ইতিহাসের নীরব সাক্ষী, কূটনীতির অদৃশ্য দাবা
প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর। একটি মানুষ পলাতক থাকেন, একটি জাতি সত্য থেকে পলাতক থাকে, আর একটি ইতিহাস ধূসর কুয়াশায় ঢাকা পড়ে থাকে। সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর মো. মোজাফফর হোসেনের গ্রেপ্তার তাই কেবল একটি ফেরারি আসামির আইনি পরিণতি নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়ের দরজায় আবার করাঘাত। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড, পরবর্তী সেনা বিদ্রোহ এবং মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুরের রহস্যময় মৃত্যু এই ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গভীরে যে ক্ষত তৈরি করেছিল, তা আজও সম্পূর্ণ সারেনি। এখন যে প্রশ্নটি সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক, তা কেবল বিচারিক নয় তা ভূ-রাজনৈতিক।
জানা গেছে, মেজর মোজাফফর ১৯৮১ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ভারতে অবস্থান করেছেন এবং সে সময় ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার আশ্রয়ে ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি 'বিপ্লব সরকার' ও 'জয় ব্যানার্জি' নামক ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন। এই তথ্য যদি প্রমাণিত হয়, তাহলে এটি শুধু একজন ব্যক্তির আত্মগোপনের গল্প নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত রাজনীতির এক জটিল পরতের উন্মোচন।
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর গোয়েন্দা কার্যক্রম এবং পারস্পরিক কৌশলগত হস্তক্ষেপ কোনো নতুন বিষয় নয়। ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার প্রতিটি রাষ্ট্রই নিজ নিজ ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছে, ইতিহাস তার সাক্ষী। বাংলাদেশের মতো একটি ছোট কিন্তু কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশ, যার অবস্থান বঙ্গোপসাগরের কোলে এবং যে দেশটি ভারত, চীন ও পশ্চিমা শক্তির মাঝে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যে দাঁড়িয়ে আছে, সেই দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে বাহ্যিক শক্তির আগ্রহ থাকা স্বাভাবিক। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর সময়কার আঞ্চলিক রাজনীতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সেই সময়টি ছিল শীতল যুদ্ধের উত্তাল দশক, যেখানে প্রতিটি দেশের ভেতর আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা চলছিল। জিয়াউর রহমান ছিলেন স্পষ্টতই মার্কিন-ঘেঁষা এবং চীনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী একজন নেতা, যা আঞ্চলিক শক্তিসাম্যে একটি বিশেষ অর্থ বহন করত।
এই পটভূমিতে মেজর মোজাফফরের জবানবন্দি যদি সত্যিকার অর্থেই ইতিহাসের অজানা অধ্যায় উন্মোচন করতে সক্ষম হয়, তাহলে তার কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া কেবল দেশের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ঢাকা ও দিল্লির মধ্যকার সম্পর্ক, যা বর্তমানে একটি সূক্ষ্ম পুনর্মূল্যায়নের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, তাতে নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে। বাংলাদেশ সরকারকে তাই এই মামলা পরিচালনায় অত্যন্ত সুচিন্তিত ও পরিমিত কূটনৈতিক কৌশল অনুসরণ করতে হবে। সত্য উদঘাটনের প্রয়াস যেন কোনো বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত না হয় এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে অপ্রয়োজনীয় টানাপোড়েন না তৈরি করে, সেই বিষয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ভূমিকা অপরিহার্য।
আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একটি প্রতিষ্ঠিত নীতি হলো, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিচার প্রক্রিয়া যখন পড়শি রাষ্ট্রের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়ে, তখন সেই বিচারকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামো এবং স্বচ্ছতার আলোকে পরিচালনা করাই শ্রেয়। মেজর মোজাফফরের জিজ্ঞাসাবাদ ও বিচার প্রক্রিয়া যদি উন্মুক্ত, স্বচ্ছ এবং আইনের শাসনের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তাহলে তা একদিকে যেমন দেশের ভেতরে জাতীয় আস্থা পুনর্গঠনে সহায়ক হবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সমাজের কাছে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও বিচারিক পরিপক্বতার বার্তাও পৌঁছে দেবে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বর্তমানে এক নতুন কৌশলগত বিন্যাসের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। চীনের ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক প্রভাব, যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল এবং ভারতের "নেইবারহুড ফার্স্ট" নীতির মধ্যে বাংলাদেশকে তার নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় নিয়ে দাঁড়াতে হবে। এই বাস্তবতায় ঐতিহাসিক সত্য অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া যদি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ারে পরিণত হয়, তাহলে তা দেশের ভেতরে বিভাজন এবং বাইরে কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা দুটোই ডেকে আনতে পারে।
এখানে একটি কথা না বললেই নয়, বঙ্গবন্ধু, জিয়াউর রহমান, মন্জুর থেকে বিডিআর হত্যাকাণ্ড সহ আরো কিছু ঘটনা একটি সুপরিকল্পিত এবং সুক্ষ সুতায় বাঁধা। রাজনীতির উর্ধ্বে উঠে জাতি হিসেবে আমাদের উচিত হবে সেই সুক্ষ সুতার উৎস খুঁজে বের করা।
ইতিহাস কখনো চুপ থাকে না, সে কেবল সময়ের অপেক্ষা করে। মেজর মোজাফফরের গ্রেপ্তার সেই দীর্ঘ অপেক্ষার একটি মোড়। জাতি হিসেবে আমাদের পরিপক্বতার প্রমাণ হবে এই মোড়ে এসে আমরা ক্রোধের বশে পথ হারাই কিনা, নাকি সত্য, ন্যায় ও ঐক্যের পথে স্থিরভাবে এগিয়ে যাই। ইতিহাসের ক্ষতকে সারিয়ে তোলার একমাত্র মলম হলো নিরপেক্ষ সত্য, আর সেই সত্যের শক্তিই একটি জাতিকে বিভাজন থেকে মুক্তি দিয়ে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।