয়ারির সবচেয়ে বড় সার্থকতা হল, মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায়, ন্যায্য ও ন্যায়সঙ্গত অধিকার প্রতিষ্ঠার যে লড়াই শুরু হয়েছিল তা প্রথমত ঢাকাকেন্দ্রিক হলেও দ্রুততর সময়ের মধ্যে তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমাবস্থায় কয়েকটি জেলাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে সংঘটিত হলেও-দেশব্যাপী এই ভাষাচেতনা জন্ম দেয় নবজাগরণরূপী এক তরঙ্গের। যার উজ্জ¦ল উদাহরণ হল, চুয়ান্নোর নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ঐতিহাসিক বিজয়। মাত্র দুই বছরের মাথায় অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে পূর্ববঙ্গ তথা পূর্বপাকিস্তানের মানুষেরা ব্যালটের মাধ্যমে যে রায় প্রদান করে তার পেছনে বেশকিছু কারণ ছিল নিশ্চয়। কিন্তু সবচেয়ে বড় কারণ যে ছিল এই ভূখণ্ডের মানুষের মাতৃভাষার প্রতি আঘাত, অবমাননা আর ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে যৎসই এক জবাব, তাতে কোন সন্দেহ নেই। এসবের পেছনে সাংস্কৃতিকভাবে যে মানুষগুলো রেখেছিল দায় ও দরদের পরাকাষ্ঠা; হাসান হাফিজর রহমান ছিলেন তাদের প্রধান প্রতিভূ। 

ড. কাজল রশীদ শাহীন: চিন্তক, গবেষক ও সাংবাদিক।

kazal123rashid@gmail.com