পাক সেনার নির্যাতন-লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বালোচ নারীরা: নায়েলা
নায়েলা কাদরি বালোচ। ছবি: সংগৃহীত
পাকিস্তান ও চীন কর্তৃক বালোচিস্তানের প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠন এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হত্যা, গুম ও চরম নির্যাতনের বিরুদ্ধে দিনে দিনে তীব্র হয়ে উঠছে স্বাধীনতাকামী বালোচদের দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক ও সশস্ত্র প্রতিরোধ। ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের সময় থেকে শুরু করে বর্তমান দখলদার পাকিস্তান ও ইরানের হাত থেকে নিজেদের অখণ্ড ভূমি রক্ষা করতে বালোচ জনগণ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। সাক্ষাৎকারভিত্তিক এই প্রতিবেদনে নির্বাসিত বালোচ সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও মুক্তি আন্দোলনের জনপ্রিয় নেত্রী নায়েলা কাদরি বালোচ বালোচিস্তানের আন্দোলন, নারীদের অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির নানা দিক তুলে ধরেছেন।
শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ও নারীদের অগ্রণী ভূমিকা
বালোচ যকজেহতি কমিটির (বিওয়াইসি) মতো সংগঠনের মাধ্যমে পরিচালিত গণআন্দোলনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো নারীদের নেতৃত্ব এবং স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে থেকেই বালোচ গণহত্যা বন্ধ এবং গুম হওয়া প্রায় ৮৫ হাজার নাগরিককে স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানানো হলেও পাকিস্তান সরকার যেকোনো বৈধ বালোচ দাবিকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ হিসেবে চিহ্নিত করছে। আন্দোলনকারী নেতানেত্রীদের ওপর মিথ্যে মামলা দিয়ে সাজা প্রদান, হত্যা এবং তুলে নিয়ে গুম করার নীতি বজায় রেখেছে রাষ্ট্রশক্তি।
বালোচ নারীদের সংগ্রামের সামনের সারিতে আসা কেবল পরিস্থিতির চাপেই নয়, বরং বালোচ সমাজের কঠোর পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার শৃঙ্খল ভেঙে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাঁদের যুক্ত করার জন্য বিগত পাঁচ দশকের একটি পরিকল্পিত কৌশলের ফসল। পাশাপাশি পাক সেনাবাহিনীর "কিল অ্যান্ড ডাম্প" (হত্যা করে ফেলে দেওয়া) নীতি ও চরম নির্যাতন নারীদের রাস্তায় নামতে বাধ্য করেছে। সেনাশিবিরের নির্যাতন কিংবা ধর্ষণ-কক্ষে প্রাণ দেওয়ার চেয়ে দখলদারদের বিরুদ্ধে লড়াই করে সম্মানজনক মৃত্যুকেই শ্রেয় মনে করছেন বালোচ নারীরা।
ইতিহাসের দীর্ঘতম গণপ্রতিবাদ ও গণমাধ্যমের নীরবতা
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খুব কম স্থান পেলেও বালোচদের এই আন্দোলন বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ ও শান্তিপূর্ণ লড়াই।
দীর্ঘতম লং মার্চ: ২০১৩ সালে রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড ও গুমের বিরুদ্ধে কোয়েটা থেকে করাচি হয়ে ইসলামাবাদ পর্যন্ত প্রায় ৩,০০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে মানব ইতিহাসের দীর্ঘতম শান্তিপূর্ণ লং মার্চ করা হয়।
৯,০০০ দিনের অবস্থান: গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের তৈরি ‘ভয়েস অফ বালোচ মিসিং পারসন্স’-এর অবস্থান কর্মসূচি টানা ৯,০০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে চলছে। ২০০০ সালে ৮০ বছরের বৃদ্ধা বিবি মাহতাব রাইসানি এটি শুরু করেছিলেন, যাকে ২০১০ সালে পাকিস্তানি গুপ্তচরেরা বিস্ফোরণে হত্যা করে।
সম্পদ লুণ্ঠন ও অর্থনৈতিক নিপীড়ন
সোনা, তামা এবং প্রাকৃতিক গ্যাসে সমৃদ্ধ হলেও বালোচিস্তানের জনগণকে ইচ্ছাকৃতভাবে দারিদ্র্যসীমার নীচে রাখা হয়েছে। শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের পুষ্টি থেকে বঞ্চিত করাকে নায়েলা কাদরি বালোচ এক ধরনের ‘পরিকল্পিত গণহত্যা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
গদর বা চাবাহার বন্দর প্রকল্পের মতো মেগা প্রকল্পে স্থানীয় বালোচদের অর্থনৈতিক সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না; বরং ‘চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর’ (CPEC)-এর নামে বালোচদের নিজেদের জমি থেকে গণ-উচ্ছেদ করা হচ্ছে। কাটার উপযোগী শস্য ও ফলের বাগান পুড়িয়ে দেওয়া এবং পারমাণবিক পরীক্ষার ফলে সৃষ্ট টানা ছয় বছরের খরায় অঞ্চলের ৯০ শতাংশ গবাদি পশু ও বন্যপ্রাণী ইতিমধ্যে ধ্বংস হয়ে গেছে।
নির্বাসিত সরকার ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির চ্যালেঞ্জ
বালোচিস্তানের স্বাধীনতা আন্দোলনের একটি বড় প্রশাসনিক মাইলফলক হলো নির্বাসিত সরকার গঠন। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মহলকে বার্তা দেওয়া হচ্ছে যে, বালোচিস্তানের সংকট পাকিস্তানের কোনো অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, বরং এটি একটি দখল হওয়া রাষ্ট্রের গল্প। অর্থনৈতিক সাহায্য বা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এ সংকটের সমাধান সম্ভব নয়; দখলদারিত্বের স্বীকৃতি এবং অবিলম্বে গণহত্যা বন্ধ করাই একমাত্র পথ।
সংবিধান প্রণয়ন, প্রতিনিধি পরিষদ ও বৈদেশিক সম্পর্ক বিভাগ গঠনের মাধ্যমে ভবিষ্যতের বালোচ রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি করা হলেও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে কিছু বাধা রয়ে গেছে। দখলদার রাষ্ট্রগুলোর বিরোধিতা ছাড়াও সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক মিত্রদের নীতিহীন অবস্থান অন্যতম বাধা। অনেক সময় রাষ্ট্রপুঞ্জ বা বিশ্বমঞ্চে বালোচদের স্বাধীনতার দাবিকে সমর্থন না করে নিজেদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থে প্রক্সি বা চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা চালানো হয়। তা সত্ত্বেও রাষ্ট্রপুঞ্জের সদস্য দেশগুলোর কাছে বালোচিস্তানের স্বাধিকারের বিষয়টি তুলে ধরে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে কাজ করে যাচ্ছে নির্বাসিত বালোচ সরকার।