'নাইন ইলেভেন হামলায় চিরতরে বদলে যায় যুক্তরাষ্ট্র-মুসলিম বিশ্ব সম্পর্ক

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৩২ পিএম
আপডেট: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০৯ পিএম
Main News Image

২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের জোড়া ভবনে মাত্র ১৭ মিনিটের ব্যবধানে দুটি বিমান আঘাত হানে। প্রায় একই সময়ে আরও দুটি ছিনতাইকৃত বিমান ক্যাপিটল হিল ও পেন্টাগনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে বিধ্বস্ত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে পরিচালিত নজিরবিহীন এই হামলায় তাৎক্ষণিকভাবে প্রাণ হারান প্রায় তিন হাজার বেসামরিক মানুষ। গত আড়াই দশকে ‘নাইন ইলেভেন’ (৯/১১) শব্দটি বৈশ্বিক রাজনীতির এমন এক বাঁক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে, যা যুক্তরাষ্ট্র এবং মুসলিম বিশ্বের সম্পর্কের সমীকরণ চিরতরে বদলে দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে নজিরবিহীন আঘাত

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪১ সালে হাওয়াই দ্বীপের পার্ল হারবারে জাপানি বাহিনীর আক্রমণের পর এটিই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে প্রথম কোনো আক্রমণ। তবে পার্ল হারবারের সঙ্গে নাইন ইলেভেনের মূল পার্থক্য ছিল এর লক্ষ্যবস্তু। পার্ল হারবার ছিল যুদ্ধকালীন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা, যেখানে প্রাণ হারিয়েছিলেন প্রায় আড়াই হাজার মানুষ। অন্যদিকে নাইন ইলেভেনের নিশানা ছিল হাজার হাজার বেসামরিক মানুষের কর্মস্থল এবং এতে নিহতের সংখ্যা পার্ল হারবারকেও ছাড়িয়ে যায়।

১১ই সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা ৪৬ মিনিটে প্রথম বিমানটি ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের নর্থ টাওয়ারে আঘাত হানে। শুরুতে দুর্ঘটনা মনে হলেও ঠিক ১৭ মিনিট পর দ্বিতীয় বিমানটি সাউথ টাওয়ারে আঘাত করার দৃশ্য সরাসরি বিশ্বজুড়ে সম্প্রচারিত হলে এটি যে একটি সুপরিকল্পিত হামলা, তা নিশ্চিত হয়ে যায়।

হামলার পরিকল্পনাকারী ও বাস্তবায়নকারী

হামলার পরদিনই মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ওসামা বিন লাদেন ও তার প্রতিষ্ঠিত আল কায়েদাকে মূল দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করে। পরবর্তীতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, কুয়েতে জন্ম নেওয়া খালিদ শেখ মোহাম্মদ এই ছিনতাই ও হামলার মূল মাস্টারমাইন্ড ছিলেন।

চারটি বিমান ছিনতাইয়ে সরাসরি অংশ নেয় মোট ১৯ জন আল কায়েদা সদস্য।

'ওয়ার অন টেরর' ও সামরিক আগ্রাসনের সূচনা

হামলার নয় দিন পর, ২০শে সেপ্টেম্বর ২০০১, তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ জুনিয়র জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ওয়ার অন টেরর’ বা ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ ঘোষণা করেন। বিশ্বের অন্য দেশগুলোর উদ্দেশ্যে বুশ চরম বার্তা দিয়ে বলেন, "হয় আপনি আমাদের পক্ষে, না হয় সন্ত্রাসবাদীদের পক্ষে।"

আফগানিস্তানের তৎকালীন তালেবান সরকার ওসামা বিন লাদেনকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিতে অস্বীকৃতি জানালে ২০০১ সালের ৭ই অক্টোবর আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে মার্কিন বাহিনী। এরপর এই বৈশ্বিক যুদ্ধের ধারাবাহিকতায় ২০০৩ সালে ইরাক এবং ২০১১ সালে লিবিয়াতেও সামরিক আগ্রাসন চালায় আমেরিকা।

ইসলামবিদ্বেষ বৃদ্ধি ও মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব

যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে আসছিল যে এই অভিযানগুলো কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে নয়, কেবল সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বজুড়ে মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে মার্কিন সামরিক আগ্রাসনের ফলে তীব্র মার্কিনবিরোধী ক্ষোভ গড়ে ওঠে। পাকিস্তানের মতো দেশগুলোতে এবং ইউরোপের বিভিন্ন শহরেও আমেরিকার এই নীতির বিরুদ্ধে বড় ধরনের বিক্ষোভ দেখা যায়।

একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও সাধারণ মুসলিমদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি রাতারাতি বদলে যায়। এফবিআই (FBI)-এর তথ্য অনুসারে, নাইন ইলেভেনের পর আমেরিকায় ইসলামবিদ্বেষী ঘৃণাসূচক অপরাধের (Hate Crimes) হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পায়:

২০০০ সাল: ইসলামবিদ্বেষী হামলার ঘটনা ঘটে ২৮টি।

২০০১ সাল: হামলার পর এই সংখ্যা লাফিয়ে দাঁড়ায় ৪৮১টিতে (যার ৮০ শতাংশই ঘটেছিল ১১ই সেপ্টেম্বরের পর)।

এর পরের দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্রে এই ধরনের অপরাধের সংখ্যা প্রায় কোনো বছরই ১০০-এর নিচে নামেনি।

নাইন ইলেভেনের ঘটনা শুধু আমেরিকার নিরাপত্তা ধারণাকেই ওলটপালট করেনি, বরং আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি, বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ দমন নীতি এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে মুসলিম সম্প্রদায়ের সম্পর্কে এক দীর্ঘস্থায়ী জটিলতার সৃষ্টি করেছে।