ফ্যাসিবাদের শিকার প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে: প্রধানমন্ত্রী
আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য উপায়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সংঘটিত প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার করা হবে বলে আশ্বস্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বুধবার সকালে রাজধানীর শেরে বাংলা নগরে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন শেষে আয়োজিত ‘জুলাই ৩৬’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন। একই সঙ্গে বিগত ১৭ বছর ও জুলাই আন্দোলনে শহীদ এবং গুম-খুনের শিকার ব্যক্তিবর্গের স্মরণে তাঁদের নিজ নিজ এলাকায় অন্তত একটি করে প্রতিষ্ঠানের নামকরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার বলে তিনি জানান।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে বলেন, “দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ আশা করে এই জাদুঘর কোনো একটি দল, গোষ্ঠী বা ব্যক্তির একক রাজনৈতিক ভাষ্য প্রতিষ্ঠার স্থান হবে না। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান কোনো একক ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা দলের নয়; এই অভ্যুত্থানের মহানায়ক বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ।”
তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে এর তুলনা করে বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল দেশ অর্জনের, আর ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল সেই স্বাধীনতা রক্ষার। একাত্তরের মতো ২০২৪-এর শহীদদেরও দেশের মানুষ কখনো ভুলবে না।
দেশে বর্তমান পরিস্থিতিতে অহেতুক ইস্যু তৈরি করে অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টা সম্পর্কে সবাইকে সতর্ক করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “অহেতুক ইস্যু তৈরি করে কেউ নিজেদের অজান্তেই পতিত ও পলাতক স্বৈরাচারের পুনরুত্থানের পথ সুগম করছেন কি না, সেটি ভেবে দেখার আহ্বান জানাই।”
তিনি দেড় দশকের স্বৈরাচারী শাসনের ভয়াবহতা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালিয়ে গণতন্ত্রকামী মানুষকে হত্যার মতো নৃশংসতা সভ্য জগতে বিরল। দীর্ঘ দেড় দশকের এই নৃশংসতাকে তিনি স্বাধীনতা-পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে তিন বছরের দুঃশাসনের সঙ্গে তুলনা করেন।
জাদুঘরের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি অসম্পূর্ণ বা অতিরঞ্জিত তথ্য এড়িয়ে সত্য ইতিহাস সংরক্ষণের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস জাতিকে শক্তিশালী করে। এছাড়া জাদুঘরের তথ্যসমূহ বিদেশি দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষায় উপস্থাপনের পরামর্শ দেন। একই সাথে এই জাদুঘরে বাংলাদেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাস থাকা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আহত জুলাই যোদ্ধাদের সার্বিক চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে সেবার পাশাপাশি গুরুতর আহত ৫০ জন যোদ্ধা বর্তমানে থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, তুরস্ক, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এছাড়া ১৩ হাজারের বেশি গেজেটভুক্ত জুলাই যোদ্ধাকে সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে মাসিক সম্মানী ভাতা প্রদান করা হচ্ছে।
রাষ্ট্র সংস্কারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে তিনি জানান, বিএনপির ৩১ দফা, নির্বাচনী ইশতেহার এবং ‘জুলাই সনদ’ পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি গণভোটের আকাঙ্ক্ষা পূরণে জাতীয় সংসদে গঠিত ‘সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’ কাজ করছে। গণঅভ্যুত্থানে জনগণের পাশে দাঁড়ানোর জন্য তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানান এবং ঘোষণা করেন, “বাংলাদেশ আর কখনো কোনো তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত হবে না।”
সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। স্বাগত বক্তব্য দেন সংস্কৃতি সচিব কানিজ মওলা।
অনুষ্ঠানে শহীদ পরিবারের সদস্য ফাতেমা তুজ জোহরা, সানজিদা খান দীপ্তি এবং জুলাই যোদ্ধা নিশাত তাবাসসুম প্রাপ্তি আবেগঘন স্মৃতিচারণ করেন।
এছাড়া স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদসহ অন্যান্য মন্ত্রী, উপদেষ্টা, প্রধানমন্ত্রীর কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান, সংসদ সদস্য, দেশি-বিদেশি কূটনীতিক ও বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। আলোচনা সভা শেষে এক বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হয়।